বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনপত্রিকার শিরোনামগুলো ছিল কাব্যময়
শিরোনাম নেওয়া হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের গান থেকে। বাঙালি মনে যখন আবেগ উথলে ওঠে, তখনই আসেন রবীন্দ্রনাথ, আসেন নজরুল। দুই কবির রচনা, গানের চরণ, কবিতার পঙ্ক্তি দিয়ে বাঙালি রাঙিয়ে দেয় তার আবেগমথিত সব কথা।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সময়ও এ জাতি তার আবেগ প্রকাশের জন্য স্মরণে নিয়েছিল রবীন্দ্র-নজরুলকে; কণ্ঠে নিয়েছিল তাদেরই গান-কবিতার চরণ। দেশের প্রায় সব পত্রপত্রিকায় ছিল কাব্যের ছড়াছড়ি। সংবাদ-নিবন্ধের শিরোনামগুলো ছিল কবিতা-গান থেকে নেয়া; অবয়বজুড়ে ছিল কাব্যময়তা।
বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিন ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দৈনিক পূর্বদেশের প্রধান প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল_'ভেঙেছ দুয়ার, এসেছ জ্যোতির্ময়'_রবীন্দ্রনাথ থেকে নেয়া। অত্যন্ত আপ্লুত ভাষায়, কাব্যিক স্পর্শ দিয়ে সংবাদটি লেখা হয়েছিল।
আগের দিন ৯ জানুয়ারি পূর্বদেশে শিরোনাম ছিল, 'তোরা সব জয়ধ্বনি কর'_এটা কাজী নজরুল ইসলামের। প্রতিবেদনে লেখা: 'বাংলার মানুষ, তোরা সব জয়ধ্বনি কর। নেতা আসছেন বিজয়ীর বেশে, সোনার বাংলার আকাশে-বাতাসে ওই শোন তার আগমনী বার্তা। দিকে দিকে আজ প্রাণের উৎসব। বাংলার সবুজ প্রান্তরে ঘাসে ঘাসে আজ তারই রোমাঞ্চ। অনেক রাত্রির তপস্যা শেষে ছিনিয়ে আনা স্বাধীনতার রক্তসূর্য এবার পূর্ণতার মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে। তাই বাংলাদেশের সংগ্রামী জনতা, তোরা সব জয়ধ্বনি কর।'
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দৈনিক ইত্তেফাকের শিরোনাম ছিল: 'ওই মহামানব আসে, দিকে দিকে রোমাঞ্চ জাগে।' রবীন্দ্রনাথের গানের কী অসাধারণ ব্যবহার! 'ইত্তেফাক রিপোর্ট' হিসেবে এখানে ছাপা হয়: 'আজ বহু প্রতীক্ষিত সেই শুভদিন। সাড়ে সাত কোটি বাঙালির অন্তরের অন্তহীন আস্থা ও ভালোবাসা, ত্যাগ-তিতিক্ষার স্বর্ণসিঁড়িতে হাঁটিয়া হাঁটিয়া স্বাধীন বাংলা ও বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সুদীর্ঘ নয় মাস পরে আবার জননী বাংলার কোলে ফিরিয়া আসিতেছেন। পাক সামরিক জল্লাদের কারাগার তাহাকে ধরিয়া রাখিতে পারে নাই।'
একই দিন ইত্তেফাকের প্রথম পৃষ্ঠায় আরেকটি শিরোনাম: 'এসো বাংলার স্বাপি্নক, স্বাগতম'। চার কলামে শিরোনাম: 'অভিনন্দন আছে, পথের দুধারে অভ্যর্থনা'। সে দিন আরো পাঁচটি আলাদা সংবাদ ছাপা হয়। সংবাদগুলোর শিরোনাম: 'প্রতীক্ষাকুল শহরবাসী', 'আমি সর্বাগ্রে গৃহিণী', 'আজ ছুটি' 'ওকে চোখে দেখার আগে কিছুই বলিব না', 'আজ অপরাহ্ন আড়াইটায়'।
১০ জানুয়ারি সংবাদ প্রধান প্রতিবেদনের শিরোনাম করেছিল: 'বঙ্গবন্ধুর অপেক্ষায় ঢাকা নগরী'। সিঙ্গেল কলাম ছিল: 'আকাশবাণী ধারাবিবরণী প্রচার করিবে'।
দৈনিক পূর্বদেশ সেদিন লাল কালিতে শিরোনাম করেছিল: 'ভেঙেছ দুয়ার, এসেছ জ্যোতির্ময়'। বঙ্গবন্ধুর বড় একটি রঙিন ছবির পাশে ছিল সম্পাদকীয়: 'মাগো, তোর মুজিব এলো ফিরে' শিরোনামে। ছয় কলাম শিরোনামে প্রতিবেদন: 'জাতির পিতা আজ তাঁর নিজের লোকের কাছে ফিরছেন'। দুই কলামে আরেকটি সংবাদ শিরোনাম: 'সাজো রেসকোর্স, এবার নতুন কথা শোনো'। সঙ্গে ছিল 'যেসব পথে আজ গাড়ি চলতে পারবে না' শিরোনামে প্রতিবেদন।
১০ জানুয়ারি আজাদ পত্রিকার শিরোনাম ছিল: 'জাতির উৎকণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে আজ পূর্বাহ্ন সাড়ে এগারোটায় মুজিবের ঢাকা আগমন'। দুই কলামে প্রতিবেদন: 'রাজধানীতে আনন্দ-উল্লাস, ঢাকায় বিপুল সংবর্ধনাদানের আয়োজন'। এক কলামের খবর: 'হিথ-মুজিব ঘরোয়া বৈঠক'। দুই কলামের খবর: 'বঙ্গবন্ধু আজ দিলি্ল আসছেন'।
১১ জানুয়ারি ইত্তেফাকে ছাপা হয়, জনতার অভিবাদনের জবাব দিচ্ছেন বঙ্গবন্ধু, বড় আকৃতির এ রকম একটি ছবি। সঙ্গে জনতার ছবি। ক্যাপশন ছিল: 'গতকাল (সোমবার) রেসকোর্স ময়দানের একাংশ। চারিদিকে মানুষ আর মানুষ।' প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল: 'স্বপ্ন আমার সফল হইয়াছে, বাঙালি এবার হাসিবে, খেলিবে'। এক কলামের খবর: 'নয়নজলে সিক্ত একটি পুনর্মিলন'। সেদিন অন্যান্য সংবাদ শিরোনাম: 'নেতার কথা', 'স্বাধীনতা কেউ হরণ করিতে পারিবে না'।
বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের খবর ইত্তেফাকসহ সব পত্রিকায় গুরুত্বের সঙ্গে পরিবেশিত হয়। ১১ জানুয়ারি ইত্তেফাকে একটি শিরোনাম: 'মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক, আমি তোমাদেরই লোক'_রবীন্দ্রনাথের কবিতা থেকে নেওয়া। সহজ ও কাব্যময় ভাষায় পাঠকের আবেগ ছুঁয়েছিল প্রতিবেদনটি।
'ইত্তেফাক রিপোর্ট' হিসেবে লেখা: 'নির্মেঘ নীলাকাশে সাদা কবুতর যে হঠাৎ দেখা দিল। সকলের হৃদয়ের গভীরে সমস্বরে একটি ধ্বনি উঠিল, ওই মহামানব আসিতেছে। বিমানবন্দরে সাড়া পড়িয়া গেল। বিমানের সিঁড়ির দশ গজ দূরে ছোট মঞ্চ। সেখান হইতে হাত বিশেক দূরে দেশ-বিদেশের সংবাদ সংস্থার অসংখ্য মুভি ক্যামেরা।'
দৈনিক সংবাদে আট কলামজুড়ে রেসকোর্সে সমবেত জনতার ছবি। প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল: 'সাবধান! ষড়যন্ত্র এখনো চলিতেছে : মুজিব'। সিঙ্গেল কলাম প্রতিবেদন : 'আনন্দে উদ্বেল নগরী'। দুই কলামের প্রতিবেদন : 'জনতা সাগরে জেগেছে ঊর্মি'। ছিল ইন্দিরা গান্ধীকে উদ্ধৃত করে প্রতিবেদন_'মুজিবকে বিরাট চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করিতে হইবে'।
১১ জানুয়ারি পূর্বদেশ পত্রিকায় 'এখন বাতাস উঠুক, তুফান উঠুক, ফিরবো নাকো আর, যাত্রা হলো শুরু, ওগো কর্ণধার'_রবীন্দ্রনাথের কবিতার পঙ্ক্তি দিয়ে সাজানো প্রধান শিরোনাম। প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল সেদিনের উত্তাল জনসমুদ্রের কথা। পাশেই ছিল আরেকটি প্রতিবেদন_'আজ আমার জীবনের সাধ পূর্ণ হয়েছে : মুজিব'। তিন কলামজুড়ে ছিল_'বাংলার প্রাণ ফিরেছে বাংলায়'। দুই কলামের খবর_'ভুট্টো সাহেব সুখে থাকুন, আর আপনাদের সঙ্গে নয়'। এক কলাম_'হোম সুইট হোম'।
আজাদ পত্রিকার মূল শিরোনাম: 'জনগণের ভাত-কাপড়ের ব্যবস্থা করতে না পারলে স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যাবে: বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠ'। দুই কলামে প্রতিবেদন : যে সংবর্ধনার কোনো তুলনা নেই'। সেদিন আজাদের প্রথম পৃষ্ঠায় বিশেষ সম্পাদকীয় ছিল : 'দিকে দিকে মুখরিত এক নাম_শেখ মুজিব'।র র
Click This Link
-----------------------------------------------------------------
ডেইলি টেলিগ্রাফ, লন্ডন, ১১ জানুয়ারি, ১৯৭২
গতকাল (১০ জানুয়ারি) ঢাকা রমনা রেসকোর্স ময়দানে লাখ লাখ বাঙালীর সামনে শেখ মুজিবুর রহমান কান্না বিজড়িত কণ্ঠে বললেন, 'বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে এবং চিরদিন স্বাধীন থাকবে।'
গত সপ্তাহের শেষ দিনে পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর শেখ মুজিবুর রহমান লন্ডন ও দিল্লী হয়ে ঢাকা পেঁৗছান। ঢাকায় আজ জনতা তাঁকে এক বিজয়ী বীরের সংবর্ধনা দেয়। তিনি বিমানবন্দর থেকে সোজা রেসকোর্সের বিশাল জনসভায় পেঁৗছান।
অত্যন্ত ক্লান্ত শেখ মুজিব তাঁর ৪০ মিনিটের বক্তৃতার মাঝে মাঝে থেমে যাচ্ছিলেন। তিনি বললেন, পৃথিবীর কোন জাতিকেই স্বাধীনতা অর্জন করার জন্য এত ত্যাগ স্বীকার করতে হয়নি।
তিনি বলেন, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ভিতরকার সমস্ত সম্পর্ক চিরতরে শেষ হয়ে গেছে। বাংলাদেশ এখন স্বাধীন সার্বভৌম দেশ, সমস্ত দেশই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবে এবং বাংলাদেশ অবশ্যই জাতিসংঘের সদস্য পদ পাবে।
শেখ মুজিব বলেন, বাংলাদেশের মূল ভিত্তি হবে_ সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতা। অর্থাৎ বাংলাদেশ পাকিস্তানের মুসলিম রাষ্ট্র সমস্ত আদর্শ সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করলো।
চোখে রুমাল চেপে ধরে শেখ মুজিব পাকিস্তানকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তোমরা আমার লাখ লাখ মানুষ হত্যা করেছ, আমার মা-বোনের ইজ্জত নিয়েছ এবং এক কোটি লোককে গৃহত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য করেছিলে, তবুও তোমাদের প্রতি আমার কোন আক্রোশ নেই, তোমরা স্বাধীন থাক, আমিও স্বাধীন থাকি।
তিনি তার ত্রিশ লাখ বাঙালীকে হত্যা করার অপরাধে হত্যাকারীদের বিচারের দাবি করেন। তিনি আশা করেন, অবশ্যই এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিকভাবে তদন্ত হবে।
তিনি বলেন, বাঙালীরা যারা দালালী, বেঈমানী করেছে এমনকি যারা তার প্রহসনমূলক বিচারে সরকারী পক্ষ নিয়েছিল তাদের সবার বিচার হবে। তবে আইন কেউ নিজের হাতে তুলে নেবেন না।
তিনি তার জনগণকে কঠোর পরিশ্রমী হবার জন্য বলেন এবং সরকারী কর্মচারীদের হুঁশিয়ারি করে দেন_ যেন তারা কেউ ঘুষ গ্রহণ না করেন। তিনি কখনই এ অপরাধ ক্ষমা করবেন না বলে জানিয়ে দেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধীকে শেখ মুজিব গভীরভাবে ধন্যবাদ জানান। মাতৃভূমির মাটি স্পর্শ করে আবেগ আপ্লুত শেখ মুজিব জানান, আমি আমার মনকে স্থির করে ফেলেছিলাম, আর কখনই আমার সোনার বাংলায় ফিরে যাওয়া হবে না। তারা আমার কবরও খুঁড়েছিল। আজ আমি এখানে, এটা কেবলমাত্র আল্লাহর ইচ্ছাতেই সম্ভব হয়েছে।
উপস্থিত কূটনীতিকদের ভিতর চীনের কোন প্রতিনিধি ছিল না। উল্লেখ্য, আমেরিকান রাষ্ট্রদূত মি. স্পিভ্যক উপস্থিত ছিলেন। মি. জন স্টোন হাউস এমপি সভা মঞ্চেই ছিলেন।
বিমানবন্দর থেকে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে পেঁৗছতে রাষ্ট্রপতির ১২ মিনিট লাগে। কারণ ব্রিটিশ রয়েল এয়ারফোর্সের বিমানটিতে নামার সঙ্গে সঙ্গে বাঁধ ভাঙা স্রোতের মতো উত্তাল জনতা বিমানটিকে ঘিরে ফেলে।
তাঁর প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন তাঁকে সংবর্ধনা জানান, ব্রিটিশ ডেপুটি হাই কমিশনার, সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত ও অন্যান্য কূটনীতিক প্রতিনিধিরা সংবর্ধনা জানান।
জনতার ভিড়ে বেগম মুজিব ও তাঁর দুই ছেলে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেন। কিন্তু শেখ মুজিব সোজাসুজি একটি খোলা পুলিশ লরিতে রমনা রেসকোর্সে যান।
বিশাল জনসভা শেষে ঢাকা শহরের উপকণ্ঠে একটি গৃহে ঘটে বর্ণনাতীত এক আবেগপ্রবণ পুনর্মিলন। বন্ধুদের শুভেচ্ছা সূচক ফুলের পাপড়িতে শোভিত শেখ মুজিব তাঁর দুই মেয়েকে জড়িয়ে ধরেন। ঘটনা এর চেয়েও এগিয়ে যায় যখন শেখ মুজিব তাঁর ৯০ বছরের পিতার পা স্পর্শ করে ৮০ বছরের মাকে বুকে জড়িয়ে শিশুর মতো কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।
(ডেইলি টেলিগ্রাফ, লন্ডন, ১১ জানুয়ারি, ১৯৭২)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


