somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্রধানমন্ত্রীর কাছে এক শহীদ জননীর [লে. সেলিম] খোলা চিঠি

০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০১০ রাত ২:২১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রধানমন্ত্রীর কাছে এক শহীদ জননীর খোলা চিঠি
সালেমা বেগম

শহীদ লে. সেলিম এবং ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির আহ্বায়ক ডা. এম এ হাসানের মা আমি সালেমা বেগম। সেই '৭১-এর মার্চে আমার ছেলেদের যুদ্ধে পাঠানোর পর বুকে যে কষ্ট ও দুচোখ ভরা যে কান্নার ভার জমেছিল তা এখনো তেমনই আছে।
এ পরিপ্রেক্ষিতে আপনাকে সবিনয়ে জানাতে চাই যে আমার ছেলে সেলিম ও আনিস যেমন '৬৯-এর আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিল, তেমনি '৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করার জন্য গ্রামে গ্রামে ছুটে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিল। সেলিম শুধু মেধাবী ছাত্রই ছিল না, সে ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বনামধন্য অ্যাথলেট এবং ছাত্রলীগের উজ্জ্বলতম ছাত্রনেতা। সে মনেপ্রাণে ছিল মুজিবভক্ত। অনেকটা তার কারণে আমাদের পুরো পরিবার বঙ্গবন্ধুর অনুসারী হয়েছিল।
২৫ মার্চ যখন কেউ রাস্তায় নামার সাহস করেনি, তখন অকুতোভয় সেলিম ও আনিস সেন্ট্রাল মেডিক্যাল স্টোরের পুলিশদের নিয়ে পাকিস্তানিদের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। ৩১ মার্চ তারা দ্বিতীয় ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দিয়েছে। জেনারেল সফিউল্লাহ নিশ্চিতভাবে স্বীকার করবেন যে তাঁর ব্যাটালিয়নে সবচেয়ে সাহসী ও উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিল সেলিম। ১৪ এপ্রিল লালপুর যুদ্ধ থেকে সে যে যাত্রা শুরু করে তা শেষ হয় বাংলাদেশের শেষ রণাঙ্গন মিরপুরে। মাঝে তেলিয়াপাড়া, হরষপুর, মুকুন্দপুর, ফুলগাজী, বেলোনিয়া, আখাউড়া যুদ্ধে সে অসামান্য সাহসিকতার পরিচয় দেয়। এসব কথা জেনারেল ভঁূইয়া, জেনারেল মোরশেদসহ সবাই স্বীকার করবেন।
দ্বিতীয় ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের 'ব্রাভো' কম্পানি কমান্ডার সেলিমকে স্বাধীনতার পরপরই রাষ্ট্রপতির গার্ড কমান্ডার পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস যে রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর অগোচরে দায়িত্বে থাকা অবস্থায় সেলিমকে তার কম্পানি থেকে বিচ্ছিন্ন করে মেজর মঈন ৩০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে মিরপুরে নিয়ে যান। দায়িত্বপরায়ণ সেলিম ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। কর্তব্যপরায়ণ তথা বীরযোদ্ধা সেলিম যুদ্ধের শুরুতেই ডান বুকে গুলিবিদ্ধ হয়। তার পরও সে পিছু হটেনি। অধঃস্তনদের ফেলে রেখে পলায়ন করেনি দেশের সম্মানের জন্য, অধঃস্তন সেনাদের প্রাণ রক্ষার জন্য সে যুদ্ধ চালিয়ে গেছে। নিজের জামা দিয়ে সেলিম বুক বেঁধেছে, কিন্তু সেনাদের ছেড়ে পিছু হটে আসেনি। সেই সেলিম তার সেনাদের নিয়ে নূরী মসজিদে জমায়েত হয়েছিল এবং পাকিস্তানি দলছুট সেনা ও বিহারিদের ওপর আক্রমণ করে কালাপানির ঢাল পর্যন্ত এসেছিল। তার অনেক সহযোগীকে পার করিয়ে দিলেও দুঃখজনকভাবে বুকের বিশাল ক্ষত নিয়ে জলা পার হতে পারেনি সেলিম। পরে সে যখন রক্তশূন্য হয়ে নির্জীব, তখন শত্রুসেনা তাকে আবারও আঘাত করে। ওই সময় সাহায্য পাওয়ার প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু তা হয়নি। বৃষ্টিস্নাত রাতে আধো জ্যোৎস্নার মাঝে সে ধীরে ধীরে মৃত্যুবরণ করে। তার সঙ্গে ৪১ জন সেনাসদস্য সেদিন শহীদ হয়েছিল।
মুক্ত হলো মিরপুর। মিরপুর মুক্তিদাতা লে. সেলিম মোহাম্মদ কামরুল হাসান এভাবেই শেষ করল নিজের জীবন। বিকেলের দিকে জীবিত সেনাদের নিয়ে কালাপানির ঢালের কাছে সে দাঁড়িয়েছে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে ফ্যাকাসে ও ক্লান্ত। সবাইকে উৎসাহ জুগিয়েছে বিল পার হয়ে ক্যান্টনমেন্টের দিকে যেতে। নিজে পানিতে নামেনি। বুকের ক্ষত পানিতে ডুবে যাবে এ কারণে। ক্লান্ত শরীরটা একটি গাছের আড়ালে রেখে একটা একটা করে গুলি চালাচ্ছিল ঘাতকদের দিকে। কভার ফায়ার দিয়ে সহযোদ্ধাদের সরে যেতে সাহায্য করছিল। হয়তো ভাবছিল Reinforcement আসবে। সেদিন রাতে মেঘে ঢাকা চাঁদ ছিল। ঝিরঝির করে বৃষ্টি ঝরছিল। হয়তো সেলিম আমার কথা, দেশের কথা, সহযোদ্ধাদের সাহায্যের কথা ভাবছিল। না, কেউ তাকে উদ্ধার করতে যায়নি। সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন মেজর মঈন ও কর্নেল সফিউল্লাহ। ওর প্রতীক্ষা কত দীর্ঘ হয়েছে জানি না। একসময় আকাশে ওই ফ্যাকাসে চাঁদের দিকে তাকিয়ে আমার চাঁদ বুঝি বিদায় নিয়েছে পৃথিবী থেকে। তখন ওর স্বপ্নে হয়তো ওর ভাই এবং অজস্র অশ্বারোহী।
এ অক্ষমতা ঢাকার জন্যই হয়তো তাঁর কমান্ডার মেজর মঈন (পরে জেনারেল) ও জেনারেল সফিউল্লাহ তাদের মিরপুরে মাটির নিচে চাপা দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ইতিহাস কথা কয়, তাই '৯৯-এ হাড়গোড় ভেসে ওঠে। মিরপুর মুক্তিদাতা সেলিমকে কোনোভাবে সম্মানিত করার এতটুকু উদ্যোগ নেওয়া হয়নি সামরিক বাহিনী থেকে। রাষ্ট্রীয় কর্তব্য পালনের জন্য, দেশপ্রেমের জন্য, নতুন দেশ ও সেনাদের সম্মানের জন্য যে জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়েছে তার এতটুকু মূল্যায়ন হয়নি।
এ পরিস্থিতিতে ৮৬ বছর বয়সে আমি শহীদের মা আপনার কাছে সবিনয় নিবেদন করছি, সেলিমকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মানিত করার জন্য। যেমন করা হয়েছে কর্নেল জামিলকে। এটা আমার প্রাণের দাবি।
প্রাসঙ্গিকভাবে আপনি '৭১-এর খেতাবসংক্রান্ত Tampering বিষয়ে তদন্তের ব্যবস্থা নেবেন_এটা আমার সবিনয় প্রার্থনা। এ-সংক্রান্ত কিছু প্রমাণ আমার ছেলে ডা. এম এ হাসান ও জনৈক লে. কর্নেল লুৎফুল হকের কাছে আছে। তাহলেই অনেক অফিসারের অপতৎপরতার তথ্য বেরিয়ে আসবে। সাধারণ মানুষসহ অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা অফিসারের বীরত্বের যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি আজও। এ মূল্যায়নের সময় এখনই।
প্রসঙ্গক্রমে, অতি বিনয়ের সঙ্গে বলতে চাই যে একজন মানুষ জীবনের চেয়ে আর কী বেশি দিতে পারে দেশের জন্য। যে টগবগে মেধাবী তরুণ জেনে-বুঝে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করল এবং সব স্বপ্ন বিসর্জন দিল, সে কী পেল এই দেশ থেকে! আর আমি মা হয়ে আমার দুই সন্তানকে যুদ্ধে ঠেলে দিয়ে কী পেলাম! ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে আমার ছোট মেয়ে সীমাহীন আর্থিক কষ্টের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর মায়া ছেড়েছে ২০ বছর আগে। আমার আর এক সন্তান ডা. এম এ হাসান আর্সেনিক দূষণ থেকে শুরু করে অ্যাজমা, এইডস-সংক্রান্ত গবেষণা করেছে দিনের পর দিন এবং যুদ্ধাপরাধের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে গিয়ে জীবনের সব সময় ও সম্পদ বিলিয়ে দিয়েছে। এর পরও আমি এবং আমরা কোনো দিন কারো কাছে কিছু চাইনি। জীবনে শুধু সম্মান চেয়েছি। দেশের বিজয় চেয়েছি। মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নগুলো ধরাছোঁয়ার মধ্যে আনতে চেয়েছি, '৭১-এর মূল্যবোধকে পুনর্নির্মাণ করতে চেয়েছি।
রাষ্ট্র ও আপনার শুভ কামনা করে আপনার ব্যক্তিগত সুস্বাস্থ্য কামনা করি।
লেখক : শহীদ লে. সেলিমের মা

Click This Link
Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০১০ রাত ২:৩০
৫টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×