: কে ?
- আমি ফেরদৌস।
: (খুব কাছাকাছি এসে, চোখটাকে কিছুটা তীক্ষ্ণ করে) ও ফেরদৌস। আসো, বসো। এই তো, একটু আগেই একজন এসেছিল ইন্টারভিউ করতে, এইমাত্র চলে গেল।
- (সোফায় বসে একটা খাকি রঙা খাম এগিয়ে দিতে দিতে) আপনার জন্মদিন সামনে, এখন তো পত্রিকা থেকে লোক আসবেই। শামসুর রাহমানের জন্মদিনের আগেও বোধ হয় তাঁর বাসায় প্রচুর লোকের ভিড় লেগে থাকত। মাহমুদ ভাই, এখানে আপনার একটা চেক আছে।
: (চেকটা চোখের খুব কাছাকাছি এনে) এটা কোন লেখাটার?
-প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যার।
: ঠিক আছে। থ্যাঙ্কস। তুমি এইখানে বসে কী প্রশ্ন করবা এইটা একটু ভাবতে থাকো। আমি এই ফাঁকে জিনিসটা ভিতরে দিয়া আসি।
উপরের কথোপকথনটি `সোনালী কাবিনে'র কবি ও `পানকৌড়ির রক্ত'র গল্পকার আল মাহমুদের সঙ্গে। ৭ জুলাই গিয়েছিলাম তাঁর গুলশানের বাসায় সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্য।
এর আগের দিন ছিল শহরজুড়ে ঝমঝম বৃষ্টি আর সেদিন কড়া রোদ। পারলে ওই রোদ যেন আমার শার্ট-প্যান্টসহ কাঁধের ব্যাগটাকেও পুড়িয়ে দেয়। রোদ আর বৃষ্টির এই হেয়লিপূর্ণ আচরণের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিলাম আঁদ্রে জিদের বাণী `সব বলা হয়ে গেছে'। ভাবছিলাম আল মাহমুদকে কী নিয়ে প্রশ্ন করব। তাঁর কবিতা, গল্প, উপন্যাস কিংবা রাজনৈতিক আদর্শ বদল নিয়ে যদি প্রশ্ন করি- এসব প্রশ্নের উত্তর তো তিনি বহুবারই দিয়েছেন। এই যখন আমার ভাবনার অবস্থা তখন আমি তাঁর বাসার সামনে এসে দাঁড়াই। দরজা খোলাই ছিল। ভেতরে ঢুকতেই প্রথমে তিনি আমাকে চিনতে পারলেন না। আমাকে চিনতে তাঁর আধা মিনিটের মাতো সময় লেগেছে। কেননা চেনার জন্য অনেক কাছাকাছি এসে আমার চেহারাটা তাঁর দেখতে হয়েছে।
তিনি অনেকদিন ধরেই চোখে কম দেখছেন এবং কানে কম শুনতে পান। প্রথম দর্শনেই সহজে কাউকে চিনতে পারেন না এ কবি। যদিও এর মধ্যেও কথা বলেন প্রাণ খুলে, তাঁর কলম এখনো রয়েছে সচল, একের পর এক লিখে যাচ্ছেন নতুন কবিতা, গল্প ও উপন্যাস। তিনি তাঁর লেখাগুলো সাধারণত লেখেন অপর কারও সাহায্য নিয়ে ডিকটেশন দিয়ে। বইপত্র আজকাল আর পড়তে পারেন না। আর যদি পড়েনও তা পড়তে হয়, দুটি হাইপাওয়ারের বাল্ব লাগানো টেবিলে। তাঁর এধরণের একটি টেবিল আছে। অনেকদিন ধরেই পড়াশুনা জন্য ওই টেবিলটি তিনি ব্যবহার করছেন।
ফেরদৌস মাহমুদ : মাহমুদ ভাই, আপনার তো অসংখ্য সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছে বিভিন্ন জায়গায়। এখন প্রশ্ন করতে গেলে দেখা যাবে আগের অনেক প্রশ্নেরই রিপিটেশন হয়ে গেছে। উত্তরগুলোও দেখা যাবে একই রকম। আপনার সঙ্গে কিছু নতুন বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছি। আপনি কী বলেন?
আল মাহমুদ : দেখো, আজকে সারাদিনই আমাকে একটার পর একটা ইন্টারভিউ দিতে হয়েছে। ঠিক কী ধরনের প্রশ্ন তুমি করবা সেটা তো আমি বলতে পারব না। তুমিই ভেবে দেখো কী করলে ভালো হয়। তবে আমি কিন্তু কানে ঠিক মতো শুনতে পাই না, একটু জোরে জোরে প্রশ্ন করবে।
: অসুবিধা নেই, আমি চিৎকার করে করেই প্রশ্ন করব। তাহলে শুরু করি `আপনি কেমন আছেন' এ প্রশ্ন দিয়েই।
আল মাহমুদ : খুব ভালো আছি, এটা বলতে পারব না। ইদানীং অলসভাবে বিছানায় চুপাচাপ শুয়ে থাকতেই ভালো লাগে।
: মানুষ যখন চুপচাপ বসে থাকে বা অলসভাবে সময় কাটায় ওই মুহূর্তগুলোতে কিন্তু তাঁর মধ্যে অদ্ভুত কিছু ভাবনা ঘুরপাক খায়। সে নানা রকম স্মৃতি-বিস্মৃতির জগৎ বা চিন্তার মধ্যে ঘোরাফেরা করে। আপনার চিন্তার ওই জগৎটা সম্পর্কে বলুন।
আল মাহমুদ : হ্যাঁ, তোমার কথা ঠিক। চুপচাপ শুয়ে থাকলেও বিভিন্ন স্মৃতি-বিস্মৃতি মাথার মধ্যে ঘোরাফেরা করেই। আমার আসলে তেমন সুখের স্মৃতি খুব একটা নেই। নানা সমস্যার মধ্যে বলা চলে জীবন কাটিয়েছি। মানুষের কাছ থেকে নানাভাবে প্রতারিত হয়েছি। কিন্তু মানুষের ওপর আস্থা হারাইনি। এখনো মানুষকে বিশ্বাস করতে দ্বিধা করি না। কারণ আমি তো জানি সব মানুষ একরকম হয় না। আমি আমার মতো মানুষও অনুসন্ধান করি।
: আপনি যখন লেখালেখি শুরু করেন ওই সময়ের মধ্যেই তো দেশ ভাগ হয়। আপনার লেখালেখি শুরুর সময়ের সাহিত্যিক-পরিবেশটা সম্পর্কে বলুন।
আল মাহমুদ : আমি যখন লিখতে শুরু করি, তখন দেশ ভাগ একটা বড় ব্যাপার ছিল। ওই সময় সাতচল্লিশ-আটচল্লিশের দিকে কলকাতা থেকে অনেক প্রখ্যাত কবি ঢাকায় এসে বসতি করে। তাদের সঙ্গে আমরা ভিড়তে চেয়েছি। যেমন ধরো- ফররুখ আহমদ, সৈয়দ আলী আহসান, আহসান হাবীব এসব প্রখ্যাত কবির কথা। কিন্তু নানা মানসিক ব্যবধানের জন্যই তাঁরা আমাদের পাত্তা দেননি। আমরা তখন আমাদের জন্য একটা স্বতন্ত্র কবিতা আন্দোলনের প্রয়াস করি। তা অবশ্য সচেতনভাবে করি না। নিজে থেকেই হয়ে যায়। তবে চল্লিশের কবিরা প্রথম দিকে আমাদের কোনো স্বীকৃতি বা সম্মান জানাতে প্রস্তুত ছিলেন না। আমরা নিজেরাই আমাদের রাস্তা তৈরি করে নিয়েছি। যেমন- আমার বিষয় ছিল, বাংলাদেশের সে সময়কার গ্রাম-জনপদ, নদী, নারী, প্রকৃতি, পরিবেশ এবং আঞ্চলিক শব্দ কাব্যে ব্যবহার করা। আমি সহজেই দৃষ্টি আকর্ষণ করি বোদ্ধা পাঠকমহলের। আমার সমসাময়িক অথচ অগ্রজ শামসুর রাহমান তখনো বুদ্ধদেব বসুর কবিতা পত্রিকায় লিখছেন। আমিও বসুর পত্রিকায় লেখা পাঠাই এবং লেখা ছাপা হয়। এভাবেই আমরা কবিতা পত্রিকার মাধ্যমে বুদ্ধদেব বসুর পছন্দ-অপছন্দের ও রুচির সহযাত্রী হয়ে যাই। আমাদের দেশে অগ্রজরা আমাদের একেবারেই স্বীকৃতি দিতে চাননি। ফলে আমরা দেশ ভাগ হওয়ার পরও কলকাতামুখী থেকে যেতে বাধ্য হই। আজ যদিও মনে হয়, ব্যাপারটা আমাদের জন্য স্বাস্থ্যকর ছিল না। কিন্তু আমরা ছিলাম নিরুপায়।
: আপনার নিকট-অগ্রজ ছিলেন চল্লিশের কবিরা। তাঁদের মধ্যে কি সমর সেনও পড়েন?
আল মাহমুদ : না, সমর সেন তো ছিলেন বলা যায় তিরিশেরই কবি। চল্লিশের বলতে পারো সুভাস মুখোপাধ্যায় বা মঙ্গলাচরণকে।
: এক্ষেত্রে অরুণ মিত্রের নামও তো নেয়া যায়।
আল মাহমুদ : অরুণ মিত্র অবশ্য চল্লিশে লেখা শুরু করলেও তাঁর লেখা প্রভাব বিস্তার করে কিন্তু পঞ্চাশের শুরুর দিকে। অর্থাৎ আমাদের সময়ে এসে। তিনি কবিতায় ফরাসি কাব্য-আঙ্গিক অনুসরণ করতেন। বিষয়টা আমাদের কাছে তখন নতুন ছিল, ফলে তাঁর কবিতা আমরা খুব মনোযোগ দিয়ে পড়তাম।
: আপনার একটা কবিতা আছে `প্রত্যাবর্তনে লজ্জা'। যে কবিতাটায় আমরা এক ট্রেন ফেল তরুণের দেখা পাই, ওই কবিতাটার ওপর অনেক সময় চলচ্চিত্রের কর্মশালায়ও চিত্রনাট্য লিখতে দেয়া হয়। আপনার এ কবিতাটা লেখার প্রেক্ষাপট বা মুহূর্তটা সম্পর্কে বলুন।
আল মাহমুদ : কবিতাটা লেখা হয়েছিল অন্যান্য কবিতা যেভাবে লেখা হয় ওই রকমভাবেই। স্বাভাবিকভাবেই। কবিতাটা আসলে আমার ব্যক্তিগত জীবনেরই বিষয়। বলতে পারো, আমি যে কোনো সময়ই ঠিক জায়গায় পৌঁছতে পারি না এটা তারই একটা প্রকাশ। আমার লাইফে আমি অসংখ্যবার ট্রেন ফেল করেছি। দেখেছি গাড়ি চলে যায়; কিন্তু আমি স্টেশনে একা পড়ে আছি। এ পড়ে থাকার বেদনাই এই কবিতাটাতে প্রকাশ পেয়েছে।
: কবিদের মধ্যে অনেক সময় একে-অপরের প্রতি ঈর্ষা লক্ষ্য করা যায়। কবিদের এ ঈর্ষার বিষয়টাকে আপনি কীভাবে দেখেন। আপনার মধ্যে কি কখনো কারও প্রতি এই ঈর্ষা কাজ করেছে?
আল মাহমুদ : আমি নিজে কখনো কারও প্রতি কোনো ঈর্ষাবোধ করিনি। আমার সঙ্গে কারও কোনো প্রতিযোগিতার ব্যাপার ছিল না। আমার সামনে কেবল একজন বড়মাপের কবি ছিলেন, তিনি শামসুর রাহমান। তাঁর সঙ্গে আমার খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। তাঁর মৃত্যুর কয়েকদিন আগেও, তুমি এখন যেখানটায় বসে আছ, সেখানেই তিনি বসেছিলেন। তাঁর পছন্দ মতো চা খেয়ে তিনি বিদায় হয়েছিলেন। অগ্রজের সম্মান আমি সবসময়ই তাকে দিয়েছি।
তবে আমি তোমার বলা ওই কবিদের ঈর্ষার কথাটা বিশ্বাস করি। কেননা, আমি সারাজীবন ব্যক্তিগতভাবে আমার প্রতি অনেক ঈর্ষাকাতর বন্ধুদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। তাদের কারও নামই আমি এখানে বলতে চাই না। তাদের অনেকের দ্বারা আমাকে অনেক মানসিক টেনশনের মধ্যে দিন কাটাতে হয়েছে। এরপরও সব সময় আমি বন্ধুত্বের মর্যাদা রক্ষা করতে চেয়েছি। যদিও জানি আধুনিক কবিদের কোনো বন্ধু হয় না।
: ফরহাদ মজহার একবার কোথাও বলেছিলেন, বাউলরা যতখানি সাধারণ মানুষের অনেক কাছাকাছি যেতে পেরেছেন, আধুনিক কবিরা তা পারেননি। আধুনিক কবিরা মানুষের খুব কাছাকাছি যেতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন। এ ব্যর্থতা প্রসঙ্গে উদাহরণ হিসেবে তিনি আপনার এবং শামসুর রাহমানের কথাও বলেছিলেন। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্যটা শুনতে চাচ্ছি।
আল মাহমুদ : ফরহাদ মজহার হয়তো বিষয়টা এভাবেই দেখেছেন। ওটা তাঁর ব্যক্তিগত মতামত।
সাধারণ জনগণ কখনো সাহিত্য-সংস্কৃতি-কবিতা ইত্যাদির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকে না। তবে সব লেখকই পাঠকের মুখাপেক্ষী। এখন জনগণ বলতে যা বোঝা যায়, সেখানে পাঠকদেরও ধরতে হবে। যদি সেভাবে ধরা হয়, তাহলে সেখানেও আমাদের গতায়ত আছে। একবারে নাখোশ করে দিলে তা চলবে কেন।
: অনেক কবিই তো গান লেখেন, আপনি কি কখনো গান লিখেছেন ?
আল মাহমুদ : আমি গান লিখি নাই। আমি চেয়েছি সাহিত্য করতে, চেয়েছি লেখালেখি করতে। গান করতে হলে নিয়মিত রেওয়াজ করতে হয়। রেওয়াজ করার প্রতি আমার আগ্রহ ছিল না। তাছাড়া গানের ব্যাপারটাকে আমার মনে হতো একটা পরনীর্ভরশীল আর্ট। ওটা আমার মধ্যে আগ্রহের সৃষ্টি করতে পারেনি। আমার যা আঙ্গিক তাঁর সঙ্গে গান ব্যাপারটা ঠিক খাপ খায় না।
তবে আমি গান সম্পর্কে জানি। যে শহরে আমার জন্ম সেটাকে বলা হয় গানের শহর। ওই শহরের নাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া। এখানে আমি দেশি সংগীতের তারযন্ত্র সম্পর্কে জানি। সেতার, সরজ, এসরাজ- এসবের নির্মাতাগোষ্ঠী এ শহরেই বাস করতেন। সেখানে আমার আসা-যাওয়া ছিল। আমি বাদ্যযন্ত্রগুলোর ইতিহাস কমবেশি জানি।
সঙ্গীতের অনেক ওস্তাদই আমার কাসমেট ছিলেন। তাঁদের সঙ্গে শৈশবে লেখাপড়া করেছি। তাঁরা তাঁদের সিলসিলা অনুযায়ী উপমহাদেশে শ্রেষ্ঠ বাদক হয়েছেন; যেমন- ওস্তাদ বাহাদুর হোসেন খাঁ।
আমি তো কবি হতে চেয়েছিলাম। সংগীত আমার আচরণির বিষয় ছিল না। কিন্তু সংগীত সম্পর্কে আমি পড়াশোনা করেছি। বলা যায় অবহিত আছি, এমনকি পাশ্চাত্য সংগীত সম্পর্কেও। আমি চার্জ মিউজিক, ক্যান্টেটা এবং সিম্ফনি সম্পর্কে ব্যাপক পড়াশোনা করেছিলাম এক সময়। এ জ্ঞান আমি সাহিত্যে লাগিয়েছি। কবিতাতে ব্যবহার করে কবিতা সৃষ্টিতে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করেছি।
: খুব কমন একটা প্রশ্ন করি- মার্কসবাদের প্রতি আপনার এত ক্ষোভ কেন? আপনি তো নিজে এক সময় মার্কসবাদীই ছিলেন।
আল মাহমুদ : আমার প্রকৃতপক্ষে কোনো আদর্শবাদের প্রতি ক্ষোভ নেই। আমি এক সময়, খুব স্বাভাবিক পড়াশোনা দ্বারা মার্কসবাদের প্রতি আগ্রহী হয়েছিলাম এবং হয়তো বা এর সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততাও ঘটে গিয়েছিল। তবে অন্যত্র পড়াশোনা আমাকে এর থেকে সরে আসার প্ররোচনা দিয়েছে। আমাকে একজন পূর্ণাঙ্গ বিশ্বাসী মানুষে পরিণত করেছে। বলতে পারো, আমি পড়তে পড়তে বদলাই আর লিখেতে লিখতে বিবর্তিত হই।
: তাহলে তো আমরা বলতে পারি, পড়তে পড়তে আপনি আপনার বর্তমান বিশ্বাস থেকে আবারও সরে দাঁড়াতে পারেন।
আল মাহমুদ : না, এখানে একটা জিনিস আছে। এখানে একটা কথা থেকে যায় সেটা হলো, মানুষের বিশ্বাস। ধর্ম মানুষকে একটা চিরন্তন আশ্রয়ের আশ্বাস দেয়। এ আশ্বাসের বলেই মানুষ পরকালে বিশ্বাস করে। মৃত্যুর পরবর্তী জীবনে বিশ্বাস করে। আমি মনে করি এ পার্থিব জীবনই শেষ নয়, মৃত্যুর পরও আমার একটা জীবন শুরু হবে।
: পরকালের জীবন তো প্রায় সব ধর্মই বিশ্বাস করে। ফলে এ বিশ্বাসটা তো আপনি বর্তমানে যে ধর্মবিশ্বাসে আছেন তা না হয়ে অন্য কোনো ধর্মেও হতে পারতো, ঠিক না?
আল মাহমুদ : দেখো তুমি আলোচানায় ধর্ম বিষয়ে খুব বেশি গভীরে চলে যাচ্ছ। এ বিষয়গুলো খুবই সেনসিটিভ। আমি আসলে এ বিষয়ে আর বেশি কথা বলতে চাই না। তোমার কথার উত্তরে সংক্ষেপে শুধু এটুকু বলব, এ বিষয়টাকে আমি শুধু একরৈখিক দৃষ্টিতে দেখছি না। সর্বধর্মের জায়গা থেকেই দেখছি। তবে ইসলাম আমার ধর্ম বলে আমি ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে ভবিষ্যৎ অবলোকনের প্রয়াসী হই।
: মাহমুদ ভাই, আমরা এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে কথা বলি।
আল মাহমুদ : ঠিক আছে বলো। তবে বেশি জটিল প্রশ্নের দিকে যেও না। আমাকে গোসল করতে যেতে হবে।
: অনেক সময় আমাদের কাছে মনে হয়, লালন ও গৌতম বুদ্ধের মধ্যে চিন্তার ক্ষেত্রে কোথায় যেন এক ধরনের মিল রয়েছে। এ বিষয়ে আপনার কী মনে হয়।
আল মাহমুদ : বাহ্যিকভাবে ওইরকম মনে হলেও আমি তোমার সঙ্গে বিষয়টাতে সম্পূর্ণ একমত হতে পারলাম না। কেননা, আমার কাছে মনে হয়েছে দুজনের মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। পার্থক্যটা হচ্ছে-
লালন প্রশ্ন করেছেন এবং নিজেই জবাব দিয়েছেন। এ জবাবগুলো আমাদের অনেক জিজ্ঞাসার সমাধান দিয়েছে।
অপরদিকে গৌতম বুদ্ধের দর্শন, প্রশ্ন এবং উত্তর আমার কাছে মনে হয়েছে কৌতূহলোদ্দীপক; কিন্তু পরিতৃপ্তিকর নয়। আমার মতো ব্যক্তিকে তিনি কোনো সমাধানই দিতে পারেননি।
: আপনার লেখালেখির শুরুটা তো কবিতা দিয়েই।
আল মাহমুদ : আমি যখন শুরু করি কবিতা দিয়েই শুরু করি। কিন্তু ভালো গদ্যও লিখতে পারতাম। যেহেতু আমার কবিখ্যাতি বেশি হয়ে গেল সেজন্য আমি গদ্যে বেশি মনোযোগ দিতে পারিনি। কিন্তু পরে একটু একটু করে চর্চা করে বাড়িয়ে দিয়েছি।
: আপনার প্রথম লেখা বা প্রকাশিত গল্প কোনটা। ওটা কী পানকৌড়ির রক্ত?
আল মাহমুদ : না, এর আগে আমি ছোটদের বিভাগে গল্প লিখেছি। কলকাতাতে। সেখানে খুব সহজেই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছিলাম, কেননা- ওখানে ছাপা হওয়া পত্রিকায় একটাও মুসলমান নাম পাওয়া যেত না।
: আপনার শুরুর দিকে বেশিরভাগ লেখার প্রকাশ বাংলাদেশে না হয়ে কলকাতাকেন্দ্রিক কেন?
আল মাহমুদ : তখন কলকাতাকেন্দ্রিকতা আস্তে আস্তে স্তিমিত হয়ে আসছিল। তবে তখনকার কলকাতার পত্রিকা এদেশে আসত। আমাদের অভ্যেস অনুযায়ী আমরা লিখেছি। কৃত্তিবাস, ময়ুখ এসব পত্রিকায় আমি নিয়মিত লিখতাম।
আর ঢাকায় তখন সমকাল প্রকাশ হতো; সমকাল প্রকাশিত হওয়ার পর আমি কিন্তু কলকাতায় বেশি লিখতাম না। সমকালে সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদক হিসেবে ছিলেন অসাধারণ সম্পাদক।
: প্রায় সব কবির মধ্যেই একটা অহঙ্কারী মন বাস করে, যে মন বলে `আমিই শ্রেষ্ঠ, আমিই শ্রেষ্ঠ'। আপনার ভেতরে কি এটা আছে? আপনি কি আপনাকে এ সময়ের শ্রেষ্ঠ কবি ভাবেন না?
আল মাহমুদ : না, আমি ভাবি না। দেখো আমার আগে শামসুর রাহমান ছিলেন। তিনি কি অহঙ্কার করতেন? নিশ্চয়ই, করতেন না। অন্তত আমার কাছে তা কখনো মনে হয়নি। আমিও করি না। তবে আমি তোমাদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ কবি। আমি সর্বতোভাবে এখনো সক্রিয় আছি, এটাই আমার অহঙ্কার।
: আপনার সারাদিন কীভাবে কাটে?
আল মাহমুদ : সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমার বাসায় নানা ধরনের লোক আসে। তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলি। যারা আসে তারা যে সবাই আমার ভক্ত তা নয়, কেউ কেউ আমার সমালোচকও বটে। আমি যথাসাধ্য তাদের সঙ্গে ভদ্র ব্যবহার করতে চেষ্টা করি, এটা আমার পারিবারিক ঐতিহ্য। যারা আসেন তাদের কিছু আপ্যায়নও করতে চাই, সব সময়ই যে পারি তা নয়। তবে মানুষের স্রোত বন্ধ হয় না। এটা আমার এক ধরনের সৌভাগ্য বলতে হবে।
এমনিতে আমার শুয়ে থাকতে ইচ্ছে হয় বটে; কিন্তু মানুষ এলে বিশ্রাম ঘটে না। এর ফাঁকে-ফুকে একটু-আধটু লেখার চেষ্টা করি। তাছাড়া রুটিন মাফিক কলাম তো লেগেই আছে। বলা যায়, লিখতে লিখতে বাঁচি। এখন এটাই আমার নিয়তি হয়ে পড়েছে।
: মৃত্যুচিন্তা আপনাকে কীভাবে আচ্ছন্ন করে।
আল মাহমুদ : আমি মৃত্যু সম্পর্কে খানিকটা নির্ভয়। কারণ মৃত্যু নিশ্চিত একটা বিষয়। মৃত্যু এক ধরনের পরিত্রাণও বটে। আমি বিশ্বাস করি, মৃত্যুতে আমার শেষ হবে না
( লেখাটি ১১ জুলাই কবির জন্মদিন উপলক্ষে দৈনিক ডেসটিনিতে প্রকাশিত)
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই জুলাই, ২০০৮ সন্ধ্যা ৬:১৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


