প্রথম অংশঃ
মেয়ে দেখলেই যে জসিম তার প্লান বাস্তবায়নে হামলে পড়ে বিষয়টি ঠিক তেমন নয়। তবে মেয়েদেরকে তার ভালো লাগে। তা ছাড়া জসিম ছেলে হিসেবে মন্দ একথা তেমন কেউ বলবে না। এমন কি মেসের জটিল বড়ভাই আব্বাসেরও তেমন আপত্তি থাকে না যখন তার সম্পর্কে কেউ এমনটি বলে থাকে। ভালই ছেলেটি। হতে পারে বিরক্তিকর সরল, বেশ কিছুটা গ্রাম্য আর কাজে কর্মে শ্লথ গতির, তবে মোটের উপর খারাপ না।
জসিম এই শহরে এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার জন্য। সুশীলন কোচিং সেন্টারের একজন সুশীল ছাত্র সে। তার কাসে অন্য সকল ছাত্রই আশেপাশের কলেজগুলো থেকে পাশ করা। শুধু সেই এসেছে পাড়া গাঁ থেকে। ঝুলন, তারেক, ফরহাদ, পিংকি, তাসফিয়া এদের সামনে বেশ অবগুন্ঠিত মনে হয় নিজেকে। শহুরে ছেলে মেয়েদের কথা বলার ধরন, বিষয়, লিঙ্গীয় পরিধি এই সব খুব ছুঁয়ে যায় তাকে। সিন্ডি, নওমি কিংবা পামেলাদের পরিচয় আর মানচিত্র তাদের মুখস্ত। জসিম শুধু জানে মুহূরী নদী, বালু মাঠ, নদী তীরের কাশবন আর শাকিল, শাবনূরদের।
মেসে তারা তিন জন থাকে। সে, আব্বাস আর রণি। আব্বাস শহরের নাম করা কলেজে অর্থনীতিতে মাস্টার্স করছে। তুখোড় সমাজতান্ত্রিক। একটি ছাত্র রাজনৈতিক সংগঠনের মাঝারি গোছের নেতা সে। এর বাহিরে শেয়ার ব্যবসা করে আর একটা প্রেম করে। শিমু আপা। আব্বাস ভাইয়ের প্রেমিকা। চশমা পরা শ্যামলা গোছের সাধারন মেয়েটি নাকি তাদের সংগঠনের একজন নামকরা কমরেড। আব্বাস ভাইয়ের কাছে ছবি দেখেছে জসিম, উত্তোলিত হাতে লাল কালিতে লেখা ফেস্টুন ধরা যেখানে পুঁজির রাজ্যে হাবুডুবু খাওয়া শ্রমিকদের পে কি যেন লেখা। একটু বাঁকা করে ধরা বলে জসিম পুরোটা পড়তে পারে না। তাতে কি! আব্বাস ভাই আর শিমু আপা যে কত বড় একটা সংগ্রামের কাজে জড়িত তা বুঝতে দেরী হয় না জসিমের।
রণির কথা বেশী বলার দরকার নেই আর বলার মত তেমন কিছু নেইও। রণি বাইরে গেলে সকাল সাতটায় ঘুম ভেঙ্গে জসিমের সদর দরজা বন্ধ করতে হয়। এছাড়া সারা দিন তেমন কোন বিরক্ত করে না রণি। কারন সে রাত এগারোটার আগে মেসে ফেরে না। বাড়িওয়ালার গেট বন্ধ করার পূর্ব মুহূর্তে রণির ত্রস্তপায়ে আগমন যেন আচমকা তাড়া খাওয়া কোন প্রাণীর প্রতিচ্ছবি।
তিনতলা বাড়ীর সাড়ে তিনতলায় থাকে জসিমরা। অর্থাৎ, দুটো পয়সা বেশী কামানোর আশায় জসিমদের দুবাই ফেরত বাড়ীওয়ালা ছাদের একপাশে তিন কামরার ছোট এই ঘরটি নির্মান করে ছাত্রদের কাছে ভাড়া দিয়েছেন। ব্যাচেলর হিসেবে কোথাও ঘর ভাড়া চাইতে যাওয়াটা যেমন বেয়াদবীর পর্যায় পড়ে সেখানে কিছু টাকা বেশী দিয়ে হলেও এমন একটা খোলা ছাদ সমেত বাড়ী নিয়ে জসিমদের পরিতৃপ্তির শেষ নেই। মেসের বড় ভাই আব্বাসের কাছ থেকে প্রতি মাসের তিন তারিখের মধ্যে ভাড়া চাইতে আসা ছাড়া বাড়ীওয়ালা উপরে উঠেন না। শুধু কাপড় শুকানো আর অর্ধমৃত কাজি পেয়ারা ও পাথরকুচি গাছে পানি দেয়ার ছাড়া অন্যরাও ছাদে উঠেনা বললেই চলে। তবে মাঝে মধ্যে বাড়ীওয়ালা খালাম্মা ছাদে উঠলেই বড় বিপদ হয় জসিমদের। লোমহর্ষক বিভিন্ন উচ্চকিত হূমকী বাসায় থাকার সুবাদে নীরবে পরিপাক করে জসিম। কেন যে বুয়া ঘর কুড়ানো ময়লাগুলো বাস্কেটে না ফেলে ছাদে ছড়িয়ে ফেলে!
দেখতে গ্রাম্য ধরনের গোলগাল ও ফর্সা জসিম কিন্তু নিতান্তই সাধাসিধে একটি ছেলে। তবে এই বয়সের একটা ছেলের তোষকের নিচে গোটা চারেক নিউজপ্রিন্টের চটি থাকাটাকে যদি আপনি বাঁকা চোখে দেখে থাকেন তাহলে জসিমকে আপনার খুব বেশী ভালো না ও লাগতে পারে। দুপুরের পর মেস যখন খুবই খালি থাকে তখন গুপ্ত সাহিত্যের রসময় জগতে হারিয়ে যাওয়া জসিমের সা¤প্রতিক সময়ের একটা ভাব বিলাসিতা। জসিমের এই সাহিত্য বিলাসের পেছনের ঘটনাটা কিন্তু বেশ নাটকীয়।
বুয়া আসেনি সেদিন। গলি থেকে বের হয়ে সদর রাস্তার পাশে একটা বিরানী হাউস থেকে তেহেরী খেয়ে মৌরী চিবুতে চিবুতে পত্রিকার স্টলে পত্রিকার পাতা উল্টাচ্ছিল সে। এই সময়ে স্কুলের পোষাক পরা একটি মেয়ে, হয়তো নাইন বা টেনে পড়ে এসে হকারকে জিজ্ঞাসা করলো, ঐ সব বই আছে? মেয়েটার জিজ্ঞাস করার বিচিত্র ধরনে জসিমের মনযোগ এরশাদের বক্তব্য বিবরনী থেকে পিছলে যায় মেয়েটির দিকে। জে আফা। আছে! বলে মিচকি হাসি দিল ফিচেল পিচ্চি। সারে সারে ম্যাগাজিনগুলোর একদম নীচ থেকে টেনে বের করা হলো একটি বই। চকিতে মলাটে চোখ পড়ে । লেখা যৌবনের ............. কি যেন আর পড়া যায় না। তবে জনৈকা শ্বেতাঙ্গীনির উন্মুক্ত উচু-নিচু ভাঁজ ভঙ্গিল ঠিকই চোখে পড়ে তার। খবরের কাগজে মোড়ানো বইটি ব্যাগে ঢুকিয়ে দাম চুকিয়ে মেয়েটি চলে গেলে জসিম হকারের কাছে জিজ্ঞাসা করে আর আছে কি না। পিচ্চি হকার এক গাল হেসে চোখ নাচিয়ে জিজ্ঞাস করে, ভাইয়া, দেশী না ফরেন? সেই থেকে শুরু। তোষকের নিচে গোটা তিন চারেক আর ট্রাভেল ব্যাগের ভেতরে গোটা বিশেক চটির বর্তমান মালিক জসিমের একটা প্রিয় ফ্যন্টাসী হচ্ছে, পথেঘাটে সেই মেয়েটির সাথে আবার দেখা হয়ে গেলে সে প্রস্তাব করবে অহেতুক রাস্তার রোদে এই সব কেনাকাটা বাদ দিয়ে সুবিধাজনক সময়ে মেসে এসে জসিমের পুরোটা (লাইব্রেরী) নেড়েচেড়ে দেখার জন্য।
খুব চাইলেও আব্বাস ভাইয়ের সংগ্রাম মূখর মেজাজের কারনে তার কাছাকাছি ঘেষা হয় না জসিমের। তবে যেদিন যেদিন শিমু আপা তাদের মেসে আসে সেদিনগুলো ছাড়া। শিমু আপা এলে সকাল সকালই আসেন। সেদিন আব্বাস ভাইয়ের গলায় মধুর নহর বয়ে যায়। দুপুরে উন্নতমানের রান্না আর ঠান্ডা পানীয় থাকে। জসিমের মনের মধ্যেও উৎসব হয়। কতই না ভালো থাকে আব্বাস ভাইয়ের মন! কিন্তু জসিমের মত হতভাগারা যেখানে থাকে সেখানে ভালো কিছু বেশী দিন টিকবে কেন?
সুশীলন কোচিং সেন্টারের জনৈক পরিচালকের মায়ের অকস্মাৎ মৃত্যুতে তিন ঘন্টার কোচিং শেষ হয়ে যায় মাত্র আধা ঘন্টায়। অবসর সময়টুকু জসিম পুরাতন বইয়ের দোকানে যেতে পারতো কিংবা বিপ্লব উদ্যানে হাটাহাটি কিংবা হকার মার্কেট! কিন্তু না জসিম একা একা সেখানগুলোতে যাওয়া পচ্ছন্দ করে না। পছন্দ করে না এমন কি ইত:স্তত রাস্তায় হাটা হাটি করাও। সে ল্য করেছে শহরের ধাউর লোকজনগুলো কিভাবে যেন বুঝে যায় যে সে গ্রাম থেকে এসেছে। অনাবশ্যক অসংলগ্ন ব্যবহার করে তার সাথে। যেন শহরের এই যে এতো নাগরিক অসুবিধা তার অন্যতম কারণ হচ্ছে জসিম। তাই সে রাস্তায় হাটাহাটি বেজায় অপছন্দ করে। পছন্দ করে মেসে তার আট বাই আট রুমটাকেই।
নিজের ভাগের চাবিটা দিয়ে সদর দরজার তালা খোলে জসিম। অনেকণ ধরে চেপে থাকা তরলকে শরীর নির্গত করার জন্য টয়লেটে যায়। টয়লেটে একটা চাপা সুগন্ধ ভুরভুর করছে। কেমন যেন পরিচিত। আদুল গায়ের পানি মুছতে মুছতে হঠাৎ মনে পড়ে - আরে! এতো শিমু আপার ব্যবহৃত পারফিউমের সুগন্ধ! এসেছে নাকি! মন ভালো হয়ে যায় জসিমের। মেসে শিমু আপার উপস্থিতি এক গোপন ও নিজস্ব ভালোলাগা জসিমের। এসেছে নাকি দেখতে আব্বাস ভাইয়ের ভেজানো দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে জসিম।
হঠাৎ যেন তরল হাইড্রোজেন ছড়িয়ে পড়ে জসিমের শরিরে। হাটু প্রথিত হয়ে যায় কালো সিমেন্টের মেঝেতে। শিমু আপার সেলোয়ার, কামিজ ওড়না ইত্যাদি অবিন্যস্ত রাখা আব্বাস ভাইয়ের চেয়ারের হাতলে আর আব্বাস ভাইয়ের লুঙ্গি গোল করে রাখা মাথার কাছে। পোষাক ছাড়া কেমন ফর্সা, বেমানান আর বোকা বোকা লাগে শিমু আপাকে। এই প্রথম এমন করে মেয়ে দেখা। হাস্যকর ভঙ্গিতে স্ট্যাচু হয়ে থাকা নেংটুদ্বয়কে পেছনে ফেলে টলতে টলতে রুম থেকে বের হয় জসিম। শুয়ে পড়ে বিছানায়। ছয় মিনিট সাতচল্লিশ সেকেন্ড পর হঠাৎ বিদ্যুতস্পৃষ্টের মত লাফিয়ে উঠে টয়লেটে যায়। আরো চার মিনিটের গোড়ার দিকে কান্ত পায়ে বিছানায় এসে শুয়ে পড়ে কপালে বাহু রেখে। উচ্চকিত কথোপোকথন শোনা যায় আব্বাস ভাইয়ের রুম থেকে। সব বোঝা যায় না। শিমু আপার শব্দই বেশী। প্রধানতরগুলো হচ্ছে, ‘আমি আগেই বলছিলাম’, ‘বেআক্কেল’, ‘আর যদি আসি’ ইত্যাদি।
শুয়ে থাকতে থাকতে দীর্ঘ কয়েক যুগ পার করে দেয় জসিম। টিপ টিপ করে ঝরে পড়ছে সময়। অনন্তকাল পর হঠাৎ ধা করে খুলে যায় আব্বাসের ঘরের দরজা। কাপড় চোপড়ে সর সর শব্দ তুলে দ্রুতগামী সরিসৃপের মত বেরিয়ে যায় শিমু। হায়! বাহিরে যাবার সদর দরজাটি যে জসিমের কামরাতেই।
জসিম জানেনা কতণ সময় পেরিয়ে ছিল। বুঝি বা একটু তন্দ্রা মতই এসেছিল। তবুও তার কামরাতে আব্বাসের ইতস্তত: বিপ্তি পদচারণা সে ঠিকই টের পায়। একই ভাবে শুয়ে থাকে সে।
‘ জসিম, ঘুমাইছ নাকি’? আব্বাসের গলায় পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের কুটনৈতিক মশৃণতা।
‘ নাহ্! এমনেই শুয়ে আছি’। প্রমাণ করার জন্যই হয়তো ভয়ার্ত কিংবা বিহবল জসিম উঠে বসে চৌকিতে।
জসিমের কুন্ঠিতভাব দেখে কিছুটা আস্বস্ত হয় আব্বাস। দেড় কাঠি চড়া সুরে বলে, ‘ আইজ তোমার শিমু আপার কাছে খুব অপমান হইতে হইল আমার। এই কামডা তুমি ক্যান করলা’?
‘ আমি বুঝি নাই ভাই! মনে করছি আপা আইছে দেখা কইরা আসি’। জীভ তড়পিয়ে আর মাথা নীচু করেই দ্রুত উত্তর দেয় জসিম।
‘ শিমু কি তোমার কাছে আইছিল? তুমি ক্যান্ ব্যস্ত হইলা তার সাথে দেখা করার জন্য’? কৈফিয়তের ধনূকে যুক্তি বিষ মাখানো তীর ছোঁড়ে আব্বাস। সরাসরি জসিমের মগজ লক্ষ করে। তারপরই একটা অদৃশ্য ভোজালীর দুই পিঠ হাতের তালুতে ঘষতে ঘষতে বলে, ‘ যাক যা হওয়ার হইছে। এই বিষয়টা গোপন থাকা আমার জন্যও ভালো, তোমার জন্য আরো ভাল । কি বল’?
‘না! না! - থাকবো থাকবো! এইটা কি মানুষরে বলার বিষয় নাকি’? জসিম আশ্বস্ত করে আব্বাসকে (নাকি নিজেকে)। একটা চোরাশ্বাস নাক চুইয়ে মুক্তি পেয়ে মিশে যায় চার দেয়ালে ঘেরা বাতাসে। জসিম মনে মনে স্বীকার করে তার এতণ ধরে ভাবা অন্তত গোটা সাতেক সম্ভাব্য সমাধানের চেয়েও অনেক সহজ হয়েছে বাস্তবেরটি।
তাই দু’দিন পরেই যখন আবার শিমুর পারফিউমের গন্ধে আমোদিত হল খোলা সদর দরজার ওপাশটা। জসিম যেকোন ধরনের প্রতিক্রিয়া গলাই যতেœর সাথে টিপে ধরে। শিমু এখন প্রায়ই আসে মেসে। আগের চেয়েও ঘন ঘন। প্রতিবারই অনেকটা একই কায়দায় বন্ধ হয়ে যায় আব্বাসের ঘরের দরজা।
(২য় পর্বে সমাপ্ত)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




