somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সুত্রঃ প্রথম আলো ঢাকা, সোমবার, ৯ মে ২০১১, ২৬ বৈশাখ ১৪১৮, ৪ জমাদিউস সানি ১৪৩২

০৯ ই মে, ২০১১ রাত ৮:৪৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ক্রমেই পরিষ্কার হয়ে আসছে হত্যা-অভিযানটি ছিল পরিকল্পিত। আন্তর্জাতিক আইনের অনেক প্রাথমিক বিধিই মানা হয়নি। দেখা যাচ্ছে, ৮০ জন কমান্ডোর ওই দলটি নিরস্ত্র শিকারকে আটকের কোনো চেষ্টাই করেনি। যেখানে তাদের সামনে কোনো বাধা ছিল না, সেখানে কেন প্রথম সুযোগেই ওসামাকে হত্যা করা হলো? তারা দাবি করে, লাদেনের স্ত্রী নাকি তাদের দেখে দৌড় দিয়েছিলেন। আইনের প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা আছে এমন সমাজে সন্দেহভাজনকে আটক করে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। ‘সন্দেহভাজন’ কথাটা আমি আবারও জোর দিয়ে বলছি।
টুইন টাওয়ার ধ্বংসের এক বছর পর এফবিআইয়ের প্রধান রবার্ট ম্যুয়েলার গণমাধ্যমে জানিয়েছিলেন, ইতিহাসের সবচেয়ে গভীর ও ব্যাপক তদন্ত চালানোর পর এফবিআই কেবল তাদের ‘বিশ্বাস’ ছাড়া আর কিছু বলতে পারছে না। তাদের বিশ্বাস পরিকল্পনাটি (টুইন টাওয়ার ধ্বংস) আফগানিস্তানে প্রণীত হয় এবং বাস্তবায়নের কাজ চলে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জার্মানিতে। ২০০২ সালে যারা কোনো কুলকিনারা করতে পারেনি, এপ্রিল মাস পর্যন্ত কোনো প্রমাণ ছাড়াই যারা কেবল বিশ্বাসের কথা বলছে, নিশ্চিতভাবেই আরও আট মাস আগে তারা এ বিষয়ে আরও কমই জানত। ৯/১১ ঘটনার পর তালেবানরা ওয়াশিংটনের কাছে প্রস্তাব দিয়েছিল, লাদেনের বিরুদ্ধে অভিযোগের কোনো প্রমাণ দিতে পারলে তারা বিন লাদেনকে আমেরিকার হাতে তুলে দেবে। তালেবানরা সত্যিই তা করত কি না, তা জানা সম্ভব হয়নি। কারণ, শোনামাত্রই তাদের এ প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্র নাকচ করে দিয়েছিল। এখন আমরা জানি, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কোনো প্রমাণ ছিল না। তাই ওবামা হোয়াইট হাউসে দাঁড়িয়ে যখন বলছিলেন, ‘দ্রুতই আমরা জানতে পারলাম, ৯/১১-এর হামলাটি ছিল আল-কায়েদার কাজ’, তখন তিনি আসলে ডাহা মিথ্যা কথাই বলছিলেন।
তারপর এ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কোনো প্রমাণ যুক্তরাষ্ট্র দিতে পারেনি। অনেকেই বিন লাদেনের ‘স্বীকারোক্তি’র কথা বলে থাকেন। এখন আমি যদি দাবি করি যে আমিই বোস্টন ম্যারাথনের মালিক, তাহলেই কি সেটা আমার হয়ে গেল? ওসামার চোখে যেটা বিরাট অর্জন, তিনি স্রেফ সেই অর্জনের কৃতিত্বটা নিতে চেয়েছেন।
মোটামুটি স্পষ্ট যে পাকিস্তানের সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর কেউ কেউ জানত অ্যাবোটাবাদে লাদেন অবস্থান করছেন। এটা নিয়ে গণমাধ্যমে অনেক শোরগোল হচ্ছে। কিন্তু একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব ভেঙে আগ্রাসনের বিরুদ্ধে পাকিস্তানিদের ক্ষোভ বিষয়ে তেমন কথা হচ্ছে না। পাকিস্তানে আগে থেকেই মার্কিন বিরোধিতা জোরদার ছিল, এ ঘটনায় সেটা আরও বাড়বে। লাদেনের মরদেহ সমুদ্রে নিক্ষেপ করার বিষয়টিও একদিকে যেমন আমেরিকার দাবি সম্পর্কে সন্দেহ জাগাচ্ছে, অন্যদিকে তা মুসলিম দেশগুলোতে ক্রোধেরও সঞ্চার করেছে।
আমাদের এখন নিজেদের জিজ্ঞেস করা দরকার, ইরাকি কমান্ডোরা যদি জর্জ বুশের বাড়িতে নেমে তাঁকে মেরে লাশ আটলান্টিকে ডুবিয়ে দিত, তাহলে কেমন হতো আমাদের প্রতিক্রিয়া? এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই, বুশের অপরাধ ওসামার থেকে শত গুণ বেশি। জর্জ বুশ নিছক ‘সন্দেহভাজন’ নন, তিনি হলেন ‘সিদ্ধান্তদাতা’। তাঁর হুকুমে এমন এক ‘চরম আন্তর্জাতিক অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল, যা কেবল অন্যান্য যুদ্ধাপরাধের থেকে আলাদাই নয়, যা জগতের সমস্ত অমঙ্গল নিজের ভেতরে ধারণ করেছিল’ (জার্মানির নাৎসি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে গঠিত ন্যুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনাল থেকে উদ্ধৃত)। যে অপরাধের জন্য নাৎসি অপরাধীদের ফাঁসি হয়েছিল তা হলো—কোটি মানুষের হত্যাকাণ্ড, কোটি মানুষকে উদ্বাস্তু করা, দেশের বড় অংশের ধ্বংসসাধন করা এবং তিক্ত গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব ছড়িয়ে দেওয়া, যা এখন বিশ্বের বাকি অঞ্চলকেও গ্রাস করেছে। নাৎসিদের মতো এই একই অপরাধে জর্জ বুশও তাই অপরাধী।
কিউবান এয়ারলাইনে বোমা বিস্ফোরণকারী অরল্যান্ডো বশ সম্পর্কেও কিছু কথা বলা দরকার, আমেরিকা যাঁকে আশ্রয় দিয়ে এসেছে। তিনি সম্প্রতি ফ্লোরিডায় শান্তিতে মারা গেছেন। বলা দরকার ‘বুশ মতবাদের’ কথাও, যে মতবাদ অনুসারে কেবল সন্ত্রাসবাদী নিজে নয়, তাদের আশ্রয়দাতা দেশ-সমাজও সমান দোষে দোষী। সন্ত্রাসবাদীদের বেলায় যা করা হয়েছে, তেমন আচরণ তাদেরও প্রাপ্য। কেউ কি খেয়াল করেছেন, এটা বলার মাধ্যমে জর্জ বুশ আসলে আমেরিকায় আগ্রাসন চালানো এবং এর দুর্বৃত্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজেকে হত্যারই ডাক দিচ্ছেন? আমেরিকা নিজেই তো সন্ত্রাসবাদীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে এসেছে এবং অন্যান্য দেশে সন্ত্রাসমূলক হামলা-নির্যাতন চালিয়েছে।
একই কথা বলা যায় লাদেন হত্যা অভিযানের নামকরণ নিয়েও। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন গেরোনিমো’। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা পরিভাষায় বিন লাদেনের সাংকেতিক নাম হচ্ছে ‘গেরোনিমো’। নামকরণের মধ্যেই সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতার ছাপ স্পষ্ট। গেরোনিমো ছিলেন একজন আমেরিকান রেড ইন্ডিয়ান মুক্তিযোদ্ধা, তিনি তাঁর দেশে যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকো শাসনকারী শ্বেতাঙ্গদের দখল-গণহত্যার বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়েছিলেন। গণহত্যা-আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াইকারী একজন সাহসী রেড ইন্ডিয়ান যোদ্ধার সঙ্গে বিন লাদেনকে এক করে দেখে আমেরিকা আসলে লাদেনকে মহিমান্বিতই করল। মনে হয় না পশ্চিমা সমাজ এটা বুঝতে পারছে। সহজভাবে ব্যাপারটা এই, আমাদের অপরাধে আমাদের হাতে নিহত ব্যক্তিদের নামে আমরা আমাদের অস্ত্রের নাম দিচ্ছি—অ্যাপাচে, টমাহক ইত্যাদি। এটা নাৎসি জার্মান বিমানবাহিনী লুফতওয়াফের জঙ্গি বিমানের নাম ‘ইহুদি’ বা ‘জিপসি’ রাখার মতোই নিষ্ঠুরতা।
এখানে অনেক কিছুই বলার ছিল, কিন্তু সবচেয়ে জরুরি প্রাথমিক সত্যগুলোই এখন আমাদের জানা দরকার, যাতে করে আমরা বিষয়টা নিয়ে চিন্তা করতে পারি। কিন্তু সত্যেরই বড় অভাব হয়েছে আজ।
গুয়ের্নিকা ম্যাগাজিন থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনুবাদ ফারুক ওয়াসি।
নোয়াম চমস্কি: মার্কিন ভাষাতাত্ত্বিক ও বুদ্ধিজীবী।
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×