নানা দাবিতে সংগঠিত গণমানুষের আন্দোলনকে প্রতিহত করতে রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের নতুন ধরন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ভিডিও ফুটেজ দেখে ‘অপরাধী’ শনাক্তকরণ। এই কাজে ব্যবহারের জন্য দেশের ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াকে তাদের সম্প্রচারিত এবং অসম্প্রচারিত (রাশ কপি) ফুটেজ সরবরাহ করার জন্য মৌখিক এবং লিখিতভাবে চাপপ্রয়োগ করে নানা সামরিক এবং বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থা। বাংলাদেশে এ ধরনের কাজ শুরু হয়েছিল অবৈধ সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছাত্রদের ভিডিও ফুটেজ দেখে তাদের ওপর নির্যাতন করা হয়েছিল। যার বেশিরভাগই ছিল সাধারণ ছাত্র। নির্যাতনের এই ধারা নির্বাচিত সরকারের সময় এসেও থামেনি। গার্মেন্টস শ্রমিক আন্দোলন, আড়িয়াল বিল রক্ষার দাবিতে গণমানুষের আন্দোলন, এমনকি শেয়ারবাজারে দরপতনের প্রতিবাদের আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীরাও রয়েছে এই হুমকির মুখে। আতঙ্কিত আন্দোলনে অংশ নেওয়া সর্বস্তরের মানুষই। অপরদিকে অভিযোগ রয়েছে, এ ধরনের আন্দোলনের ফুটেজ সংগ্রহের কাজে সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াকে চাপ প্রয়োগ করে থাকে। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার দায়িত্বশীল সাংবাদিকরা বলছেন, এভাবে প্রচারিত ও অপ্রচারিত ফুটেজ নিয়ে নির্যাতনের কাজে ব্যবহার হলে জনমনে এই সন্দেহ জাগা খুবই স্বাভাবিক যে, গণমাধ্যম সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগী হিসেবে কাজ করছে! আর এতে সংবাদমাধ্যমের নীতিনৈতিকতা তো অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সঙ্গে সঙ্গে গণমাধ্যমের ওপরে সাধারণ মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এই ধরনের কাজকে সমর্থনযোগ্য নয় বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান।
কয়েকটি ঘটনা : সর্বশেষ পুঁজিবাজারে দরপতনের ঘটনায় রাজধানীর মতিঝিল এলাকায় নিয়মিত বিক্ষোভ দেখানো এবং ভাঙচুরকারীদের সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বলেছেন, মতিঝিলে একই মুখ বারবার বিক্ষোভ ও ভাঙচুর করছে। তাদের আদৌ কোনো শেয়ার আছে কিনা তা দেখা দরকার। ভিডিও ফুটেজ দেখে বিক্ষোভকারীদের সম্পর্কে খোঁজ নেওয়ার জন্য তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নির্দেশ দেন। আড়িয়াল বিলের ঘটনায় পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেছেন, ভিডিও ফুটেজ দেখে ও তদন্ত করে হতাহত পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলাকারী ও মদদদাতাকে খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হবে। তিনি দাবি করেছেন, একশ্রেণীর দুষ্কৃতিকারী পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা করেছে। এর আগে গত বছরের আগস্টে গার্মেন্টস শ্রমিকদের আন্দোলনের পর ভিডিও ফুটেজ দেখে আন্দোলনকারীদের গ্রেফতারের কথা বলেন র্যাবের তৎকালীন মহাপরিচালক হাসান মাহমুদ খন্দকার। তার এই বক্তব্যের পরই র্যাব-১ আন্দোলনে অংশ নেওয়া ৯ জন পোশাক শ্রমিককে আটক করে এবং পরবর্তীতে র্যাবের পক্ষ থেকে বলা হয়, তারা নিয়মিত পোশাক শ্রমিক নয়। তবে গ্রেফতারকৃত এই শ্রমিকদের মিডিয়ার সামনে আনা হয়নি। গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বেতন ও বিভিন্ন ফি বাড়িয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে তারা আন্দোলন করে। তাদের আন্দোলন চলাকালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রসাশন ভিডিও ফুটেজ দেখে আন্দোলনকারীদের শনাক্ত করে বহিষ্কারের হুমকি দেয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই কাজের জন্য ক্যামেরাম্যানও নিয়োগ করেছে বলে জানা যায়। গত বছরের ২৩ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে আর্মি অফিসার্স হাউজিং সোসাইটির নামে সেনা আবাসন পল্লী গড়ে তোলাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনায় জড়িতদের ভিডিও ফুটেজ দেখে শনাক্ত করা হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়। একই বছরের ১১ অক্টোবর সিরাজগঞ্জে রেললাইনের পাশে বিএনপির জনসভায় ট্রেন দুর্ঘটনায় ছয় জনের মৃত্যুর ঘটনায়ও একই রকম বক্তব্য রাখা হয় সরকারের পক্ষ থেকে। ভিডিও ফুটেজ দেখে আন্দোলনকারীদের শনাক্তকরণের কাজ শুরু হয় সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বিক্ষোভের পর থেকে। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারী কয়েক ছাত্রকে তুলে নিয়ে সেনা হেফাজতে নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ আছে। এসব ঘটনা ছাড়াও নানা ইস্যুতে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা এবং ব্যক্তি ভিডিও ফুটেজ দেখে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলেছেন।
ভিডিও ফুটেজ দেখে নির্যাতন ও গ্রেফতার : ভিডিও ফুটেজ দেখে গ্রেফতার ও নির্যাতনের ঘটনা দেশে বাড়ছে। গার্মেন্টস শ্রমিকদের আন্দোলনে অংশ নেওয়া শ্রমিকদের গ্রেফতার করেছে র্যাব। আড়িয়াল বিলে আন্দোলনকারীদের গ্রেফতার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনে অংশ নেয়া ছাত্রকে গ্রেফতারের পর রিমান্ডের নাম করে ব্যাপক নির্যাতন করেছে। নির্যাতিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের সেই সময়কার তৃতীয় বর্ষের চূড়ান্ত পর্বের পরীক্ষার্থী দীন ইসলাম। গণমাধ্যমে প্রচারিত হওয়া চিত্রের সূত্র ধরেই গ্রেফতার হন তিনি। তার ওপর করা হয় মারাত্মক নির্যাতন। কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা তাকে মাটিতে ফেলে দীর্ঘসময় ধরে নির্যাতন চালায়। ভেঙে দেওয়া হয় দীন ইসলামের ডান পা। তিনি বুধবারকে বলেন, তাদের নির্যাতনে আমার সমনের পাটির দাঁত থুতনির ভেতরে ঢুকে যায়। গলগলিয়ে রক্ত বের হয়ে আসে। লাথি খেয়ে নিচে পড়েই সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ি।
টিভি মিডিয়ার অভিযোগ : টেলিভিশন মিডিয়ার কাছ থেকে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ভিডিও ফুটেজ চায়। প্রচারিত এবং অপ্রচারিত ফুটেজ প্রদানের জন্য মিডিয়াগুলোর ওপর সরকারি এসব সংস্থা চাপ সৃষ্টি করে। এমনও নজির আছে যে, একটিমাত্র নির্দিষ্ট ঘটনার জন্য সরকারের অনেক সংস্থা মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রচারিত এবং অপ্রচারিত ভিডিও ফুটেজ প্রদানের জন্য চাপ প্রয়োগ করে। সাম্প্রতিককালে অনেকগুলো ঘটনায় গণমাধ্যমের কাছে ফুটেজ চাওয়া হয়েছে বলে জানা যায়। এমনকি খুব সাধারণ ঘটনার ক্ষেত্রেও যেমন প্রেসক্লাবে একটা সংবাদ সম্মেলন হয়েছে সেখানে কি হলো সেই ফুটেজ পর্যন্ত চাওয়া হয় বলে জানা গেছে। তারা লিখিত এবং মৌখিকভাবে ফুটেজ চেয়ে তা মিডিয়াগুলোকে দিতে বাধ্য করে। এ প্রসঙ্গে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল বৈশাখি টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল বুধবারকে বলেন, এভাবে ফুটেজ নেওয়ার প্রশ্নে আমি বলবো, ‘গোয়েন্দা সংস্থার মতো করে সংবাদ মাধ্যমগুলোকে ব্যবহার করা হয়। এটা গণমাধ্যমের জন্য বিপজ্জনক।’ আরেকটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এটিএন বাংলার বার্তা প্রধান জ ই মামুন বলেন, ‘সরকারের বিভিন্ন সামরিক-বেসামরিক সংস্থার মাধ্যমে মন্ত্রণালয়, সামরিক সংস্থার বিভিন্ন শাখা আমাদের কাছ থেকে বিভিন্ন বিষয়ের ভিডিও ফুটেজ চেয়ে থাকে। তারা আমরা যেসব ফুটেজ প্রচার করেছি তার পাশাপাশি যেসব ফুটেজ প্রচার করিনি সেসব রাশ ফুটেজও চায়। তাদের এই চাওয়ার ধরন দুই রকম, কখনো কখনো টেলিফোনে মৌখিকভাবে, আবার কখনো কখনো চিঠি দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে।’
ফুটেজ প্রদানের ক্ষেত্রে নীতি-নৈতিকতা : সংবাদ মাধ্যমের কাছ থেকে এভাবে ভিডিও ফুটেজ চাওয়ার ক্ষেত্রে সরকার কোনো নীতি-নৈতিকতা অবলম্বন করছে না। দেখা যায়, একটা বিশ্ববিদ্যালয়, গার্মেন্টস এলাকায় যদি সংঘর্ষ হয় তখন যদি বলা হয় টেলিভিশনে প্রচারিত ফুটেজ দেখে জড়িতদের ধরা হবে তাহলে কিন্তু ওই এলাকায় আর টিভি মিডিয়ার ক্যামেরাম্যানরা যেতে পারে না। কারণ আন্দোলনকারীরা মনে করে এই ক্যামরার ফুটেজ দেখেই তাদের ধরা হবে। এসব আতঙ্কের কারণে সংবাদকর্মীরা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এমন ঘটনাও আছে। এ বিষয়ে মঞ্জুরুল আহসান বলেন, ‘আমার টেলিভিশনে যেটা প্রচার হয়েছে সেটা আমি দিতে পারি, কিন্তু এর বাইরে যেটা একেবারেই রাশ ফুটেজ সেটা আমি কখনোই দিতে পারি না। তাছাড়া টেলিভিশন দেখে অপরাধীদের ধরা হচ্ছে, মানুষ যদি এটা মনে করে, তাহলে আমাদের ওপর একটা চাপ পড়ে। তখন মনে হয় আমরা সংবাদ মাধ্যম না, আমরা গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করছি। এটা বড় ধরনের একটা ঝুঁকি। গোয়েন্দা সংস্থা যদি তাদের মতো করে ভিডিও করে সেটা তাদের বিষয়। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমকে ব্যবহার করে তারা তাদের কাজ করবে এটা খুবই নীতিবিরুদ্ধ কাজ। তাই আমি বলবো, টেলিভিশনের কাছ থেকে এভাবে ফুটেজ চাওয়া এবং দেওয়া দুটোই নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য।’ জ ই মামুন বলেন, ‘টেলিভিশনে প্রচারিত ফুটেজ কেউ চাইতে পারে। সেটা আমরা হয়তো দিতেও পারি। কিন্তু যখন কোনো ধরনের আবেদনপত্র ছাড়াই কেবল মৌখিকভাবে এ ধরনের ক্ষেত্রে ফুটেজ চাওয়া হয় তখন আসলে নীতিগতভাবে দেওয়ার কোনো কারণ নেই। কিন্তু বাংলাদেশে আসলে লিখিত আইনের বাইরেও অনেক কিছু আমাদের মেনে চলতে হয়। সরকারের একটা সংস্থা যখন আমাদের কাছে মৌখিকভাবে বলে তখন আমাদের ধরে নিতে হয় এটা এক ধরনের আদেশ। কারণ সামরিক ও বেসামরিক প্রভাবশালী কিছু প্রতিষ্ঠান আছে। এ কারণে আমাদের মধ্যে এক ধরনের সেন্সরশিপও কাজ করে। কারণ কোনো ফুটেজ চাইলে সেটা না দিলে পরবর্তীতে তারা আমাদের সঙ্গে ঝামেলা করবে।’
গণমাধ্যমের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে : মিডিয়া থেকে তথ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে ওয়ান-ইলেভেনের সময় চাপ ছিল। তবে নির্বাচিত সরকারের আমলে এসে শুধু সেই চিত্রের পরিবর্তন ঘটেছে, তবে গুণগত কোনো পরিবর্তন হয়নি। অপ্রকাশ্যে সেই কাজ থেমে নেই। দেখা যায়, একটি ঘটনার জন্য মিডিয়াকে অনেক সংস্থার কাছে ফুটেজ সরবরাহ করতে হচ্ছে। এটা মিডিয়ার জন্য অনেক সময় ঝামেলার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মিডিয়া বিশ্লেষকরা বলছেন, এভাবে চাপ সৃষ্টি করাটা অনৈতিক কাজ। এটা করে গণমাধ্যমের কাজে বাধা প্রদান করা হচ্ছে। গোয়েন্দাবৃত্তির কাজে মিডিয়াকে ব্যবহার করা হবে এটা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। এ প্রসঙ্গে মঞ্জুরুল আহসান বলেন, ‘ভিডিও ফুটেজ প্রদানের ক্ষেত্রে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। এখানে আমাদের কথা হচ্ছে, আমরা সোর্সের নাম প্রকাশ করবো না, আমরা কোনো তথ্যপ্রমাণ কারো হাতে তুলে দিতে বাধ্য নই। তারা আমাদের কাছে ফুটেজ চাওয়ার অর্থই হচ্ছে এক ধরনের চাপ সৃষ্টি করা।’ জই মামুন বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে আমাদের চাপের মধ্যে থেকেই ফুটেজ সরবরাহ করতে হয়। এটা আসলে স্বাধীন সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে অন্তরায়। একটা বিষয় হচ্ছেÑ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় যদি আমাদের কোনো বিষয় প্রচার করতে বলে সেটা আমরা করে থাকি। কিন্তু সরকারকে কোনো ফুটেজ আমরা দেব কিনা সেসব বিষয়ে কোনো আইন বা নীতিমালা নেই। এটা আমরা করতে চাই না, তবুও আমাদের করতে হয়। তাদের এভাবে আমাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। সরকারের এজেন্সিগুলো টেলিভিশনে প্রচারিত অনুষ্ঠানগুলোকে ২৪ ঘণ্টা রেকর্ড করে নিলেই পারে।’
গণমাধ্যম কি গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগী? : গণমাধ্যমের ওপর এভাবে চাপ প্রয়োগ করে বিভিন্ন ঘটনার ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করে সে বিষয়ে সরকারের পদক্ষেপ নেওয়াটা যেমন বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষের জন্য তেমনি পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন গণমাধ্যম কর্মীরাও। এভাবে ফুটেজ নেওয়ায় গণমাধ্যম কর্মীরা গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগী হয়ে কাজ করছে কিনা এমনটা খোদ গণমাধ্যম কর্মীদেরই বক্তব্য। এ প্রসঙ্গে প্রবীণ সাংবাদিক এবং এনটিভির সাবেক প্রধান নির্বাহী আতাউস সামাদ বলেন, ‘টেলিভিশন চ্যানেলগুলো যে অংশ প্রচার করে সেটুকু গোয়েন্দারা রেকর্ড করে রাখে বলেই জানি। তারপরও রাশ কপিটা চাওয়া অন্যায়। গোয়েন্দাবৃত্তির কাজে গণমাধ্যমকে এভাবে সম্পৃক্ত করাটা আসলে ঠিক না।’ মঞ্জুরুল আহসান বলেন, ‘আমরা যদি এ ধরনের কাজে ব্যবহৃত হই তাহলে আমাদের কাজে বাধা তৈরি হবে। সাধারণ মানুষ ধারণা করবে, আমরা গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগী হয়ে কাজ করছি।’
প্রবীন সাংবাদিক আতাউস সামাদের বক্তব্য : দেশের প্রবীণ সাংবাদিক এবং বেসরকারি টেলিভিশন এনটিভির সাবেক প্রধান নির্বাহী আতাউস সামাদ বুধবারকে বলেন, ‘‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশনের কাছে প্রচারিত এবং অপ্রচারিত ভিডিও ফুটেজ চায়। পেশাগতভাবে এই ধরনের ফুটেজ সরবরাহ করাটা সাংবাদিকতার জন্য বিপজ্জনক। কারণ সরকার ক্ষমতা খাটিয়ে আমাদের কাছ থেকে ফুটেজ নিয়ে সেটাকে একজন লোকের বিরুদ্ধে তদন্তের নামে ব্যবহার করবেÑ এটা যদি চলতে থাকে তাহলে আমরা অনেককে আমাদের শত্র“ বানিয়ে ফেলবো। এমনকি যখন কোনো বিক্ষোভ হবে, তখন সেখানে কোনো সাংবাদিক যেতেই পারবে না। সাংবাদিকদের উপরে হামলা করবে, ক্যামেরা ভেঙে দেবে, অপমান করবে। এভাবে চলতে থাকলে আমরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবো না। অন্যদিকে প্রশ্ন হচ্ছে, যদি কোনো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার সময় কেউ ছবি তুলে থাকে আর সেই ছবিটা যদি রাষ্ট্র সাক্ষ্য হিসেবে দেখাতে চায় তাহলে আদালত থেকে সেটা চাওয়া হোক। অথবা দেশে আইন করা হোক যে, এরকম চাহিবামাত্র দিতে হবে। বহুদেশেই আইন আছে, কারো বাড়িতে সার্চ করতে হলেও আদালতের একটা ওয়ারেন্ট লাগবে। তাহলে সেই প্রেক্ষাপটে বলবো, আমাদের কাছে এভাবে ভিডিও ফুটেজ চাওয়াটা ঠিক না।
‘‘আমি বলবো এটা স্বাধীনভাবে সাংবাদিকতা করার পথে অন্তরায়। আদালত যদি চান তাহলে আদালত যথোপযুক্ত আইন প্রদর্শন করে হুকুম করতে পারেন। কিন্তু আমাদের জানা মতে, এরকম কোনো আইন নেই। এখন এটা তাহলে সংসদে আলোচনা হোক। তার আগে তদন্ত কাজে সহায়তার জন্য আমরা বড়জোর যেটা করতে পারি, সেটা হচ্ছে প্রচারিত অংশের একটি কপি আমরা তাদের দিতে পারি। আমাদের কাছে চাপ দিয়ে তারা আমরা যা চিত্রগ্রহণ করেছি সেগুলো চাইবে, এটা হতে পারে না। এটা খুবই অন্যায়। যে ধরনের বিক্ষোভ হয় সাধারণত এগুলোতে সরকারের ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া। সরকার যখন ভুল কাজ করে, অপকর্ম করে, মানুষকে উত্ত্যক্ত করে তখন মানুষ মাঠে নামে। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে বিক্ষোভ বা প্রতিবাদ হবে সরকার এমন কাজ করে কেন? সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বজায় রাখতে হলে গণমাধ্যমের কাছে এভাবে ভিডিও ফুটেজ চাওয়াটা অনুচিত। এতে গণমাধ্যমের লোকজন একদিকে বিপন্ন হয় অন্যদিকে স্বাধীনতা ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যায়। কারণ যারা এই কপি চায় তারা গণমাধ্যমকে তাদের সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। এভাবে চলতে থাকলে রাষ্ট্র পুলিশি রাষ্ট্র হয়ে যাবে। আমরা এই অবস্থা থেকে মুক্তি চাই। স্বাধীনতা চাই।’’
মানবাধিকার কমিশনের বক্তব্য : ভিডিও ফুটেজ দেখে গ্রেফতার এবং গ্রেফতারের হুমকি সম্পর্কে বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, টেলিভিশনে প্রচারিত বা অপ্রচারিত ফুটেজ এভাবে চাওয়াটা গণতান্ত্রিক নয়। কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে এটা হতে পারে না। গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর এভাবে হস্তক্ষেপ গণতন্ত্র সুলভ নয়। এটা গণতন্ত্রের জন্য শুভলক্ষণও নয়। ভিন্ন মত এবং পথ থাকতেই পারে। অনেক ক্ষেত্রে সরকার যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন না করতে পারলে গণআন্দোলন হবেই। এই আন্দোলনকে দমানোর জন্য এটা কোনো সমর্থনযোগ্য পদ্ধতি হতে পারে না। রাষ্ট্রের উচিত জনগণ কি চায় সেটাকে মূল্যায়ন করা। রাষ্ট্র যদি সেটা না করে তার পছন্দকেই জনগণের ওপর চাপিয়ে দিতে চায় তাহলে সেটা দুঃখজনক। মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে গণমাধ্যমের ওপরে এভাবে চাপ সৃষ্টি কখনোই সমর্থন যোগ্য নয়।
লেখাটি সাপ্তাহিক বুধবারের চলতি সংখ্যায় প্রকাশিত

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



