somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শহীদ সাংবাদিক রশীদ ভাইকে খোলা চিঠি...

০৬ ই জুন, ২০১১ রাত ১২:৪৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



( ১৯৮৯ সালের ৪ জুন রাঙামাটি শহরে নিজপত্রিকা পার্বত্য বার্তা অফিসে কর্মরত অবস্থায় আততায়ীর গুলিতে নিহত সাংবাদিক আবদুল রশীদ এর স্মরণে )

প্রিয় কমরেড,
জানিনা,না ফেরার দেশে কেমন আছেন আপনি ? যে জীবনের খবর এই পৃথিবীতে পৌঁছায়না,সেই অজানা -অচেনা জীবনে আপনি ভালো থাকবেন,এমনটাই কামনা আমাদের। জানি,সেই জীবনে থেকেও আপনার জানতে ইচ্ছে করে ফেলে আসা রাঙামাটির কথা। কেউ না বলুক,আপনার অনুজপ্রতীম এক সহকর্মী হিসেবে,আপনার স্মৃতিমাখা সেই শহরের গল্প জানাতেই এই চিঠি।

প্রিয় কমরেড,প্রিয় সহকর্মী আমার,
আমাকে আপনি ঠিক চিনবেননা। আপনার চির বিদায়ের ছয় বছর পর আপনার আদর্শিক সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নে যোগদান আমার। আর ঠিক এক যুগ পর সাংবাদিকতায় প্রবেশ আমার। স্বভাবতই আমাকে চেনার কথা না আপনার। কিন্তু কমরেড,আপনার স্বভাব,আপনার আদর্শ,আপনার সাহসিকতা,আপনার ঔদ্ধত্ব কি করে যেনো ভর করেছে আমার উপরও। আপনার মতো করে এই শহর আমাকে আপন করলেও, এই শহরের মানুষের যে নিদারুন ভালোবাসা আপনি পেয়েছেন,সেটা আমার বা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। বদলে যাওয়া সময়,বদলে যাওয়া মানুষ,বদলে যাওয়া চারপাশ----আরো অনেক কিছুকেই এতো বেশি করে বদলে দিয়েছে যে,আপনি বেঁচে থাকলে কষ্টই পেতেন ! কারণ,ভালোমানুষ ক্রমশঃ বন্ধুহীন হতে থাকে,আর বন্ধুহীন হতে হতে একদিন নিঃসঙ্গ হয়ে যায়। নিঃসঙ্গতার কষ্ট বড় ভয়াবহ। তাই নিঃসঙ্গ হওয়ার আগেই আপনার মৃত্যু আপনাকেই অমর করেছে কমরেড ! ঘাকতরা বড় ভুল করে ফেলেছে। জীবিত রশীদের চেয়ে মৃত রশীদ যে কতটা শক্তিশালী সেই হিসেব মিলেনি তাদের।

প্রিয় কমরেড,
আপনার দেখে যাওয়া,রেখে যাওয়া পৃথিবী এখন আর আগের মতো নেই। স্বপ্নের সমাজতন্ত্র বিলীন প্রায়। দুই জার্মানীর মধ্যিখানের বার্লিন প্রাচীর ভেঙ্গে খানখান,পূর্ব আর পশ্চিম জামার্নী এখন কেবলই স্মৃতি। সমাজতন্ত্রের চারণভূমি রাশিয়া এখন বুর্জোয়া হওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। চীনা সমাজতন্ত্র এখন অদ্ভূত এক আকার নিয়ে যেনো মাও সেতুং কেই বিদ্রুপ করছে। পাশের পশ্চিম বাংলায় মহাননেতা জ্যোতিবসুর প্রয়াণের পর সমাজতন্ত্র উধাও,নির্বাচনে ভূমিধ্বস পরাজয় জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া সমাজ বিপ্লবীদের। ল্যাটিন আমেরিকার পথে পথে যদিও এখনো চে গুয়েভারা আর ফিদেল এর চেতনায় উজ্জীবিত তরুনরা লড়াইয়ের ময়দানে। পুরো বিশ্ব এখন শাসন করছে এক আমেরিকা। ফ্রাংকেস্টাইনরূপী আমেরিকার ইচ্ছেয় তৈরি হয় লাদেন,তার ইচ্ছেয় নিহত হয় লাদেন। আর বিশ্বজুড়ে মানবতাবাদী মানুষের সংখ্যা কমতে কমতে হাতে গোণা। তবুও আশাবাদী মানুষ কমেনি। এখনো হাজারো তরুণের বুকে উজ্জ¦ল হয়ে জ্জ্বলজ্বল করে প্রিয় সমাজতন্ত্র। এখনো ক্ষীন ¯্রােতধারায় প্রবাহিত বিপরীত চিন্তার তারুণ্যের মিছিলে শ্লোগানে দীপ্ত কন্ঠে উচ্চারিত হয় আপনার নেই প্রিয় শ্লোগান-‘ একটাই মন্ত্র,সমাজতন্ত্র’।


প্রিয় ভাই আমার,
আপনার দেখে যাওয়া প্রবল স্বৈরশাসক এরশাদ এখন শুকিয়ে যাওয়া নদীর মতো বিগত যৌবনা। তাকে ঘিরে এখনো মাঝে মাঝে গল্প ছড়ায়,কিন্তু সেই গল্পে প্রাণ নেই আগের মতো। কিন্তু তার বিদায়ের পর আমাদের প্রিয় দুই নেত্রীর হাত ধরে যে গনতন্ত্র এলো,সেই গনতন্ত্র নিয়েই এখন সর্বত্র কৌতুক আর হাসাহাসি। নারীর ক্ষমতায়ন তাদের আপোষ করতে না শেখানোয়,এর ধকল সইছে পুরো দেশ। দুই দশকের গনতন্ত্রে এখনো সন্দেহ অবিশ্বাস। এখনো কথিত গনতন্ত্রের ফাঁক গলে ঢুকে পড়ে উর্দি পড়া রক্ষাকবচ। এখনো ক্রসফায়ার এর নামে লাশ হয়ে যায় শত ভিন্নমতাবলম্বীরা। ভিন্ন মিছিলের বন্ধুর বুকে গুলি ছুড়ে উগ্র মতাদর্শিক তরুন। শিক্ষাঙ্গনে যে সন্ত্রাস বন্ধের জন্য সারাজীবন লড়াই করেছেন,তা এখনো বন্ধ হয়নি। যে শিক্ষানীতির জন্য রাজপথ কাঁপিয়েছেন,সেই প্রত্যাশিত শিক্ষানীতি এখনো আমরা পাইনি। আর যেই রাষ্ট্র আর সংবিধানের জন্য অস্ত্র হাতে লড়াই করেছেন,সেই সংবিধান ক্রমাগত বদলাতে বদলাতে অদ্ভূতুড়ে এক আকার নিচ্ছে !

প্রিয় সহকর্মী আমার
আপনার রেখে যাওয়া শহর রাঙামাটিও অনেক বদলেছে। ছোট্ট ছিমছাম সেই শহর এখন প্রায় বস্তি,জনারণ্য যেনো। আপনার সেমিপাকা বাড়ী কাম পত্রিকা অফিসটিও এখন বহুতল ভবন। শহরে এখন অনেক তরুন-প্রবীন কোটিপতি,বহুতল সুরোম্য প্রাসাদ এর কমতি নেই। বেদখল হতে হতে বিপন্ন হয়ে গেছে আপনার প্রিয় কাপ্তাই হ্রদ। আপনার হাত ধরে সাংবাদিকতায় আসা অনেকেই এখন অনেক বড় সাংবাদিক। নানা সীমাবদ্ধতায় আপনার প্রতিষ্ঠিত প্রিয় পত্রিকাটিও আর নিয়মিত বের হয়না। ছোট্ট সারা আর রনি এখন অনেক বড় হয়েছে। শহরের ডিসি বাংলোর চাপালিশ গাছটির বয়স আরো বেড়ে তিনশ বছর পেরিয়ে গেছে। যে সংকট আর বিহ্বলতার বলি হয়েছেন আপনি,সেই পার্বত্য সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানই হয়েছে,চুক্তির মধ্য দিয়ে। কেউ স্বীকার না করুক,আমরাতো জানি,আপনিই প্রথম বলেছিলেন,পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা রাজনৈতিক সমস্যা,এর সমাধান রাজনৈতিকভাবেই হতে হবে। পাহাড়ে চুক্তি হয়েছে,এখনো পুরো শান্ত হয়নি পাহাড়,একদিন ঠিকই হবে। সেই আশায় আমরা আশাবাদী মানুষ বুক বাঁধি। কিন্তু আপনার মতো শান্তির জন্য যারা প্রাণ দিলো,তাদের স্বীকৃতি দিয়ে একটি স্মৃতিসৌধ বানানোর জন্য ২০ বছরেও সময় পেলোনা আমাদের মাথামোটা জনপ্রতিনিধিরা,যাদের অনেকেই জীবিত আপনারই ঘনিষ্ঠজন। তাইতো এখনো প্রতিবছর ৪ জুন এলে রাঙামাটি পার্ক এর ৩৬৪ দিন অবহেলায় পড়ে থাকা বেদীটিতে ফুল দেই আমরা।

হে আদর্শিক বন্ধু আমার,
আপনার কতো কাছের বন্ধু দূরের হয়ে গেছে,সে খবর আমরা পাই। কিন্তু খুব দূরের অনেকে যে কাছে এসে আপনাকে ভালোবাসা দিচ্ছে,সেই বা কম কি ! যদিও,আপনার শহর রাঙামাটিতে এখনো সাম্প্রদায়িকতার চাষাবাদ ব্যাপক,এখনো এখানে মানুষে মানুষে সংঘাত,পান থেকে চুন খসলেই আগুন আর লাশ। এখনো দ্বিধাবিভক্ত শহরের শ্রমিক-মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত। এখনো জাতিগতবোধ প্রবল সবার মনে-মগজে। ন্যায়ের প্রশ্নে এখনো এক হতে পারেনা শিক্ষিত-অশিক্ষিত কেউই। এখনো রাষ্ট্রশাসন মানেই দলবাজি আর লুটপাট। এখনো আগুন জ্বলে বাঘাইহাট,লংগদু,রামগড়ে। এখনো লাশ হয় নিরীহ পাহাড়ী-বাঙালী। জিঘাংসার আগুনে পুড়ে খাঁক হয় সবুজ পাহাড়। উগ্র জাতীয়তাবাদ কুঁড়ে খায় সম্ভাবনাময়ী মগজ।

প্রিয় কমরেড
আমাদের স্বপ্নের সমাজতন্ত্র এখন সংকটে। সাম্রাজ্যবাদ নানা ছলাকলায় এখন উদ্ব্যত বিষাক্ত সাপ। কিন্তু বিপ্লব আর বিপ্লবীর মৃত্যু নেই। সাহসী ডানায় ভর করে আবার রুখে দাঁড়াবো আমরা একদিন সদলবলে। সেই দিন খুব বেশি দুরে নয়। যখন পাহাড়ের প্রতিটি প্রান্তে মানবিক মূল্যবোধেরই জয় হবে শেষাবধি। যখন সবাই জাতিগত পরিচয়ের উর্ধ্বে উঠে মানুষ হয়ে উঠবে। খবরের সন্ধানে থাকা আর কোন রশীদ নিজেই এইভাবে খবরের শিরোনাম হবেনা। তখন আপনার আর আপনাদের রক্তের ঋণ শোধ করার সুযোগ হয়ত তৈরি হবে। কমরেড,আপনি ভালো থাকুন,আমরা আপনার আদর্শের পতাকা বয়ে নিয়ে যাবো দূর...বহুদূর,যেখানে আপনি যেতে চেয়েছিলেন।
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র - ভ্রাম্যমান লাইব্রেরী ভাবনা

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:৪৬


শ্রদ্ধেয় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যাররে হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তার জন্মলগ্ন ১৯৭৮ সাল থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। আমার মনে পড়ে, আমি স্কুলে পড়াকালীন সময়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে স্কুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৫



যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×