লালনের দর্শন ও রাজনীতি
আমাদের গ্রামে একজন চৌকিদার ছিলেন । সবাই তাকে রইক্ক্যা চৌকিদার নামে জানত ।পরে তাঁর কাছে শুনেছি তাঁকে তাঁর দাদার দেয়া নাম ছিল রফিক । ছোটবেলাতেই কোন একদিন তাঁর দাদার দেয়া রফিক নামটি বিকৃত হয়ে বদলে রইক্ক্যা হয়ে গিয়েছিল । কারো অভিপ্রায়ে হয়েছিল কিনা বলা মুশকিল তবে একথা বলা যায় যে সমাজের সবার বাপ-দাদার দেয়া নাম এভাবে বিকৃত হয়ে বদলে যায় না । শ্রেণী অবস্থানের কারণে রফিক হয়ে যায় রইক্ক্যা । এভাবে কুদ্দুস হয়ে যায় কুদু , ফেরদেৌস হয়ে যায় ফেদু । অর্থাৎ শ্রেণী চেতনা সমাজে খুবই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্রিয়াশীল ।এর মধ্যে কোন দর্শন আছে কিনা গবেষকেরা খুঁজে দেখবেন ।শ্রেণী অবস্থানের কারণে ভিন্ন চিন্তা ভিন্ন দর্শনতো বটেই মানুষের নাম পর্যন্ত নিয়ন্ত্রক সমাজের স্বয়ংক্রিয় অভিপ্রায়ের দ্বারা বিকৃত হয়ে বদলে যায় ।
লালন সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রেণীর একজন ।কিন্তু এ পর্যন্ত কখনোই সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রেণী সমাজের নিয়ন্ত্রক হতে পারেনি । তাই লালনের চিন্তা লালনের দর্শনকে টিকে থাকার জন্য অবিরাম লড়াই করতে হয় ।সমাজের নিয়ন্ত্রক শ্রেণী নয় ,ক্ষমতাহীন সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রেণী লালনের চিন্তা ও দর্শনের বাহক, যাদের নিজেদের নাম সমাজ কর্তৃক স্বয়ংক্রিয়ভাবে বদলে যেতে দেখেও যাদের করার কিছুই থকে না ।কাজেই এমন চিন্তা , এমন দর্শন যা’ এই সমাজকে আঘাত করে ,প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায় ,পরিচালকদের চেহারাটাকে চিনিয়ে দেয় তা’ অবিকৃতভাবে , অবাধে প্রচারিত হতে পারে না । লালনের চিন্তা এবং দর্শনও তা’ থেকে ব্যতিক্রম নয় । তবে লালনের যেহেতু সুর আছে এবং তা’ মর্মকে স্পর্শ করে যায় তাই তার আলাদা একটি শক্তিও আছে ।এখানে নিয়ন্ত্রকদের সমাজ তাঁর সুরকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আটকে দিতে পারেনি ।নিয়ন্ত্রকদের সমাজ চার্বাকদের চিন্তা ও দর্শনকে চর্চায় এবং আমলে নেয়নি ।লালনের চিন্তা ও দর্শনকেও চর্চার মধ্যে নেয়নি তবে তাঁর সুরকে থামিয়ে রাখতেও পারেনি । নিয়ন্ত্রক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষার জন্য অভিপ্রায়মূলকভাবে বদ্ধ সমাজের অভ্যন্তরীণ সংকটের কারনেই সমাজ প্রগতির আবাহনে সমাজের বদ্ধ অবস্থা ভাঙার জন্য নিয়ন্ত্রক শ্রেণীরই একটি অংশ বের হয়ে আসে । নিয়ন্ত্রক শ্রেণী থেকে বের হয়ে আসতে থাকা এই অংশটি খুব ক্ষুদ্র হলেও এর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব আছে । সুরের শক্তিতে টিকে থাকা লালনের সাথে এই অংশটির পরিচয় হতে থাকে । তারা লালনকে নতুন করে অনুসন্ধান করে । শুধু তাঁর সুরই নয় তাঁর দর্শন, তাঁর রাজনীতিকেও এই অংশটি খুঁজে ফিরে ।
নিয়ন্ত্রক শ্রেণী তাদের নিয়ন্ত্রিত সমাজকে সংষ্কৃতি এবং অভ্যাসের দিক দিয়ে এমন এক স্বতঃস্ফুর্ত অবস্থায় নিয়ে যায় যে , যে কোন চিন্তা , দর্শন যা’ এই সমাজকে প্রশ্নের সন্মুখিন করে, কোন ব্যাক্তিগত অভিপ্রায় ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমাজ সেই চিন্তা বা দর্শনের বিরূদ্ধে দাঁড়িয়ে যায় । লালনের সুরের পথ ধরে সমাজের একটি অংশ যখন তাঁর রাজনীতি , দর্শনের সন্ধান করতে লাগে তখন সমাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তার বিরূদ্ধে দাঁড়ায় ।সমাজের এই বিরূদ্ধে দাঁড়ানোর ভঙ্গি এবং ধরণ বিভিন্ন কিন্তু লক্ষ্য এক ।সেই অভিন্ন লক্ষ্যটি হলো লালনকে রাজনীতি এবং রাজনৈতিক দর্শন থেকে বাইরে রাখা । তাঁকে একজন নিত্য ভজন-সাধন করা সাধু হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করা । এই করতে গিয়ে লালনকে লালনের বাইরে লালনরূপে নির্মাণ করতে হয় ।এই নির্মাণ কাজ নানাভাবে চলছে । উপন্যাস রচনার মধ্যদিয়ে , সিনেমা নির্মাণের মাধ্যমে ,গবেষণার নামে , একাডেমীর নামে নানা রূপে নানা প্রক্রিয়ায় লালনের বাইরে লালনের নির্মাণ কাজ চলছে । লালনের বাইরে লালনরূপে যাকে নির্মাণ করা হচ্ছে সে লালন রাজনীতি থেকে বাইরে ।জমিদারের সাথে তার সম্পর্ক মেনে নেয়ার । সেখানে তার কোন কষ্ট নেই প্রশ্ন নেই ।সমাজ সম্পর্কে সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবন সম্পর্কে তার কোন জিজ্ঞাসা নেই । এই নির্মিত লালনে ততটুকুই রাখা হয় যতটুকু রাখলে সমাজের কাঠামো এবং সমাজের সম্পর্কগুলো কোনভাবেই প্রশ্নের সন্মুখিন হয় না । এ লালন সমাজ ভাবনায় , রাষ্ট্র ভাবনায় , ক্ষুধা-জ্বরা-মৃত্যু এসব ভাবনায় সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত ।এ লালন শুধুই সুরমিশ্রিত কতকগুলো বাণী দিয়ে যান যা’ ধরা যায় না , ছোঁয়া যায় না , কোন দেয়ালে আঘাত করে না কিন্তু শুনতে বেশ লাগে । নির্মিত লালনের রূপ তাঁর সুরমিশ্রিত বাণীকে সীমাবদ্ধ করে দেয়, আটকে দেয় আগে বাড়তে দেয় না । সেখানে ভঙ্গি বা উপস্থাপনের শুদ্ধতা বা অশুদ্ধতায় কিছু যায় আসে না । তাই একতারাতে , ফিউশনে বা ব্যান্ডের কুর্দনে কোন ভিন্ন অর্থ তৈরী করে না ।
লালনকে চিণ্হিত করা হয় গুরুবাদী হিসাবে । কিন্তু নির্মিত লালনের রুপের মধ্যদিয়ে লালনের গুরুবাদকে বুঝা মুশকিল ।লালন গুরুবাদী বটে কিন্তু তিনি গুরুকে নির্দিষ্ট করে দেন নাই ।এখানে লালনের গুরু হচ্ছে মানুষ । সেই মানুষ যে মানুষ লালনের দর্শনে বিকাশের শীর্ষে । সে মানুষ হচ্ছে সহজ মানুষ ।যে কেউ সহজ মানুষ হতে পারেন এবং মানুষের গুরু হতে পারেন । এখানে মানুষ হচ্ছে মানুষের গুরু , সকল মানুষ সকল মানুষের গুরু । এখানে গুরু হচ্ছে শ্রদ্ধা অর্থে , ভক্তি অর্থে , সন্মান অর্থে , সমাজের পারষ্পরিক দৃঢ় বন্ধন অর্থে ।সহজ মানুষ এমনিতেই তৈরী হয় না । তার জন্য চাই সহজ সমাজ । তাই সহজ মানুষ যেমন লালনের স্বপ্ন তেমনই সহজ সমাজও তাঁর স্বপ্নের বাইরে নয় । মানব জনমের স্বার্থকতার জন্য মন যা চায় তাই করতে পারা বা করা সহজ সমাজের প্রেক্ষাপট ছাড়া বুঝা মুশকিল । খন্ডিত মালিকানা সমগ্রের রূপ-রস আস্বাদনের জন্য অন্তরায় । যত বড়ই হোক ব্যাক্তিগত মালিকানা খন্ডিত এবং সীমাবদ্ধ।সীমাবদ্ধ মালিকানায় চলবে না । সমগ্রের মালিকানা চাই । তা কি করে সম্ভব ? মালিকানা ত্যাগ করে । মালিকানা ত্যাগ করেই সমগ্রের মালিকানা লাভ করা সম্ভব ।
চূড়ান্ত বিকাশের সহজ সমাজের স্বপ্ন একেক কালের মানুষ একেকভাবে দেখে থাকেন । লড়াইয়ের ধরণও ভিন্ন হয় কিন্তু লক্ষ্য এক । লালনের দর্শন এবং রাজনীতি বুঝতে হলে এই জটিল সমাজের অভিপ্রায়ে নির্মিত লালন রূপের মধ্য দিয়ে তা’ বুঝা যাবে না । লালকে প্রাসঙ্গিক করেত হলে লাগাতার সংগ্রামরত ক্ষমতাহীন সংখ্যাগুরুর অবস্থানে তাঁকে দেখতে হবে , তাঁর রাজনীতি এবং দর্শন বুঝতে হবে । তবেই হবে লালনের প্রকৃত রূপ দরশন নইলে ধাঁধাঁয় পড়তে হবে নিশ্চিত ।
১৭/১০/২০১১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

