হাঁটতে বের হতে বললেই জিপসীর গায়ে জ্বর আসে! তারপরও তৌহিদ অনুরোধ করাতে বের হলো। তৌহিদ এসেছে ক’দিন হলো মাত্র। ওর কথা ফেলতে না পেরে, অনেকটা উশখুশ করে শেষে বললো, আচ্ছা শুধু সিডি’র দোকান পর্যন্ত কিন্তু! ……জীবনে যে কয়েকটা ছোট ছোট বিলাসিতা ধরে রেখেছি এখনো, এবং যে কয়েকটা জিনিষ আমাদের মিলে, চা’ তার মধ্যে একটা। দোকানের ইন্ডিয়ান মেয়েটা আমাদেরকে ঢুকতে দেখলেই হলো, বলার আগেই দু’কাপ চা’র অর্ডার লিখে ফেলে। তৌহিদকে সাথে দেখে তিন কাপ অর্ডার দিলো।… চা কী এক ধরনের মারিজুয়ানা? এক কাপ মন মতো চা খাওয়ার পর মনে হয় যেনো চৌরাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে গলা ছেড়ে বলি, যা দুনিয়া, তোকে মাফ করে দিলাম!...
আমাদের সামনেই পরিবারটাও হাঁটছে। হাঁটছে বলার চেয়ে বলা ভালো, এখনো কথা বলতে না পারা নাদুস নুদুশ গাবলুশ টাইপ ছোট্ট পুচকা মেয়েটা হেলেদুলে হাঁটছে আর তার বিশাল দেহের বাবা আর মাঝারি সাইজের মা পিছনে পিছনে অনুসরণ করছে! পুচকা আবার কিছুক্ষণ পর পর পিছন ফিরে দেখে নেয় সবাই ঠিক মত তার পিছনে পিছনে আসছে কিনা! আমাদের হো হো হাসিতে বিশাল দেহের বাবা-মা পিছন ফিরেন। তখনি পুচকা আবার চেক করার জন্যে মাথা ঘুরায়! আমাদের হাসি দ্বিগুন হয়। বিশাল দেহের বাবা কাঁধ ঝুলিয়ে অসহায়ের একটা ভংগি করেন আমাদের দিকে। আমি হাসতে হাসতেই অবাক হয়ে ভাবি, কী যাদু এই ছোট্ট এক হাতের পুচকার ভিতর? এক হাত লম্বা পিচকি কী করে অনুসরণ করিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তার চেয়ে কমপক্ষে সাত/আটগুন লম্বা, বিশাল দেহের বাবাকে! আর তার সাথে সাথে মাকে! কী মায়া! কী মায়া!... আমি তৌহিদের সাথে বক বক করতেই থাকি। কীভাবে রাস্তা পার হতে হবে, ট্রলি কোথায় ব্যাক রাখতে হবে, স্টেশন থেকে ফিরতি পথে বাসা কীভাবে চিনবে, এই সেই হাবিজাবি। কোনো মহান ব্যক্তি কি কখনো বলেছিলেন, ‘দুঃখ পাওয়া ভাল। তাহলে অন্য কেউ দুঃখ পাওয়ার আগেই সে দুঃখ বুঝা যায়’? কেউ না বলে থাকলে, আমি মহান না হলেও, সাধারন হয়েই বলছি, দুঃখ পাওয়া ভাল। কোনো এক সময় এক নতুন দেশে গিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন সমাজ, ভিন্ন জীবন যাত্রা আর ভিন্ন সব মানুষের ভীড়ে ছোট ছোট ভুলের জন্যে ছোট ছোট তিক্ত কথা সহ্য করতে করতে একদিন আর না পারতে ইচ্ছা করে হারিয়ে গিয়ে অনেক দূরে কোনো অচেনা স্টেশনের এক কোণায় বেঞ্চে বসে হু হু করে কেঁদেছিলাম, তৌহিদ তাই কোনো ভুল করার আগেই আমি বক বক করতেইই থাকি… খুব সুন্দর বাতাস হচ্ছে, না গরম না ঠান্ডা হালকা দোল খাওয়ার মত এমন বিকেল খুব দূর্লভ সিডনীতে।… সুন্দর বিকেল দেখতে দেখতে হঠাৎ করেই মাথায় একটা প্রশ্ন আসে। এক একটা মানুষ, এক এক কারখানা অনুভূতি প্রতিটা মানুষের এক পাঞ্জা বুকের ভিতর! কীভাবে আঁটে?!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




