আমার প্রিয় পোস্ট

উন্নত দেশে ব্যক্তি স্বাধীনতা

১৯৭১ : মুজাফফরাবাদ

২৯ শে জানুয়ারি, ২০০৯ দুপুর ১২:৫৬

শেয়ারঃ
0 0

১৯৭১ সালে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙ্গালী যে ক'জন মুজাফফরাবাদে ছিলেন, তারা সকলেই, জানা মতে সামরিক বাহিনীতে চাকুরিরত ছিলেন। সর্ব সাকুল্যে হয়তো সাত থেকে দশ পরিবার হতে পারেন। সাত থেকে দশ ব্যবধানটা উল্লেখ করার কারন মুলত ১৯৭১ সালের মাঝামাঝি থেকে নভেম্বরের সময়ে অনেকে পরিবারকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। জানামতে মুজাফফরাবাদ থেকে পালিয়ে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে কেউ অংশগ্রহণ করতে যাননি। কারন হিসেবে আমার ব্যক্তিগত মূল্যায়ন হচ্ছে, পরিবার সহ পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন তাদের পক্ষ অত্যন্ত ঝুকিপূর্ণ ছিল। মুজাফ্ফরাবাদের সন্নিকটে সমতল ভূমির কোন সীমানা ক্রসিং ছিল না। বিদেশে আমাদের এই ছোট বাঙ্গালী গোষ্ঠী কিন্তু অতি সহজেই জানতে পারত সামরিক বাহিনীর কোন বাঙ্গালী সদস্য পালিয়ে গিয়ে ভারত হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করতে চলে গেছে। তার মধ্য লাহোর সীমানায় গেট ভেঙ্গে জীপ চালিয়ে মেজর মনজুরের(পরে বাংলাদেশে মেজর জেনারেল মনজুর, ১৯৮১ সালে চট্টগ্রামের জি, ও, সি) খবরটি অতি সহজেই জানাজানি হয়ে যায়।

এরকম আরও পালিয়ে যাবার খবর আসতে শুরু করে। অধিকাংশই আমার ধারনা তরুন অফিসার ও জোয়ান। জোয়ানরা অবশ্য দেশে ছুটিতে গিয়ে আর ফেরেন নি, জেনেছি সরাসরি বাংলাদেশ থেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন, অনেকে। এ ধরনের ঘটনা যত ঘটছিল, আমরা যারা রয়ে গিয়েছিলাম, তাদের উপর সামরিক গোয়েন্দা নজরদারি স্বাভাবিক কারনেই বেড়ে গিয়েছিল। এই একই কারনে অনেক পরিবার সম্পন্ন সামরিক চাকুরে বাংলাদেশে তাদের ছুটি কাটাতে যান নি।

মুজাফফরাবাদের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে বাবার চাকুরী ছিল। এই সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে সরকারী বেসরকারী সব ধরনের রোগী ও যোদ্ধাদের চিকিৎসা চলতো। ভারতীয় যোদ্ধাহত সৈন্যও এই হাসপাতালে চিকিৎসা হতে দেখেছি। বিশেষ করে আমি ও আমার ছোট বোনতো শোনার পর দৌড়ে দেখতে গেছিলাম, শত্রু দেখতে কেমন হয় এটা দেখার জন্য। দেখার পর আমার উৎসাহ একেবারে নিবে গেছিল, মনে গভীরভাবে উচ্চারিত হচ্ছিল, "আরে ও তো আরেকটা মানুষ"

১৯৭১ এর জুন মাস থেকে নয়া দিল্লি রেডিও যতটুকু মনে পড়ে, বিকাল চারটা থেকে এক ঘন্টা ব্যপী বাংলা অনুষ্ঠান চালু করেছিল। ঐ রেডিও আর বিবিসি থেকেই মুক্তিযুদ্ধের খবরাখবর পাওয়ার জন্য আমরা উদগ্রীব হয়ে থাকতাম। বিবিসি বাংলার সিরাজুর রহমান তখন অতি পরিচিত কন্ঠ। ওটা সকালে ১৫ মিনিটের জন্য আর বিকেলে আধা ঘন্টার জন্য হোত। তবে সকলে বিবিসির তথ্যকেই প্রদান্য দিয়ে থাকত।

ঐ দুই রেডিও প্রচার শোনার জন্য আমাদেরকে বেশ সতর্কতা অবলম্বন করতে হোত। "লো" ভলিউম ও ট্রান্সিস্টর রেডিও কাছে গিয়ে কান পেতে, রুমের দরজা বন্ধ করে শুনতাম প্রায় সকলেই। এক পরিবার তো গোয়েন্দাদের/প্রতিবেশীকে খুশি করার জন্য বিবিসি আর দিল্লি রেডিও বদ্ধ ঘরে শোনার পর, রেডিও পাকিস্তান "হাই" ভলিউমে চালিয়ে দরজা - জানালা খুলে রাখত ( "নে তোদের রেডিও শোন")।

ডিসেম্বরের দশ তারিখে সম্ভবত আমার এ্যবোটাবাদ পাবলিক স্কুল শীত কালীন ছুটি হলে মুজাফফরাবাদ আসি। আসার পর দেখি বাবা নেই, জানালো হোল ফ্রন্ট লাইনে ফিল্ড এ্যম্বুলেন্সের সংগে বাবাকে যুদ্ধের ডিউটিতে পাঠিয়েছে। আমি জানতাম বাবার এই সিনিয়র পজিশনে থেকে যুদ্ধে রনক্ষেত্রে যাবার কথা নয়, ওটা জুনিয়ররা করে থাকেন। বুঝলাম বাঙ্গালী হিসেবে বাবাকে শাস্তি দেয়ার জন্যই তাকে এই শীতে রনক্ষেত্রে পাঠিয়েছে। সিংগেল জুনিয়র বাঙ্গালী ডাক্তারকে পাঠানো যাবে না, কারন সে যদি ভারতে পালিয়ে যায়। সবাই দোয়া করছে কুশল সংবাদের জন্য। নিজের দেশে দেশের জন্য কাজ করতে পাঠানোর সময়ও আমাদেরকে শত্রু ভাবা হচ্ছে।

১৯৭১ এর শেষ দিকে আমরা ও যাত্রা পথে পাকিস্তানীদের অশোভন উক্তি থেকে নিজেদেরকে মুক্ত রাখার লক্ষে নিজেরা ও অপ্রয়োজনীয় ভ্রমন প্রায় বাদই দিয়ে ফেলেছিলাম।

নভেম্বরের দিকে নয়া দিল্লি রেডিও "শোন একটি মজিবরের কন্ঠ থেকে লক্ষ মজিবরের কন্ঠ........." এই গানটি প্রচার করত। এবং গানটি শুনতে অসম্ভব ভাল লাগত। রেডিও তরঙ্গ জ্যমি প্রযুক্তি তখন নিশ্চয়ই উন্নত ছিল না। থাকলে ভারতের আকাশ বানী শুনতে হোত না।

১৪ই ডিসেম্বর বাবাকে যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে বেশ অসুস্থ অবস্থায় ফেরত আনা হোল। চারিদিকে তুষারপাত অবস্থা ও তীব্র ঠান্ডা পরিবেশে তাঁবুতে থাকতে থাকতে বাবার বয়সে ধরা শরীর আর ধকল নিতে পারে নি।

১৬ ডিসেম্বর সকাল থেকেই বিবিসির খবরে আমরা জানতে পারি। বাংলাদেশে পাকিস্তান বাহিনী আত্মস্বমর্পণ করেছে। অবশ্য তেশরা ডিসেম্বর থেকেই নয়া দিল্লি রেডিও থেকে পাকিস্তান বাহিনীকে আত্মস্বমর্পণ করতে ইষ্টার্ন কমান্ড থেকে উচ্চারিত হচ্ছিল।

ছবিঃ ইন্টারনেট মুজাফফরাবাদ

 

লেখাটির বিষয়বস্তু(ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড): ১৯৭১ ;
প্রকাশ করা হয়েছে: আমার ডায়েরি  বিভাগে । বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...

 

২৯ শে জানুয়ারি, ২০০৯ দুপুর ১:১২

লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ

২৯ শে জানুয়ারি, ২০০৯ দুপুর ১:১৩

লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ আপনাকে।

৩. ২৯ শে জানুয়ারি, ২০০৯ দুপুর ১:৩৪
পাই বলেছেন: জানলাম।
ভালো লাগলো।
৫. ২৯ শে জানুয়ারি, ২০০৯ বিকাল ৩:১৯
মাহবুব সুমন বলেছেন: লেখাটি ভালো লাগছে
৬. ৩০ শে জানুয়ারি, ২০০৯ ভোর ৬:৫০
ফেরদাউস আল আমিন বলেছেন: ভাল লাগলো আপনার ভাল লাগা প্রতিবেদনটি পড়ে। আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে হয় এই ব্লগের জন্মলগ্ন থেকেই আছি। মনে পড়ে লিনাক্সে প্রথম প্রথম বাংলা প্রদর্শিত হোত না। ঐ টি র ছবি দিয়েও ব্লগ লিখেছি। আমার প্রথম লেখা "কালো বরফে দূঃর্ঘটনা" সেই ২০০৬ সালের এপ্রিল মাসে।
৭. ৩১ শে জানুয়ারি, ২০০৯ সন্ধ্যা ৬:০০
বাংলাদেশ-ফয়সাল বলেছেন: ফেরদাউস ভাই পরের ঘটনাগুলো জানতে চাই। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি। কিভাবে দেশে ফিরলেন? আপনার বাবা এখন কেমন আছেন??

 

মোট সময় লেগেছে ২.৮০৩২ সেকেন্ড

 

সামহোয়‍্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...
© সামহোয়্যার ইন...নেট লিমিটেড | ব্যবহারের শর্তাবলী | গোপনীয়তার নীতি
সুন্দর এই পৃথিবীতে আগমন পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে। স্কুল ........... সে অনেক.. মিশনারি স্কুল,
ডি এন হাই স্কুল চাঁদপুর,
চাকলালা বাংলা মিডিয়াম...
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ