রাঙামাটি সরকারী কলেজের হিসাব বিজ্ঞান প্রথম বষের্র ছাত্র ফরহাদ চৌধুরীর একাডেমিক ফলাফল যেমন ভালো তেমনি সে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানও,আবার এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া আমিনুল ইসলামরা নিজ মেধায় বা মুক্তিযোদ্ধা কোটায় যেকোন একটিতেই তার বৃত্তি পাবার কথা। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক প্রদত্ত এই বৃত্তিতে প্রায় ছয়শতজন শিক্ষার্থীকে বৃত্তি প্রদান করা হলেও অজ্ঞাত কারণে ফরহাদ বা আমিনুলের মতো মেধাবী এবং যোগ্য আরো অনেকেই বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড আগে প্রতিবছর পার্বত্য অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করার অংশ হিসেবে এই বৃত্তি প্রদান করতো। কিন্তু গত কয়েকবছরে একাধিকবারবার আবেদন জমা নিলেও বৃত্তি ঘোষনা করেনি। সর্বশেষ ২০১০সালে আবার আবেদন চেয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয় প্রতিষ্ঠানটি। এতে তিন পার্বত্য জেলার স্থায়ী বাসিন্দা শিক্ষার্থীদের মধ্যে রাঙামাটি থেকে ১ হাজার ৭৮ জন শিক্ষার্থী আবেদন করলেও বৃত্তি পেয়েছে ২৭২ জন,খাগড়াছড়ি জেলা থেকে ৪৮৬ জন আবেদন করে বৃত্তি েেপয়ছে ১৬৮ জন এবং উন্নয়ন বোর্ড চেয়ারম্যানের নিজের জেলা বান্দরবান থেকে ৬২৭ জন আবেদন করলেও বৃত্তি পেয়েছে ২৩৩ জন।
উন্নয়ন বোর্ড বৃত্তিকে দুইটি আলাদা ভাগে ভাগ করে কলেজ পর্যায়ের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এই দুইভাগে ভাগ করেছে। প্রথম পর্যায়ের শিক্ষার্র্থীরা এককালীন ২৪০০ টাকা এবং উচ্চ পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা ৩৬০০ টাকা পাবে। সবমিলিয়ে মোট ৬৭৩ জন শিক্ষার্থী এই বৃত্তি পাবে। এবং এইখাতে মোট ব্যয় হয়েছে ১৯ লক্ষ ৭০হাজার ৪০০ টাকা।
তবে বৃত্তির বাছাই প্রক্রিয়া নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তান,ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী এবং আত্মীয়স্বজনরাই মূলতঃ এই বৃত্তি পেয়েছে। সবচে বেশি অভিযোগ বান্দরবানের তালিকা নিয়ে। সেখানে খোদ বোর্ড চেয়ারম্যানের পছন্দের তালিকার বাইরে কেউ কোন বৃত্তি পায়নি। এমন অনেকেই বৃত্তি পেয়েছে যাদের জীবনে একটিও প্রথম বিভাগ বা শ্রেণী নেই। আবার অনেকের সকল পর্যায়ে ভালো ফলাফল থাকা সত্ত্বেও বৃত্তি পায়নি। এমনকি জেলা পর্যায়ে ফলাফলে শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থীরাও এই তালিকায় নেই।
এদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড কার্যালয়ে যোগাযোগ করে বৃত্তির তালিকা চাইলে এনিয়ে এক নাটক শুরু করে বোর্ড কর্মকর্তারা। সাংবাদিকরা কারা বৃত্তি পেয়েছে তার কোন তালিকা নোটিশ বোর্ডে না থাকায় তালিকা দেখতে চাইলে দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিকল্পনা কর্মকর্তা প্রীতিকান্তি ত্রিপুরা সাংবাদিকদেরকে বলেন,ভাইস চেয়ারম্যানের অনুমতি লাগবে,একথা শোনার পর ভাইস চেয়ারম্যানের কাছে গেলে তিনি বলেন, লিখিত আবেদন করতে হবে এবং তাতে বোর্ড চেয়ারম্যার বীর বাহাদুরের অনুমতি সম্বলিত সাক্ষর লাগবে,এরপর নানা যুক্তি দিয়ে সাংবাদিকরা তাকে বোঝানোর পর তিনি সাংবাদিকদের পাঠান সদস্য (পরিকল্পনা) মোঃ মনজুরুল আলম এর কাছে । মনজুরুল আলম ততক্ষণে উন্নয়ন বোর্ড আইনের বই নিয়ে বসেছেন,তিনি সাংবাদিকদের সেই আইনের কপি দেখিয়ে বলেন-উন্নয়ন বোর্ড আইন অনুসারে এটি দেয়ার ক্ষমতা সদস্য ( প্রশাসন) এর। এরপর তিনি তারই বিভাগে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রীতিকান্তি ত্রিপুরাকে আদেশ দেন সদস্য (প্রশাসন) এর সাথে কথা বলে একটি সুরাহা করতে। কথামতো কথা বলে ফিরে আসেন প্রীতিময় এবং সাংবাদিকদের জানান,কোন তালিকা দেয়া যাবেনা। কোন তথ্য লাগলে বলেন। শেষ পর্যন্ত তালিকা না দেখেই ফিরে আসতে হয় সাংবাদিকদের।
এবকই অবস্থা,সাধারন শিক্ষার্থীদের। কে বৃত্তি পেয়েছেন আর কে যে পাননি,তাও জানার কোন উপায় নেই। পরিকল্পনা কর্মকতা প্রীতিকান্তি ত্রিপুরা জানান-আমরা সব প্রতিষ্ঠানে চেক এবং চিঠি পাঠিয়ে দিচ্ছি,তারাই জানিয়ে দেবে। বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে,শিক্ষার্থীরা জানবে কিভাবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন-এটাতো আমার দেখার বিষয় না। নোটিশ বোর্ড দেয়া হয়নি কেনো জানতে চাইলে তিনি বলেন-নোটিশ বোর্ডে দিলে ছেলেরা ছিঁড়ে ফেলে,তাই দিয়ে লাভ নেই।
এই বিষয়ে কথা বলার জন্য উন্নয়ন বোর্ড চেয়ারম্যার বীর বাহাদুরের সাখে যোগাযোগ করলে জানা যায়,তিনি ইউএনডিপির এক্সপোজার ভিজিটে অস্ট্রেলিয়া আছেন। তবে ভাইস চেয়ারম্যান এডিএম আবুল বাসেত বলেন-এর সাথে আমার কোন সম্পৃক্ততা নেই,আমি আসলে জানিনা কে,কোন প্রক্রিয়ায় বৃত্তি পেয়েছে,এই বিষয়ে চেয়ারম্যানই ভালো বলতে পারবেন।
এদিকে বৃত্তির তালিকা নিয়ে ক্ষুদ্ধ রাঙামাটি জেলা এবং কলেজ ছাত্রলীগের নেতারাও। তারা অভিযোগ করেন-বীর বাহাদুর বান্দরবানের সংসদ সদস্য হওয়ায় তিনি অন্যায়ভাবে তার নিজের জেলায় কম আবেদন সত্ত্বেও বেশি বৃত্তি দিয়েছেন,আর রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িকে বঞ্চিত করেছেন। এব্যাপারে ছাত্রলীগ নেতারা উন্নয়ন বোর্ডে এসে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে কৈফিয়ত তলবও করে। তবে কর্মকর্তারা পুরো বিষয়টি চেয়ারম্যানের এখতিয়ার বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করেন।
বৃত্তিপ্রাপ্তদের তালিকা নিয়ে উন্নয়ন বোর্ড কর্মকর্তাদের লুকোচুরিতে স্পষ্টতঃ বিরক্তি প্রকাশ করে রাঙামাটি রিপো র্টাস ইউনিটির সাধারন সম্পাদক ফজলুর রহমান রাজন বলেন-সরকার যখন অবাধ তথ্য প্রবাহের কথা বলছে,জেলা প্রশাসন যখন তার সকল তথ্যের দ্বার জেলা তথ্য বাতায়নে উম্মুক্ত করে দিচ্ছে সেই সময় উন্নয়ন বোর্ডের বৃত্তিপ্রাপ্তদের তালিকা নিয়ে লুকোচুরি প্রমাণ করে সেখানে কোন ঘাপলা আছে। তিনি বলেন-বৃত্তিপ্রাপ্তদের নাম নোটিশ বোর্ডেও দেয়া হয়নি কেনো,এটা তো প্রশ্নের জন্ম দিবেই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



