"বন্ধু"! শব্দটাই কেমন যেন হারিয়ে দেয়। অপরিচয়ে নিশ্চিন্ততা কিংবা বহুবছরের পরিচয়েও বন্ধু হওয়া যায় না। বন্ধুত্ব আসলে হয় কেন? চোখের ভাল লাগায়, তেমনটি হয়ত নিতান্ত শিশুকালে ঘটেছিল, আবার কাছে ঘেঁষার পর অপছন্দ হতেই ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়া। তাই বোধ হয় বন্ধুত্বের জন্য আচরণের একটা সূক্ষ্ম অথবা মৌল হলেও মিল থাকা জরুরী। মোহাচ্ছন্নতাও বন্ধুত্ব ঘটায় কখনো কখনো, তবে তাতে একতরফা ভাবটাই প্রবল থাকে। বিশ্লেষণ করার যথেষ্ট যোগ্যতা রাখি না যদিও তবু মনে হলো বলে ভূমিকা টানলাম।
বন্ধু শব্দটির সাথে কবে কখন পরিচিত হয়েছিলাম মনে নেই এখন। তবে খুব শিশুকালে পিঠাপিঠি ছোট ভাইটিই হয়ত বন্ধু ছিল। কারণ, ওর তেড়ামীগুলো সব আমার সাথে আর আমিও "ধুমধাম"-এ আলসে করতাম না। তারপর বলা যায় টিপু-অপুদের কথা, জেঠাত ভাই, সমবয়সী প্রায়। চিত্তের স্থিরতার কারণে কি না জানিনা, টিপুটাকে আমি বেশী কাছের মনে করতাম। একই ক্লাসের পড়ুয়া হলেও টিপু ছিল একটু বেপরোয়া আর আমি বিপরীত, তাই ছায়া দিত সেকালের হাফপ্যান্ট পরা দাঙ্গাবাজদের বিপরীতে। একদিনের কথা খুব মনে পড়ে-এমনিতেই আমি কখনোই মারপিট পছন্দ করতাম না, ছাত্রজীবনের অনেকগুলো বছরে মাত্র একবার এক সহপাঠীর সাথে ক'টি মাত্র ঘুষি বিনিময় করেছি-তো আসছিলাম দূরের কোন আত্মীয়ের গ্রাম থেকে, বিকেলের পথের পাশের কোন এক মাধ্যমিক স্কুল ছুটি হওয়ায় ক'টি দুষ্ট ছেলে আমাদের অকারণেই শাসাচ্ছে, এমনকি মার দেয়ার হুমকিও দিয়ে ফেলেছে। আমি টিপুকে বলছিলাম চল্ যাই, সে রুখে দাঁড়ালো, বলল- দুনিয়াটা এমন যে, ভাগতে নেই এখানে, রুখে দাঁড়াতে পারলেই বাঁচা যায়, দুর্বলের জন্য মার ছাড়া আর কিছু থাকে না। বাস্তবে তাই হলো, ওরা পিছু নিল; আমি মুগ্ধ হলাম তার কথায়।
কাছের দূরের রক্তের বাঁধনদের সাথে সাথে ছিল বাবুল, হামীদ, মাহবুব, শাহাবুদ্দিন, নজরুল এবং এভাবেই একদিন বড় হয়ে গেলাম। কোন এক পরীক্ষাকালে গাঁ থেকে বহুদূরে অবস্থান করতে হয়েছিল। স্বল্পকালীন সেদিনগুলো খুব অন্যরকম লেগেছিল, যেন পরীক্ষা নয়; কোথাও বেড়াতে এসেছি। একদিন রাতে বৃষ্টি ভেজা পথে চলতে গিয়ে সেলিমকে অন্য কোন হৃদয়ের টানেই হোক অথবা নিছক বন্ধুত্বের কারণে হোক বলে বসেছি যে, এতগুলো দিন পার করে দিলাম অথচ আমার কোন সত্যিকারের বন্ধু নেই, সেও দেখি এ পক্ষীয় জবাবই ফিরিয়ে দিল। বন্ধুত্বের জন্য আদৌ মৌখিক স্বীকৃতির কোন প্রয়োজন আছে কি না আমার জানা নেই, কিন্তু সেদিন যেন আমরা বন্ধুত্ব নামক একটা বন্ধনে আবদ্ধ হলাম। কেন জানিনা, সে কথাগুলোই যেন আমাদেরকে আজো বেঁধে রেখেছে হাজার দূরত্বের মাঝেও। বন্ধু তো অনেকেই ছিল, আসলে মননে দাগ কাটতে পারেনি হয়ত সকলে, তাই আমরা অথবা হয়ত আমি মনে করতে পারি না সকলকে। হুম, এমনো হয়েছে যে, আমি মনে না রাখা বন্ধু আমাকে সবচেয়ে বেশী মনে রেখেছে, সিরাজ বন্ধু ছিল কি না বুঝতে পারিনি তবে তার কথাগুলো খুব মনে আছে-"শিশিরে সুমনের পা ভিজে গেল"-তৃতীয় শ্রেণীর "আমার বই"-এর লাইন। কারন, তখন ছোট খালার দেয়া "সুমন" নামটি বেশ পরিচিত ছিল।
বন্ধুরা চাইতো বাজারের কোলাহল, টিভির পর্দা, ফুটবল মাঠ; আর আমার মনটা বার বার ছুটে যেত উত্তরের মরা গাঙের ধারের সুবজের মেলায়। তেমন প্রাকৃতিক সবুজ বাস্তবের চোখে আর দেখেছি কি না মনে করতে পারছি না। কবিতা লিখতাম না তখনো, কিন্তু মনটাই যেন সেখানে কবিতা হয়ে যেত। এভাবেই "শকুন্তলা শিল্প ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী"র বন্ধুদেরকেও ভুলে উঠলাম তেজগাঁয়ের চারতলায়। প্রথম দিনেই মুনীর আপন করে নিল, লালবাগের ঐশ্বর্যশালীর ছেলেটা বন্ধুত্বের কাছাকাছি পৌঁছেছিল হয়ত, কিন্তু অহং-ঔদ্ধত্যপনা আর মোটামুটি দাঙ্গাবাজীর পরিকল্পনা টের পেয়ে আর চলা হয়ে উঠেনি। গাঁয়ের সহপাঠিনীদের কথা না হয় নাইবা বল্লাম, আমরা ছিলাম পরিবারের সদস্যদের মত, কারো বাবা মারা গেল তো ক্লাস বন্ধ, কারো ভাই ইরাক যুদ্ধে বাংলাদেশের পক্ষ হতে যোগ দিল তো সবার দুঃশ্চিন্তার অন্ত থাকতো না, এমনি করেই কমার্স ক্লাসের মাত্র তিন জনেও চেয়েছিল বন্ধু বানাতে। কি আর করা, তাদের কৌতুকী "অপেক্ষমান কেউ" যে আমার জন্য "দশটায় হাজিরা দেয়া চাকুরী" ছিল সেকথা কি করে বলি। এমন ধারাপাতেই বাকী পথটাও নিজের মাঝেই কেটে গেল, সপ্তম থিয়েটারের সমবয়সী শাহ আলমকেও ছুঁতে পারিনি, সংস্কৃতির ধারাটাই বোধ হয় মন মেনে নিতে পারেনি অন্তর। মুনীরই শুধু শেষমেষ বিদায় দিল "জিয়া"র পুরু কাঁচের ওপাশ হতে।
প্রবাসের বন্ধুত্বে অংকের হিসেবটা হুটহাট সামনে চলে আসে, অথচ হিসেব কষে বন্ধুত্ব হয় না কি না। ভার্চূয়াল জীবনই যেন শ্রেয় হয়ে দেখা দিল। যেখানে নেই কোন সময়ের হিসেব, অর্থের হিসেব; অন্তর থেকে অন্তরে শুধু বার্তা প্রেরণ মেশিনের মাধ্যমে। তাই আন্তরিকতাটা একটু বেশী ঠেকলো এখানে। পাঁচ ফুলের একটি বৃন্ত দাঁড়িয়েছিল একদা, সূতোটা কিংবা রোদ্দুরের বিশুষ্কতা হয়ত সহ্য করতে পারেনি আমাদের কোমল মনের পাপড়ীগুলো; সূতো ছিঁড়ে গেল, বৃন্ত নুয়ে পড়লো। তাই আজকাল খুব মনে হয়, ভুলে যাওয়া গুণটাই বোধ হয় মানুষের মানসিক প্রশান্তি লাভের একটা উল্লেখযোগ্য সুকারণ। চেষ্টা চলছে, পাথরে খোদাই করা "বন্ধু" শব্দটি কি এত কম সময়েই মুছে যাওয়া সম্ভব; অন্তর যে কোথাও কোথাও নিরেট পাথর হয়!
পাথরের বুকেও না কি ফুল ফোটে, কেননা ঝর্ণারা তো পাথরের বুক থেকেই নির্ঝরিত হয়। তাই উদ্ভিদেরা তো জন্ম নেবেই, ফুলেরা ফুটবে, লতা-গুল্মরা কিছুদিন বেয়ে বেয়ে অবশেষে পাহাড়ী ঢলে ধুয়ে যাবে। তারপর একদিন হয়ত পাথর খসে পড়বে পর্বত শিখর হতে; সেদিন অনুভব মরে যাবে!
ছবির জন্য কৃতজ্ঞ যেখানে।
আলোচিত ব্লগ
শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমরা এমন কেন?
একটা গল্প দিয়ে শুরু করা যাক।
শেষ বিচারের পর নরকে শাস্তি ভোগ করছে পাপীরা। বিশাল বিশাল তেলের ড্রামে তাদের একবার ডুবিয়ে আবার ভাসিয়ে তোলা হচ্ছে। প্রতিটি ড্রামের সামনে একজন করে পাহারাদার... ...বাকিটুকু পড়ুন
পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন
“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমাদের গ্রামের গল্প!

আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।