অনেকে এটা নিয়ে কনফিউজ থাকেন
শেখ মনি হত্যা , বিদ্রোহের আলাদা মামলা করা উচত
---------------------------------------------------------------------
ঢাকা, নভেম্বর ১৯ ২০০৯(বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- বঙ্গবন্ধু মামলার আপিলের চুড়ান্ত রায়ের পর্যবেক্ষণে আপিল বিভাগ বলেছে, রাষ্ট্রপক্ষ দণ্ডিতদের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পেরেছ। এটি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার মামলা, বিদ্রোহের মামলা নয়। তাই সাধারণ আইনে এ মামলার বিচারে কোনো বাধা ছিল না।
বৃহস্পতিবার বিচারপতি মো. তাফাজ্জাল ইসলামের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ বঙ্গবন্ধু মামলার রায়ের সংক্ষিপ্ত আদেশে এই অভিমত ব্যক্ত করেছে।
পর্যবেক্ষণে আরো বলা হয়, মৃত্যুদণ্ড কমানোর পক্ষে আপিলকারীরা তাদের যথাযথ যুক্তি তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই আপিলকারীদের মৃত্যুদণ্ডের হাইকোর্টের রায়ে হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই।
আপিল বিভাগ চূড়ান্ত রায়ের সংক্ষিপ্ত আদেশে বলেছে, "এ রায় দেওয়ার যুক্তি পরে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হবে। আমরা আদেশ দিচ্ছি যে, আপিলকারী মেজর মো. বজলুল হুদা, লেফটেন্যান্ট কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান, লে. কর্নেল সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, লে. কর্নেল মহিউদ্দিন (আর্টিলারি) এবং মেজর এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ (ল্যান্সার) হাইকোর্টের ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল এবং ২০০১ সালের ১৪ ডিসেম্বরের রায়ের বিরুদ্ধে পাঁচটি লিভ আবেদন দায়ের করে।"
আদালত বলেন, "নিচের যুক্তিগুলো বিবেচনার জন্য আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ (লিভ মঞ্জুর) করা হয়েছিল। এগুলো হচ্ছে: ১. হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চের দুই বিচারক দুটি আলাদা এবং বিভক্ত রায় দিয়েছেন, তৃতীয় বিচারপতি দণ্ডপ্রাপ্ত সব আসামির বিষয় এবং পুরো রায়টি বিবেচনা না করে কেবল দণ্ডপ্রাপ্ত ছয় আসামির মামলা বিবেচনা করে আইনগতভাবে মৌলিক ভুল করেছেন।
"২. মামলা দায়েরে ২১ বছরের অস্বাভাবিক বিলম্ব হয়েছে। এই অযৌক্তিক বিলম্ব আপিলকারীদের মিথ্যাভাবে জড়ানোর অসৎ উদ্দেশ্য এবং পরিকল্পনার বানোয়াট গল্পের কথাই বলে। হাইকোর্ট বিভাগ এই বিষয়টি বিবেচনা না করে আসামিদের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে আইনগতভাবে ভুল করেছে।
"৩. সাক্ষ্য-প্রমাণে দেখা গেছে, এটি বিদ্রোহের পরিণতিতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার মামলা, এটি সাধারণ হত্যাকাণ্ডের মামলা নয়। তাই আপিলকারীদের সাধারণ ফৌজদারি আদালতে যে বিচার হয়েছে তা বাতিলযোগ্য।
"৪. সাক্ষ্য-প্রমাণে একথা বলা যায় না যে এটি অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে হত্যা সংঘটনের মামলা। কিন্তু এটি তৎকালীন মুজিব সরকারকে পরিবর্তনের জন্য বিদ্রোহ সংঘটনের ষড়যন্ত্রের মামলা। তাই আসামিদের দণ্ড বেআইনি।"
"৫. রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষ্য-প্রমাণের যথাযথ মূল্যায়নের মাধ্যমে আপিলকারীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারার হত্যা ও অভিন্ন উদ্দেশ্যে হত্যার অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে। তাই গুরুতরভাবে ন্যায়বিচার ব্যাহত হয়েছে।"
রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, "উপরের যুক্তিগুলোতে আমাদের মতামত হলো:
১. ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৮ ও ৪৩৯ ধারার বিধান মতে তৃতীয় বিচারপতির একক এখতিয়ার হলো তিনি কোন কোন পয়েন্টে যুক্তিতর্ক শুনানি গ্রহণ করবেন। এতে বলা যায়, তিনি (তৃতীয় বিচারপতি) মতভিন্নতার অংশটুকু নিষ্পত্তি করতে সম্পূর্ণ স্বাধীন। হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চের দুই বিচারপতির ছয় আসামির বিষয়ে মতভিন্নতার বিষয়টি নিষ্পত্তি করার ক্ষমতা রয়েছে তৃতীয় বিচারপতির। দ্বৈত বেঞ্চের দুই বিচারপতি যে ৯ আসামির বিষয়ে কোনো দ্বিমত পোষণ করেননি, সে সিদ্ধান্তের বিষয়ে তৃতীয় বিচারপতি একমত ছিলেন।
"২. মামলা দায়েরের বিলম্বের বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের ব্যাখ্যা সাক্ষ্য-প্রমাণের বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিচারিক আদালত ও হাইকোর্ট বিভাগ বিশ্বাস করেছেন। এই বিষয়ে দুই আদালতের (বিচারিক ও হাইকোর্ট) অভিমত একই হওয়ায় এতে আমাদের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই।
"৩. হত্যার অপরাধ সেনা আইনের ৫৯ (২) ধারায় বিচারের জন্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে শর্ত হলো অপরাধী দায়িত্বরত (অ্যাকটিভ সার্ভিসে) অবস্থায় অপরাধ করলে এ ধারা প্রযোজ্য হবে। কিন্তু আপিলকারীরা সেনা আইনের ৮(১) ধারায় অ্যাকটিভ সার্ভিসে ছিলেন না, তাই সাধারণ ফৌজদারি আদালতে তাদের বিচারে বাধা নেই। এমনকি সেনা আইনের ৮(২) ধারার সংজ্ঞায় এটিকে বেসামরিক অপরাধ ধরে নেওয়া হলেও ওই আইনের ৯৪ ধারা মতে ওই অপরাধের বিচারে আইনগত কোনো বাধা নেই।
"৪. এমন কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ নেই যে বিদ্রোহের ফলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তার পরিবারের অন্য সদস্য ও তিন নিরাপত্তা কর্মীর হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। আমাদের মতে, এটি ফৌজদারি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বিদ্রোহ সংঘটনের মামলা নয়। বরং এটি অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার মামলা।
"৫. হাইকোর্ট বিভাগ বিশ্বাস করেছে যে রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যমে আপিলকারী এবং অন্য দণ্ডিতদের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। আসামিপক্ষ প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে যে হাইকোর্ট বিভাগ সাক্ষ্য-প্রমাণের যথাযথ মূল্যায়ন না করে আপিলকারীদের ডেথ রেফারেন্স গ্রহণ করে কার্যত অবিচার করেছে। তাই আমরা হাইকোর্ট বিভাগের রায়ে হস্তক্ষেপ করার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ দেখতে পাই না।
"৬. বিশেষ অবস্থায় মৃত্যুদণ্ড কমানোর পক্ষে আপিলকারীরা তাদের যথাযথ যুক্তি তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই আমরা হাইকোর্টের বহাল রাখা আপিলকারীদের মৃত্যুদণ্ডের বিচারিক আদালতের রায়ে হস্তক্ষেপ করতে চাই না। এই পরিপ্রেক্ষিতে আপিলকারীদের আপিল, জেল আপিল ও ফৌজদারি রিভিউ আবেদন খারিজ করা হলো। রায় কার্যকর স্থগিতের এই আদালতের আদেশ খারিজ করা হলো। এই সংক্ষিপ্ত আদেশ রায়ের অংশ হিসেবে গণ্য হবে।"
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/এটি/পিবি/এসএম/আরবি/আরএ/এমআই/জিএনএ/এইচএ/১৯৪৭ ঘ.
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০১০ বিকাল ৩:৩২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



