somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার যত প্রিয় টীচার এবং অবশেষে আমি নিজেই যখন টীচার! -৩

১৮ ই মার্চ, ২০১০ দুপুর ২:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


...এর মধ্যে কম্পারেটিভ রিলিজন ক্লাস শুরু হলো। আর আমার চোখের সামনে খুলে গেলো একটা সম্পূর্ণ নতুন দুনিয়া! ক্লাসে ফিসফাস, মেয়েরা এই ক্লাস করবেনা। বাইরে প্রতিবাদ লিপি ভিসি বরাবর, ইসলামিক ইউনি’তে পড়ানোর নামে কাফির আনা হয়েছে! আর আমি? নতুন ম্যাডামের অফিসের দরজার ফাঁক দিয়ে ভীষন অবাক হয়ে দেখি, জীবনে এত সুস্থির আর সুন্দর ভাবে, একাগ্র হয়ে কাউকে কখনো নামায পড়তে দেখিনি!! এত সুন্দর করে রুকূ দেয়া, এত সুন্দর করে সেজদা দেয়া!! আমি হাঁ করে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ধরা পরে যাই, ম্যাডাম যে কখন সালাম ফিরিয়েছেন টেরই পাইনি! ‘কাম ইন ডার্লিং, হোয়াই আর ইউ স্ট্যান্ডিং আউট দেয়ার? কামিন প্লীজ’! আমি বিব্রত, ইতস্ততঃ করে সে বিশাল অফিসে ঢুকি! ওরে বাপরে, এসেছেন মাত্র ক’দিন, এরমধ্যেই অফিসটাকে দেখি লাইব্রেরী আর গার্ডেন বানিয়ে ফেলেছেন! সেই যে ইতস্ততঃ পায়ে দরজা পেরিয়ে ঢুকেছিলাম, আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। দারাখশাহ ম্যাডামের সহযোগীতায় গাজালা ম্যাডামের এসিস্ট্যান্ট রিসার্চারের চাকরিটা পেয়ে গেলাম।

একটা মানুষের আইডিয়া আমার আইডিয়ার বিপরীত হতে পারে, একটা মানুষের বিশ্বাস আমার বিশ্বাসের বিপরীত হতে পারে, একটা মানুষের জীবনবোধ আমার জীবনবোধের বিপরীত হতে পারে, কিন্তু তার মানে কি এইযে এই বৈপরীত্যের জন্যে আমি তাকে মেরে ফেলবো?! একটা জিনিষ আমার কিছুতেই বুঝে আসেনা, আমরা কেন কেউ যখন আমাদের অপজিট চিন্তা করে, সেই চিন্তাকে খুন করে ফেলতে চাই?! কেউ যদি অন্যরকম চিন্তাই না করে তাহলে আমার নিজের চিন্তা’র মজাটা থাকলো কোথায়? কারণ সম-চিন্তার মানুষদের মধ্যে চিন্তা কখনো ডেভেলপ করেনা। সিভিলাইজেশন তখনি দাঁড়াবে, তখনি সামনে বাড়বে যখন মানুষেরা একজন আরেকজনের চিন্তা’র কাউন্টার চিন্তা করবে; এবং এক চিন্তা আর আরেক চিন্তা মিলে যখন অন্য চিন্তার জন্ম নিবে। ম্যাডাম ধর্মের ট্র্যাডিশনাল আন্ডারস্ট্যান্ডিং’র বাইরের মানুষ ছিলেন। আর সেখানেই যত গন্ডগোল। থ্রেটের পর থ্রেট, যেকোনো সময় ম্যাডামের খুন হওয়ার আশংকা।

একদিন রুমে ফিরে আমার বিছানায় টাইপ করা কাগজ ‘রিযিক কা মালিক আল্লাহ হে, গাজালা নেহি। ইয়ে চাকরি ছোড় দো, বারনা ইয়ে তোমহারে লিয়ে খতরনাক হো সাকতাহে’। জিদ চেপে যায়, যতদিন ম্যাডাম ইউনিতে আছেন, ততদিন ছাড়বোনা এ চাকরি। কিন্তু ম্যাডাম টিকতে পারলেন না। ইউনি থেকে ওনাকে টার্মিনেট করা হলো। যেদিন ট্রাক এলো ওনার অফিসের গাছগুলো পিন্ডিতে ওনার মায়ের বাসায় পৌঁছে দিতে, আমার হাতে শেষ বেতনের খামটা তুলে দিয়ে বিশাল দেহের সেই পাঠান টাইপ সহজ সরল আর ভীষন সুন্দরী মহিলা আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন, ‘আপনা খেয়াল রাখনা বেটি, ম্যারি বেটি তো আভি আল্লাহ মিয়া’কি হাত মে’। সেদিন রুমে এসে অনেক কেঁদেছিলাম। ধর্মের নামে মানুষের হিংস্রতায়, মানুষের অন্ধকার আর পাশবিক জঘন্যতায়, মানুষের রক্তের জন্যে লালসায় আর মানুষের ভিন্ন চিন্তার প্রতি কদর্য জিঘাংসায়।………

এর ঠিক তিনবছর পরে সিডনীতে গাজালা ম্যাডাম আমাকে দেখতে এসেছিলেন একদিনের জন্যে। এখনো নিজের অবস্থানে থেকে ফাইট করে যাচ্ছেন বুড়িয়ে আসা মানুষটা। আমরা তর্ক করি, কিন্তু তর্ক শেষে আবার এক টেবিলে বসেই ওনি স্কিম মিল্ক দেয়া কালচে কফি খান আর আমি কড়া চা পাতা আর ঘন দুধ দিয়ে বানানো দুধ চা খাই। ওনি বলেন ‘দিস ইজ ভেরী আনহেলদি ফারজানা!’ আর আমি বলি ‘লাইফ ইজ জাস্ট ফর ফিউ ডেইজ ম্যাম, হোয়াই নট আ কাপ অব থিকেন্ড মিল্ক টী?’ ওনি হাসেন। আমিও হাসি।

মাস্টার্স ফাইনাল দিয়ে যে আমি ‘জীবনেও আর পড়ালেখা করবোনা’ বলে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, সে আমি সিডনীতে যখন আবার পড়বো বলে সিদ্ধান্ত নিলাম, হান্নান চাচা আমাকে উৎসাহ জোগালেন। বাংলাদেশের এত বড় ইকোনোমিস্ট, এক সময়ের সেক্রেটারী অব গভার্নমেন্ট, আমার সরাসরি একাডেমিক টীচার না হয়েও যিনি আমার গুরু, বললেন, ‘থিসিসটা ট্রান্সলেট করে ফেলো মা। আদারওয়াইজ তো এডমিশান পাবানা। ইংলিশ দূর্বল বলে ভয় পেয়োনা, আমি চেক করে দেবো’। পৃথিবীতে বড় মনের মানুষেরা কী আসলে এমনই হয়? যেখানে কোনো স্বার্থ জড়িত না, সেখানে গিয়ে পাশে এসে দাঁড়ান। সামনে কদম ফেলার জন্যে হাত ধরে বলেন, এই যে পাশে আছি! কিন্তু মোটামোটি অসম্ভব এডমিশান সম্ভব হলো সামারের জন্যেই। আমার একমাত্র টীচার যাকে আমি ফার্স্ট নেইম ধরে ডাকি। ওয়েস্টের ফ্যাশন লাস্ট নেইম ধরে ডাকা। কিন্তু বাংলাদেশে তো সবাই ফার্স্ট নেইম ধরেই ডাকে! সামার ও অনুমতি দেয়, ‘যেটা তুমি কম্ফোর্ট ফীল করো’! সামার লেসবি বলে পরিচিত সবাই হায় হায় করে উঠে। এমনকি জিপসী পর্যন্ত একটু থমকে যায়। ‘ইয়ে… মানে…’। দাদু’র কাছ থেকে পাওয়া জিদ আমার, অতএব হার মানলেও মুখ কালো করে থাকে।

নিজেদেরকে ইসলামের জিম্মাদার ভাবা বড় বড় মানুষগুলো ফোন করে আব্বুর কান ভাংগাতেও সময় লাগান না মোটেও। আব্বু কিছুটা ইতস্ততঃ, ‘তোমার ঐ আংকল বললেন…’। আরেকদিন, ‘অমুকজন বললেন……’। আব্বুকে আমি চিনি, জানি কী বলতে হবে। তাই শেষে একদিন বলি, ‘আব্বু, আপনি কি আমাকে বিশ্বাস করেন?’ আব্বু’র হো হো হাসি শোনা যায় ওপাশে। আর কোনোদিন আব্বু কিছু বলেননি। কিন্তু মানুষের মুখ বন্ধ করতে পারিনি। সে যাই হোক, আমার নীতি ছিল একটাই- সুপারভাইজার পার্সোনাল লাইফে কী তাতে আমার কিছুই আসে যায়না।

যে বিষয়ে পড়তে চাচ্ছি, সৌদি’র তিন তিনটা ইউনিতে একই এপ্লিকেশান পাঠিয়ে জবাব পেয়েছি ‘মাহরাম নাই, তাই এডমিশান দেয়া যাবেনা’! দুই মামা, এক খালা তারা নাকি মাহরামের পর্যায়ে পড়েননা! আমার সামনে পথ খুব সহজ ছিল। দুই রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি। একদিকের রাস্তা যে সমাজে গেছে সে সমাজে মেয়েদের জ্ঞানার্জন সবচেয়ে কঠিন করে রাখা। এমন সব নিয়ম বানিয়ে রাখা যেসব নিয়ম ডিংগাতে গেলে মহাযুদ্ধ লাগাতে হবে পৃথিবীতে। আরেকদিকের রাস্তা এমন সমাজে গেছে, যে সমাজে একজন লেসবিয়ান প্রফেসর তার সম্পূর্ণ বিপরীত চিন্তার, বিপরীত আদর্শের একদম অচেনা একজন স্টুডেন্টকে সুপারভাইজ করতে দ্বিধা করেন না শুধু এই শর্তে যে, ‘ইফ ইউ হ্যাভ স্ট্রং লজিক ফর ইউর স্ট্যান্ড, গো এহেড’। খুব সোজা, আমি শেষেরটা বেছে নিয়েছি। এবং বেছে নিয়ে এমন একজন টীচার পেয়েছি, যে আমাকে জ্ঞানের এক সমুদ্রে এনে ডুবিয়ে দিয়েছে, একটাই কথা- হাতড়ে হাতড়ে পাড়ে ফিরো। আমি দাঁড়িয়ে আছি কিনারায়। তুমি ডুবে মরবানা। জাস্ট ট্রাই হার্ড টু সুইম ইউরসেলফ।

……যে কিনা এল লাইসেন্সের আমাকে দিনের বেলায় প্রচন্ড বিজি সিডনীর এম ফাইভের মত হাই ওয়েতে, হেনরি লরেন্স’র মত বিপদজনক ড্রাইভে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বলেছে, ‘ব্রেক দ্য রুলস ডিয়ার! এক্সিলারেট! এক্সিলারেট! আই ওয়ান্ট হান্ড্রেট টুয়েন্টী!’ হুইলের পিছনে হতভম্ব আমি বলেছি, ‘ফর গডস সেইক সামার! আ’ম এলাউড টু এইটি অনলি! দে’উল ফাইন মী!’ আমাকে অবাক করে দিয়ে পালটা ধমক, ‘আই সেইড হান্ড্রেড টুয়েন্টি! আ’ল পে ইউর ফাইন! ডোন্ট ওরি!’ …… হান্ড্রেড টুয়েন্টি’তে গাড়ি চালিয়ে অবশেষে যখন ইউনি’র পার্কিং’এ ফিরে এসেছি, গাড়ি থেকে নেমে সে একটা কথাই বলেছিল, ‘জাস্ট রিমেম্বার ওয়ান থিং, হোয়েন ইউ ওয়ান্ট টু বিল্ড সামথিং, ইউ’ল হ্যাভটু ব্রেক ইট ফার্স্ট, এন্ড দ্যাটস দ্য মোস্ট ডিফিকাল্ট থিং অব দ্য ওয়ার্ল্ড’! জীবনে যতদিন বেঁচে থাকবো ততদিন সামারের সে কথাটা ভুলবোনা। ম্যাক্সিম গোর্কি’র মা বইটা পড়ার পরে আম্মুকে কী যেন একটা কমেন্ট করার পরে আম্মুও হুবুহু এইরকমই একটা কথা বলেছিলো, ‘পাভেলের মা একদম শেষে গিয়ে বুঝতে পেরেছিলো তার ছেলে আসলে কেন এ সমাজকে এভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে ভাংগতে চাচ্ছিলো। না ভাংগলে তো গড়তে পারবেনা’!
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই মার্চ, ২০১০ দুপুর ২:৪৯
২৪টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিলিয়নিয়ার রবিন খুদা ও আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ০৯ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৩০

বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় কী?

কর্মসংস্থান? না।

বিনিয়োগ? না।

ডলার সংকট? না।

গার্মেন্টস খাতে ছাঁটাই? না।

ব্যাংকিং খাতের আস্থা সংকট? না।

সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো— কোনো অনুষ্ঠানে জুলাই চেতনা কত মিলিলিটার ঢুকেছে, কে কতবার উচ্চারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×