“ভাবী এমুন ডরান ক্যান? আমগো চাংকু টীচারগুলারে তো দেখেন নাই, ভালা কইরা একটা সেন্টেন্সও কইবার পারেনা। তাও হালায় ঘন্টার পর ঘন্টা ক্লাস নিতাছে! মন চায় এমুন একটা *** লাগাই! আপনে তো তাগো তুলনায় অনেক ভালা। ডরাইয়্যেন না, দেখবেন, কেমুন সুন্দর ক্লাস নিয়া আইয়্যা পড়ছহেন!”
জাকীর ভাইয়ের আশ্বাস একান দিয়ে ঢুকে ওকান দিয়ে বের হয়ে গেল। চুপসানো মুখ আরো চুপসে যায় ধীরে ধীরে। ভাংগা গলায় বলি, “কিন্তু ইউরোপীয়ান স্টুডেন্টগুলা দেখেছেন? একেকটা যে বিশাল, আর যে লম্বা! আমি ওদের পেটের কাছে পড়ে থাকবো!”
“আরে হেরা লম্বা হইছে তো কাহিনী খালাস নাকি? শুনেন, ভালো বুদ্ধি দেই, আপনে আপনার বোর্ডের সামনে থাইক্যা নড়বেন না। যত ঘুর ঘুর, সব বোর্ড আর টেবিলের আশেপাশে। স্টুডেন্টগুলার আশেপাশে আসলেই ওরা বান্দরামী শুরু করবো কইলাম… এহহেম… ইয়ে… বুঝেন তো!”
বুঝি। বুঝি বলেই আরো বেশী নার্ভাস হয়ে যাচ্ছি।
মিস ক্যারি’র ছেলেদের মত ভরাট গলা কানের কাছে গম গম করে, ‘কংগ্র্যাটস মিস মাহবুবা এন্ড ওয়েলকাম। প্লীজ এলাও মী টু শো ইউর লেকচার রুম ইন লেভেল টু’। মিস ক্যারির পিছন পিছন হাঁটি, পা গির গির করে কাঁপে। সে কাঁপানো লুকাতে গিয়ে মিস ক্যারি কী যেন বলার জন্যে পিছন ফিরতেই করিডোরের দেয়াল ঘেষে দাঁড়িয়ে যাই। প্রথম দিনেই বেইজ্জত হওয়ার কোনো মানে নেই। পিএইচডি’র ধান্দায় শেষ পর্যন্ত এ কোন ফাঁদে পড়লামরে বাবা!
রুমটার কার্পেট ছাড়া সব সাদা! এমনকি বেঞ্চগুলো পর্যন্ত। মিস ক্যারি স্টুডেন্টদের একটা চেয়ারে বসে হাসেন, ‘নাউ ইউ আর দ্য বস হেয়ার!’ আগামী সপ্তাহে মিস ক্যারির বদলে এখানে এক দংগল ছেলে মেয়ে বসে থাকবে। আর আমি ওখানে টেবিলের ওপাশে! গলা এমন শুকনো লাগছে! মনে হচ্ছে যেন এক দলা বালু খেয়েছি। একটু আগেই না পানি খেলাম!
জীবনে কতকিছুই না হব ভেবেছিলাম! সবচেয়ে কঠিন স্বপ্ন ছিল জার্নালিস্ট হওয়ার। জার্নালিজম পড়ার জন্যে সে কি যুদ্ধই না করেছিলাম, কিন্তু পাহাড়ের মত শক্ত আম্মুকে টলাতে পারিনি। তাও লুকিয়ে চুরিয়ে টুকটাক জার্নালিজমের যে স্বাদ পেয়েছি, সেও মন্দ না। যা চেয়েছি তার কিছুটা হলেও তো করেছি!... একসময় আবার চাইতাম লেখিকা হব। সে স্বপ্ন যে বিলাসিতা ছিল তা বুঝেছি অনেক পরে। অখ্যাত কিছু পত্রিকা,ম্যাগাজিন আর টুকিটাকি ব্লগিং করেই সে স্বপ্নের জিন্দাবাদ! … আম্মু চেয়েছিল ইসলামিক ইন্টেলেকচুয়াল বানাতে। কিন্তু ইন্টেলেক্ট হওয়ার ধৈর্য আমার নেই। তাছাড়া ইন্টেলেক্ট হতে হলে বিশাল মাপের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ পলিটিশিয়ান হতে হয়।দাদা’র থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া চরম এবং কখনো কখনো যে ক্ষ্যাপাটে টাইপ ঘাড় ত্যাড়ামী পেয়েছি, আর যাই হোক সে দিয়ে আর পলিটিক্যাল এই দুনিয়ার ইন্টেলেক্টদের কাতারে যাওয়া যায় না!... সুরভী আপু, খাইরুন্নেসা আপু সবাইকে বলে বেড়াতেন, ‘আমাদের ফারজানা বিশাল মাপের বিপ্লবী হবে’। মুসানি আর এ্যাশ মিলে সে বিপ্লবের সাথে চিনি আর লবণ মিশিয়ে স্যালাইন বানিয়ে খেয়ে ফেলেছি। বিপ্লবের শ্রাদ্ধি করতে করতে এমন চরম শ্রাদ্ধিই করেছি, শব্দটা শুনলেই এখন কেমন খুক করে হাসি পায়! …আব্বু একসময় বলতো ‘আমার মেয়ে ডাক্তার হবে’। ফুয়াদ যেদিন মারা গেল সেদিনই অবশ্য সবাই বুঝেছিল আমাকে দিয়ে আর যাই হোক, ডাক্তারী হবেনা। আম্মু বললো সেদিন ফারহানা বাসায় পড়ার সুবিধার জন্যে সত্যিকারের কংকাল কিনে এনেছে।সে কংকাল নাকি এখন ওর রুমে, যে রুমে আগে আমার ভাগ ছিল। আমি আঁতকে উঠে বলেছি, ‘আম্মু, দেশে আসলে আমি কিন্তু তোমার রুমে থাকবো!’… অনার্স শেষ করতে করতে এক সময় ত্যাক্ত হয়ে ভেবেছিলাম, এই শেষ পড়ালেখার। এইবার আমি একদম পাক্কা ট্র্যাডিশনাল বউ হব। বউ হতে গিয়ে বন্ধুই হারালাম শুধু, ‘ভাল’ বউ’র বদলে জঘন্য টাইপ এক গৃহিনী হলাম।… আর এখন, অবশেষে, এই ছিল আমার কপালে?! বেলজিয়ামের সুপারভাইজার ওনার ‘ত’ ‘ত’ ইংলিশ দিয়ে ওবামা স্টাইলে বললেন ‘ইয়েস! ইউ ক্যান দু ইত!’
মিঠু ভাই আর লুবনা ভাবী আমার নাকের উপর জমে উঠা ঘাম দেখে ফিক ফিক করে হাসে। ‘আরে মেয়ে, ক্লাসে এভাবে ঘামলে তোমাকে দেখে স্টুডেন্টরাই নার্ভাস হয়ে যাবে!’ আড্ডার সবাই হো হো করে হাসে।
আম্মুকে ফোন করি। এ কথা সে কথা… অনেক কথার ভীড়ে আস্তে করে বলি, ‘আম্মু, নেক্সট উইক থেকে ইউনিতে ক্লাস নিচ্ছি’। আম্মু খুশী হয় না কী হয় এত হাজার মাইল দূরে ফোনের অপর প্রান্ত থেকে ঠিক বুঝিনা। ফারহানা আম্মু থেকে শুনে হই হই করে ফোন কেড়ে নিয়ে বলে, ‘আমি এখনি দিব্য চোখে তোমার ভবিষ্যত অফিস দেখতে পাচ্ছি আপু! দরজায় নেইমপ্লেটে লিখা ডক্টর ফারজানা মাহবুবা!’ ফারহানার কথায় আমিও ফিক করে হেসে ফেলি!... ফোন রেখে দেয়ার একটু আগে আম্মু হঠাৎ করে বলে, ‘তুই কখন যে এত বড় হয়ে গেলি! মনে হয় এইতো সেদিন তোকে নিয়ে মহাখালি হসপিটালে দৌঁড়াচ্ছি! তোর আব্বু মিটিং এ, আর এদিকে আমি ভাবছি তুই তোর আব্বুকে শেষবার না দেখেই মরে গেলি!’ এ কাহিনী আম্মু থেকে অনেকবার শুনেছি। কলেরা হয়ে একদম মরেই গিয়েছিলাম বলতে গেলে… আম্মু কী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো? …আমার চোখে কেন যে পানি চলে আসে!
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই মার্চ, ২০১০ সকাল ১০:২০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



