somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সাদামনের মানুষ: ডাঃ মানবেন্দ্রনাথ সরকার

২৮ শে মে, ২০০৮ রাত ১২:৫৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

#ফিচারটি দৈনিক প্রথম আলোর ‌৫ডিসেম্বর ২০০৩ শুক্রবারে 'অন্যআলোতে‌' ছাপা হয়েছিলো এবং ইউনিলিভার ঘোষিত 'সাদামনের মানুষ' প্রতিযোগীতায় নির্বাচিত হয়। ২৬ মে ২০০৮ সন্ধ্যা ৭.৫০ মি: এটিএন বাংলায় এটি প্রচারিত হয়।#



সকল ধর্মের সকল বর্ণের মানুষ পৃথিবীতে পদার্পণ করে এক ও অভিন্নরুপে। মাতৃজঠর থেকে অজস্র রক্তস্নাত হয়ে ভুমিষ্ট হয় শিশু। এই মায়ের কাছে তার আজন্ম ঋণ। মাতৃকোল থেকে সে স্থান পায় আর এক মায়ের কোলে। সে মা তার মাটি, তার মাতৃভূমি। মানুষটি যখন বড় হয়, একজন শিক হয়, ডাক্তার হয়, ইঞ্জিনিয়ার হয় তখন তার এই বড় হয়ে উঠার পিছনে থাকে গ্রামের বা সমাজের মানুষের বড় অবদান। তারা প্রত্য পর ভাবে সেই মানুষকে মানুষ হিসাবে গড়ে ওঠার জন্য চেতনে অবচেতনে সাহায্য করে। ভূমিষ্ট সেই মানুষটি ঋনবদ্ধ হয় তার জন্মদাত্রী মা এবং দেশের মানুষের প্রতি। সেই ঋণবদ্ধতার দায় থেকে কেউ কেউ নিস্কৃতি পেতে পারেনা। এই দায়বদ্ধতা থেকে ডাঃ এম.এন.সরকার জীবন উৎসর্গ করেছেন মানুষের কল্যানে। কুমিল্লার মুরাদনগরের অযাচক আশ্রমের অধ্য ডাঃ মানবেন্দ্র নাথ সরকার একজন ব্রহ্মচারী হিসাবে নিজেকে পরিচয় দেন। ডাঃ যুগল ব্রহ্মচারী নামেই তিনি পরিচিত। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় দেড় থেকে দু’শ রোগী দেখেন তিনি। এ জন্য তিনি রোগীদের কাছ থেকে কোন ফি নেন না। তবে আশ্রম পরিচালনার জন্য পাঁচ টাকা এন্ট্রি ফি নেয়া হয়। রুগীরা এখানে পান সর্বোচ্চ সেবা। এখানে এসে পরম প্রসস্তিতে ভরে যায় রোগীদের হৃদয়। রুগীদের প্রতি থাকে সুন্দর ব্যবহার এবং কেউ কেউ পান বিনামূল্যে ঔষধ। এই ঔষধগুলো বিভিন্ন ঔষধের কোম্পানীগুলো ফ্রি মেডিকেল সেম্পল হিসাবে আশ্রমকে দিয়ে দেয়। তাছাড়া কাছেই গড়ে উঠেছে একটি ডিসপেন্সারী। সেখানে অনেক কমমূল্যে ঔষধ পাওয়া যায়। বিভিন্ন ঔষধের কোম্পানী কমমূল্যে এখানে ঔষধ সরবরাহ করে। ডাঃ যুগল ব্রহ্মচারীকে সহযোগিতা করার জন্য আরো তিন জন সহযোগী রয়েছেন। নিরঞ্জন ঘোষ ও সুজিত সাহা, আশ্রমের পাশেই তাঁদের বাড়ী। তারা বিনা শ্রমে এখানে সেবা দান করেন।

অযাচক আশ্রমের প্রতিষ্ঠা :
বাংলা ১৩৩৭ বঙ্গাব্দ, ইংরেজী ১৯৩১ খৃষ্টাব্দে কুমিল্লা শহর থেকে প্রায় ৬০ কিঃ মিঃ দূরে মুরাদ নগর থানার রহিমপুর গ্রামে এ আশ্রমটি প্রতিষ্ঠিত হয়। অখন্ড মন্ডলেশ্বর শ্রী শ্রী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেব এ আশ্রমটি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ছিলেন সমাজ সংস্কারক মানবতাবাদী এক মহান গুরু। তার মূল জন্মস্থান চাঁদপুরে। জ্ঞান অন্বেষা ও মানুষের কল্যাণে তিনি পরিব্রাজক হয়ে দেশে দেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন। তখন ঘুরতে ঘুরতেই এই গ্রামে মানুষের কল্যাণে কিছুদিন কাটিয়েছেন। তখন তিনি ছোট আকারে এখানে আশ্রমটি প্রতিষ্ঠা করেন। আশ্রম গড়ার মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের কল্যাণ সাধন। চিন্তা চেতনা ও শারীরিক ভাবে মানুষ নানা প্রকার ক্ষতিগ্রস্থ হয়। সে ক্ষতি অনেক ক্ষেত্রে তার নিয়ন্ত্রনে থাকে না। তখন সে মানুষের প্রয়োজন হয় অন্যের সেবা গ্রহণ করা। কোন মানুষের চৈতন্যে যখন অসুস্থতা দেখা দেয় তখন সমাজ ও বিপুল জনগোষ্ঠীর উপর তার বিরুপ প্রতিক্রিয়া ঘটে। কখনো কখনো সমাজ হয়ে উঠে সহিংস আত্মঘাতি। মানুষে মানুষে দেখা দেয় হিংসা হানাহানি। মানুষের ভিতর বেড়ে যায় কুচিন্তা, কু-কর্ম। সমাজে মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ে। তখন প্রয়োজন হয় আত্মশুদ্ধীর। অযাচক আশ্রম সে আত্মশুদ্ধীর কাজটি করে যায় নিয়মিত। এখানে সকাল সন্ধ্যা নিয়মিত ধ্যান ও উপসনার আয়োজন করা হয়। নানান উৎসব ছাড়াও আশ্রমে আয়োজন করা হয় 'ঈদে মিলাদুন্নবী'।


সেবায় উৎসর্গকৃত প্রাণ :
ডাঃ যুগল ব্রহ্মচারী মানব সেবায় নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন। মানুষের কল্যাণে নিজেকে বিলিয়ে দেবার এক গোপন মনবাসনা তাঁকে আশৈশব তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। আশ্রম থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরে তার নিজ বাড়ী। মানুষ সেবার কাজ তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন শৈশব থেকে। তিনি পড়াশুনা করেছেন চট্রগ্রামে। বাবা প্রয়াত সুধীরঞ্জন সরকার একটি সুইস প্রতিষ্ঠান 'ভলকার্ড' এ চাকুরী করতেন। তার মা ৬৪ সালে 'করোনারী হার্ট ডিজিজে' মারা যান। সে সময় এ চিকিৎসার খুব উন্নতি ছিলোনা। ডাঃ যুগল ব্রহ্মচারী জানালেন, ১৯৮৪ সনে তিনি এ আশ্রমের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হন। সে থেকেই তিনি এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ১৯৬৩ সালের দিকে তিনি যখন স্কুলের ছাত্র তখন এই আশ্রমের সঙ্গে যোগসূত্র হয়। তাঁর গুরুদের অখন্ড মন্ডলেশ্বর শ্রী শ্রী স্বামী স্বরুপানন্দ পরমহংসদেবের কিছু উপদেশ তাঁকে বিপুল ভাবে প্রভাবিত করে। তাঁর জীবনের কয়টি মৌলিক বিষয় হলো 'তুমি যেখানে যে অবস্থায় থাকনা কেন মানুষের কল্যান তোমাকে করতে হবে। যতটুকু পার, যারমধ্যে বেশী সে বেশী করবে। যে পারবে না সে তার খাদ্য থেকে কিছুটা উৎসর্গ করবে। অর্থাৎ কিছু একটা করতেই হবে। মানুষ বিভিন্ন বিষয়কে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। গুরুজী জন্মটাকেও সে ভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। গুরুজী বলেন, 'দিয়ে দিবার তরে, তোর জীবন পেয়েছি, রক্ত দিব বলে মায়ের রক্ত নিয়েছি'। ডাঃ যুগল ব্রহ্মচারী কথাগুলো ব্যাখ্যা করেন এভাবে, ‘তুমি যে জন্ম গ্রহণ করেছো, মায়ের রক্তস্নাত হয়ে পৃথিবীতে এসেছো, এতে এটাই প্রতিয়মান হয় যে, তোমাকে এ ঋন শোধ করতে হবে। পৃথিবীর জন্য রক্ত দাও। এই যে একটা জিনিস কিছু করতে হবে পৃথিবীর জন্য সমাজের জন্য। আজকে অনেকেই অনেক কিছু বলেন, হয়তো আমি বলতে পারি আমার বাবার পয়সায় আমি ডাক্তার হয়েছি। কিন্তু তা তো না। প্রত্যক্ষ বা পরক্ষভাবে সমাজের একেবারে অতি দরিদ্র শ্রেণী থেকে উচ্চ বিত্ত পর্যন্ত সকলের কিছু না কিছু সেবা আমি গ্রহণ করেছি। আমি তাদের প্রতি দায়বদ্ধ। আরেকটা জিনিষ হলো, মানুষ মাত্রই সমাজ। বিভিন্ন কারনে যে সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি হয়। সুন্দর কথা সবাই বলেন, কিন্তু গুরুজী বলেন, পৃথিবীর সকল সম্প্রদায় আমার, আমি সকল সম্প্রদায়ের। কাজেই আমি খোঁজ করছিলাম যে এমন কিছু পাই কিনা। আমি আমার পিতা মাতার কাছে কৃতজ্ঞ যে, তারা আমাকে এই মিশনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। দেখুন, মধ্যবিত্ত পরিবারে সন্তানদের শিক্ষা দেয়া হয়, তুমি পরিবারের জন্য কিছু কর। সুতরাং ছোট বেলা থেকে আমার মন মানসিকতা এ আশ্রমের উপযোগী করে গড়ে তুলি। স্কুল কলেজ জীবন শেষ করে ১৯৭৩ সনে আমি চট্রগ্রাম মেডিকেল কলেজে ভর্তি হই। ডাক্তারী পাশ করার পর কিছুদিন পরই স্থায়ী ভাবে এখানে চলে আসি। সে থেকে চেষ্টা করছি গুরুদেবের আদর্শ ভাবদর্শন চর্চা করা। মানুষের মাঝে বিলিয়ে দেয়া। গুরুদেব বলেন, ‘আমি হিন্দুও চিনিনা, মুসলমান ও চিনিনা, আমি চিনি মানুষকে’।

সেবাদান কর্মসূচী :
ডাঃ যুগল ব্রহ্মচারী জানান, প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকেই আশ্রম থেকে মানুষদের নানাভাবে সেবাদান করে আসছে। তাঁর আশ্রমে আসার পরই এখানে ফ্রি মেডিকেল সার্ভিস চালু হয়। প্রথম নেয়া হতো জন প্রতি এক টাকা। এখন নেয়া হয় মাত্র পাঁচ টাকা। তিনি জানান, এ পর্যন্ত প্রায় আড়াই লাখ মানুষ এখানে সেবা গ্রহণ করেছেন। এখানে গড়ে উঠেছে একটি মেডিকেল ষ্টোর। সারা বাংলাদেশের থেকে সবচেয়ে কম দামে এখানে ঔষধ পাওয়া যায়। আগে এটা চিন্তাই করা যেতো না। তিনি জানান, যারা এখানে সেবা গ্রহণ করছেন এটা তাদেরই দয়া। কারন দীর্ঘ সময় ব্যয় করে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে দূরদুরান্ত থেকে মানুষ আসেন। তারা আমাদের সীমিত সুযোগগুলো গ্রহণ করেন। আমরা চেষ্টা করি তাঁদেরকে 'পেশান হিয়ারিং' দিতে। এখানে যারা একেবারে দরিদ্র তাদের জন্য বিনামূল্যে কিছু ঔষধ সরবরাহ করা হয়। এগুলো বিভিন্ন ঔষধ কোম্পানীগুলো ফ্রি মেডিকেল স্যাম্পল হিসাবে দিয়ে থাকেন। আরেকটা হলো বিভিন্ন হাসপাতালে যখন আমরা কোন রুগী রেফার করি তখন তারা সে রুগীদের খুব যত্নের সাথে চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। কারন আমাদের তো একেবারে সীমিত ব্যবস্থা। এখানে সার্জারী বা বড় ব্যবস্থার আয়োজন নেই। তবে কোন সার্জারী রুগী যদি আমাদের এখান থেকে কোথাও পাঠানো হয়, তাঁরা চেষ্টা করেন তাঁকে সর্বোচ্চ সেবা দান করতে। সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি এখানে পরিলক্ষিত হয়েছে তা হলো মানসিক ভাবে রুগীরা এসে এখানে তৃপ্তির সুধা নিয়ে যান। মানুষ যখন অসুস্থ হয় তখন তাঁরা সেই অসুখের চাইতেও মানসিক ভাবে বেশী পর্যুদস্ত হন। তখন তার রোগের চিকিৎসার সাথে সাথে নম্র ভাষায় একান্ত আপন হয়ে যদি মনের জোরটা বাড়ানো যায় তবে সে অনেকটাই সুস্থ হয়ে উঠে। এখানে সার্বনিক যারা সেবা দান করছেন তাঁরা সে কাজটি করে যাচ্ছেন পরম মমতা দিয়ে।

ব্রহ্মচারী জীবনাচার :
ব্রহ্মচারীর শব্দের অর্থ হলো যে নিজেকে সর্বোত ভাবে ঈশ্বর তথা ঈশ্বরের সৃষ্টির জন্য জীবন উৎসর্গ করে। এটাকে সংক্ষেপে ব্রহ্মচারী ব্রত বলা যায়। সাধারন ভাবে মানুষ সংসার জীবনে জড়িয়ে পড়ে। ডাঃ যুগল ব্রহ্মচারী সে রকম কোনে আকর্ষন বোধ করেননি। তিনি বলেন, এ আকর্ষনের চেয়ে অধিক বেশি তিনি মানুষের জন্য কিছু করার আকর্ষন বোধ করেন। সে কারনে তিনি ব্রহ্মচারী ব্রত গ্রহণ করেছেন। '৭৮ সনে চট্রগ্রাম মেডিকেল থেকে তিনি ডাক্তারী পাশ করেন। মানুষকে সেবা করার ব্রত নিয়েই তিনি ডাক্তার হয়েছেন। তার আগে তিনি চট্রগ্রাম কলেজ থেকে '৭২ সনে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। এই আশ্রমে ৮ জন সার্বক্ষনিক কর্মী রয়েছেন। তবে সবাই ব্রহ্মচারী নন। এখানে যেমন রয়েছেন উচ্চ শিক্ষিত কর্মী তেমন সাধারন লেখাপড়ার কর্মীও রয়েছেন। সিলেটের হবিগঞ্জ থেকে এসেছেন শংকর ব্রহ্মচারী। তিনি জানালেন গুরুজীর আদর্শে অনুপ্রানিত হয়েই তিনি এই আশ্রমে এসেছেন। সর্বাঙ্গে শ্বেত শুভ্র পোষাকে আবৃত থেকে সর্বদা মনকে সুচীশুদ্ধ করে তুলছেন। সংসার ধর্ম তিনি আর পালন করবেন না। ত্রিশের কোঠায় বয়স হলেও জানালেন মানুষের সেবা করে যাওয়াই হবে তার আগামী জীবনের সাধনা। কর্মী কমল দেবনাথ এসেছেন বরিশাল থেকে। বরিশাল বি.এম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাষ্টার্স করে গুরুজীর সেবার জন্য এসেছেন। তিনি আশ্রমের প্রকাশনা ও লাইব্রেরীর দায়িত্বে রয়েছেন। আশ্রমের কম্পিউটারের কাজ তিনি করে থাকেন। তরে তার বয়স কম। সোম্য চেহারা। বল্লেন এখনো ঠিক করেনি ব্রহ্মচারী হবেন না সংসারী হবেন। আশ্রমের পাশেই নিজের বাড়ী রয়েছে কর্মী সুজিত সাহার। মধ্যম বয়সী এই কর্মী জানালেন ক্লিনিকে ডাঃ যুগল ব্রহ্মচারীকে তিনি সার্বনিক সহযোগিতা করছেন। সেচ্ছাসেবক হিসাবে তিনি এখানে কাজ করেন। এর জন্য তিনি কোন পারিশ্রমিক নেন না। তিনি জানান, আমাদের সংসার আছে, বৌ বাচ্চা আছে, অন্য কাজ কর্মও আছে, আমি ব্রহ্মচারী নই। ব্রহ্মচারী হওয়া সাধনার বিষয়। ঘোষণা দিয়েও ব্রহ্মচারী হওয়া যায়না। এটা নিজের সঙ্গে আত্মার অঙ্গীকার। এই আশ্রমে কোন নারী সেবাকর্মী নেই।

আশ্রমের আয় ও কার্যক্রম :
অযাচক আশ্রমটি চলছে মূলত তার নিজস্ব আয়, বই প্রকাশনা ও বিভিন্ন মানুষের সহযোগিতায়। ডাঃ যুগল ব্রহ্মচারী জানালেন অযাচক শব্দের অর্থ কারো কাছে কোন কিছু যাচা বা চাওয়া নয়। নিজের যে সম্পদ আছে এবং নিজস্ব সম্পদ বাড়িয়ে তা মানুষের কল্যাণে ব্যয় করা। এ লক্ষে তারা বিভিন্ন মাছ চাষ, গবাদী পালন বিভিন্ন প্রকার কৃষি করে আয়ের ব্যবস্থা করছেন। এ অঞ্চলে একসময় মানুষ ধান ছাড়া কিছুই করতো না। মানুষ মনে করতো শুধু ধান চাষই কৃষি। নানা রকম শাক সবজি উৎপাদনও যে কৃষির অংশ তা এ অঞ্চলের মানুষ জানতো না। এই আশ্রম থেকেই প্রথম নানা রকম সবজি উৎপাদন শুরু করে এবং তা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। আজ এ অঞ্চলে একটি খালি জমিও পাওয়া যাবেনা যেখানে কোন না কোন কৃষি উৎপাদন হচ্ছে না। ডাঃ যুগল ব্রহ্মচারী জানালেন, এ নিয়ে তাঁরা নানা ভাবে গবেষণাও করছেন। আশ্রমের মধ্যেই রয়েছে বড় একটি পুকুর। সেই পুকুরে মাছ চাষ করা হয়। একবার দেখা গেল সেই পুকুরের কিছু মাছ কোন রকম কারন ছাড়াই মারা যাচ্ছে। কি কারনে মাছ গুলো মরে যাচ্ছে কেউ ধরতে পারছিলেন না। তখন তাঁর একবার সুযোগ হয়েছিলো নতুন দিল্লিতে 'ইন্টারন্যাশনাল এগ্রিকালচার ফেয়ার' এ অংশগ্রহণ করার। সেখানে তিনি জানতে পারেন এক ধরনের 'এলজি' বা শেওলা এ মাছগুলোর মরার কারন। যেখানে মানুষ কিংবা গবাদী পশুর মূত্র যদি বেশী যায় তাহলে সেখানে এই শেওলা জন্মে এবং মাছের মড়কের কারন হয়। এখন তাঁরা গবাদী পালন সাময়িক ভাবে বন্ধ করে রেখেছেন। সাধারনতঃ বলা হয়ে থাকে পুকুরে তিনটি স্তরে তিন জাতের মাছ চাষ করা যায়। পুকুরের তলায় মৃগেল জাতীয় মাছ মাঝে রুই জাতীয় মাছ এবং উপরে কাতল জাতীয় মাছ চাষ করার কথা বলা হয় মৎস্য বিভাগ থেকে। এখন তারা পুরো পুকুরকে এক জাতীয মাছ চাষ করছেন। যেমন তোলাপিয়া চাষ করা হচ্ছে। এ মাছের সবচেয়ে অসুবিধা হলো এরা খুব দ্রুত বাচ্চা দেয় তাতে সুবিধার চেয়ে অসুবিধাই হয় বেশি। মা তেলাপিয়াকে মাসখানেক রেখে হরমন দিয়ে পুরুষ চরিত্র করা যায় কিনা তা তারা দেখছেন। এ দেশে তার কার্যকারিতা কেমন তা তারা গবেষণা করে দেখছেন। আরো তারা ভাবছেন কৈ মাছ চাষ করবেন। কৈ এর পোনা আসবে থাইল্যান্ড থেকে। এ থেকে তারা যদি সফল হতে পারেন তা হলে বড় লাভ জনক প্রকল্প গড়ে উঠবে এ সেক্টরে। তিনি বল্লেন, দেখুন আমাদের দেশ মূলতঃ কৃষি প্রধান। কিন্তু সরকারী বেসরকারী পর্যায়ে এ নিয়ে কেউ ভাবছেনা। গবাদী পশুর চিকিৎসা কিংবা উন্নয়নের জন্যও আমরা কেউ ভাবছিনা। সরকারের এ বিষয়ে বিশেষ নজর দেয়া দরকার।

পরিবেশ সচেতনতা বিষয়ে তিনি বল্লেন, দেখুন, আমি বিজ্ঞানের ছাত্র। কীটনাশক, রাসায়নিক সার ব্যবহার করে আমাদের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে ঠিকই। কি করে আমাদের পরিবেশ ঠিক রাখতে পারবো সরকারী ভাবে তা তেমন প্রচারিত হয় না। গণমাধ্যম এ ব্যাপারে সক্রিয় ভুমিকা রাখতে পারে। কি কারনে ফুলপাখী কীট পতঙ্গ বাঁচবে তার কোন কার্যকরী প্রচার তেমন হচ্ছেনা। আমরা চাই প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে কিংবা স্বল্প প্রয়োজনে কোন প্রাণী যেন হত্যা না হয়। বিভিন্ন আশ্রমে বলা হয়ে থাকে এটা ছোঁবেনা ওটা ছোঁবে না। আমরা নিরামিশী। কিন্তু সেটা ঐ কারনে নয়। তাই প্রোটিন আমাদের জীবনাচারের সঙ্গে খাপ খায় না। সেটা প্রয়োজন নেই বলে আমরা মনে করি। কিন্তু সংসারে যারা আছেন তারা প্রোটিন গ্রহণ করবেন। সেটি তার নিজস্ব অভ্যাস।

অযাচক আশ্রমের মূল লক্ষ হলো স্বাবলম্বী হওয়া। সর্বোতোভাবে এ লক্ষেই আশ্রমের কাজ পরিচালিত হচ্ছে।

আত্মউন্নয়ন ও আত্মশুদ্ধি :
ডাঃ যুগল ব্রহ্মচারী বল্লেন, 'আমাদের আশ্রমে একটি প্রজেক্ট আছে তা হলো চরিত্র গঠন। আধ্যাত্মিক বা সামাজিক বিশ্বাস তার যাই হোক সে যদি ভাল মানুষ হয়, তাহলে সমাজের জন্য জাতীর জন্য সে তার কিছু সময় ব্যয় করবে'। গুরুজী তাই বলে গেছেন, 'তোমাদের চরিত্র গঠন ব্যক্তিগত পর্যায়ই শুধু নয় এটাকে সামাজিক বিপ্লবে নিয়ে যেতে হবে'। তার কারন প্রতিকুলতা এতবেশী যে আপনি একা বা আমি একা তার সঙ্গে যুদ্ধ করে নিজের মনের ভাল অংশটাকে ধরে রাখতে পারবো না। এর জন্য সমমনা যারা তাদের মধ্যে আত্মার সমষ্টিগত কৌশল রপ্ত করতে হবে। তবেই আমরা আমাদের কল্যাণ বয়ে আনতে পারি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বামী স্বরুপানন্দ ফাউন্ডেশন নামে বিশ্ব ধর্মতত্ত্ববিভাগ একটি প্রকল্প হাতে নিতে যাচ্ছে, যা আগামীতে দেশের প্রধান ব্যক্তিদের সহ কিভাবে সাধারন মানুষের নৈতিকতার উৎকর্ষ সাধন করা যায় সে বিষয়ে চর্চার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। গুরুজী বলে গেছেন, মানুষের চরিত্র খারাপ হয় তার মূখ্য কারন অভাবে জন্য, অভাব কেন হয়? আলস্যের জন্য। কাজেই আলস্য দূর করতে হবে। এটা নিশ্চই যে যাদের প্রাচুর্য আছে তাদেরও চরিত্র হরণ হয়। যাদের মাধ্যমে লোভ লালসা চরিতার্থ করছে তারাও অভাবী। সবদিক দিয়ে পরনির্ভরশীল হয়ে তারা অভাবী হয়ে উঠছে। কাজেই মানুষের আলস্য যদি দুর করা যায় তাহলে অনেক ভাবে চরিত্র গঠনে সাহায্য হবে। এ বিষয়ে গুরুজী প্রচুর সাহিত্য রচনা করে গেছেন। আশ্রম থেকে সে বইগুলো প্রচারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এছাড়াও মাসিক মহাজীবন নামে একটি পত্রিকা প্রকাশের ব্যবস্থা হচ্ছে।

আজ যেমন স্বনির্ভর আন্দোলন, বৃক্ষরোপন কর্মসূচী শুরু হয়েছে, গুরুজী সে কর্মসূচী অনেক আগেই স্বউদ্যোগে করে গেছেন। ১৯৩৯ বঙ্গাব্দ থেকে ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত তিনি এ অঞ্চলে ঘরে ঘরে ফলজ গাছ নিজ হস্তে বিতরন করেছেন। তার দেখা দেখি অনেকেই তার প্রচার করেছেন। কোথাও যদি রাস্তা একটু ভাঙ্গা থাকতো, কয় ঝুড়ি মাটি দিলেই সে রাস্তা চলাচলের উপযোগী হয়ে যেতো তা তিনি নিজ হাতেই একা করে দিয়েছেন। মজাপুকুর সংস্কার করেছেন। মানুষ আজ পরনির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এ থেকে আমাদের পরিত্রাণ পাওয়া অতি জরুরী হয়ে পড়েছে।

আত্মানুসন্ধানের পথে :
এক মহাকাল থেকে আর এক মহাকালে আত্মার চলছে বিরামহীন অনন্ত যাত্রা। সেই আত্মার ক্ষনিক স্থিতি এই বিশ্বলোক। আত্মা মানবদেহ ধারন করে অতি স্বল্প সময় অবস্থান নেয় ইহলোকে। এই ক্ষীন অবস্থানে মানবের এক কঠিন পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হয়। এই সময় পরের জন্য জীবন দেওয়া এক মহাসুখের বিষয়। 'পরের তরে জীবন দেওয়া তার যে কেমন সুখ, বুঝবে কি সে আত্মসুখে দুরন্ত যার ভুখ'। এই সুখানুভুতি নিয়েই যদি মানুষ মরনের পারে যাত্রা করতে পারে তবেই তার জন্ম সার্থক হয়। এই আসা যাওয়ার মাঝেই শ্রষ্টার স্বরুপ স্পষ্ট হয়। মৃত্যু হয় অপূর্ব সুন্দর। মরন কেবল নামেই ভয়ষ্কর, মৃত্যু আছে বলেই সৃষ্টি অপূর্ব সুন্দর।








২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিলিয়নিয়ার রবিন খুদা ও আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ০৯ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৩০

বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় কী?

কর্মসংস্থান? না।

বিনিয়োগ? না।

ডলার সংকট? না।

গার্মেন্টস খাতে ছাঁটাই? না।

ব্যাংকিং খাতের আস্থা সংকট? না।

সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো— কোনো অনুষ্ঠানে জুলাই চেতনা কত মিলিলিটার ঢুকেছে, কে কতবার উচ্চারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×