বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ভারতের তাচ্ছিল্যপূর্ণ এবং আগ্রাসী আচরণের প্রতিবাদে ব্লগার ও ফেবু ব্যাবহারকারীরা জেগে উঠেছে। তাদের জেগে উঠার সাথে সহমত জ্ঞাপন করেই এই পোস্টটির অবতারনা। সীমান্ত হত্যা ও অত্যাচার নিয়ে আমাদের দীর্ঘদিনের পূঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণটি ঘটিয়েছে সাম্প্রতিক বের হওয়া বিএসএফ-কর্তৃক এক গরু-ব্যাবসায়ী অত্যাচারিত হবার ভিডিও চিত্রটি। হঠাত আমাদের জেগে উঠার মানে এমনও নয় যে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বি,এস,এফ এর আগে এইমাত্রার অত্যাচার করেনি বা হঠাত করেই এই সীমান্ত এতটা প্রাণনাশী হয়ে উঠেছে। বরংচ, সীমান্তে ভারতীয় বাহিনীর এই আগ্রাসী আচরণের চর্চাটি অনেক পুরোনো এবং প্রাণহানিকর। বিগত ১০-১২ বছরের পরিসংখ্যান অন্তত তাই বলে—

যদিও মানবাধিকার সংস্থা “অধিকার” [১] থেকে সংগৃহীত এই তথ্যের সাথে ভারতীয় বি,এস,এফ-এর তথ্যের অসামঞ্জস্যতা আছে [২], তবে এই মুহুর্তে সেটা বিবেচ্য নয়। প্রতিনিয়ত যেখানে লাশ পরে, কারণে-অকারণে মানুষ অমানবিক অত্যাচারের শিকার হয়, সেখানে ৫ জন নাকি ১৫ জন এই আলোচনা আদৌ গুরুত্বপূর্ণ নয়। সত্য হচ্ছে— সেখানে এক জন হলেও লাশ পড়ছে ভারতীয় বি,এস,এফ-এর হাতে, নির্বিচারে অত্যাচার করা হচ্ছে বাংলাদেশীদের উপর। আইনের চোখে অপরাধী তারা, কিন্তু অপরাধীকে ন্যাংটা করে প্রহার কোন আইনের আওতাতেই পড়েনা। আইন বহির্ভূত এসব বর্বরতার কথা ব্যাপকভাবে উঠে এসেছে গার্ডিয়ান ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর রিপোর্টেও [৩]।
[ নোটঃ স্বাধীনতার সাড়ে ৩ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের হঠাত “ইসলামী প্রজানতন্ত্র বাংলাদেশ” হিসেবে উত্থান, সপ্তাহব্যাপী মধুচন্দ্রিমা ও পুণরায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে ফিরে যাওয়া, এবং ১৯৭৫ এর ক্যু পরবর্তী বাংলাদেশ সরকারগুলোর তীব্র ভারতবিরোধী ও চরম পাকিস্থানপন্থী চিন্তাধারার চাষাবাদ ও পৃষ্ঠপোষকতা, বাংলাদেশ-ভারতের বিদ্যমান সম্পর্কের বৈরীতা অংশে একজন বাংলাদেশী হিসেবে আমাকেও আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। তবে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বৈরীতা তৈরীর পিছে আমাদের দায়, অবদানটুকু বা আত্মসমালোচনার দিকগুলো এই পোস্টের আওতায় পড়েনা। যত বৈরী সম্পর্কই থাকুক শেয়াল-কুকুরের মতন সীমান্তে অনবরত নাগরিকদের প্রাণহানি ও বিচারহীন অত্যাচার মেনে নেওয়া যায়না। ]
সমকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতা:
সীমান্তে বি,এস,এফ-এর হাতে মৃত্যুর বিগত দশ বছরের পরিসংখ্যান তুলে ধরবার পাশাপাশি উপরোক্ত ছবিটি যুক্ত করবার আলাদা একটি উদ্দ্যেশ্য আছে। ব্যাপারটা খোলাশা করা যাক—
"বর্তমান রাজনীতিতে ৪-দলীয় বিরোধী শিবির কট্টর ভারত বিরোধী, তারা সীমান্ত হত্যা ও অত্যচারের বিরুদ্ধে বিশেষ পদক্ষেপ নেবার ক্ষমতা রাখে"— এমন উত্তপ্ত বক্তৃতাবাজি করে ভোক্তা পর্যায়ের এই পণ্যবর্জনের আন্দোলনে ক্ষমতার রাজনীতির ঘোড়া জুড়ে দেবার শঙ্কাটি উঁকি দিচ্ছে মনে। রাজনৈতিক লাভের বশবর্তী হয়ে অনেক সুযোগ সন্ধানীই চাইতে পারেন (বিশেষ করে ছাগুজনপদ, রাজাকারপ্রেমী ছুপাছাগুগণ এবং বর্তমানে তাদের উপর প্রকাশ্যে ছাতাধরে থাকা বিরোধী দল বি,এন,পি) বি,এস,এফ ও ভারতের প্রতি ক্ষুব্ধ বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠির ক্ষোভকে ফুঁসলিয়ে রাজপথে নামিয়ে আনতে। অথচ এসব ছাগুদের উদ্দ্যেশ্য একটাই— রাজপথকে অস্থির করে চলমান বিচার প্রক্রিয়াকে থামিয়ে দিয়ে ছাগুদের তাত্ত্বিক আব্বা গোলাম আজম ও অন্যান্য রাজাকার-আলবদরদের জেল থেকে বের করে আনা। আর সেই প্রচেষ্টায় ক্রমাগত ঘি ঢেলে যাচ্ছেন ম্যাডাম জিয়া ও তার নেতা-নেত্রীরা।
ছাগুদের বর্তমান আন্দোলন স্টাইল দেখলে এই শঙ্কা আসলেই অমূলক নয়। এসব বিবেচনায় রেখেই আমাদের রাজনীতিতে ভারতবিরোধী ধারার এই অংশের অতীত কিছু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাঝে “উত্তপ্ত ভারতবিরোধীতার” উপস্থিতি নিয়ে সামান্য আলোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছি। এতে করে অন্তত এদের ভন্ডামী কিছুটা বোঝা যাবে—
৯০ পরবর্তী বাংলাদেশের বিরোধী দলগুলোর ভারত বিরোধীতা অনেকটা নারকেলের মতন মনে হয় আমার— বাইরে থেকে টোকা দিয়ে প্রচন্ড শক্ত মনে হলেও আসলে ভেতরে ভেতরে যথেষ্ঠ নরম ও শাঁস যুক্ত। উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে “ফেনী পর্যন্ত ভারত হয়ে যাবে” এমন তীব্র ভারত বিরোধী উক্তিকারী রাজনৈতিক জোটের ২০০১ এর নির্বাচন ও নির্বাচন পরবর্তী সময়ের কিছু ভারত “বিরোধীতা চর্চার” নমুনা—
১। আমেরিকার ইউনোকল কোম্পানির প্রস্তাবিত ভারতে গ্যাস রফতানী (সিলেট বিবিয়ানা থেকে দিল্লি পর্যন্ত পাইলপাইনে) ইস্যুতে টেক্সাস অস্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর এনার্জি ইকোনোমিক্সের প্রতিবেদনে ২০০১ সালে তদানীন্তন চার-দলীয় জোট সরকার সম্মন্ধে মূল্যায়ন [৪]—
There was some indication that the new government of Prime Minister Khaleda Zia would be more favorably disposed to natural gas exports to India, and it created a panel in December 2001 to study the issue and recommend a decision.
(There was some indication ) ইন্ডিকেশান বা আভাস ২০০১ এর নির্বাচনের পরের না আগের (?) সেই তর্কে না গিয়েই এখান থেকে তদানীন্তন সরকারের শুরুর দিককার সময় ভারতের সাথে আপাত “বিরোধহীন” মনোভাবের চরিত্র ফুটে উঠে। এহেন বিরোধহীনতার সম্পর্কই যদি হবে, তবে রাজপথে বা পল্টন ময়দানে অথবা বায়তুল মোকাররম উত্তর-গেটে দাঁড়িয়ে ভারত নিয়ে হেন-করেঙ্গা, তেন-করেঙ্গা টাইপ বক্তৃতাবাজি করে জনগণকে উত্তেজিত করাটা কি আসলেই ভন্ডামীর পর্যায়ে পড়েনা? যাহোক, গ্যাস রফতানীর ইস্যুতে নির্বাচনের পূর্বের অবস্থান বজায় রেখে যথারীতি তদানীন্তন বিরোধী দল শেখ হাসিনার (এই মুহুর্তে সরকারে থেকে আবার শেখ হাসিনা ভারতের বিরুদ্ধে তেমন উচ্চবাচ্য করছেননা) নেতৃত্বে ভারতে গ্যাস রফতানী সংক্রান্ত যেকোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের তীব্র বিরোধীতা করেন—
leading the anti-gas sale lobby is the awami league. party chief and former prime minister sheikh hasina wajed has already threatened to launch a movement. joining the brigade is the communist party of bangladesh led by manjul ahsan khan and saidullah choudhury.
বিরোধী রাজনৈতিক দলের চাপে সেসময়কার খালেদা সরকার পিছু হটে এবং ভারতের সাথে দীর্ঘদিনের বিদ্যমান অন্যান্য ইস্যুকে বর্ম বানিয়ে গ্যাস রপ্তানীর চিন্তা থেকে সে যাত্রায় সরে আসে। ৯০ পরবর্তী সময়কালে রাজপথে ও মিডিয়ায় বেগম জিয়ার ভারত বিরোধী রাজনীতির সাথে “more favorably disposed” শব্দগুলো আসলেই অত্যান্ত বেমানান।
২। জামাত ও অন্যান্য ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোর মোর্চা আপাদ-মস্তক ভারত বিরোধীতায় মোড়া মনে হলেও, ২০০১ সালে সরকার গঠনের পর ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষীয় স্পর্শকাতর ইস্যুতে তাদের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যকার স্বাক্ষরকৃত (১৯৭২, ১৯৮০ সালের একটি চুক্তির সময়সীমা অতিক্রান্ত হয়ে গেলে, চুক্তিটি পুণরায় সংশোধিত আকারে স্বাক্ষরিত হয় চারদলীয় জোট সরকারের আমলে। ২০০৬ সালের মার্চ মাসে তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়ার ভারত সফরে গেলে তখন চুক্তিটি স্বাক্ষর হয়। চুক্তিটি [৫]--

একই খবর প্রেস ইনফরমেশান ব্যুরো, আসামে (ভারত সরকারের অংশ) থেকে প্রকাশিত আর্টিক্যালে [৬]—

অন্তত এটুকু নিশ্চিত যে “পুরো দেশ ভারত হয়ে যাবে” এমন বক্তৃতা করা নেতা-নেত্রী ও তাদের সমমনারা বাংলাদেশের ভৌগলিক অবস্থান, আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট ও উতপাদনগত বাস্তবতার ভিত্তিতে নীতিগতভাবে এমন অনেক ইস্যুতেই ভারতের সাথে সখ্যতা বজায় রাখেন (বা নিদেন পক্ষে রাখবার অভিনয়টুকুও করেন) যা তাদের রাজপথের “চরম ভারত বিরোধী” রাজনীতির সাথে সুস্পষ্টভাবেই সাংঘর্ষিক।
এবার ফিরে আসি বি,এস,এফ-এর গুলিতে নিহত বাংলাদেশীদের তালিকায়। তালিকা বলছে বি,এস,এফ ২০০০-২০০১ সময়ে ১১৪ জন বাংলাদেশীকে হত্যা করেছে। ২০০০ এর আগেও হত্যা চলেছে সীমান্তে, প্রচুর ভারত বিরোধী রাজনীতিও হয়েছে সে সমময়। “অর্ধেক দেশ ভারত হয়ে যাবে”, “করদ রাজ্য হবে”— এমন উত্তপ্ত বক্তৃতাবাজির পাশাপাশি সাথে ছিল “মালাউন-ভারত” বিরোধী বাংলাদেশের জিহাদী দলগুলোও। এরাই যখন ক্ষমতায় এলো ২০০১ এ, সব ভারত বিরোধীতা ছাপিয়ে “অন্য বাস্তবতা” জায়গা করে নিল! তাদের রাজপথ কাঁপানো তীব্র “ভারত বিরোধীতা” দিয়ে তারা ২০০১-২০০৬ এর শাসনামলে একটি বছরের জন্যেও বি,এস,এফ-এর নৃশংসতার বিরুদ্ধে শক্ত পদক্ষেপ নিতে পারেনি। বরংচ, সব ছাপিয়ে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তিকে পূণর্নবায়ন করে ভারত-বাংলাদেশের নিজ নিজ যোগাযোগ ব্যাবস্থা একে-অন্যকে ব্যাবহারের সুবিধা দেবার নীতিগত সিদ্ধান্তটি তারা নিয়েছিল এসময়ই! তাই, সীমান্ত হত্যা নিয়ে সাধারণের মাঝে বিরাজমান ক্ষোভকে পুঁজি করতে রাজপথের “উত্তপ্ত ভারত-বিরোধী বক্তৃতাবাজিতে” আপাতত বিভ্রান্ত হবার কোন সুযোগ নেই।
শেষ কথাঃ
বি,এস,এফ-এর চরম আগ্রাসী আচরণের প্রেক্ষিতে ভারতীয় পণ্য বর্জন ইস্যুতে আমাদের জাগরণকে রাজাকার-আলবদররা যাতে সুযোগ সন্ধানীর মতন তাদের রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যাবহার না করতে পারে, আপাতত সেই সতর্কতাটুকু সবাইকে ধারণ করবার অনুরোধ রাখতেই এই পোস্টের মূল উদ্দ্যেশ্য।
[বাংলাদেশ-ভারতের জটিল সম্পর্কে যে কোন সরকারের পক্ষেই শক্ত হওয়া দূরহ এবং পরবর্তী পোস্টে এ সংক্রান্ত বক্তব্য তুলে ধরবার আশা রাখি]
যেহেতু পণ্য বর্জন ব্যাক্তি নিয়ন্ত্রণাধীন চর্চা, নিজেকে সচেতন করে খুব সহজেই আমরা এই কাজটি শুরু করতে পারি। সেক্ষেত্রে আবেগের বশবর্তী হয়ে কোন পথ সমাবেশ, মুক্তাঙ্গনে মিলন বা শাহবাগে মানববন্ধন করার মতন রিস্কি পদক্ষেপ, যা থেকে ছাগুগণেরা এই মুহূর্তে খুব সহজেই লাভবান হতে পারে, তা এড়িয়ে চলাই হয়তো জনসচেতনতা মূলক এই উদ্যোগকে অর্থবহ ভাবে এগিয়ে নিতে পারে। অন্তত, বর্তমান সরকারকে অস্থিতিশীল করে আগামী দু’বছরের আগেই সরকার পরিবর্তন করতে আমাদের ক্ষোভ ও পণ্যবর্জনের সচেতনতাকে যেন কেউ পুঁজি হিসেবে ব্যাবহার করতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করাটাও আমাদের দায়িত্বের মধ্যেই পরে। কারণ, গোলাম আজম ও রাজাকারেরা এখনও দিন গুণছে অস্থিতিশীল সেরকম একটি মুহূর্তের জন্যই...
চলবে...
সূত্রঃ
১। Click This Link
২। http://www.hrw.org/en/node/94641/section/6
৩। Click This Link
৪। Click This Link
৫। Click This Link
৬। http://pibguwahati.nic.in/nemirror-apr2006.pdf
সীমান্তে হত্যার প্রতিবাদে ভারতীয় পণ্যবর্জন: পর্ব ১— প্রয়োজনীয় সতর্কতা
লিখেছেনঃ (সিসিফাস) (তারিখঃ শনিবার, ০৪/০২/২০১২ - ২১:২৭)
http://amarblog.com/udvraanto/posts/143330
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১২ রাত ২:৪০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


