somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

১৯৭৮ সালে ঢাকা পৌরসভার নাম পাল্টে করা হয় ঢাকা পৌর কর্পোরেশন। এমনকি মিরপুর ও গুলশান ঢাকা পৌর এলাকার বাইরে দু’টি আলাদা পৌরসভা ছিল।

০৫ ই ডিসেম্বর, ২০১১ সকাল ১১:১৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ঢাকা ভাগের বিভ্রান্তি
ডিসেম্বর ৩, ২০১১
98Share

plato-fবর্তমান ঢাকা সিটি কর্পোরেশন- ডিসিসি ভেঙে উত্তর ও দক্ষিণ দু’টি সিটি কর্পোরেশন করায় প্রবল হৈচৈ শুরু হয়েছে। গত ২৯ নভেম্বর সংসদে স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) সংশোধন বিল পাস হয়।

সংসদের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ইতোমধ্যে এর প্রতিবাদে হরতাল ডেকেছে। বিদায়ী মেয়র সাদেক হোসেন খোকা আদালতে ঠুকে দিয়েছেন মামলা । আদালত সরকারকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে। ডিসিসি ভাগের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে অনেক কলামও লেখা হচ্ছে। একটি দৈনিকে শেখ হাসিনাকে ‘উন্মাদ’ বলে তার প্রধানমন্ত্রীত্ব খারিজ করার আহ্বান জানিয়েছেন এক কলাম লেখক! বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতাদের একজন ড. কামাল হোসেন খোকার মামলার শুনানির মন্তব্যে- এই বিভাজন ‘সংবিধানের ৫ অনুচ্ছেদকে আঘাত করেছে’ বলে খবর বেরিয়েছে!

সাদেক হোসেন খোকা সাংবাদিকদের বলেছেন, “সংবিধান অনুসারে ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী। এভাবে ভাগ করার কোনো যৌক্তিকতা ছিল না।” খোকার আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস সবুজ বলেছেন, “বাংলাদেশের রাজধানী আইন দ্বারা নির্ধারিত। সাধারণ আইন দ্বারা এর পরিবর্তন করা যায় না। এজন্য আগে সংবিধান সংশোধন করতে হবে।”

মামলার শুনানিতে ড. কামাল হোসেন বলেছেন, “সংবিধান বলছে না- উত্তর বা দক্ষিণ ঢাকা রাজধানী হবে। সংবিধান বলছে, ঢাকা রাজধানী হবে।”

বিরোধিতাকারীদের বক্তব্যের মূল কথা- সংবিধানে উল্লেখিত রাজধানী ঢাকাকে অসংবিধানিকভাবে বিভক্ত করেছে সরকার।

সপ্তম শতক থেকেই ঢাকার অস্তিত্ব। মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে ১৬০৮ সালে জাহাঙ্গীরনগর নামে প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এই ঢাকা। বিরোধীদের প্রচারে মনে হচ্ছে, দেশের রাজধানী ঢাকাকেই বুঝি সরকার দ্বি-খণ্ডিত করে ফেলেছে। নগরবাসীও তাই বিচলিত। কিন্তু ‘রাজধানী ঢাকা’ আর ‘ঢাকা সিটি কর্পোরেশন-ডিসিসি’ এক বিষয় কি না সেটি ঘোলা হয়ে গেছে বড় বড় সংবিধান বিশারদদের হৈচৈ-এ।

ঢাকার পৌর ইতিহাস বেশ পুরোনো। ১৮৬৪ সালের পহেলা অগাস্ট ঢাকা পৌর কমিটি প্রতিষ্ঠিত হয়। জেলা পৌর উন্নয়ন আইন অনুযায়ী গঠিত হয় ঢাকা পৌর কমিটি। ১৮৮৪ সালে আইন পরিবর্তন করে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়।

দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালে ঢাকা পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক রাজধানী হয়। ১৯৬০ সালে অর্ডিন্যান্স জারী করে এই পৌরসভার আগের সব আইন বাতিল করা হয়। বাতিল হয়ে যায় নির্বাচন পদ্ধতিও। পৌর চেয়ারম্যান নিয়োগের ক্ষমতা চলে যায় সরকারের হাতে। শহরকে ২৫টি ইউনিয়নে ভাগ করা হয়। পরে ’৬৪ সালে তা বাড়িয়ে করা হয় ৩০টি। স্বাধীন বাংলাদেশে একে পঞ্চাশটি ওয়ার্ডে ভাগ করা হয়। ১৯৭৭ সালে পৌরসভা অর্ডিন্যান্স জারী করে সে বছরই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

বাংলাদেশের সংবিধানের ‘প্রজাতন্ত্র’ অংশের পঞ্চম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- “১. প্রজাতন্ত্রের রাজধানী হবে ঢাকা ২. রাজধানীর সীমানা আইন দ্বারা নির্ধারণ করা হবে।”

পত্রিকার সংবাদ অনুযায়ী ড. কামাল হোসেন শুনানিতে বলেছেন, ডিসিসি ভাগের জন্য সম্প্রতি পাশ হওয়া বিলটি এই ধারাকে আঘাত করেছে। লক্ষ্য করলেই দেখা যায়, সংবিধানে রাজধানীর নাম বলা হয়েছে ‘ঢাকা’। এই ঢাকা ‘জেলা ঢাকা’ নাকি ‘শহর ঢাকা’? এমন কোনো মন্তব্য নেই। বলা আছে- আইন দিয়ে এর সীমানা ঠিক করা হবে। তবে, এমন কোনো সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানা নেই।

আভিধানিকভাবে রাজধানী বলতে শহরকে ধরে নিলেও প্রশ্ন আসে ‘শহর’ আর ‘সিটি কর্পোরেশন’ এলাকা এক বিষয় কিনা? তথ্যের দিকে তাকালে সেটি স্পষ্ট হয়ে যায়।

প্রথমত স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী হিসেবে ঢাকা মর্যাদা পাবার সময় ঢাকা সিটি কর্পোরেশন ছিল না। ১৯৭৮ সালে ঢাকা পৌরসভার নাম পাল্টে করা হয় ঢাকা পৌর কর্পোরেশন। এমনকি মিরপুর ও গুলশান ঢাকা পৌর এলাকার বাইরে দু’টি আলাদা পৌরসভা ছিল। তবে তখনও এসব এলাকা রাজধানীর অংশই ছিল। ’৭৮ সালেই ওই দু’টি পৌরসভাকে ঢাকা পৌর কর্পোরেশনে একীভূত করা হয়। আজকের ডিসিসি ভাগকে যারা ‘অসাংবিধানিক’ বলতে চাইছেন, তাদের কাছে প্রশ্ন- ’৭৮ সালে ঢাকা পৌরসভার আওতা বাড়িয়ে মিরপুর ও গুলশানকে একীভূত করে ‘ঢাকা সিটি কর্পোরেশন’ করাও কি তাহলে অসাংবিধানিক ছিলো?

আজ যারা এসব বলছেন সেদিনও তারা বহাল তবিয়তে ছিলেন। কিন্তু এই প্রশ্ন তখন তোলেন নি। কারণ বিষয়টি প্রকৃতপক্ষে সংবিধানের ‘রাজধানী’ প্রসঙ্গের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।

বিষয়টি আরো স্পষ্ট হবে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) তথ্যে। পঞ্চাশের দশকে ৮২০ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে ছিলো ঢাকা শহরের পরিকল্পনা। আর ’৯৫ সালে ১ হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার জুড়ে রাজধানী শহরের পরিকল্পনা নিয়েছে রাজউক। ঢাকা ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানের (ড্যাব) ১ হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকার উত্তরে গাজীপুর পৌরসভা, দক্ষিণে ধলেশ্বরী নদী, পশ্চিমে বংশী-ধলেশ্বরী আর পূবে শীতলক্ষ্যা নদী। এর সঙ্গে কোনো মিল নেই ডিসিসি এলাকার।

১৯৯০ সালে ‘ঢাকা মিউনিসিপাল কর্পোরেশন’র নাম বদলে রাখা হয় ঢাকা সিটি কর্পোরেশন। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্যে সিটি কর্পোরেশনের আয়তন বর্তমানে ৩৬০ বর্গকিলোমিটার। এমন কি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের দায়িত্বের এলাকাটিও ডিসিসির আয়তনের চাইতে বড়।

তার মানে রাজধানী ঢাকা, ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন প্রতিটি বিষয়ই স্বতন্ত্র প্রসঙ্গ।

সংবিধানে উল্লেখিত ‘একটি আইনের দ্বারা রাজধানীর সীমা’ নির্ধারিত থাক বা না থাক, দিন দিন শহর বেড়েই চলেছে। এখন ঢাকা বলতে যা বোঝায়, ’৭২ সালে সংবিধান গৃহিত হওয়ার সময় এর অনেক এলাকাই শহর হিসেবে পরিচিত ছিলো না।

তবে কি এই বর্ধিত শহর রাজধানী নয়? বা ’৭৮ এর আগে মিরপুর ও গুলশান পৌর এলাকা রাজধানীর অংশ ছিল না?

সরকার বলছে, তারা ডিসিসি ভাগ করেছে আর বিরোধীরা বলছে, সরকার রাজধানী ভাগ করেছে। ঘোলা জলে একটা হরতালও ডাকা হয়েছে। ডিসিসি ভেঙে দুটো করা নাগরিক সেবা বাড়ানোর জন্য সুবিধাজনক কি না সে আলোচনা ভিন্ন প্রসঙ্গ। কিন্তু রাজধানী ভাঙার ধুয়ো তুলে যে জনদুর্ভোগ চাপানো হলো তার কি কোনো হেতু আছে?

মুজতবা হাকিম প্লেটো: সাংবাদিক।

৯টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×