প্রশ্নটা নীতির,কিছুটা আদর্শ বা অবস্থানেরও-
১৯ এবং ২০ ফেব্র“য়ারী বাঘাইছড়ির বাঘাইহাট এলাকায় সংঘটিত পাহাড়ী বাঙালী সহিংসতা আমাদের নৈতিক অবস্থানকেই আরো একবার বেশ শক্তভাবেই নাড়া দিয়ে গেলো। মানুষের মানবিক বোধ মাঝে মাঝে যে তার শ্রেষ্ঠ জীবের স্বীকৃতিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তাও দেখা গেলো আরো একবার !
পার্বত্য চট্টগ্রামের সংঘাত বা সহিংসতার ইতিহাস বহু পুরনো। সেখানে রাষ্ট্রের নানা বিপরীতধর্মী অবস্থান,রাষ্ট্রক্ষমতার পালাবদল,সংবেদনশীলতাহীন সিদ্ধান্ত আর আধিপত্যবাদী মনোভাব যেমন ছিলো,তেমনি কারো কারো গোষ্ঠি স্বার্থ বা আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভূমিকাও কম ছিলোনা। তবে ১৯৯৭ সালে পার্বত্য শান্তি চুক্তি সাক্ষরিত হওয়ার পর পাহাড়ে আবারও নতুন করে সংঘাত মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন যেকোন মানুষ মাত্রকেই বিপন্ন করে,ভাবিত করে।
আজকের আলোচনার বিষয় পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা নয়। কিংবা নয় পাহাড়ের সা¤প্রতিক রাজনীতির হালচালও। এখানকার আলোচনাটা কেবলই ঘটনাকেন্দ্রীক। গত ১৯ এবং ২০ ফেব্রয়ারীর সংঘাত এবং এরপর এই ঘটনার জের ধরে সংঘটিত ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে কেমন ছিলো স্থানীয় এবং জাতীয় গনমাধ্যমের ভূমিকা । আলোচনাটা পুরোটাই অভিজ্ঞতালদ্ধ। এখানে যুক্তি বা উদাহরণই থাকবে,মূল্যায়ন নয়। আসুন আমরা এক নজরে দেখে নেই বাঘাইহাট সহিংসতায় কেমন ছিলো আমাদের গনমাধ্যমের ভূমিকা জেনে নেই তারই একটি সরল পাঠ।
প্রথম সংবাদদাতা দিগন্ত টেলিভিশন !
বাঘাইহাট সহিংসতার খবর প্রথম যে গণমাধ্যমটি পরিবেশন করে সেটি হলো দিগন্ত টেলিভিশন। ১৯ ফেব্রুয়ারী রাত আনুমানিক সাড়ে এগারোটা থেকেই এই টেলিভিশন চ্যানেলটি তার স্ক্রীনের টিকারে বাঘাইহাটে বাঙালীদের বাড়ীঘরে আগুন দেয়ার সংবাদ প্রচার করতে থাকে। পরে নানা টিভি চ্যানেল সংবাদটি প্রচার করলেও ওইদিন কেবলমাত্র দিগন্ত টিভিতেই সংবাদটি প্রচারিত হয়। তবে সংবাদটির সূত্র সম্পর্কে নিশ্চিত হতে রাঙামাটির স্থানীয় সাংবাদিকরা টেলিভিশন চ্যানেলটির স্থানীয় সাংবাদিক সহকর্মীর সাথে যোগাযোগ করলেও সে সংবাদটি পাঠায়নি বলে নিশ্চিত করে জানায়,সম্ভবত সংবাদটি খাগড়াছড়ি প্রতিনিধির কাছ থেকে গেছে। পরে অবশ্য এই সংবাদটি এই চ্যানেলে প্রকাশ হওয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়। কোন কোন পত্রিকা তার সম্পাদকীয়তেও এই বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
একুশে টিভির ভূল ফোনো !
১৯ তারিখ রাতভর সহিংসতার পর ২০ তারিখ সকাল থেকেই তৎপর হয়ে উঠে স্থানীয় সাংবাদিকরা। মজার ব্যাপার ছিলো ঘটনাস্থলটি রাঙামাটি জেলার অন্তর্ভূক্ত হলেও যোগাযোগ সুবিধাজনিত কারণে খাগড়াছড়ির সাংবাদকিরাও অতপ্রোতভাবে ঘটনাটির সাথে জড়িত হয়ে পড়ে। ফলে দুই পাহাড়ী জেলার সাংবাদিকরা প্রথশ থেকেই এই সংবাদটি বিট করতে থাকে। ২০ ফেব্রয়ারী ঘটনায় নিহতের সংখ্যা নিয়ে তৈরি হয় বিভ্রান্তি। সাংবাদিকরা নানা সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করছিলো আর তা নিশ্চিত না করেই প্রকাশ করছিলো। এই ক্ষেত্রে টিভিচ্যানেলগুলোর মধ্যে সর্বপ্রথম সবচে বড় ভুল করে একুশে টেলিভিশন। তারা তাদের বেলা ২ টার খবরে রাঙামাটি প্রতিনিধির লাইভ ফোনো প্রচার করে,যেখানে স্থানীয় প্রতিনিধি অন্ততঃ পাঁচজন নিহত হওয়ার সংবাদ প্রচার করে,এমনকি নিহতদের নাম,পিতার নাম,ঠিকানাও পড়ে শোনায় ( যদিও তখন পর্যন্ত ১ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত ছিলো,পরে আরো একজনের কথা জানা যায়)। পরে দেখা যায়, মৃত হিসেবে যাদের নাম প্রচার করা হয়েছে তারা অনেকেই বেঁচে আছে এবং নানা কর্মসূচীতে অংশ নিচ্ছে। তখন পর্যন্ত কোন টিভি চ্যানেলে এটাই ছিলো সর্বোচ্চ সংখ্যক মৃতের ঘোষণা !
মৃত্যু নিয়ে বিভ্রান্তি !
বাঘাইহাট সহিংসতায় ঠিক কতজন মারা গেছে তা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয় ২১ তারিখের পত্রিকাগুলো এবং ওয়েবগুলোতে। এক্ষেত্রে সংখ্যাটি ছিলো ১ থেকে ৮ পর্যন্ত। দেশের প্রাচীনতম দৈনিক ইত্তেফাকের সংবাদের শিরোনাম ছিলো ‘বাঘাইছড়িতে পাহাড়ী বাঙালি সংঘর্ষে নিহত ৭’সেনা সদস্যসহ অর্ধশত আহত,শতাধিক বাড়ীতে আগুন’। ঠিক একদিন পরেই এই পত্রিকাটির সংবাদ শিরোনাম ছিলো ‘বাঘাইছড়িতে আরো ২ লাশ উদ্ধার,নিখোঁজ ১৪’,অথচ সংবাদের প্রথম প্রথম লাইনটি শুরু হয়েছে এইভাবে-‘রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়িতে পাহাড়ি বাঙ্গালি সংঘর্ষে এ পর্যন্ত ২ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।’পাঠক কি বুঝবে এই সংবাদ থেকে ?
প্রথম আলোর সংবাদ শিরোনাম ছিলো ‘নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি,চার না সাত?সংঘর্ষ-গুলি,রক্তাক্ত বাঘাইছড়ি’। এতে চার না সাত বলা হলেও পরে এর কোনটাই সত্যি হয়নি। সংবাদটিতে ১১ টি গ্রামে অগ্নিসংযোগের তথ্য প্রদান করা হলেও মোট কতটি বাড়ী অগ্নিদগ্ধ হয়েছে,বা কেউ আহত হয়েছে কিনা সেই তথ্য প্রদান করা হয়নি। আবার সংবাদে বিভিন্ন পক্ষের নিহতের সংখ্যা নিয়ে দাবীগুলো তুলে ধরে একজনের মৃতদেহ পাওয়া যাওয়ার খবর জানানো হয়।
মৃতের সংখ্যা সর্বোচ্চ হিসেব দেয় অনলাইন বার্তা সংস্থা দি এডিটর। তাদের পরিবেশিত সংবাদে বলা হয়-নিহতের সংখ্যা ৮ জন।
একইভাবে মূলধারার বা জনপ্রিয়ধারার প্রায় সবগুলো পত্রিকাই কমবেশি মৃত্যু সংবাদ নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোয় ভূমিকা পালন করেছে।
সংবাদ প্রকাশে রাজনৈতিক চিন্তা বা পত্রিকার পলিসি
পার্বত্য চট্টগ্রামের সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে দেশের প্রথমসারির পত্রিকাগুলোর বেশির ভাগেরই যে কোন সুনির্দিষ্ট পলিসি নেই তা আরো একবার প্রমাণ হলো সা¤প্রতিক ঘটনার পর সংবাদ প্রচারে। পত্রিকাগুলো কখনো নিজেদের স্থানীয় প্রতিনিধি আবার কখনো ঢাকা বা চট্টগ্রাম থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাঠানো প্রতিনিধিদের পাঠানো ঢালাও বা একপেশে সংবাদ প্রচার করেছে। এই ক্ষেত্রে দেখা গেছে,কোন কোন পত্রিকা একই দিনে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য উপস্থাপন এবং তথ্য দিয়েছে। আবার শব্দ চয়নেও সতর্ক ছিলোনা অনেক পত্রিকা। রাজনৈতিক বিশ্বাস ভেদেও পত্রিকায় প্রভাব পড়েছে সংবাদের। তাই সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান নিয়েছে প্রথম আলো এবং আমার দেশ। আবার মোটা দাগে নিরপেক্ষ বা সত্যের পক্ষেই অবস্থান ছিলো এমন পত্রিকার সংখ্যা নেই বললেই চলে। মূলতঃ পত্রিকাগুলোর সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধির চিন্তার প্রতিফলনই ঘটেছে প্রকাশিত প্রতিবেদনে। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে পত্রিকার পলিসিও সংবাদকর্মীকে বাধ্য করেছে প্রভাবিত হতে।
অতিথি সাংবাদিক !
পার্বত্য জেলা রাঙামাটি এবং খাগড়াছড়ি দুটি জেলাতেই প্রতিটি জাতীয় দৈনিক এবং টিভি চ্যানেলের নিজস্ব প্রতিনিধি আছে। কিন্তু সহিংসতার সময় প্রায় সব কটি দৈনিক এবং টিভি ওই এলাকায় তাদের অতিথি সাংবাদিক প্রেরণ করে। দুঃখজনক হলেও সত্য, এইসব সাংবাদিকদের প্রেরিত সংবাদের বড় একটি অংশই ছিলো এক পেশে এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন। ঘটনার পরদিন থেকেই ঢাকা থেকে বিভিন্ন টেলিভিশন এবং পত্রিকার একাধিক সাংবাদিক খাগড়াছড়ি হয়ে বাঘাইহাট যায়। কিন্তু ঘটনার সাথে জড়িত বিভিন্ন পক্ষের সাথে কথা না বলে এবং এই ঘটনার পুরনো ইতিহাস না জেনেই রিপোর্ট করা শুরু করে তারা। ফল যা হবার তাই হয়েছে। একটি গোষ্ঠী ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠে সাংবাদিকদের উপর। এরই প্রতিফলন দেখা যায় ২৩ ফেব্রয়ারী। ওইদিন খাগড়াছড়িতে ইউপিডিএফ এর ডাকা অবরোধ ( আসলে কার্যত হরতাল) এর দিন উত্তেজনাকর মূূহূর্তে হঠাৎ করেই ক্ষুদ্ধ মানুষজন সাংবাদিকদের উপর হামলা চালাতে শুরু করে। এই সময় ঢাকা এবং চট্টগ্রাম থেকে যাওয়া সাংবাদিক ছাড়াও স্থানীয় পনের জন সাংবাদিক কম বেশি আহত হয়েছেন। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকদের উপর হামলা বা আক্রমন একেবারেই সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু সাংবাদিকরাও যা ইচ্ছে তাই লিখবে বা দেখাবে সেটা কি সমর্থনযোগ্য ? বাঘাইহাট,সাজেক এবং খাগড়াছড়ির ঘটনা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে ঢাকায় প্রতিটি জাতীয় দৈনিক এবং টেলিভিশন এর পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবহিত বা প্রাক অভিজ্ঞতাসমপন্ন সাংবাদিকের কতটা অভাব !
ভাড়াটে সাংবাদিক !
বাঘাইহাট এবং খাগড়াছড়ির ঘটনার পর পার্বত্য দুই জেলা রাঙাামটি এবং খাগড়াছড়িতে ব্যাপক সাংবাদিক সমাগম ঘটতে থাকে। নানা পত্রিকা আর টিভির সাংভাদিকদের পাশপাশি দেশী বিদেশী গনমাধ্যম,ফ্রি ল্যান্স সাংবাদিক আর কথিত লেখক আর কলাম লেখকদের আনাগোনা শুরু হয় পাহাড়ে। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য,এইসব সাংবাদিক বা সংবাদ কর্মীদের বড় একটি অংশ স্বপ্রণোদিত হয়ে আসেনি,এসেছে ভাড়াটে হিসেবে। বিভিন্ন দেশী বিদেশী প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সহযোগিতায় এই সব সাংবাদিকদের আগমন সহিংসতাত্তোর সাজেক এবং খাগড়াছড়ির ঘটনা নিয়ন্ত্রন বা প্রশমনে নয়া সংকট তৈরি করে। এবং পরিস্থিতিতে আরো উসকে দেয়। বেশ কিছু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান - এনজিও এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশন নিজস্ব পৃষ্ঠপোষকতায় সেই সময় সাংবাদিকদের পাহাড়ে এনেছে,এমন প্রমাণ এই লেখকের কাছেই আছে। এইসব সাংবাদিকদের ‘এমবেডেড জার্নালিজম’ পাহাড়ের পরিস্থিতির সত্যিকার চিত্র তুলে আনতে ব্যর্থ হয়েছে। কেবল সাংবাদিকই নয়,বেশ কজন স্বনামধন্য লেখক ও মানবাধিকার কর্মীও এই অভিযোগ থেকে দায়মুক্ত নয়।
আড়ালের গল্পটা সামনে আসেনি !
সাজেক এর সহিংসতার ঘটনার আসলেই উৎপত্তি কবে,কেনই বা সেখানে হঠাৎ অগ্নিকুন্ড বিস্ফোরিত হলো,ঘটনার পেছনের আসল ঘটনা কি সেটিই বের করতে ব্যর্থ হয়েছে মিডিয়া। সবার নজর ছিলো কতটা বাড়ী পুড়েছে,কতজন মারা গেছে,আর ক্ষতিগ্রস্তরা কতটা মানবিক জীভন যাপন করছে তার উপর। কিন্ত কেনই বা এই সহিংস ঘটনার উৎপত্তি,কারা নেপথ্য নায়ক,কোত্থেকে হঠাৎ গজিয়ে উঠল সাজেক ভূমি রক্ষা কমিটি এবং সাজেক নারী সমাজ নামের দুিিট সংরক্ষণ,এদের নেপথ্যে কারা-এইসব ঘটনার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলোনা মিডিয়া। এমনকি সাজেক এর ভূমিপুত্র পাংখোয়াদের বক্তব্য বা অবস্থানও মূলধারার গনমাধ্যমে উঠে আসেনি। আর যে জমি নিয়ে বিরোধ সেই জমি আসলেই কার,সরকারের রিজার্ভ ফরেস্ট নাকি কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সেই প্রশ্নের উত্তর ও খুঁজে বের করতে পারেনি অতি তৎপর মিডিয়া। সাজেক এর চাকমা আর বাঙালীদের ভূমি নিয়ে খেলায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠী পাংখোয়ারা যে বিপন্ন হয়ে পড়েছে সেই প্রশ্নটিও আসেনি মিডিয়ায়। মিডিয়ার চোখ ছিলো কেবলই ঘটনায়,পারিপার্শ্বিকতায় নয়।
এবং কালের কন্ঠ !
পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ীদের মধ্যে প্রথম আলোর জনপ্রিয়তা প্রশ্নাতীত। নানা কারণে পাহাড়ীদের প্রতি সংবেদনশীল এই পত্রিকার প্রতি পাহাড়ীদের টানও ব্যাপক। তাই তিন পার্বত্য জেলাতেই প্রথম আলোর প্রতিদ্বন্ধী কেবল প্রথশ আলোই। পাহাড়ীদের ঘরে ঘরে প্রথম আলো। কিন্তু সাজেক এবং খাগড়াছড়ির ঘটনার পর পুরো পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। এই ঘটনায় সবচে বেশি কাভারেজ করেছে নতুন দৈনিক কালের কন্ঠ। প্রথম এক পৃষ্ঠার ফটোফিচারও করে তারা। আর তাদের সাংবাদিকই প্রথম গেছে ওই এলাকায়। এর ফল পাওয়া গেছে হাতে নাতেই। পরদিন থেকেই পাহাড়ে প্রচার সংখ্যায় হিট কালের কন্ঠ। প্রতিষ্ঠার বারো বছর পর সবচে বড় চ্যালেজ্ঞের মুখে পড়েছে প্রথম আলো। ঘটনার প্রতিবাদে রাঙামাটিতে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনেও সবার হাতে হাতে ছিলো পত্রিকাটি। আর সেই সময় শত শত ফটোকপি বিক্রি হয়েছে পত্রিকাটির। আর তাদের ফটো ফিচার অনেক পাহাড়ীই ঘরের ড্রইং রুমে বাধিয়ে রেখেছে। প্রথম আলো পরে চট্টগ্রাম এবং ঢাকা থেকে একাধিক প্রতিনিধি,আলোকচিত্রি পাঠিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু লাভ হয়নি। কালের কন্ঠে এই ঘটনার পর সন্তু লারমা,চাকমা রাজা দেবাশীষ রায় এবং প্রসিত বিকাশ খীসার সাক্ষাতকার প্রকাশিত হওয়ায় পত্রিকাটি পাহাড়ীদের মাঝে ভ্যাপক গ্রহযোগ্যতা অর্জন করে। কিন্তু কালের কন্ঠের কিছু প্রতিবেদনেও ছিলো নির্জলা পক্ষপাত আর বিপুল তথ্যের ঘাটতি।
অগ্নিদগ্ধ পাহাড়, বিবেকদগ্ধ সাংবাদিক !
সাজেক এবং খাগড়াছড়ির ঘটনার পর সবচে আলোচিত বিষয় ছিলো এই ইস্যুতে সাংবাদিকতা কতটা সঠিক বা দায়িত্বশীল ছিলো সেই বিষয়টি। এই বিষয়ে নানা মুনির নানা মত। কেউ বলেন ঠিকই ছিলো আবার কারো কারো মত মিডিয়া বাড়াবাড়ি করেছে। এ নিয়ে বিতর্ক হয়ত চলতেই থাকবে। কিন্তু একজন তৃনমূল সংবাদকর্মী হিসেবে আমার মনে হয়েছে,সাজেক বা খাগড়াছড়িতে যে ঘটনা ঘটেছে তার মিডিয়া কাভারেজ যথেষ্ঠই ছিলো কিন্তু তাতে সততা ছিলোনা,দায়িত্ববোধ ছিলোনা,প্রকৃত সত্য প্রকাশের আগ্রহও ছিলেনা। কোন কোন সাংবাকিদা হয়ত চেষ্টা করেছেন,কিন্ত প্রতিষ্ঠান বিরোধীতা আর প্রচলিত বৃত্ত ভাংতে না পারায় সেই চেষ্টা খুব একটা ফলপ্রসূ হতে পারেনি। আর সাংবাদিকদের একটি বড় অংশই তার জাতিগত পরিচয়ের উর্ধ্বে উঠতে এবং অসা¤প্রদায়িকতার দীক্ষা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে এই ইস্যুতে। ফলে পাহাড় যখন পুড়ছিলো,তখন যে মগজ পোড়ার গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিলো,তা মূলতঃ সাংবাদিকদের বলেই মনে করেন অনেকেই।
গণমাধ্যমের সীমাবদ্ধতা,যে গন্ডি থেকে বের হওয়া যায়না
পাহাড়ের ইস্যুতে গনমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা শেষে যে বিষয়টি না বললেই নয়,তা হলো পাহাড়ে সাংবাদিকতা বড় অসহায়। এখানে যেসব সংবাদকর্মী এই পেশার উপর নির্ভরশীল তারা নানা কারণেই নিজের এবং পরিবারের ঝুঁকি নিয়েই এই পেশায় আছেন। এখানে অস্ত্রধারী সব গুলো পক্ষই চায় সংবাদে তার চিন্তার প্রতিফলন। চায় বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা ! আর এখানে বস্তুনিষ্ঠতার সংজ্ঞাই হলো কোন মত বা পথের পক্ষে সংবাদ পরিবেশন করা ! সবাই ভাবেন,পাহাড়ে দিন বদলেছে ! চুক্তি হয়েছে,শান্তি এসেছে ! উন্নয়নের জোয়ার বইছে ! আরো কত কি ! কিন্তু বাস্তবতা বড়ই কঠিন। এখানে কোন সংবাদ জেএসএস এর বিপক্ষে গেলে আপনি উগ্র বাঙালী,সমঅধিকারের বিপক্ষে গেলে আপনি পাহাড়ীদের দালাল,ইউপিডিএফ এর বিপক্ষে গেলে আপনি সেনাবাহিনীর মানুষ,আর সেনাবাহিনীর বিপক্ষে গেলে আপনি ব্লাডি জার্নালিস্ট। আর যদি আপনার নিউজ প্রায়শই কারো না কারো পক্ষে বা বিপক্ষে যায়,অথবা পুরো সত্যনিষ্ঠ হয়, তাহলেতো আর কথাই নেই......। তখন,পার্বত্য চট্টগ্রামে আপনিই সবচে অসহায় মানুষ !

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

