একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ রয়েছে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযমের বিরুদ্ধে। সে সময় তিনি পাকিস্তানি ঘাতকদের পক্ষ নিয়ে দলগতভাবে নানা যুদ্ধাপরাধ কাজে প্রকাশ্য সমর্থন, সহযোগিতা ও উৎসাহ জুগিয়েছেন। এসব গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনে তাঁরই নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী ও শান্তি কমিটি। বিশেষ করে তাঁরই পরিকল্পনা অনুযায়ী আলবদর বাহিনী নৃশংসভাবে হত্যা করে দেশের বুদ্ধিজীবীদের। দেশ স্বাধীনের পরও তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রচারণা চালান স্বাধীন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে।
দেশ স্বাধীনের পর একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি, ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি, সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম ও সর্বশেষ সরকার ঘোষিত শীর্ষস্থানীয় ৩৬ যুদ্ধাপরাধীর তালিকার প্রথমেই রয়েছে গোলাম আযমের নাম।
ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির গবেষণা এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রকাশিত দৈনিক পূর্ব দেশ, দৈনিক পাকিস্তান, দৈনিক আজাদ ও জামায়াতে ইসলামীর মুখপত্র দৈনিক সংগ্রাম থেকে গোলাম আযমের যুদ্ধাপরাধের নানা তথ্য পাওয়া গেছে।
অকাট্য দলিল সেই চিঠি
গোলাম আযম যে হত্যাকারী ছিলেন, এর সাক্ষ্য দিয়েছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী দলে থাকার সময়। ১৯৯২ সালের ১৬ এপ্রিল জাতীয় সংসদে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, 'কুমিল্লার হোমনা থানার রামকৃষ্ণপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক সিরু মিয়া দারোগা (তৎকালীন পুলিশের উপপরিদর্শক) ও তাঁর কিশোর ছেলে আনোয়ার কামালকে (অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র) গোলাম আযমের লিখিত পত্রের নির্দেশে হত্যা করা হয়। ১৯৭১ সালের ২৭ অক্টোবর সিরু মিয়া ও তাঁর ছেলে আনোয়ার কামাল মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং ক্যাম্পে যাওয়ার সময় অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে রাজাকারদের হাতে ধরা পড়েন। সিরু মিয়া দারোগা মুক্তিযুদ্ধে অনেক দুঃসাহসিক কাজ করেছেন। তিনি প্রবাসী বিপ্লবী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের স্ত্রী বেগম তাজউদ্দীনকে সপরিবারে কুমিল্লা সীমান্ত পার করিয়ে দিয়েছিলেন।' বক্তব্যকালে শেখ হাসিনা এ হত্যাকাণ্ডের নির্দেশসংবলিত দলিল তাঁর কাছে রয়েছে বলে উল্লেখ করেন।
সেই হত্যাকাণ্ডসংক্রান্ত কিছু তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত 'পাক্ষিক একপক্ষ' পত্রিকার ১ বর্ষ, সংখ্যা ১-এ। সেখানে বলা হয়, ২৯ অক্টোবর সিরু মিয়ার স্ত্রী আনোয়ারা বেগম তাঁদের মুক্তির জন্য ঢাকায় দূরসম্পর্কের আত্দীয় মহসীনের কাছে আসেন। মহসীন ছিলেন খিলগাঁও সরকারি হাই স্কুলের শিক্ষক এবং গোলাম আযমের দুই ছেলের গৃহশিক্ষক। তাঁর মাধ্যমে গোলাম আযমকে ধরলেন তিনি। গোলাম আযম একটি চিঠি লিখে খাম বন্ধ করে আনোয়ারার হাতে দিয়ে বললেন, 'এটি কুমিল্লা জেলার রাজাকার কমান্ডারকে দিলে সিরু মিয়াদের ছেড়ে দেওয়া হবে।'
আনোয়ারার ভাই ফজলু মিয়া ১ নভেম্বর কুমিল্লায় গেলেন চিঠি নিয়ে। চিঠি পড়ে রাজাকার কমান্ডার বললেন, ঈদের পরদিন কামালকে ছেড়ে দেওয়া হবে। আর সিরু মিয়াকে পুলিশে যোগদানের জন্য পাঠানো হবে। ২৩ নভেম্বর ছিল ঈদ। পরদিন ফজলু মিয়া কুমিল্লা জেলখানায় কামালকে আনতে গেলে সেখানে তাঁর হাতে সিরু মিয়া ও কামালের জামাকাপড় তুলে দেওয়া হয়। ফজলু মিয়া জানতে পারেন, ঈদের আগে ২১ নভেম্বর সন্ধ্যায় তিতাস নদীর পাড়ে ৪০ মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে দাঁড় করিয়ে হত্যা করা হয়েছে সিরু মিয়া ও তাঁর ছেলে আনোয়ার কামালকেও। গোলাম আযমের দেওয়া খামবন্ধ চিঠিতে হত্যার ওই নির্দেশ ছিল। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, গোলাম আযমের সেই চিঠি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছেই রয়েছে।
গণ-আদালতে দেওয়া সাক্ষ্য
১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রতীকী বিচারের জন্য গঠিত গণ-আদালতে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। তিনি বলেন, ১৯৭২ সালে গোলাম আযম লন্ডনে 'পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটি' করে অপর দুই অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধী মাহমুদ আলী ও খাজা খায়েরউদ্দীনের সঙ্গে মিলে বিভিন্ন দেশে পূর্ব পাকিস্তান পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলন গড়ে তোলেন। সেই আদালতে শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. বোরহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীর তাঁর সাক্ষ্যে বলেন, 'গোলাম আযম পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর আমির হিসেবে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীকে গণহত্যা, নারী ধর্ষণ, লুণ্ঠন ও জনপদ ধ্বংসের কাজে সহায়তা করেছে।' প্রমাণ হিসেবে তিনি ১৯৭১ সালে প্রকাশিত দৈনিক পূর্ব দেশের ৫ এপ্রিল ও ২৭ জুন; দৈনিক পাকিস্তানের ৭, ১৬ ও ২০ এপ্রিল, ১৯ ও ২১ জুন, ১৬ ও ১৯ আগস্ট, ১৭ ও ১৮ সেপ্টেম্বর ও ২৪ নভেম্বর; দৈনিক আজাদের ২১ জুন এবং দৈনিক সংগ্রামের ১৭, ২১ ও ২২ জুন সংখ্যা উপস্থাপন করেন।
বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রচারণায় সাড়ে সাত বছর
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭৮ সালের ১০ জুলাই পর্যন্ত নানাভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশকে দুর্বল ও সহায়হীন, বিচ্ছিন্ন ও বিনষ্ট করার ষড়যন্ত্র করার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি প্রকাশিত যুদ্ধাপরাধীদের তালিকায় গোলাম আযমের বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা প্রসঙ্গে বলা হয়, ১৯৭৩ সালে ম্যানচেস্টারে অনুষ্ঠিত ফেডারেশন অব স্টুডেন্টস ইসলামিক কমিশনের বার্ষিক সভায় তিনি বাংলাদেশবিরোধী বক্তৃতা দেন। ১৯৭৪ সালে মাহমুদ আলীসহ কয়েকজন পাকিস্তানিকে নিয়ে পূর্ব লন্ডনে পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটির বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে গোলাম আযম ঝুঁকি নিয়ে হলেও বাংলাদেশে ফিরে অভ্যন্তর থেকে 'কাজ চালানোর' প্রয়োজনীয় কথা তুলে ধরেন। ১৯৭৭ সালে লন্ডনের হোলি ট্রিনিটি চার্চ কলেজে অনুষ্ঠিত একটি সভায় তিনি একই কথার পুনরাবৃত্তি করেন। ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে সৌদি আরবের রিয়াদে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ইসলামী যুব সম্মেলনে যোগ দিয়ে পাকিস্তান পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সব মুসলিম রাষ্ট্রের সাহায্য প্রার্থনা করেন। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত সাতবার সৌদি বাদশার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দেওয়ার এবং বাংলাদেশে কোনো আর্থিক সাহায্য বা কোনো ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করারও আহ্বান জানান তিনি। ১৯৭৪ সালে রাবেতায়ে আলমে ইসলামীর উদ্যোগে মক্কায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এবং ১৯৭৭ সালে কিং আবদুল আজিজ ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত একটি সভায় বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বক্তৃতা করেন। একইভাবে ১৯৭৩ সালে বেনগাজিতে অনুষ্ঠিত ইসলামী পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে আগত প্রতিনিধিদের কাছে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দেওয়ার জন্য জোর তদবির এবং ত্রিপলিতে অনুষ্ঠিত ইসলামী যুব সম্মেলনে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেন। সে বছর মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত 'মুসলিম স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন অব আমেরিকা অ্যান্ড কানাডা'র বার্ষিক সম্মেলনে বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তানভুক্ত করার জন্য সবাইকে কাজ করার আহ্বান জানান।
আত্দসমর্পণের নির্দেশ অমান্য
যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গোলাম আযমসহ ১৪ রাজনীতিককে আদালতে আত্দসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছিল বাংলাদেশ সরকার। ১৯৭২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপন জারি করে। প্রজ্ঞাপনে সে বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি বেলা ৩টায় গোলাম আযমকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অথবা ঢাকা (দক্ষিণ) মহকুমা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির হতে নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু গোলাম আযম আত্দসমর্পণ না করে পাকিস্তানে চলে যান। ফলে সরকার ১৯৭৩ সালের ১৮ এপ্রিল এক আদেশে পলাতক ৩৮ রাজনীতিকের সঙ্গে গোলাম আযমের নাগরিকত্ব বাতিল করে। নিষিদ্ধ করে জামায়াতে ইসলামীকে।
সংবিধান লঙ্ঘন করে আমির
জিয়াউর রহমানের সরকার ১৯৭৮ সালে জামায়াতে ইসলামীকে রাজনীতি করার ছাড়পত্র দেয়। সেই সুযোগে পাকিস্তানি পাসপোর্ট ও তিন মাসের ভিসা নিয়ে ওই বছরের ১১ জুলাই বাংলাদেশে প্রবেশ করেন গোলাম আযম। ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও তিনি অবৈধভাবে দেশে থেকে যান। সরকার তাঁকে ১৯৮৮ সালের ২০ এপ্রিলের মধ্যে দেশত্যাগের নির্দেশ দিলেও তিনি থেকে যান। ১৯৯১ সালের ২৯ ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামী দেশের সংবিধানের ৩৮ ধারা লঙ্ঘন করে তাঁকে দলের আমির ঘোষণা করে।
জনতার রোষে দুইবার
দেশের মানুষ ভীষণ ক্ষুব্ধ ছিল গোলাম আযমের ওপর। এর প্রমাণ মেলে দুটি ঘটনায়। এক. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের ২৫ বছর পূর্তি উৎসবে তাঁর উপস্থিতির প্রতিবাদ করেন এক শহীদের সন্তান ও ফজলুল হক হলের তৎকালীন ছাত্র সংসদের এজিএস। দুই. ১৯৮১ সালের ১ জানুয়ারি বায়তুল মোকাররমে ফিলিস্তিন যুদ্ধে শহীদ দুই বাংলাদেশির জানাজা পড়তে এলে উপস্থিত নামাজিরা তাঁকে জুতাপেটা করে তাড়িয়ে দেন। পরদিন দেশের বিভিন্ন পত্রিকায় খবরটি ছবিসহ প্রকাশিত হয়।
টিক্কা খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ
একাত্তরের ৪ এপ্রিল নুরুল আমিন, গোলাম আযম, ফরিদ আহমদ, খাজা খায়েরউদ্দীন, হামিদুল হক চৌধুরী প্রমুখ নেতা সামরিক প্রশাসক ও পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খানের সঙ্গে দেখা করে পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগিতার আশ্বাস দেন। ওই খবর ও ছবি ছাপা হয় ১৯৭১ সালের ৬ এপ্রিলের দৈনিক পূর্ব দেশে। পরে ৬ এপ্রিল গোলাম আযম টিক্কা খানের সঙ্গে আবার একান্ত বৈঠক করেন। ৭ এপ্রিল দৈনিক পাকিস্তানে ছাপা হলো, মহান মুক্তিযুদ্ধকে তিনি 'ভারতীয় হস্তক্ষেপ ও অনুপ্রবেশ' হিসেবে ব্যাখ্যা দেন।
গঠন করেন শান্তি কমিটি
১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল গোলাম আযমসহ কয়েকজনের উদ্যোগে 'শান্তি কমিটি' গঠিত হলো। ১২ এপ্রিল ঢাকায় মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে শান্তি কমিটির মিছিলে গোলাম আযম পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাফল্য কামনা করে আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। (দৈনিক সংগ্রাম, ১৩ এপ্রিল ১৯৭১)
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রকাশিত '৭১ : গণহত্যার দলিল' শীর্ষক গ্রন্থ থেকে জানা যায়, একাত্তরে কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটির ১০৪ সদস্যের মধ্যে ৩ নম্বর ছিলেন গোলাম আযম। ওই গ্রন্থেই রয়েছে নৃশংস জেনারেল টিক্কা খানের সঙ্গে পরামর্শরত গোলাম আযমের আলোকচিত্র। ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি প্রকাশিত শান্তি কমিটির ২১ সদস্যের কার্যকরী কমিটির ৩ নম্বরেই রয়েছে গোলাম আযমের নাম।
তাঁর নির্দেশেই অপর তিন বাহিনী
গোলাম আযমের নির্দেশেই জামায়াতের আরেক নেতা এ কে এম ইউসুফ একাত্তরের মে মাসে খুলনার খানজাহান আলীর একটি আনসার ক্যাম্পে প্রথমে ৯৬ জামায়াতকর্মী নিয়ে গঠন করেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহযোগী সশস্ত্র সংগঠন 'রাজাকার বাহিনী'। একাত্তরের ১ জুন জেনারেল টিক্কা খান 'পূর্ব পাকিস্তান রাজাকার অর্ডিন্যান্স ১৯৭১' জারি করেন এবং সেই অর্ডিন্যান্সে আনসার বাহিনীকে বিলুপ্ত করে রাজাকার বাহিনীতে রূপান্তর করা হয়।
গোলাম আযমের নেতৃত্বেই গড়ে ওঠে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ নিধনে আলবদর ও আলশামস বাহিনী। একাত্তরের ২৩ নভেম্বর বদর বাহিনীর দুই প্রধান নেতা আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ ও মীর কাসেম আলী এক বিবৃতিতে 'সৈনিক হিসেবে প্রস্তুত হয়ে যাওয়ার জন্য' বদর বাহিনীর সদস্যদের আহ্বান জানান। বিবৃতিতে আরো বলা হয়, 'নমরুদের হাত থেকে মাতৃভূমিকে রক্ষার জন্য আমাদের আমির গোলাম আযমের নির্দেশ পালন করুন।' এই আলবদর বাহিনীর নেতৃত্বেই ঘটে বুদ্ধিজীবী নিধনযজ্ঞ।
গোলাম আযমের বক্তব্য
গত ২৫ মার্চ মানবতাবিরোধী ট্রাইব্যুনালের যাত্রা শুরু হলে এবং প্রাথমিক পর্যায়ে শীর্ষস্থানীয় ১৭ সন্দেহভাজন যুদ্ধাপরাধীর তালিকা প্রকাশিত হলে কালের কণ্ঠ থেকে গোলাম আযমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।
এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য গোলাম আযমের বর্তমান বাসভবন রাজধানীর মগবাজারের ১১৯ কাজী অফিস গলির 'আল বায়তুল আযমী' অ্যাপার্টমেন্টে ফোন করে তাঁকে পাওয়া যায়নি। গত ২৮ মার্চ টেলিফোনে তাঁর ছেলে পরিচয় দিয়ে একজন জানতে চান কী বিষয়ে ফোন করেছেন? বিষয়টি জানানো হলে তিনি বলেন, 'যুদ্ধাপরাধীর সংজ্ঞা কী? ডিফেন্সের লোকেরাই যুদ্ধে অফেন্স করে। উনি তো কোনো দিন ক্ষমতায় ছিলেন না। ওনার নামে কোনো মামলাও হয়নি। আমার বাবার বক্তব্য হচ্ছে, ভারতের গোলামির আশঙ্কায় ভারতের হাত ধরে তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ সমীচীন মনে করেননি। একাত্তরে এটা ছিল তাঁদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।' তিনি পুনরায় জানতে চান, 'স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল। ১৯৯৬ সালে দ্বিতীয়বার তারা ক্ষমতায় আসে। বাবা অপরাধ করলে তখন বিচার করেনি কেন?'
কালের কণ্ঠ
Click This Link
যেমন কাটছে দিনকাল সেলিম জাহিদমগবাজারের কাজি অফিস গলির মসজিদ আর ঘরেই প্রায় দিন কাটছে এখন গোলাম আযমের। মাসে একবার জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলীয় বৈঠকে ইউনিট সদস্য হিসেবে অংশ নেন।
যোগাযোগ করলে গোলাম আযম জানান, তিনি দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভীষণ উদ্বিগ্ন। তাঁর আর বেঁচে থাকারও ইচ্ছে নেই। মৃত্যু কামনায় এখন তিনি নিয়মিত দুটি দোয়া পড়ছেন।
ইতিহাসের কুখ্যাত নরঘাতক হিসেবে পরিচিত গোলাম আযমের নেতৃত্বেই জামায়াতে ইসলামী একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় সহযোগী রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী হত্যা, খুন ধর্ষণ ও অগি্নসংযোগসহ নানা মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করে।
গোলাম আযমের বয়স এখন প্রায় ৮৯ বছর। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বার্ধক্য ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি দলকে সময় দিতে পারেন না। পড়াশোনা, কিছু লেখালেখি আর দর্শনার্থীদের সময় দেওয়া ছাড়া বাকি সময়টা কাটে বিশ্রামে। প্রতিদিন আসরের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত চেম্বারে বসেন। এ সময় তিনি দলীয় নেতা-কর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী ও দর্শনার্থীদের সাক্ষাৎ দেন। এ মুহূর্তে তিনি কিছু লিখছেন না।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, গোলাম আযমের লেখা ৩৫টি বই সাংগঠনিকভাবে জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের পাঠ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। ১৯৭৯ সাল থেকে একনাগাড়ে ২২ বছর তিনি জামায়াতে ইসলামীর 'আমির' পদে দায়িত্ব পালন করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, জামায়াত আমির মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদসহ দলের কেন্দ্রীয় নেতারা বিশেষ গরজে তাঁর সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করেন, বুদ্ধি পরামর্শও নেন। বিশেষ করে বিতর্কিত ইস্যুতে কখনো দলের জন্য সংকট ঘনীভূত হলে মুজাহিদের নেতৃত্বাধীন জামায়াতের 'রাজনৈতিক কমিটি' তাঁর পরামর্শ নিতে যায়।
জামায়াতে ইসলামীতে গোলাম আযমের বর্তমান ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে দলের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ বলেন, 'উনি আমাদের মুরবি্ব, দলের সিনিয়র সদস্য_আমরা সেভাবেই উনাকে মূল্যায়ন করি।'
জামায়াতে তাঁর প্রভাব আছে কি না_এ প্রশ্নে মুজাহিদ বলেন, 'ব্যক্তিগতভাবে তিনি প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেন না, তবে পরামর্শ দিলে আমরা তা ভালোভাবেই নিই।'
২০০০ সালে জামায়াতে ইসলামীর 'আমির' পদ থেকে স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ানোর পর রাজনীতি থেকেও অলিখিতভাবে অবসরে চলে গেছেন গোলাম আযম। দলীয় সূত্র জানিয়েছে, প্রতি খ্রিস্টীয় মাসের প্রথম সোমবার মাগরিবের নামাজের আগে অথবা পরে তিনি বড় মগবাজারের ৫০৫ এলিফ্যান্ট রোডের জামায়াত কার্যালয়ে আসেন। এই দিন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় তিনটি ইউনিটের মধ্যে এক নম্বর ইউনিটের বৈঠক হয়।
জানা গেছে, জামায়াত আমির মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদসহ কেন্দ্রীয় নির্বাহী ও কর্মপরিষদের ১৬ জন ইউনিট সদস্য মাসে একবার বৈঠকে বসে নিজেদের সাংগঠনিক রিপোর্ট উপস্থাপন করেন। এরপর তাঁরা দরসে (শিক্ষা বা পাঠদান) কোরআন-হাদিসে অংশ নেন। একেক মাসে একেকজন পালাক্রমে দরস দেন। দলের নায়েবে আমির মকবুল আহমদ কেন্দ্রীয় এক নম্বর ইউনিটের সভাপতি। সর্বশেষ গত ৫ এপ্রিল অনুষ্ঠিত বৈঠকে গোলাম আযম দরস দেন। সর্বশেষ ৭ জুন অনুষ্ঠিত ইউনিট বৈঠকেও গোলাম আযম উপস্থিত ছিলেন। এ দিন দরস দেন আবু নাছের মোহাম্মদ আবদুজ জাহের।
জানা গেছে, রাজনীতি থেকে অবসরে যাওয়ার পর গোলাম আযম এখন ভক্ত-অনুরাগী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের ছেলেমেয়েদের বিয়ে পড়ান। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গোলাম আযমের পরিবারের এক সদস্য বিষয়টি স্বীকার করে প্রতিবেদককে বলেন, 'হ্যাঁ, এটি সত্য, কাজটি তিনি নিষ্ঠার সঙ্গেই করছেন। কারণ অনুরাগীরা আবেগে উনার কাছে আসেন, উনিও সানন্দেই তা করেন।'
পরিবারের ওই সদস্য জানান, গড়ে প্রতি মাসে কমপক্ষে তিন-চারটি বিয়ের আকদ পড়ান গোলাম আযম। মগবাজারের কাজি অফিস গলির 'বায়তুল কোরআন মসজিদে' বর ও কনে পক্ষের উপস্থিতিতে আকদ পড়ানো হয়। ৭ জুন ছাত্রশিবিরের বিদায়ী সেক্রেটারি শিশির মুহম্মদ মুনিরের আকদও পড়ান গোলাম আযম। কখনো কখনো কাজি অফিস গলির ১১৯/২ অ্যাপার্টমেন্টে নিজ বাসায়ও বিয়ে পড়ানো হয়। এর জন্য তিনি কোনো সম্মানী নেন না।
ছয় ছেলে ২০ নাতি-নাতনির মধ্যে চতুর্থ ছেলে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (সদ্য বরখাস্ত) আবদুল্লাহিল আমান আল আযমী, তাঁর ঘরের তিন নাতি-নাতনি ও স্ত্রী স্যাইয়েদা আফিফা আযম বার্ধক্যের জীবনে তাঁর সঙ্গী। বড় ছেলে আবদুল্লাহিল মামুন আল আযমী জেদ্দায় ইসলামী ডেভেলপমেন্টে কর্মরত। বাকি চার ছেলে আবদুল্লাহিল আমিন আল আযমী, আবদুল্লাহিল মোমিন আল আযমী, আবদুল্লাহিল নোমান আল আযমী, আবদুল্লাহিল সালমান আল আযমী সপরিবারে যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টারে বসবাস করেন।
গোলাম আযমের স্ত্রী স্যাইয়েদা আফিফা আযম বলেন, 'জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তিনি ব্যস্ত ছিলেন শিক্ষা, ধর্ম ও রাজনীতি নিয়ে। এখন তিনি পরিবারকে সময় দিচ্ছেন।'
Click This Link
রাজনৈতিক আশ্রয় নিতে লন্ডন যাওয়ার চেষ্টায় গোলাম আযমআপিল জেতার পর ভিসা পাওয়ার অপেক্ষায় লন্ডন সংবাদদাতাজামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির এবং মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযম দেশ ছাড়ার চেষ্টা করছেন। জানা গেছে, ব্রিটেনে রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য গোপনে তিনি বাংলাদেশ ত্যাগ করার চেষ্টা করছেন। ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্যের ভিসা পাওয়ার জন্য সব আইনি প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হয়েছে। জানা গেছে, লন্ডনে পেঁৗছামাত্র তিনি রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য আবেদন জানাবেন।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, গোলাম আযমের দেশত্যাগের বিষয়টি কঠোর গোপনীয়তার সঙ্গে মনিটর করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে সমন্বয় করছেন গোলাম আযমের ইংল্যান্ড প্রবাসী ছেলে নাবিল আল আযমী। এমনকি দলের বাংলাদেশ অংশের নীতিনির্ধারণী মহলকে এ ব্যাপারে অন্ধকারে রাখা হয়েছে।
সূত্র জানায়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি জোরালো হয়ে উঠলে প্রথমবার গোলাম আযমকে দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেন তাঁর পরিবারের সদস্যরা। সে সময় নির্বাচনে বিজয়ী হলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হবে_আওয়ামী লীগের এ রকম ঘোষণায় উদ্বিগ্ন পরিবারের সদস্যরা ইংল্যান্ডে গোলাম আযমের রাজনৈতিক আশ্রয় লাভের সম্ভাব্যতা যাচাই করেন।
২০০৮ সালের ২৮ এপ্রিল গোলাম আযম ভিসার জন্য বাংলাদেশে ব্রিটিশ হাইকমিশনে আবেদন করেন। আবেদন প্রক্রিয়া গোপন রাখা হয় এবং বাহক মারফত আবেদনপত্র পেঁৗছে দেওয়া হয়। পরে ব্রিটিশ দূতাবাসের গুলশান ১-এ অবস্থিত ভিসা ফ্যাসিলিটেশন সেন্টারে (ভিএফএস) এসে গোলাম আযম তাঁর অঙ্গুলির ছাপ দিয়ে যান। ভিএফএসে গোলাম আযমের উপস্থিতি গোপনীয়তার সঙ্গে সম্পন্ন হয়। উল্লেখ্য, ব্রিটিশ দূতাবাসের এই ভিসা ফ্যাসিলিটেশন কেন্দ্রটি একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক সংস্থা দ্বারা পরিচালিত। ২০০৮ সালের ভিসার আবেদনটি ব্রিটিশ হাইকমিশন প্রত্যাখ্যান করলে নাবিল আযমীর পক্ষ থেকে যুক্তরাজ্যে 'অ্যাসাইলাম অ্যান্ড ইমিগ্রেশন ট্রাইব্যুনাল'-এ আপিল করা হয়। গত সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নির্বাচিত হলে, গোলাম আযম আবার ভিসার জন্য আবেদন করলে সে আবেদনও প্রত্যাখ্যাত হয়।
এ সময় নাবিল আযমী অ্যাসাইলাম অ্যান্ড ইমিগ্রেশন ট্রাইব্যুনালে আবার আপিল করেন। এবার আপিল করার সময় আপিলের রায় যাতে গোলাম আযমের পক্ষে আসে, এ জন্য নাবিল আযমীর ব্যবস্থাপনায় জামায়াত সমর্থিত কয়েকজন ইমিগ্রেশন অ্যাডভাইজার এবং পাকিস্তানি একজন নাগরিককে যুক্ত করা হয়।
আইনি লড়াইয়ের পর ইমিগ্রেশন বিভাগের বিচারক গত এপ্রিল মাসের শুরুতে গোলাম আযমকে যুক্তরাজ্যে তাঁর ছেলে নাবিল আযমীর কাছে যাওয়ার জন্য ভিসা দিতে সংশ্লিষ্ট দূতাবাসকে আদেশ দেন।
লন্ডনের একটি দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, এই আদেশটি যাতে দ্রুত নিষ্পন্ন হয় এ জন্য আদেশের কপি গোলাম আযমের পক্ষ থেকে ঢাকায় ব্রিটিশ হাইকমিশনের কাছে পাঠানো হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক লন্ডনে জামায়াতের সঙ্গে জড়িত এই সূত্রটি জানিয়েছে, ভিসা পেলে গোলাম আযম যাতে নির্বিঘ্নে দেশত্যাগ করতে পারেন, সে জন্য সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে সরকারের প্রশাসনের ভেতরে কিছু লোক কাজ করছেন; এমনকি গোলাম আযমের পাসপোর্টের মেয়াদ ২০০৯ সালের জুলাই মাসে শেষ হয়ে গেলে সম্প্রতি তাঁর পাসপোর্টটিও সরকারের কোনো বাধা ছাড়াই দ্রুত নবায়ন করা হয়েছে বলে সূত্রটি নিশ্চিত করেছে।
লন্ডনের তরুণ ইমিগ্রেশন আইনজীবী মোহাম্মদ গোলাম কিবরিয়া এই প্রতিবেদককে বলেন, 'আপিল বিভাগে জেতার পর গোলাম আযমের ভিসা পেতে আর কোনো অসুবিধা নেই। তিনি ইতিমধ্যে ভিসা পেয়ে গেছেন বলে আমরা ধারণা করছি। আমরা যত দূর জানি, যুক্তরাজ্যের বিচার বিভাগে ভিসা পাওয়ার জন্য নাবিল আযমী যে আপিল করেছেন এবং বিজয়ীও হয়েছেন, সেটি বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কেউ জানেন না। এমনকি সন্দেহভাজন যুদ্ধাপরাধীদের ব্যাপারে বাংলাদেশে অবস্থিত কোনো দূতাবাসকে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের সতর্কীকরণ বার্তাও দেওয়া হয়নি। গোলাম আযম যুক্তরাজ্যে এলে তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁকে এখানে রেখে দেওয়া খুব কঠিন কাজ নয়। তিনি রাজনৈতিক আশ্রয় দাবি করলে তাঁর আবেদনটি এ দেশের আইন অনুসারে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। সাধারণত ৭০ বছরের বেশি বয়সী কোনো ব্যক্তি রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য আবেদন করলে মানবিক কারণে তাঁর আবেদন বিবেচনা করা হয়।'
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে লন্ডনে জনমত সংগঠনের অন্যতম নেতা এবং আমারব্লগডটকম-এর প্রধান নির্বাহী সুশান্ত দাসগুপ্ত এই প্রতিবেদককে বলেন, 'গোলাম আযমের চার ছেলে লন্ডনে বাস করেন। তাঁরা এখানকার জামায়াত নেতা এবং আন্তর্জাতিক লবিগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করে চলেন। আমরা আশঙ্কা করছি, গোলাম আযম যদি কোনোক্রমে বাংলাদেশ ত্যাগ করে এ দেশে এসে পেঁৗছান, তাহলে তাঁকে আর কখনোই বাংলাদেশে ফিরিয়ে নিয়ে বিচার করা যাবে না।'
এ ব্যাপারে কালের কণ্ঠ অফিস থেকে ২০ জুন সন্ধ্যা ৭টা ৪৪ মিনিটে লন্ডনে নাবিল আযমীর মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে এক ব্যক্তি প্রথমে নিজেকে তাঁর চাচা পরিচয় দিয়ে এই প্রতিবেদকের কাছে রিপোর্টের বিষয়বস্তু জানতে চান। প্রতিবেদক এ ব্যাপারে নাবিল আযমীর সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছা পোষণ করলে তিনি জানান, নাবিল আযমী ব্যস্ত আছেন। তাঁর নাম জানতে চাওয়া হলে পরে তিনি নিজেকে গোলাম আযমের ছোট ছেলে সালমান আল আযমী পরিচয় দেন। গোলাম আযমের লন্ডন যাওয়ার ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি প্রথমে এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে অস্বীকার করেন। পরে তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশে ব্রিটিশ হাইকমিশন সম্পূর্ণ অনায্যভাবে গোলাম আযমকে ভিসা দিতে অস্বীকার করলে তাঁরা লন্ডনে পারিবারিকভাবে আপিল করেন এবং মাস দুই আগে তাঁরা সে আপিলে বিজয়ী হয়েছেন। তিনি আরো জানান, আপিলের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে ব্রিটিশ হাইকমিশন গোলাম আযমের পাসপোর্ট চাইলে তা জমা দেওয়া হয়েছে। দূতাবাস ভিসা দিয়েছে কি না_এ ব্যাপারে তিনি কিছু জানেন না বলে জানান।
গোলাম আযম লন্ডনে স্থায়ীভাবে থাকার চেষ্টা করবেন কি না_এ প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, এটি নিছকই পারিবারিক ভ্রমণ। ভিসা পাওয়ার পর সরকার যদি তাঁকে দেশের বাইরে যেতে বাধা দেয়, তাহলে পারিবারিকভাবে তাঁরা কোনো পদক্ষেপ নেবেন কি না প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, এ ব্যাপারে এখনো কোনো চিন্তাভাবনা করা হয়নি। যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত করে গোলাম আযমের বিচার শুরু হলে তাঁরা লন্ডন থেকে আইনি সহায়তা দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা করছেন কি না_এ প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, এ রকম কোনো পরিকল্পনা এখনো তাঁদের নেই।
এদিকে লন্ডনের সূত্রটি নিশ্চিত করেছে, যদি নাবিল আযমীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গোলাম আযম ভিসা পেয়ে ইংল্যান্ডে পেঁৗছতে পারেন, তাহলে সেখানে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার পক্ষে আবেদন করবেন তাঁর আরেক ছেলে আমীন আল আযমী। পারিবারিকভাবে বাবাকে সন্তানের সঙ্গে রাখার ব্যাপারে সাধারণ মাইগ্রেশন আইন অথবা রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য আবেদন, এই দুইভাবেই আবেদনের আইনগত ও রাজনৈতিক বিষয় খতিয়ে দেখা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য আবেদন করা হবে বলেই প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য আবেদন করা হলে এ থেকে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের জন্য অভিযুক্ত জামায়াতের বাকি নেতারাও ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মহলে রাজনৈতিক সহমর্মিতা লাভ করবেন বলে তাঁরা ধারণা করছেন। এ ব্যাপারে আমীন আল আযমী ইতিমধ্যেই কয়েকজন ইমিগ্রেশন আইনজীবীর সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছেন বলেও সূত্রটি জানিয়েছে। উল্লেখ্য, এর আগে গোলাম আযম একাধিকবার লন্ডনে গিয়ে আমীন আল আযমীর তত্ত্বাবধানে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন।
এ ব্যাপারে সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) শফিউল্লাহ বীর উত্তম এমপি কালের কণ্ঠকে বলেন, 'বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে দালাল আইন করেছিলেন। সেই আইনে সব চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীকে গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। গোলাম আযমসহ চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীরা তখন দেশের বাইরে পালিয়ে থেকে গ্রেপ্তার এড়িয়ে ছিলেন। আমি মনে করি, বঙ্গবন্ধুর সেই উদ্যোগ এখনো বলবৎ আছে। সুতরাং গোলাম আযমসহ চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের অবিলম্বে সরকারের হেফাজতে নিয়ে আসা দরকার। এসব চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী যাতে দেশ ছেড়ে পালাতে না পারে, সে জন্য দেশের সব বিমান ও স্থলবন্দরে সতর্কতা জারি করাই যথেষ্ট নয়। বিদেশি সব দূতাবাসেও অবিলম্বে তাদের তালিকা পাঠানো প্রয়োজন, যাতে কোনো দেশ তাদের ভিসা না দেয়।'
গোলাম আযমের বিদেশ ভ্রমণের উদ্যোগের কথা শুনে ওয়্যার ক্রাইম ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির আহ্বায়ক ডা. এম এ হাসান ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, 'আমাদের বন্ধু রাষ্ট্রগুলো কোনোভাবেই এই চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের ভিসা প্রদান করতে পারে না। যুক্তরাজ্য ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দেশগুলো জেনেভা কনভেনশন এবং জেনোসাইড কনভেনশনে সই করেছে। তারা কোনোভাবেই একজন যুদ্ধাপরাধীকে ভিসা দিতে পারে না।'
তিনি বলেন, 'গোলাম আযম এ দেশের প্রধান যুদ্ধাপরাধীদের একজন। তিনি যদি কোনোক্রমে দেশের বাইরে যেতে পারেন, তাহলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রহসনে পরিণত হবে। ১৯৭১ সালে আমরা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর যুদ্ধাপরাধীদের দেশের বাইরে যেতে দেওয়ায় তাদের আর বিচারের মুখোমুখি করতে পারিনি। গোলাম আযম যদি এখন দেশের বাইরে যেতে পারেন, তাহলে তাঁর বিচার করাও সম্ভব হবে না।'
তিনি অবিলম্বে সব চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীর পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান।
Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে জুন, ২০১০ সন্ধ্যা ৬:২৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


