somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মাগনা উপদেশে চিত্ত বিনোদনের আলাপচারিতা

২১ শে জুন, ২০০৯ বিকাল ৩:৫৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



মাগনা উপদেশে কার কেমন লাগে জানিনা, আমার মাঝে মাঝে বিনোদিত বিনোদিত মনে হয় নিজেকে।
অদ্ভূদ সব ইচ্ছে ঘুরে তখন মাথার ভিতর। খুব সম্ভব মাঝে মাঝে চোখেও সে ইচ্ছেরা রিফ্লেক্ট করে।
মাদ্রাসায় পড়ার সময় ক্লাসের অন্যরা, বিশেষ করে এ্যাশ বলতো, তোর চোখ গুলা হাসের ডিমের মত। (এ্যাশ, খবরদার অস্বীকার করবিনা শালার শালা! সাক্ষী আছে কিন্তু)।
হাঁসের ডিমের মত চোখে ইচ্ছেদের রিফ্লেক্ট করতে সুবিধা হয় মনে হয়।
তাই মুখে যতই মিঠে কথা বলে বাধ্য মেয়ের মত ঘাড় নাড়াই না কেনো, উপদেশ দাতারা প্রায় সময় কীভাবে যেন টের পেয়ে চুপ মেরে যান। মনে মনে হয়তো গালিও দেন ‘বেয়াদ্দব মেয়েছেলে!’
মেয়েদেরকে ‘মেয়েছেলে’ গালি দিতে অনেকেই বেশ সুখ পান। এটা অবশ্য আমার হাইপোথিসিস, এবং এই হাইপোথিসিসে আমি নিজে হয়তো সুখ পাই বলেই বিশ্বাস করি।
আমি কত বিচিত্র! (এখানে ‘মানুষ কত বিচিত্র’ বলে জেনারালাইজেশন করাতে মন চাইলোনা)।

সে যাই হোক, মাগনা উপদেশের কথা হচ্ছিলো।
স্কার্ফ পড়ার বদৌলতে অনেক সৌভাগ্যজনক, দূর্ভাগ্যজনক নিত্যদিনের ঘটনার মধ্যেই এই ভদ্রলোকের আগমন। ভোরে এলার্ম বাজলে এলার্মে স্নুজ দিয়ে দিয়ে আবার দশমিনিট দশমিনিট করে ঘুমাই। এই করে করে প্রতিদিন দৌঁড়ুতে দৌঁড়ুতে ট্রেন ধরতে স্টেশন। ইদানীং অবশ্য পুরা সপ্তাহের জন্যে একসাথে পিংক পাস কাটলেও তখন ডেইলী সিংগল কাটতাম। অতএব কাউন্টারের লাইনে দাঁড়িয়ে উশখুশ আর গলা বাড়িয়ে ট্রেন এসে চলে গেল কিনা দেখার চেষ্টা।
সেদিনও দৌঁড়ে আছি। তারমধ্যে ভদ্রলোকের গপ্প! ‘আসসালামু আলাইকুম!’
অবাক হইনা।
আমার স্কার্ফ দেখে ‘হাই হ্যালো’র বদলে মুসলিমদের অনেকেই সালাম দিতে পছন্দ করে।
‘ওয়ালাইকুমুস সালাম’ বলে যখন মানিব্যাগ হাতড়াচ্ছি খুচরো পয়সার জন্যে, তখনি টুক্কুশ করে পিংপং বলের মত গড়িয়ে আসলো প্রথম উপদেশ, ‘ইফ সামওয়ান সে ইউ আসসালামু আলাইকুম, ইউ’ল হ্যাভ টু সে ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়ারাহমাতুল্লাহ’।
ভ্রুকে কুঁচকে যেতে না দিয়ে আমার সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর হাসিটা উপহার দেই।
বাবার বয়সী ভদ্রলোক আমার মেয়ের মত হাসিতে বিগলিত হন।
আমি হাসি ধরে রেখেই বলি ‘ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়ারাহমাতুল্লাহ’।
তিনি খুশী।
আমিও খুশী টিকেট হাতে পেয়ে।
দৌঁড়ুতে দৌঁড়ুতে চলে যাই।

ক’দিন পর ওনার আবার শিফট! দূর থেকে ওনার চেহারা দেখে কাউন্টার চেইঞ্জ করার আগেই আই কন্টাক্ট!
ভদ্রলোক যেন নিজের মেয়ের দেখা পেয়েছেন, এমন খুশীতে ঝল মল করে উঠেন।
একবার মনে হলো, হাসির মায়েরে বাপ, এম্নিতেই লেইটে আছি, কাউন্টার চেইঞ্জ করে ফেলি!
কিন্তু আবার কেনো যেনো এই ছোট্ট ইনসাল্টটা করতে মন চাইলোনা।
অতএব পালটা মুচকি হাসি ধরে রেখে টিকেট হাতে নেওয়া।

তিন চারদিনেই নিজের মেয়ে বানিয়ে ফেললেন আমাকে। এবং সেই সাথে উপদেশের ঝুড়ি।
এইখানে বড় হয়েছো, কাফিরদের দেশে, ইসলামের অনেক কিছুই তো জানোনা- এইরকমের উপদেশ।
আমি ইচ্ছে করে বলিনা যে আমি মোটেও এইখানে বড় হইনাই। এক বছর হইছে মাত্র আসছি।

সেদিন রাতে আবার মোলাকাত। এইবার কাউন্টারের ভিতর না, সিড়িতে। ইয়া বিশাল এক সাইনবোর্ড নিয়ে নামছেন। আর আমি পিঠের উপর বস্তার মত ব্যাগের ভার সামলাতে সামলাতে সারাদিনের দৌঁড়াদৌঁড়ি শেষে ঘরে ফিরছি।
মেজাজ এমনিতেই তিনশ নয়।
‘হেয়ার ইউ আর! আই হ্যাভন’ট সিন ইউ ফর ফিউ ডেইজ!’
মুচকি হাসি। বস্তাটা ফেলে দিয়ে সিড়িতেই বসে পড়তে ইচ্ছে করে। কিন্তু এখনো প্রায় দশ মিনিটের হাঁটা। একবার মনে হলো বলি, ‘আংকল, রাস্তা মাপেন। বহুত বাপগিরী দেখাইছেন’।
ভদ্র হওয়ার চেষ্টা সৎ হওয়ার চেষ্টাকে বাঁধা দেয়।
অতএব মিথ্যা করে মুচকি হাসি।
‘লিসেন মাই ডিয়ার, ডু ইয়ু নো হোয়াট ইজ দ্য এরাবিক অফ হেভেন?’
(এই লাইনে এসে যারা চিন্তা করছেন কোনো কথা বার্তা ছাড়াই কেউ আলাপের প্রথম লাইনে এসেই এই ধরনের প্রশ্ন করে নাকী?!- তারা এখানেই খ্যামা দেন। আর পড়ার দরকার নাই। দুনিয়াতে যে কত কিসিমের মানুষ আছে তার এক কিসিম এই ভদ্রলোক, সে আমার খেয়ে দেয়ে ঠ্যাকা পড়েনি কাউকে বিশ্বাস করাতে যেতে।)
-ইয়েস আংকল। ইটস কল্ড ‘জান্নাহ’।
-ব্র্যাভো মাই ডার্লিং, ব্র্যাভো। ইউ অলরেডী নো দ্যাট। দ্যান, ডু ইউ নো হোয়াট ইজ দ্য ল্যাংগুয়েজ অভ জান্নাহ?
পিঠের ব্যাগটা কী লোকটার মুখে ছুড়ে মারবো?
দুনিয়াদারী যদি আসল হিমুদের হতো, তাহলে হয়তো এই জায়গায় আমি ব্যাগ ছুড়ে মারতাম।
কিন্তু দুনিয়াদারী হিমুদের না। মেয়ে হিমুদের তো প্রশ্নই আসেনা।
আমি তাই আরেকটা সেকেন্ডারী হাসি দিয়ে বলি, - ইয়েস আংকল। এরাবিক।
মনে মনে গালি দেই। তোর এরাবিকের মায়েরে বাপ।
-ইয়েস ইয়েস! ইউ আর ভেরী গুড গার্ল। নাউ লিসেন, ইউ উইল হ্যাভ টু লার্ন এরাবিক। আদারওয়াইজ হাউ উইল ইউ স্পীক ইন হেভেন হোয়েন ইউ উইল গো টু হেভেন?
প্রশ্নটা করে খুব আত্নতুষ্টি নিয়ে বাবা বাবা হাসি দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। যেন আমাকে এইবার বাগে পেয়েছেন।
আমিও ধরা পড়ার হাসি দেই।
তারপর তেলিয়ে বলি ‘ইয়েস আংকল। ইউ আর রাইট। আই উইল লার্ন এরাবিক, আই উইল লার্ন ইট ফ্রম ইউ’।
ব্যাস, তেলে ভেসে গেলেন তিনি।
আমিও কোনোরকমে সেদিনের মত ইতি টেনে অবশেষে বাড়ি।

অস্ট্রেলিয়ায় যত মাগনা উপদেশ পেয়েছি, তারমধ্যে এই উপদেশ ছিল সবচেয়ে পিক্যুলিয়ার।
কিন্তু পুরো জীবনে যত উপদেশ পেয়েছি, তারমধ্যে সবচেয়ে পিক্যুলিয়ার ছিল এক পাকিস্তানী মেয়ের।
নাম নাই বলি।
আই আই ইউ আই মেয়েদের হলে রমজান মাস। আসরের নামায শেষ বের হয়ে আসছিলাম মসজিদ থেকে, মসজিদের দরজায় সে দেখি খুব চিন্তিত হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। উর্দূতে সে যা বললো তার সারাংশ হলো- তুমি খোঁপা করে নামায পড়েছো কেনো?? তোমার নামায তো হবেনা!
আমার অবাক হওয়ার ক্ষমতা মনে হয় কিছুটা কম।
তাই সেখানেও মুখে হাসি ধরে রেখে বলেছিলাম, ‘তাই নাকি?! কেনো? কেনো? খোঁপা করা গুনাহ?’
সে আরো সিরিয়াস হয়ে বলেছিল ‘ইন্নাল্লাল্লিহ! তুমকো বাতা নেহী ইয়ে জুড়িয়া কি সাথ নামায পড়না আল্লাহ মিয়াকো বিলকুল না পছন্দ হ্যায়। বাল-কো নামায মে কাভি জুড়িয়া করনা নেহী চাইয়ে! (এইখানে প্রথমতঃ পাকিরা কেনো যে আল্লাহ কে ‘আল্লাহ মিয়া’ বলে তা আমি জানিনা। দ্বিতীয়তঃ আমার ভুলভাল উর্দূ ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখলে খুশী হই। ঐ মেয়ের কথার টোন-টাকে লেখায় ধরতে চাওয়ার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে মেয়েটার কথা মেয়েটার ভাষাতেই লিখার চেষ্টা করা হয়েছে। তৃতীয়তঃ যারা জানেননা, তাদের জন্যে, ‘জুড়িয়া’ মানে খোঁপা)।
এরপর কী ঘটনা হয়েছিল, সে এক লম্বা কাহিনী।
তবে মাঝে মাঝে মনের সব অদ্ভূদ ইচ্ছেগুলোর একটা দু’টোকে বাস্তবতা না দিলে, জীবন পানসে হয়ে যায়।
ঐ মেয়ের সামনে আমি তাই মেয়ে হিমু হওয়ার সাধকে বাস্তবতা দিয়েছিলাম।
এবং ফলাফল- মাগনা উপদেশ দিতে আসা সেই মেয়ে বাকী যতটা দিন আই আই ইউ আই এ ছিলাম, দেখা হলেই মুখ ফিরিয়ে চলে গিয়েছে।

আরেক অদ্ভূদ উপদেশ পাইলাম আজকে।
ফেইসবুক আমার কাছে অনেকটা রিক্রিয়েশানের জায়গা। এইখানে বেশীরভাগ মানুষেরই মেজাজ মর্জি থাকে ‘খাও দাও ফূর্তি করো/ দুনিয়াটা মস্তবড়’ ধরনের। দুই তিন দিন বাদে বাদে এই মেজাজের ছোঁয়া পাইতে খারাপ লাগেনা, তাই ঢুকি। আজকে ঢুকে দেখি মেইল বক্সে নতুন কিছু মেইল। তারমধ্যে এক ভদ্রলোকের মাগনা এক লাইনের উপদেশের মেইল। হুবুহু বলতে গেলে - “HI How are you? Read quran and do salah five times ina day” হুবুহু এইভাবে লিখা।
কোনো অপরিচিত কাউকে কেউ যে এইভাবে ইসলাম প্রচার করতে পারে, তা দেখে আমি বড়ই মুগ্ধ।
আমার মুগ্ধতা আকাশ ছুঁতে ছুঁতে আকাশ ফুঁরে বেড়িয়ে যায়।

মাগনা উপদেশ দাতারা বেঁচে থাকুক চিরকাল।
অন্ততঃ আমাদের মত অসৎ মানুষদের মনে - যারা মনে মনে ভাবি একটা, ভদ্র হয়ে মুখে বলি আরেকটা- ক্ষনিকের জন্যে চিত্তবিনোদনের মত হিমু হয়ে যাওয়ার বাসনা জাগানোর জন্যে হলেও, আপনারা বেঁচে থাকুন আমাদের সাথে সাথেই, আমাদেরকে বিপথগামীতা থেকে বাঁচাতে!


০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×