বিভ্রান্তি ও ষড়যন্ত্রের দোলাচলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শাহরিয়ার কবির
২০ শে জুলাই, ২০১০ সন্ধ্যা ৭:৪০
বিভ্রান্তি ও ষড়যন্ত্রের দোলাচলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার
শাহরিয়ার কবির
'৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ও প্রধান নাগরিক আন্দোলনের দাবি। যুদ্ধাপরাধী বলতে বাংলাদেশের আমজনতা মনে করেন মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত সকল অপরাধ_ '৭৩-এর আইনে বর্ণিত গণহত্যা, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, শানত্মির বিরম্নদ্ধে অপরাধ, জেনেভা কনভেনশনের লঙ্ঘন ইত্যাদি। সাধারণ মানুষ রাজাকারকেও যুদ্ধাপরাধী মনে করেন। মন্ত্রীরা যখন বলেন আমরা যুদ্ধাপরাধের বিচার করব না, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করব তখন মানুষ বিভ্রানত্ম হন। এর পাশাপাশি বিচার নিয়ে আগ্রহী আন্দোলনকারীদের ভ্রূকুঞ্চিত হয়। কোন অপরাধে কার বিচার কীভাবে কতদিনে হবে এসব বিষয়ে মনত্মব্য করবার এখতিয়ার কার_মন্ত্রীদের না ট্রাইব্যুনালের? ট্রাইব্যুনাল তো মন্ত্রণালয়ের অধীন সরকারি কোন সংস্থা নয়!
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলন ১৯৯২ সালের জানুয়ারিতে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে সংগঠিতভাবে সূচিত হয়েছে বটে, তবে দাবি উচ্চারিত হয়েছে ১৯৭২-এর মার্চে। আজকের প্রজন্মের জানবার কথা নয়_সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে রাজপথে প্রথম যে মিছিল নেমেছিল সেটি ছিল '৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে। ১৭ মার্চ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জমায়েত থেকে মিছিল শুরম্ন হয়েছিল, শেষ হয়েছিল বঙ্গভবনে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিকট স্মারকপত্র প্রদানের মাধ্যমে। কোন সংগঠনের ব্যানারে নয়, মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্বজন এই মিছিলে অংশগ্রহণ করেছিলেন, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তাঁরা কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। সেই থেকে রাসত্মায় আছি_৩৮ বছর কেটে গেছে বিচারের অপেক্ষায়।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহের উদ্যোগ প্রথম গ্রহণ করেছিল সৈয়দ নজরম্নল-তাজউদ্দীন নেতৃত্বাধীন মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকার। মন্ত্রিপরিষদ সচিব এইচটি ইমাম '৭১-এ পাকিসত্মানী হানাদার বাহিনী এবং তাদের সহযোগীদের গণহত্যা, নির্যাতন, লুণ্ঠন, গৃহে অগি্নসংযোগ, অপহরণ প্রভৃতি তদনত্ম করে প্রতিবেদন পাঠাবার নির্দেশ দিয়েছিলেন জেলা ও থানা পর্যায়ের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের। বঙ্গবন্ধু '৭২-এর ২৪ জানুয়ারি দালাল আইন প্রণয়ন করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আরম্ভ করেন। এই বিচারের সমস্যা ছিল প্রচলিত ফৌজদারি আইনে। ১৮৯৮ সালে প্রণীত ফৌজদারি কার্যবিধিতে গণহত্যা, মানবতার বিরম্নদ্ধে অপরাধ, শানত্মির বিরম্নদ্ধে অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের বিচারের কোন সুযোগ নেই। এসব অপরাধ আইনশাস্ত্রে সংজ্ঞায়িত হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নাৎসি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য গঠিত 'আনত্মর্জাতিক সামরিক ট্রাইবু্যনাল' যা নুরেমবার্গ ট্রাইবু্যনাল নামে পরিচিত তার নীতি প্রণয়নের সময়। এসব অপরাধে হিটালারের সরকার, দল ও বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিচার ও শাসত্মি হয়েছিল। একই নীতি অনুসৃত হয়েছে জাপানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময় টোকিও ও ম্যানিলা ট্রাইবু্যনালে।
ফৌজদারি আইনে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরম্নদ্ধে অপরাধের বিচার সম্ভব নয় বলেই বঙ্গবন্ধুর সরকার ১৯৭৩ সালের ২০ জুলাই এসব অপরাধের জন্য দায়ী সংগঠন, বাহিনী ও সহযোগীদের বিচারের জন্য 'আনত্মর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবু্যনালস) আইন' প্রণয়ন করেন। ভবিষ্যতে কেউ যাতে এই আইন বাতিল বা চ্যালেঞ্জ করতে না পারে তার জন্য এটি প্রণয়নের আগে সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে।
১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর সহযোগীদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে দালাল আইন বাতিল করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করে, তাদের কারামুক্ত করে দল করার অধিকার দিয়েছিলেন বটে_ '৭৩-এর আইন বাতিল করতে পারেননি, এটি সংবিধানের দ্বারা সুরক্ষিত হওয়ার কারণে। ১৯৯১-এর ডিসেম্বরে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে সমঝোতার সুযোগে জামায়াতে ইসলামী যখন সংবিধান লঙ্ঘন করে শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধী ও পাকিসত্মানী নাগরিক গোলাম আযমকে দলের আমির ঘোষণা করে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম যৌক্তিক কারণে বিক্ষুব্ধ হয়েছিল। এরই পরিপ্রেৰিতে বিশেষ ট্রাইবু্যনালে গোলাম আযমসহ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং তাদের রাজনীতি নিষিদ্ধকরণের দাবিতে গঠিত 'একাত্তরের ঘাতক দালাল নিমর্ূল কমিটি।' এরপর শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে সর্বদলীয় '... জাতীয় সমন্বয় কমিটি' গঠিত হয়েছে, যুদ্ধাপরাধের দায়ে গোলাম আযমের প্রতীকী বিচার অনুষ্ঠিত হয়েছে গণআদালতে, তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ পর্যনত্ম সর্বসত্মরের মানুষ এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।
১৯৯২-এর ২৬ মার্চ গণআদালতে গোলাম আযমের বিচার অনুষ্ঠানের পরদিন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া আমাকে ও নাসিরউদ্দিন ইউসুফকে তাঁর দফতরে ডেকেছিলেন। বলেছিলেন, গোলাম আযমের বিরম্নদ্ধে যুদ্ধাপরাধের কোন তথ্যপ্রমাণ যদি আমাদের হাতে থাকে আমরা আদালতে কেন যাচ্ছি না, কেন গণআদালত করে আইন নিজেদের হাতে তুলে নিচ্ছি। আমরা বলেছি ফৌজদারি আইনে, ফৌজদারি আদালতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কোন সুযোগ নেই বলেই এর জন্য '৭৩-এ বিশেষ আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। এই আইন অনুযায়ী সরকারকে ট্রাইবু্যনাল গঠন করতে হবে, মামলার বাদীও হতে হবে সরকারকে। আর গণআদালত আনত্মর্জাতিক রীতিসম্মত জনগণের প্রতিবাদ ও ক্ষোভ জ্ঞাপনের অভিব্যক্তি, গণআদালতের অর্থ আইন হাতে তুলে নেয়া নয়। ১৯৯২-এর খালেদা জিয়া ২০০১-০২-এর মতো জামায়াতপ্রেমে অন্ধ স্বৈরাচারিণী ছিলেন না। গণআদালত আয়োজনের জন্য আমাদের বিরম্নদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা করেছিলেন, ২০০২-০৩-এর মতো রাষ্ট্রদ্রোহী বানিয়ে জেলে নিয়ে নির্যাতন করেননি।
সেই থেকে বার বার বলছি, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে হবে '৭৩-এর আইনে বিশেষ ট্রাইবু্যনালে, কোন অবস্থায় প্রচলিত আইনে নয়। নিমর্ূল কমিটি গঠনের পর থেকে শুধু বিএনপি নয় জামায়াতও চাইছে আমরা যেন বিশেষ ট্রাইবু্যনালে না গিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য প্রচলিত আদালতে যাই। তারা এটা ভালভাবেই জানে ফৌজদারি আইনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্ভব নয়। ড. ফখরম্নদ্দীন আহমেদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কয়েকজন কর্তাব্যক্তি যখন বললেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হওয়া উচিত এবং ভুক্তভোগীদের কেউ যদি মামলা করেন সরকার তাদের সহযোগিতা করবে। তখন কিছু শহীদ পরিবারের সদস্য আপনজনের হত্যার জন্য থানায় বা আদালতে গিয়ে মামলা করেছেন। আবার কেউ কেউ পরিচিতি লাভের আশায়ও মামলা করেছেন। কেরানীগঞ্জে একজন মুক্তিযোদ্ধা হত্যার জন্য জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের অভিযুক্ত করে জনৈক মুক্তিযোদ্ধার মামলা দায়ের এরকমটি মনে হয়েছে। এই সুযোগে জামায়াতের কিছু লোকও '৭১-এর হত্যা, নির্যাতন, লুণ্ঠন ও গৃহে অগি্নসংযোগের দায়ে জামায়াত নেতাদের বিরম্নদ্ধে মামলা করেছে। এমনকি ছাত্রশিবিরের এক প্রাক্তন কর্মী অস্ট্রেলিয়ার এক আদালতে পাকিসত্মানী হানাদার বাহিনী এবং তাদের সহযোগীদের বিরম্নদ্ধে '৭১-এর গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে মামলা করে খবরের কাগজে ঝড় তুলেছিল। কেউ কেউ তখন আমাদের কটাক্ষ করে এমন কথাও বলেছিলেন, এত বছর আন্দোলন করে আমরা কিছুই করতে পারিনি যা অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী এক বাঙালী যুবক করে দেখিয়েছে। এই যুবকও উত্তেজিত ও উচ্ছ্বসিত হয়ে আমাকে ফোন করে বলেছিল আমরা যা পারিনি ও তা করেছে, আমাদের কাছে যা তথ্যপ্রমাণ আছে যেন ওকে পাঠাই। আমি ওকে নিরম্নৎসাহিত করে বলেছি মামলা আমলে নেয়া না হলে জামায়াত এর সুযোগ নেবে। ওকে নিবৃত্ত করতে পারিনি, আদালত মামলা গ্রহণ করেনি। পরে শুনেছি সেই যুবকই নাকি জালিয়াতির মামলায় আসামি হয়েছিল সেখানে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে যখন বিভিন্ন থানা ও আদালতে জ্ঞাত ও অজ্ঞাতনামাদের নামে '৭১-এর হত্যা, নির্যাতন ও ধ্বংসের জন্য মামলা নিয়মিত বিষয়ে পরিণত হয়েছিল এবং আমাদের বন্ধুদের কেউ কেউ ঘটা করে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন_ তখন বিচারপতি কেএম সোবহান বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন, '৭১-এর যুদ্ধকালীন অপরাধের জন্য প্রচলিত আদালতে মামলা দায়ের করার জন্য আমরা বারণ করছি। আমাদের নিষেধ উপেক্ষা করে কেউ যদি মামলা করেন তাকে আমরা জামায়াতের দোসর হিসেবে চিহ্নিত করতে বাধ্য হবো। এতে আমাদের বন্ধুরা নিবৃত্ত হয়েছিলেন বটে, জামায়াতকে পারা যায়নি। গত তিন বছরে দেশের বিভিন্ন থানায় জামায়াতের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতাদের নামে কয়েকশ' মামলা দায়ের করা হয়েছে।
২০০৮-এর নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীনে মহাজোট যে অভূতপূর্ব বিজয় অর্জন করেছে তার প্রধান কারণ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতি অঙ্গীকার। মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর জাতীয় সংসদে যুদ্ধাপরাধীদের দ্রম্নত বিচারের জন্য সর্বসম্মত প্রসত্মাবও গৃহীত হয়েছে। প্রথমে সরকারের শীর্ষ নেতারা জাতিসংঘের সহযোগিতায় বিচারের কথা বলেছিলেন। আমরা বলেছি যে, সব দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য নিজস্ব আইন বা আদালত নেই তারা জাতিসংঘের সহযোগিতা চাইতে পারে_আমাদের একটি অসাধারণ আইন রয়েছে, অত্যনত্ম মেধাসম্পন্ন বিচারক, আইনজীবী ও তদনত্মকারী রয়েছেন; আমাদের জাতিসংঘে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের প্রসত্মাব সরকারের নীতিনির্ধারকরা ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন।
সরকারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের কিঞ্চিৎ অবনতি ঘটেছিল ট্রাইবু্যনালের স্থান নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে সরকারকে সহযোগিতার জন্য বিচারপতি মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানীর নেতৃত্বে একটি নাগরিক কমিশন গঠন করেছিলাম, বিচারের ক্ষেত্রে করণীয় সম্পর্কে আইনমন্ত্রীকে আমাদের সুপারিশ লিখিতভাবে জানিয়েছিলাম ২০০৯-এর ১৩ ফেব্রম্নয়ারি। এতে আমরা বিচারের স্থানের জন্য পুরনো হাইকোর্ট ভবন নির্বাচনের প্রসত্মাব করেছিলাম। পরে জানলাম এই ভবনে নয়, আবদুল গণি রোডের একটি টিনের চালের মর্চেপড়া ছোট বাড়িতে এই বিচার হবে। এ নিয়ে হইচই করে কর্তাদের টনক নড়াতে না পেরে বাধ্য হয়ে গত ডিসেম্বরে আমরা প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছিলাম। শেষ পর্যনত্ম প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আমাদের প্রসত্মাবিত পুরনো হাইকোর্ট ভবনকেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য নির্বাচন করা হয়।
পরে ঝামেলা বেধেছিল ট্রাইবু্যনালের প্রধান তদনত্ম কর্মকর্তা হিসেবে '৭১-এ পাকিসত্মানী সামরিক জানত্মা ও জামায়াত সমর্থক আবদুল মতিনের নিয়োগকে কেন্দ্র করে। আমরা তার নিয়োগ বাতিলের দাবি করায় সরকারের কিছু কর্মকর্তা আমাদের ওপর অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। এরপর প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এবং আওয়ামী লীগের একজন প্রবীণ নেতা মতিনের নিয়োগ সম্পর্কে প্রশ্ন তোলায় তাকে যেতে হয়েছে, যদিও দুজন মন্ত্রী বলেছেন মতিনের নিয়োগ নাকি সঠিক ছিল। সমপ্রতি আমাদের পাটমন্ত্রী বলেছেন, নিজামীদের সঙ্গে তিনি নাকি একমত, তারা নাকি '৭১-এ যুদ্ধাপরাধ করেনি, তারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে! জামায়াত যদি মন্ত্রীর এই মনত্মব্য আদালতে তাদের অবস্থানের পক্ষে পেশ করে মামলা জেতার জন্য ব্যারিস্টার রাজ্জাকের প্রয়োজন হবে না।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য '৭৩-এর আইন অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত ট্রাইবু্যনাল গঠিত হলেও এটিকে এখনও পূর্ণাঙ্গ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ বলা যাবে না। এখনও যথেষ্ট সংখ্যক আইনজীবী ও তদনত্ম কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়নি, পুরনো হাইকোর্টের সামান্য অংশ ট্রাইবু্যনালকে বরাদ্দ করা হয়েছে, পুরো অংশজুড়ে এখনও সেখানে আইন কমিশনের দফতর রেখে দেয়া হয়েছে। ভবনের নিরাপত্তার কোন ব্যবস্থা নেই, এখনও ট্রাইবু্যনালের নিয়মাবলীর গেজেট প্রকাশ করা হয়নি। প্রয়োজনীয় পরিবহন, গবেষণাসামগ্রী, আসবাবপত্র কোন কিছুই নেই। এক কথায় বলা যায়, ট্রাইবু্যনালকে পুরীর মন্দিরের ঠুঁটোজগন্নাথ বানিয়ে রেখে দেয়া হয়েছে। ট্র্রাইবু্যনালকে কার্যক্ষম ও গতিশীল করার জন্য গত ৭ জুলাই (২০১০) আমরা এর সঙ্গে যুক্ত সরকারের সাতজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীকে চিঠি দিয়ে ৯টি প্রসত্মাব করেছিলাম, কোন কাজ হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। এ চিঠিতে আমরা একটি উদ্বেগের কথা বলেছিলাম। সমপ্রতি জামায়াতের পাঁচজন শীর্ষ নেতার গ্রেফতার এবং নিকট অতীতে বিভিন্ন থানায় দায়েরকৃত '৭১-এর অভিযোগ সংক্রানত্ম মামলার পুনরম্নজ্জীবন লক্ষ্য করে আশঙ্কা হচ্ছে, আমাদের আঠার বছরের আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের শহীদ পরিবার, নির্যাতিত, ভুক্তভোগী ও মুক্তিযোদ্ধাসহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক বাঙালীর সকল স্বপ্নের সলিল সমাধি রচিত হতে যাচ্ছে।
সরকার গত ২৯ জুন জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামী, সাধারণ সম্পাদক আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে গ্রেফতার করেছে। আদালতের নির্দেশ অগ্রাহ্য করে একটি মামলায় উপস্থিত না হওয়ার কারণে আদালত তাদের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে এবং তাদের যথারীতি গ্রেফতার করা হয়। পরদিন এই মামলায় তারা জামিন পেলেও তাদের বিরম্নদ্ধে পূর্বে দায়েরকৃত যেকটি মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়_অন্যতম হচ্ছে '৭১-এর হত্যা ও নির্যাতন। এরপর জামায়াতের অপর দুই প্রধান নেতা কামরম্নজ্জামান ও কাদের মোলস্নাকে সরাসরি '৭১-এর গণহত্যার মামলায় গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ ও মাঠপর্যায়ের তদনত্ম আরম্ভ হয়ে গেছে, যে বিষয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য গঠিত ট্রাইবু্যনালের তদনত্ম সংস্থা ও প্রসিকিউশন কিছুই জানেন না। বিএনপি ও জামায়াত চেয়েছিল '৭১-এর যুদ্ধাপরাধের বিচার যেন ফৌজদারি আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী হয়। ট্রাইবু্যনালকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ প্রদর্শন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিএনপি-জামায়াতের অভিপ্রায় অনুযায়ী '৭১-এর ঘাতকদের বিচার নিয়ে গেছে ফৌজদারি আদালতে।
জামায়াতের আবদুল মতিন ট্রাইবু্যনাল থেকে সরে যাওয়ার পর আমরা জানতে চেয়েছিলাম এই ব্যক্তিকে কে বা কারা কাদের সুপারিশে নিয়োগ দিয়েছেন এটা আমাদের জানা দরকার। শর্ষের ভেতর ভূত থাকলে সেই শর্ষে দিয়ে যেমন ভূত তাড়ানো যায় না, একইভাবে সরকার ও প্রশাসনে যদি যুদ্ধাপরাধীদের প্রকৃত দোসরদের অবস্থান যদি অব্যাহত থাকে সেই সরকার বা প্রশাসনের নিকট যুদ্ধাপরাধের বিচার আশা করা যায় না। '৭১-এর যুদ্ধকালীন অপরাধের জন্য যদি জামায়াত নেতাদের প্রচলিত আদালতে বিচার হয় এবং ফৌজদারি আইনের সীমাবদ্ধতার কারণে তারা যদি উপযুক্ত শাসত্মি না পান তার দায় প্রশাসনের ঘাপটি মেরে বসে থাকা জামায়াতীদের নয়, গোটা মহাজোট সরকারকে বহন করতে হবে। নিজামী-মুজাহিদ-সাঈদী-কামরম্নজ্জামান, কাদের মোলস্না ও অন্য জামায়াত নেতাদের যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রচুর লিখিত, চলচ্চিত্রিক, আলোকচিত্র ও তথ্যপ্রমাণ দেশে ও বিদেশে রয়েছে ঠিকই, তবে এদের বিচারের এখতিয়ার একমাত্র 'আনত্মর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবু্যনাল'-এর ফৌজদারি আদালতের নয়।
আমাদের জানা দরকার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আমাদের পুলিশের কর্মকর্তারা আইনকানুন কিছু না জেনেই কি জামায়াতের নেতাদের বিরম্নদ্ধে যুদ্ধকালীন অপরাধের মামলা দায়ের করেছেন? তারা কি আশা করেন রিমান্ডে নেয়া নিজামী, কামরম্নজ্জামান, কাদের মোলস্নারা গড় গড় করে বলে দেবেন '৭১-এ তারা কীভাবে এসব অপরাধ করেছেন? শুধু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অভিযুক্ত করছি কেন, আমাদের আইন প্রতিমন্ত্রীও তো বলেছেন যুদ্ধাপরাধীদের ধরা হয়েছে, বিচার শুরম্ন হয়েছে এবং এ বছরের ভেতর বিচার শেষও হয়ে যাবে। প্রতিমন্ত্রী সব জানেন, অথচ যেখানে বিচার হবে সেই ট্রাইবু্যনাল কিছুই জানে না।
যে আদালতে নিজামীদের '৭১-এর অপরাধের বিচারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে সেই আদালতের বিচারক এবং তদনত্মকারী কর্মকর্তাকে আমি তিরিশ লাখ শহীদ পরিবারের একজন প্রতিনিধি হিসেবে বিনীত আবেদন জানাতে চাই_আপনারা '৭৩-এর আনত্মর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবু্যনালস) আইনটি পড়ুন। দয়া করে বলুন, ফৌজদারি কার্যবিধিতে গণহত্যা, মানবতার বিরম্নদ্ধে অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের বিচারের কোন সুযোগ নেই, এর এখতিয়ার একমাত্র 'আনত্মর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবু্যনালের।' এক অপরাধে একজন ব্যক্তির দুবার বিচার করা যায় না। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ফৌজদারি আদালতে হলে নবগঠিত আনত্মর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবু্যনাল এবং মহাজোট সরকারের অঙ্গীকার মসত্ম প্রহসনে পরিণত হবে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বলব, ছাত্রলীগের মধ্যে শুধু শিবির ঢোকেনি, আওয়ামী লীগেও জামায়াত ঢুকেছে। এদের দলে রেখে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দূরে থাক আপনার এবং আমাদের রাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সম্পর্কে আমরা যারপরনাই শঙ্কিত। আপনার সরকারের সময়কালে আনত্মর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবু্যনাল যদি শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের অর্থবহ ও মানসম্পন্ন বিচার করতে না পারে_আর কখনও এই বিচার সম্ভব হবে না।
১৮ জুলাই ২০১০
১ . Click This Link
২. Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে জুলাই, ২০১০ সন্ধ্যা ৭:৪৩ | বিষয়বস্তুর স্বত্ত্বাধীকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...
সাচার বলেছেন:
বেটা শয়তানের প্রেতাত্মা আর কি বলবে। শয়তান যা বলতে বলে তাই বলে। নিজেকে শয়তানের কাছে সোর্পদ করে দিয়েছে।
লেখক বলেছেন: তথাকথিত বাংলাদেশ আন্দোলনের সমর্থকরা ইসলাম, পাকিস্তান ও মুসলমানদের দুশমন – গোলাম আযম – দৈনিক সংগ্রাম ১২ই আগস্ট, ১৯৭১
লেখক বলেছেন: http://www.genocidebangladesh.org/?page_id=246
লেখক বলেছেন: পাক সেনারা আমাদের ভাই, তারা জেহাদী চেতনায় উজ্জীবিত – মতিউর রহমান নিজামী – দৈনিক সংগ্রাম ৩রা আগস্ট, ১৯৭১
অন্তস্থ সায়ন্ত বলেছেন:
সাচার বলেছেন: বেটা শয়তানের প্রেতাত্মা আর কি বলবে। শয়তান যা বলতে বলে তাই বলে। নিজেকে শয়তানের কাছে সোর্পদ করে দিয়েছে। @সাচার...............
বিপ্লব৯৮৪২ বলেছেন:
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বলব, ছাত্রলীগের মধ্যে শুধু শিবির ঢোকেনি, আওয়ামী লীগেও জামায়াত ঢুকেছে। এদের দলে রেখে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দূরে থাক আপনার এবং আমাদের রাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সম্পর্কে আমরা যারপরনাই শঙ্কিত। আপনার সরকারের সময়কালে আনত্মর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবু্যনাল যদি শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের অর্থবহ ও মানসম্পন্ন বিচার করতে না পারে_আর কখনও এই বিচার সম্ভব হবে না। এইটুকুই বড় জ্ঞানী কথা ।
মুন্না_৯৭ বলেছেন:
সমপ্রতি আমাদের পাটমন্ত্রী বলেছেন, নিজামীদের সঙ্গে তিনি নাকি একমত, তারা নাকি '৭১-এ যুদ্ধাপরাধ করেনি, তারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে!ছাত্রলীগের মধ্যে শুধু শিবির ঢোকেনি, আওয়ামী লীগেও জামায়াত ঢুকেছে।
কৌতুক....... কৌতুক...... ব্যাপুক মজাদার খাবার..
ওরাকল বলেছেন:
এক্কেবারে ছেড়াবেড়া অবস্থা Click This Link এটা পড়লাম এই মাত্র।নিজেরা নিজেরাই লেগে গেছে
সরকার পুর ব্যাপারটাকে একটা সারকাসে পরিনত করে ছাড়বে মনে হচ্ছে
সামহোয়্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...














