somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রামচাঁন্দ পাকিস্তানী

২৯ শে অক্টোবর, ২০০৮ সকাল ৭:৫৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মা বাবাকে কেনো বেশী চা দিয়েছ, তাকে কেনো কম দিয়েছে, তাই নিয়ে রাগ করে চা ফেলে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বেখেয়ালে বর্ডার পার করে ইন্ডিয়ায় ঢুকে গিয়েছিলো পাকিস্তানের সীমান্ত-অধিবাসী আট বছরের শুদ্র-হিন্দু রামচাঁন্দ। ক্ষেতে কাজ করতে থাকা বাবা দূর থেকে ছেলেকে বর্ডারের দিকে যেতে দেখে হাল-চাষ ফেলে খুঁজতে খুঁজতে নিজেও একসময় ভুলে পার হয়ে যায় সাদা সাদা পাথরগুলো। এরপর বাবা আর পুত্রের ইন্ডিয়ার জেলে কাটানো দিন এবং সাদা পাথরের ওপারে গলা ফাঁটিয়ে পুত্রের নাম ধরে চিৎকার করতে থাকা এক মা-কে নিয়ে সামান্য এক কাহিনী। অনেকটা আমাদের দেশের সীমান্তে সাদা পাথর পার না হয়েও বিএসএফের গুলি খেয়ে মরে যাওয়া বা লা-পাত্তা হয়ে যাওয়া একটা/দু’টা/তিনটা/চারটা টগবগে ছেলের কাহিনীর মত যার সদ্য বিবাহিতা বউ অথবা মা ‘ও হরিপদ, বাবা ফিরে আয়’ ‘ও হান্নান, বাবা ফিরে আয়’ হাহাকারে ক্লান্ত হয়ে একসময় ভাষাহীন হয়ে যায়।

সাধারন কাহিনী।
কাগজে/যান্ত্রিক স্ক্রীনে খবরটার উপর চোখ বুলাতে গিয়ে একটু দীর্ঘশ্বাস, একটু থমকে দাঁড়ানো, তারপর আমাদের জীবন আবার চলে যায় জীবনের মত। অথচ এই ভীষন সাধারন দাগ-না-কাটা আর দশটা কাহিনীর মতই মুভিটার ভিতর দিয়ে আমি কেনো যেনো হাজার হাজার মাইল দূরের সীমান্ত নারী রামচাঁন্দের মা চম্পাকে স্পষ্ট দেখতে পাই। মুভি শেষ।কিন্তু তারপরও-
কিচেনে রান্না বসিয়ে আলু কাটতে কাটতে বেখেয়ালে আমি চম্পাকেই ভাবি।
ছোট ছোট কিছু সাদা পাথরের প্রচন্ড শক্তির কথা ভাবি।
এপার-ওপার শব্দেরও ওপারে আকাশে বিনা-পাসপোর্টে সাদা পাথরের উপর দিয়ে উড়ে যাওয়া পাখিদের কথা ভাবি।
৪৭’এর সেই সীমানা পেরিয়ে আসা লাশ আর রক্ত ভর্তি ট্রেনের কথা ভাবি।
মানুষের ভিতরের প্রচন্ড বর্বরতা আর পাশবিকতার কথা ভাবি।
চম্পার লাল শাড়ি আর সবুজ ব্লাউজের আড়ালে তার দু’হাত ভর্তি সাদা চুড়ির কথা ভাবি।

পৃথিবীর অঘোষিত কিন্তু শ্বাশত নিয়মের ধার ধেরেই একলা সেই অপেক্ষমান বউ’র দিকে লাল চোখে তাকিয়ে থাকে সমাজ। একদিকে স্বামী আর পুত্রের ফিরে আসার আশায় সীমান্তের দিকে ক্লান্ত-ঘুমহীন চোখে তাকিয়ে থাকা নারী, আরেকদিকে সমাজের পুঁথি-বদ্ধ আচারাবলী। নারী, তুমি যে শান্তিতে অপেক্ষাও করতে পারবেনাগো!

আর তাই পালিয়ে থেকে অপেক্ষা।
এরপরও জীবন এভাবেই যাপিত হয়। কেউ একজন সে যেনো না খেয়ে মরে না যায় এই ভেবে বাড়ির ভিতর গম রেখে যায়। লোলুপ শিকারীই শিকারের অসহায়তায় সমাজকে ফাঁকি দিয়ে সাহায্য করে যায়, রেখে যায় তার ছেলের সেই শেষ স্মৃতি। মা সেই স্মৃতি আকঁড়ে ধরেই পৃথিবী থেকে চলে যেতে চেয়েও পারেনা। দূরের মরিচীকাকেই শেষ সম্বল হিসেবে আঁকড়ে ধরে বউ তার স্বামীর পথের উপর পরে থাকে, মা তার ছেলের পথের উপর পরে থাকে। আর জেলের ভিতর রিক্ত অসহায় ছেলেকে একবার গাঁজাখোরের হাত থেকে, আরেকবার পার্ভার্টের হাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে মার খাওয়া পিতা অবশেষে যখন তিতিবিরক্ত হয়ে “তেরে লিয়েই সাবকুছ হুয়া হ্যায়” বলে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে কাঁদতে বসে, জেলের ভিতরেই একবছর কাটিয়ে দেয়া রামচান্দের ছোট চেহারাটা ভিজে যায় চোখের পানিতে। পুরো পৃথিবীর উপর অভিমানে কাঁদে রামচাঁন্দ।

রামচাঁন্দের সাথে আমিও কাঁদি। ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড কান্ট্রিতে বিশাল এপার্টমেন্টে নরম সোফায় গরম চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বসে, আমিও কাঁদি। হয়তো দুঃখবিলাসিতা করে। হয়তো আসলেই রামচাঁন্দের কান্না ছুঁয়ে গিয়ে। অথবা হয়তো হান্নান আর হরিপদের মত সীমান্তের ওপারে হারিয়ে যাওয়া, স্রেফ হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর জন্যে কাঁদি। কিংবা হয়তো শুধু আটবছরের রামচাঁন্দের জন্যেই কাঁদি।

অবশেষে একদিন বাবার শার্টের কলার নিয়ে খেলতে থাকা ছোট্ট রামচাঁন্দের খুশীতে ঝলমল প্রশ্ন, ‘বাবা আমরা কী এখান থেকে ট্রেনে করে যাবো?’
‘কতদিন লাগবে বাবা?’
‘বাবা আমি কিন্তু এই শার্ট, প্যান্ট পরে যাবো! আংরেজদের মত!’
‘বাবা, কাকার জন্যেও নিয়ে যাবো!’

আর বাবা?
নিজের স্ত্রীর সেই লাজমাখা মুখের কথা ভেবে, সেইসব চুপি চুপি ভালবাসার রাত্রিগুলোর কথা ভেবে, অথবা কাজ করার সময় অনুরাগে লজ্জায় ঝামটা মারার কথা ভেবেই হয়তো বাবা জিজ্ঞেস করে, ‘তোর মাকে যখন প্রথম দেখবি কী বলবিরে বেটা?’ তার গলার কাছে অনুভূতি সব দলা পাকিয়ে আটকে যায়। পৃথিবীর সব অন্যায্য অন্যায়ের কথা ভুলে গিয়ে তার চোখের সামনে শুধু সেই মায়াভরা ভালবাসার মানুষটি ভেসে থাকে। সে জানে এতদিন পর বউকে দেখে সে কোনো কথাই বলতে পারবেনা যে!

কিন্তু জীবনের লীলাখেলা যে এত সহজে শেষ হবার নয়। মরুভূমি’র সহজ সরল গ্রাম্য শংকর ছেলের সাথে কদর্য-জেলের চীপা গলিতেই ফিরে আসে আবার। বউ তার সুদী-মহাজনের ঋণ চুকাতে চুকাতেই দিন কাটায়। নতুন শাড়ী কিনে, কিন্তু সে শাড়ী যে কার জন্যে- তাই এক বিশাল প্রশ্ন হয়ে থেকে যায়। আর সুপারিটেন্ডেন্ড ম্যাডামের সাথে বসে টিভি স্ক্রীনের নায়িকার মাঝে ম্যাডামের চেহারার মিল খুঁজে রামচান্দ।

অবশেষে একদিন, বার বছরের রামচান্দ একলা বর্ডারে দাঁড়িয়ে ভাবে- বাবা ভিনদেশী জেলে, মা হয়তো বেঁচে-হয়তো মরে, পুরো পৃথিবীই যেনো শুস্ক মরুভূমি। রামচাঁন্দ বর্ডারের দিকে হাঁটে। ওর সাথে সাথে হাঁটি আমিও। হাঁটতে হাঁটতেই সিডনীর রাস্তা দিয়ে সাঁই সাঁই করে চলে যাওয়া গাড়ি, ছোট ছোট টুকরো কাপড় পড়া নারী, আর ছবির মত সাজানো বাড়ি দেখতে দেখতে রামচাঁন্দ মলিন হয়ে আসে চোখের সামনে। একটু আগের কান্নাও অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। দোকানের সেন্সরড দরজা আমার ছায়াতেই অটো খুলে যায়। আজকে আমার ফ্ল্যাটম্যাটের বার্থডে। মাথা চুলকে ভাবি কী কেনা যায়!
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে অক্টোবর, ২০০৮ ভোর ৪:৫৫
২৯টি মন্তব্য ২৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকাল

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৭ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:৫১



আজকাল আমার মনে হয় -
আমাকে কেউ পছন্দ করে না,
কারো কাছে গেলে, সে বিরক্ত হয়।
পোশাক অগোছালো, এলোমেলো চুল,
চোখের দৃষ্টি কেমন ঘোলাটে!
বীরত্ব দেখানোর কিছু নেই।
চতুর পুরুষ স্ত্রীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে ৯টি বছরঃ একজন লিলিপুটিয়ান থেকে সত্যিকার ব্লগার হয়ে উঠার গল্প

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২৮

আজ আমার ৩য় বইয়ের জন্য চুক্তি করতে প্রকাশক আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। প্রকাশনা সংস্থা 'উত্তরণ'-এর মাসুদ ভাইয়ের বাংলাবাজারের অফিসে ঘণ্টাখানেক ছিলাম। তাঁর সাথে কথা বলতে বলতেই আমার মনে একটি বোধোদয় আসে! আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×