ভিনদেশী সম্পূর্ণ অপরিচিত কেউ, যাদের সাথে কাজের জায়গায় সপ্তাহে দু’একদিন দেখা হলে দুই তিন মিনিট ছোট ছোট বাক্য বিনিময় ছাড়া আর কোনো পরিচয় নেই; এসে যদি খুব অবাক হয়ে সরাসরি চোখের দিকে তাকিয়ে বলে ‘মাই গার্ল, ইউ আর আপসেট টুডে’; বুকটা তখন কেমন হঠাৎ করে খালি হয়ে যায়, কেমন করে চোখ ভরে পানি চলে আসে, কেমন করে পৃথিবীর সব মানুষকে তখন ক্ষমা করে দিতে ইচ্ছে করে, এমনকি নিজেকে পর্যন্ত! কেমন করে ইচ্ছে করে আম্মুর কোলে মুখ লুকিয়ে কিছুই না বলে সব কথা বলে ফেলি! কেমন করে ইচ্ছে করে সেন্ট্রালের টানেলটা লম্বা হতে হতে শেষহীন হয়ে যাক, আর আমি টানেলের ভিতরে গীটার বাঁজাতে থাকা হিপ্পী মেয়েটার টুং টাং শুনতে শুনতে আজীবন এই টানেলে হাঁটতে থাকি। কেমন করে ইচ্ছে করে……… কেমন করে কত কিছু যে ইচ্ছে করে!
আমি হাসি।
বলি, ‘নাতো!’
বৃদ্ধ বৃদ্ধা আমাকে অপ্রস্তুত করে দিয়ে হোহো করে হাসেন। আমি অবাক হই। বৃদ্ধা বলেন, এক জীবন পার করে দিয়ে মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষকে মিথ্যে বলা এত সহজ নয়।
এই বৃদ্ধ বৃদ্ধা কেন যেন আমাকে ‘মাই গার্ল’ ডাকেন। ওনাদের নিজেদের একটা মেয়ে আছে। নিউয়র্ক থাকে। শিল্পী মেয়ে। একদিন সে মেয়ের ছবিও দেখিয়েছেন বৃদ্ধা পার্স খুলে। অদ্ভূদ সুন্দর হাস্যোজ্জ্বল সেই মেয়ের সাথে বিন্দুমাত্র মিল নেই আমার। তাছাড়া ইট-পাথর আর সব কিছু সিস্টেমের এই দেশে যখন খুব কম মানুষই কাছের মানুষদের ছাড়া অন্যদের সাথে শুধু ‘হাই-হ্যালো’র ভদ্রতাতেই বন্দী, তখন এই বৃদ্ধ বৃদ্ধা চোখে লাগার মত আন্তরিক।
‘হোম সিকনেস?’
আমি আবারও হাসি।
আম্মু এখন কী করছে? আব্বু? আর চট্রগ্রামের চকবাজারের ঐ রাস্তাটাতে কী এখন জ্যাম লেগে আছে? মনে হয়না। বিকেলে সাধারনত জ্যাম কম থাকে। আর ডাস্টবিনটা? ময়লাগুলো কি এখনো রাস্তায় ওভাবেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে আর কাকগুলো সারাক্ষন ডাষ্টবিন ঘিরে কা কা করতে থাকে। পোষ্ট অফিসের সেই দাদুটা কি এই ভার্চুয়াল পোষ্ট অফিসের যুগেও এখনো ঝিমুতে ঝিমুতে চিঠির উপর ডাকটিকিট লাগিয়ে যান। জেবুর পিচ্চিদু’টো, আর সেই রিকশাওয়ালা আংকেল……
বৃদ্ধ বৃদ্ধাকে আশ্বস্ত করি। তারা চলে যান। যাওয়ার সময় বৃদ্ধ পিছন থেকে বৃদ্ধাকে এক হাত দিয়ে বেড় দিয়ে রাখেন। দু’জন আস্তে আস্তে হাঁটেন। আমি পিছন থেকে তাদেরকে দেখি। আমার চোখে আবার পানি চলে আসে। কেউ একজন একসময় আমাকে ‘কাঁদুনিবুড়ি’ ডাকতো। আজকাল সত্যি সত্যি মনে হয় ছিঁচকাঁদুনে টাইপ হয়ে যাচ্ছি।
ট্রেনের দুলুনিতে চোখ বন্ধ করতে গিয়েও বন্ধ করতে পারিনা। খেয়াল রাখতে হয় ট্রেনে পর্যাপ্ত পরিমান যাত্রী আছে কিনা। নাহলে এই রাতের বেলা বগি চেইঞ্জ করে যে বগিতে যাত্রী আছে ওটাতে চলে যেতে হবে। ক’দিন আগের বিশ্রী অভিজ্ঞতা এখনো কাহিল করে রেখেছে মনকে। ঘুম তাড়াতে বাইরে তাকাই। টানেলের ভিতর দিয়ে ট্রেন যাচ্ছে। ঘুটঘুটে অন্ধকার।
ক্লাসের একগাদা পড়ালেখা মাথায় ঘুর ঘুর করে। ব্লগ জীবনকে অনেক অনেক দূরের মনে হয়। পত্রিকার পাতার মন খারাপ করা সব খবরকে দূরের মনে হয়। আব্বুম্মুকে অনেক দূরের মনে হয়। আয়েশার সাথে হেঁটে হেঁটে মেয়ে হিমু হয়ে যাওয়ার সাধনাকে অনেক দূরের মনে হয়। ইউনির হলের কুক নাহার আন্টির লুকিয়ে রেখে দেয়া খাবারের মোহনীয় গন্ধকেও অনেক দূরের মনে হয়। পেশোয়ারের হেনাদের কিচেনের কাহওয়ার মন মাতানো সুঘ্রানটাকেও অনেক দূরের মনে হয়। সেদিনের নারীবাদী প্রফেসরটার প্রানচঞ্ঝল সেমিনারটাকে দূরের মনে হয়। মানুষ, দেশ আর শত সহস্র সমস্যায় জর্জরিত পুরো পৃথিবীটাকেই কেমন দূরের মনে হয়।
সিডনীর কোনো এক জায়গায় মাটির নীচের টানেলের ভিতর দিয়ে ঝিক ঝিক করতে করতে ছুঁটতে থাকা ট্রেনের ভিতর ঝিমুতে ঝিমুতে ঘুটঘুটে অন্ধকার দেখতে দেখতে ঘরে ফিরতে ফিরতে বগির ভিতর মানুষগুলোকে খেয়াল রাখতে রাখতে, কেন যেন, বিকেলবেলার সেই বৃদ্ধ ভদ্রলোক তার বৃদ্ধা বউকে আগলে ধরে রেখে আস্তে আস্তে হেঁটে বের হয়ে যাওয়াটাকে বড্ড কাছের মনে হতে থাকে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



