প্রথম পর্ব
তিন
তাহের বাড়ীর সবার ছোট, বড় ভাই শফিক কুমিল্লার কালীবাড়ীতে ব্যবসা করে। মেঝ ও সেঝ ভাই ইতিমধ্যেই সৌদিতে।
শফিককে ঐ দিন জরূরী ব্যবসার কাজে ঢাকা যেতে হবে, তাই তাড়াতাড়ি করে ফেরার জন্য কলেজে মোরে নেমে গিয়েছিল। সাধারনতঃ সে সন্ধ্যার আগে গ্রামের বাড়ী ফেরে না । কোন কোন দিন ফেরে ও না, দু তিন দিন পরে আসে। ছোট ভাই তাহেরকে বাসে ঝুলতে দেখে ফেলেছে। শুধু তাইই নয় ভেতরের তিন সহ পাঠীকে ও দেখেছে এবং চিনেছে।
- আব্বা, তাহের ডারে দ্যাশে রাহন ঠিক না। বাড়ীতে এসে স্ত্রীর সম্মুখে এই অবেলায় আসার প্রশ্নবোধক চিহ্ন মুখের উত্তর না দিয়েই শফিক কথাটা বললো।
- ক্যান কি হইছে, বাবার স্বাভাবিক উৎকন্ঠা ভরা প্রশ্ন।
ঘটনার বিবরণ বিস্তারিত ভাবে জানালো শফিক। মাঝে মাঝে বিশেষ বিশেষ স্থান সামান্য অতিরঞ্জিত করতেও দ্বিধা বোধ করলো না। কারন বাবাকে ব্যপারটা এখনই গুরুত্ব দিয়ে অনুধাবনের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।
- সেই সব পোলাপানের সংগে ক্লাশ ফাঁকি দিয়া শহরের হাওয়া খাইতে আর আড্ডা দেওনের লইগা বাহির হইছে। অগো দুইটারে আমি ভাল কইরা আমি চিনি, ফেল করা পোলা। গাাঁজা শুধু খায়ই না কলেজের পোলাপানের মইধ্যে বিলায়। ডাইলের ব্যবসাও করতে পারে।
- গাঁজা খায় আবার ডাইলের ব্যবসা?
গ্রামের সহজ সরল কোন এক প্রৌঢ় পিতার সমসাময়িক ঘটনাবলির সহিত ব্যবহৃত শব্দের অজ্ঞতার বহিপ্রকাশ পেল। শফিকের স্ত্রীর ও মুখে একই ধরনের প্রশ্নবোধক অভিব্যক্তি। দুজনকেই শফিক ফেনসিডিল পানে তরুণ ও যুব শক্তির আসক্তি হয়ে বিপথগামী হওয়ার বিষয়টি বাবা ও স্ত্রীকে খোলাসা করে বললো।
সন্ধ্যায় তাহের বাড়ী ফিরে এলে, বাবার সামনে জেরা করে সত্যি ঘটনা উৎঘাটন করা হোল। সামান্য উত্তম মাধ্যম ও দেয়া হোল। বাবা, মা, ভাই ও ভাবী মিলে সিদ্ধান্ত নিল তাহেরকে আর দেশে রাখা যাবে না; বিদেশে পাঠাতে হবে। অসৎ সংগে সর্বনাশ।
চার
রোববার এমিরেট্স্ এয়ারলাইনে জরূরী ভিত্তিতে টিকেট কিনতে হয়েছিল আব্দুল্লাহ্ র। ফোন ও ফ্যাক্স এর মাধ্যমে দু দু বার ছুটি এক্সটেন্ড করেছিল, প্রাপ্ত ছুটি সব শেষ। তাই এবার ফেরত যেতেই হবে।
পরিবার পরে যাবে ঠিক করেছে।প্রতিবারই মনে করে ছিল চার সপ্তাহ ছুটি শেষে কাজে যোগদান করবে, কিন্তু প্রায়ই তার আসার পর অনিচ্ছা সত্বেও ছুটির মেয়াদ বাড়াতে হয়েছে। ভাগ্য ভাল তার সরাসরি আরবী ওপরওয়ালা তাকে একটু হলেও সুনজরে দেখে।
একা যাবার সময় আজকাল আবদুল্লাহ কাউকে আর সংগে আনে না। দিনের বেলা হলে ব্যবি ট্যক্সি করেই চলে আসে। রাত একটু বেশী হলে অবশ্য ভিন্ন ব্যপার। ঐ সময় নিরপত্তার খাতিরেই কাউকে অনুরোধ করে বিমান বন্দরে নামিয়ে দেবার জন্য। আজ দুপুরে তার ফ্লাইট, তাই ব্যবি ট্যক্সিতেই কাজ হল।
জিয়া বিমান বন্দরে মূল ইমারতের বর্ধিতকরনের কাজ চলছে। তবুও আব্দুল্লাহ্ র বিশ্বাস দুবাই বিমান বন্দর বা সিআপুরের চাঙ্গি বিমান বন্দরের ন্যায় চৌকস বিমান বন্দর “জিয়া” কখনই হবে না। আব্দুল্লাহ্ প্রতি বারেই লক্ষ করে সিলিং এ ঝুলন্ত সাইন বোর্ড গুলো তাচ্ছিল্ল্য সহকারে লাগানো হয়েছে। অধিকাংশেরই “এ্যালাইনমেন্ট ” ঠিক নেই। তার চল্লিশ বছরের চশমা বিহীন চোখে অনায়াসেই তা ধরা পড়ে এবং দৃষ্টি কটু লাগে। বোর্ডিং বৃজের নিকট লম্বা করিডোরের কার্পেটে ময়লার কারনে ওটার আসল রং কি বোঝাই যাচ্ছে না। তারপর যার পায়ের শক্তি বেশী মনে হয় সে যেন তার জুতার চাপে কার্পেটের বেশ কিছু জায়গাতে ওটাকে মুচরিয়ে ফেলেছে। কিছু স্থানে পচে যাওয়া কার্পেটের দূঃর্গন্ধও ছড়াচ্ছে বোধ হোল।
বিমান বন্দরের চেক ইন কক্ষে শত শত বাংলাদেশী তরুণ ও যুবককে দেখলো। বিদেশে যাবার জন্য উদগ্রীব তাদের মুখমন্ডল। তাদের পরনে কোন এক “Contracting Company” র নাম সম্বলিত একই রং এর ক্লিনিং অথবা লেবার ড্রেস। এবারে ব্যতিক্রম হিসাবে ছোট একটি মহিলাদের দল দৃষ্টিতে এল। সস্তা সাদা কাপড়ের এ্যাপ্রোন শাড়ী বা শেলওয়ার কামিজের ওপরে পরিহিত।
আব্দুল্লাহ ইচ্ছে করেই ওয়েটিং লাউঞ্জে বেশীক্ষণ যাবত বসে রইলো। একবোরে শেষ মূহুর্তে আরোহণের সিদ্ধান্ত নিল। কারণ আব্দুল্লাহ বমিান বন্দররে করিডোরের ময়লা কার্পেট ও তার দূঃর্গন্ধ লাইনে দাড়িয়ে আহরন করতে চায়নি।
বিমানে আব্দুল্লাহর দু পাশের সীটে দুজন হবু প্রবাসী বাংলাদেশী, বাংলাদেশের বহু আকাঙ্খিত বৈদেশিক অর্থ উপার্জনকারী জনশক্তির লোক পেল। ডানে সবুজ ক্যাপ পরিহিত প্যান্ট-শার্ট একই সাথে সেলাইকৃত পোশাকে এক যুবক। বয়স ২২/২৩ হতে পারে আব্দুল্লাহ অনুমান করলো। বাম পাশের মেয়েটি ১৬ / ১৭ বছরের হতে পারে, এ্যাপ্রোন পরিহিত, সেই সাদা কাপড়েরই একটি মাথার চুল ঢাকার জন্য একটি স্কার্ফ। পূর্বে আব্দুল্লাহ এদের সাথে সংকোচের সাথে কথা বললেও বর্তমানে উংসাহ নিয়েই এদের সাথে আব্দুল্লাহ কথা বলে, খোঁজ খবর নেয়। কারণ এরাই তো বাংলাদেশের বহু প্রয়োজনীয় বৈদিেশক মূদ্রা অর্জনকারী দূর্ভাগা জনশািক্ত।
অন্যান্য সীটে বাংলাদেশের ফুটবল ফেডারেশনের একদল তরুণকে দেখল। চৌকস পোশকে সজ্জিত। ন্যাভী ব্লু প্যান্ট, হালকা আকাশী রং এর হাফ শার্টে বি এফ এফ এর অক্ষরে খচিত টাই পরিহিত এক ঝাক উচ্ছল তরুণকে দেখে প্রাথমিক ভাবে ভাল লাগল। আব্দুল্লাহর পরক্ষণেই মনে হোল এই তরুণরা কি জানে না, কাদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ে এই চৌকস তরুণ দল বিদেশে খেলতে যাচ্ছে। -- সম্ভবত না, ঐ চেতনাই হয়তো এদের হয় নি। তাদের ব্যাগে ”Under 19 Football Team” লেখা রয়েছে।
- আপনি কোথায় যাচ্ছেন? ডান পাশের যাত্রীকে আব্দুল্লাহ জিজ্ঞেস করলো।
- দামাম এয়ারপোর্টে।
বিস্তারিত এই যুবক জানাতে না চাইলেও সৌদি আরবের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা থেকে নানাহ গল্প শুনেছে। সম্ভবত জানে এরা এয়ারপোরটে ক্লিনার হিসেবেই নিয়োজিত হতে পারে। আহার - বাসস্থান ইত্যাদি ফ্রি লখো থাকলেও, বাসস্থান অধিকাংশ সময়ই অমানবিক পযায়ে চলে যায়।
- কত টাকা খরচ করছেন?
পরিমান জানালো যুবক। আব্দুল্লাহর মনে হোল এই ছেলে তো অনেক কম বলেছে। তার নিজের প্রতিষ্ঠানে একই ধরনের কাজে কর্মরত বাংলাদেশীরাতো ব্যয়ের পরিমান এক লক্ষ বা তার অধিক বলে।
- বেতন কত?
- চারশ বিয়াল। আগে মালেশিয়া ছিলাম। ঐ খানে তামিল বউরে মারনের লইগা সারে তিন হাজার বাঙ্গালী ফেরত পাঠাইছে। আসলে বাঙ্গালী মারে নাই, ওরাই মাইরা বাংলাদেশীগো দোষ দিছে।
এরপর সে মালেশিয়ার জোহর বরু শহরে থাকা ও চায়নীজ মালিকের অধিনে কাজের অভিজ্ঞতা বর্ণণা করলো। আর সব বাংলাদেশীদের মতই নিজের সাফল্যের ইতিহাসই তাতে লিখিত, -- ব্যর্থতা নেই।
(...চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই নভেম্বর, ২০০৮ রাত ৮:১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



