মাথাপিছু আয় ॥ ৭৫০ ডলার
০ এক বছরে মাথাপিছু আয় বেড়েছে ৭৪ ডলার
০ জিডিপি ৬২০ থেকে ৬৮৪ ডলারে পৌছেছে
০ এ ধারা অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতেই বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে
রাজু আহমেদ॥ চলতি অর্থবছরে প্রথমবারের মতো ৭শ' মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে মাথাপিছু জাতীয় আয়। সাময়িক হিসেবে এক বছরের ব্যবধানে ৭৪ ডলার বেড়ে মাথাপিছু আয় ৭৫০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। একইসঙ্গে চলতি অর্থবছরে মাথাপিছু জাতীয় উৎপাদন (জিডিপি) ৬২০ ডলার থেকে বেড়ে ৬৮৪ ডলারে দাঁড়াচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অনুবিভাগ প্রণীত 'অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০১০'-এ এসব তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। জাতীয় আয় বৃদ্ধির বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে অদূরভবিষ্যতে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন।
২০১০ সালের অর্থনৈতিক সমীক্ষায় দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা সত্ত্বেও ২০০৯-১০ অর্থবছরে বাংলাদেশ সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা সমুন্নত রাখাসহ সন্তোষজনক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। মন্দার ফলে বিশ্ব অর্থনীতি সঙ্কোচিত হয়ে পড়লেও বাংলাদেশের অর্থনীতি সীমিত পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এ সময়ে রাজস্ব খাত ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে।
মাথাপিছু আয় ও বণ্টন ॥ সাময়িক হিসেব অনুযায়ী, ২০০৯-১০ অর্থবছরে দেশে মাথাপিছু জাতীয় আয় ৭৫০ ডলারে দাঁড়াবে। সে অনুযায়ী দেশীয় মুদ্রার হিসেবে প্রথমবারের মাথাপিছু আয় ৫০ হাজার টাকা ছাড়িয়ে ৫১ হাজার ৮২১ টাকায় দাঁড়িয়েছে। গত অর্থবছরে মাথাপিছু আয়ের পরিমাণ ছিল ৪৬ হাজার ৫৬০ টাকা। অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির গতিধারার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ধনী-গরিব বৈষম্য। ২০০৫ সালে পরিচালিত খানা আয়-ব্যয় জরিপ উল্লেখ করে সমীক্ষায় দেখানো হয়েছে, দেশের মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশেরও বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। দেশের সর্বনিম্ন ৫ শতাংশ চরম দারিদ্র্যপীড়িত পরিবারের আয় ২০০০ সালে মোট জাতীয় আয়ের দশমিক ৯৩ শতাংশ থেকে হ্রাস পেয়ে ২০০৫ সালে দশমিক ৭৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এর বিপরীতে ২০০৫ সালে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ ধনী পরিবারের আয় ছিল মোট জাতীয় আয়ের ২৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ।
জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ ॥ অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের গতিধারা অনুযায়ী চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশ অর্জিত হবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর চূড়ান্ত হিসেবে গত অর্থবছরে (২০০৮-০৯) স্থির মূল্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৫.৭৪ শতাংশ। ২০০৮-০৯ অর্থবছরের তুলনায় জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার দশমিক ২৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থনীতি সমীক্ষায় বলা হয়, রফতানি আয়ে ইতিবাচক ধারা, আমন ও বোরো ধান উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষি ও শিল্পে প্রবৃদ্ধি, মূলধনী যন্ত্রপাতি কাঁচামাল আমদানি বৃদ্ধির হালনাগাদ তথ্য বিবেচনা করে জিডিপি প্রবৃদ্ধির এ হার প্রাক্কলন করা হয়েছে।
চলতি বছরে জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ২০.১৬ শতাংশ। আর এ খাতে প্রবৃদ্ধির হার ৪.৩৯ শতাংশ। আগের বছর সামগ্রিক কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৪.১৩ শতাংশ। কৃষিতে প্রবৃদ্ধি বাড়লেও শিল্প খাতে এ হার কিছুটা কমে গেছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে শিল্পে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৬.৪৬ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৬.৪২ শতাংশ।
সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামোতে ২০১০-১১, ২০১১-১২ এবং ২০১২-১৩ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার যথাক্রমে ৬.৭ শতাংশ, ৭.২ শতাংশ ও ৭.৬ শতাংশ হবে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। সরকারের ঘোষিত রূপকল্পে ২০১৩ সালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশ এবং ২০১৭ সালে এ হার ১০ শতাংশে উন্নীত করে অব্যাহত রাখার লৰ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
জাতীয় সঞ্চয় বাড়লেও কমেছে বিনিয়োগ ॥ চলতি অর্থবছরে দেশে সঞ্চয়ের হার বাড়লেও কমে গেছে বিনিয়োগ। জাতীয় সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে এবার দেশের প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও দেশজ সঞ্চয় কিছুটা কমে গেছে। ২০০৯-১০ অর্থবছরে সাময়িক হিসেব অনুযায়ী, দেশজ ও জাতীয় সঞ্চয়ের পরিমাণ জিডিপির শতকরা হারে যথাক্রমে ১৯ দশমিক ৭৮ শতাংশ ও ২৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে এ হার ছিল যথাক্রমে ২০ দশমিক ০৯ শতাংশ ও ২৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ।
জাতীয় সঞ্চয় বাড়লেও বিনিয়োগের হার ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ২৪ দশমিক ৩৭ শতাংশ থেকে কমে ২০০৯-১০ অর্থবছরে জিডিপির ২৪ দশমিক ৩৫ শতাংশে দাঁড়াচ্ছে। এর মধ্যে সরকারী খাতের অবদান জিডিপির ৪.৬২ শতাংশ এবং বেসরকারী খাতের অবদান জিডিপির ১৯.৭৪ শতাংশ। আগের অর্থবছরে এ অবদানের হার ছিল যথাক্রমে জিডিপির ৪.৭০ শতাংশ ও ১৯.৬৭ শতাংশ।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী মোট বিনিয়োগে সরকারী খাতের অবদান ধারাবাহিকভাবে কমছে, বাড়ছে বেসরকারী খাতের অংশীদারিত্ব। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে মোট বিনিয়োগে ব্যক্তি খাতের অবদান ছিল প্রায় ৬০ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে এ অবদান ৮০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।
খাদ্যপণ্যে
মূল্যস্ফীতি বাড়ছেই ॥ অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি ব্যাপক হারে বেড়েছে। মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতির উর্ধগতি কিছুটা থেমেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই মাসে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৩ দশমিক ৪৬ শতাংশ_ যা ফেব্রুয়ারি মাসে বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ০৬ শতাংশে। মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৬ দশমিক ৮৯ শতাংশ।
খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের তুলনায় খাদ্যপণ্যের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ ক্রমাগত বেড়েছে। মার্চ মাসে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৬০ শতাংশে সীমিত থাকলেও খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৮০ শতাংশে দাঁড়ায়।
মূল্যস্ফীতির কারণ হিসেবে অর্থনৈতিক সমীক্ষায় বলা হয়, বিশ্ব অর্থনীতির মন্দা কাটিয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্যের দ্রুত বৃদ্ধি বিভিন্ন দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ সৃষ্টি করছে। জ্বালনি তেলের মূল্যবৃদ্ধিকে মূল্যস্ফীতির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের প্রচেষ্টা সম্পর্কে সমীক্ষায় বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতির এ উর্ধমুখী ধারা রোধে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করে দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখার লক্ষ্যে খোলাবাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী বিক্রির ব্যবস্থা, বাজার মনিটরিং, মজুদদারি রোধসহ নানাবিধ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংক ব্যবসায় অতিরিক্ত তারল্য যাতে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে না পারে_ সে লক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকের নগদ জমা সংরক্ষণ হার (সিআরআর) ০.৫ শতাংশ বৃদ্ধি করে ৫.৫ শতাংশ এবং সংবিধিবদ্ধ জমার হার (সিএলআর) ০.৫ শতাংশ বৃদ্ধি করে ১৮.৫ শতাংশ করেছে।
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



