* ওই মামা কি করস, চল ফুটবল খেইলা আসি।
* দূর ব্যাটা ফাইজলামি করস? এতো রাতে ফুটবল খেইলা আসি।
* আরে মামা... রাতের ফুটবল খেলা বুঝছ না? ওইটা আর কি, ডিস্পেনসারি থেকে এংলেট কিনে যাইতে হয়।
* ও! না, মামা আজ সারাদিন রিয়ার সঙ্গে ছিলাম তুই যা।
অবাক হওয়ার কিছুই নেই। আপনি এখন সেই আধুনিক যুগেই বসবাস করছেন, যে আধুনিক যুগের আধুনিকতার সিল হচ্ছে উপরের এই সংলাপগুলো। এই সংলাপগুলো দুই বন্ধুর একান্ত কোনো কথা নয়, দর্শকদের সামনেই তারা রীতিমতো টিভি নাটকে বলছে হরহামেশাই। মোটামুটি টিভি নাটক দেখার অভ্যাস আছে, এমন যে কেউই হয়তো ধরতে পারবেন এসব সংলাপ কোন ধরনের পরিচালকের নাটকে ব্যবহার হচ্ছে। সঙ্গত কারণেই নাটক ও পরিচালকের নাম এখানে উল্লেখ করা হচ্ছে না।
দেশে যে হারে টেলিভিশন চ্যানেলের সংখ্যা বেড়েছে, তাতে গণমাধ্যমের প্রফেসনালিজম আরো অনেক বাড়ার কথা ছিল। কিন্তু আমাদের জন্য খুবই দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হচ্ছে, তা হয়নি। আর বাস্তবতা হচ্ছে, ভালো না হলে, ঠিক সেই পরিমাণ বা তারও বেশি খারাপ হবে এটাই স্বাভাবিক। সম্ভবত আমাদের খারাপের মাত্রাটা একটু বেশিই হয়েছে। আর এর বেশিরভাগই হয়েছে আধুনিকতার দোহাই দিয়ে। জানা না থাকলে গুনাহ্ মাপের মতোইÑ আধুনিকতার দোহাই দিয়ে অশ্লীলতা অনেকটা আমরা জায়েজ করে ফেলেছি। এসব দেখে শুনে যাদের মাথায় চিনচিনে ব্যথা করে, তারা চুপ করে থাকেন নানা কারণে। কারণগুলোর মধ্যে প্রধান নিজে ‘ব্যাকডেটেড’ অপবাদ পাওয়ার সম্ভাবনা। আর অন্য কারণগুলোর প্রধানটিই হচ্ছে নানারকম সামাজিক অস্থিরতা।
সমাজের চলমান পরিস্থিতিকে বোঝাতে বা চলমান পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে যে ধরনের নাটক সাধারণ দর্শকদের গেলানোর চেষ্টা চলছে তা নিঃসন্দেহে ভয়ঙ্কর বার্তা বহন করছে। গণমাধ্যমের কাজ সমাজের বাস্তব চিত্র তুলে ধরা। কিন্তু এখন যেসব নাটক প্রচারিত হচ্ছে সেসবের মাধ্যমে মোটেও তা হচ্ছে না। এসব নাটকের মাধ্যমে সমাজের বিপথগামী একটি ক্ষুদ্রগোষ্ঠীর আচার-আচরণকে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে প্রদর্শনের মাধ্যমে তাদেরও অপসংস্কৃতির মধ্যে নিক্ষেপের চেষ্টা ছাড়া কিছুই নয়।
বাস্তব অবস্থা হচ্ছে, এই দেশের চলচ্চিত্রের সোনালী অতীতকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছে একটি অপশক্তি। আর সেই অপশক্তিই এখন বেশ তৎপর হয়ে উঠেছে টিভি নাটকের ঐতিহ্যকে ধ্বংস করার নেশায়। বিস্ময়কর বিষয় হচ্ছে, এসব জেনে এবং বুঝতে পেরেও আমাদের রাষ্ট্র চুপ করে থাকে। হয়তো চুপ করে থাকতে বাধ্য হয়। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের এই চুপ করে থাকাটা যে গোটা জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক বিকাশের জন্য কতোটা ভয়াবহ তা সচেতন মানুষমাত্রই অনুমেয়। তাই এ ক্ষেত্রে সচেতনদের সম্মিলিত সাংস্কৃতিক যুদ্ধের কোনো বিকল্প নেই, থাকতে পারে না।
সমাজের বাস্তব অবস্থা তুলে ধরার দোহাই দিয়ে যারা নাটকগুলো নির্মাণ করছেন তাদের নাটকের সংলাপ এবং চিত্রায়ন এতোটাই নিচে নেমেছে যে, শুধু একটি নাটকের দৃশ্যের উদাহরণ দিলে বুঝতে সুবিধা হবে। ওই একই গ্র“পের একজন পরিচালক একটি নাটক বানিয়েছেন, পকেটমারের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক নিয়ে। সেই নাটকের একটি দৃশ্যে দেখা যায়, পুলিশ অফিসারের শরীর ম্যাসেজ করছে পকেটমার। একটু পরে শরীর ম্যাসেজ শেষ হলে থানা থেকে বের হয়ে যায় পকেটমার। আবার কয়েক সেকেন্ড পর থানায় ঢুকে সেই পুলিশ অফিসারের সামনে কাচুমাচু করতে থাকে। আর এই দেখে পুলিশ অফিসারের প্রশ্ন, ‘কি হইলো আবার আসছোস কেন?’ জবাবে পকেটমার স্যার বলে অফিসারের দিকে মানিব্যাগটা বাড়িয়ে ধরলেন। অফিসার, ‘আমার পকেট মাইরা দিছস? দেহি সব ঠিক আছেনি!’ মানিব্যাগ চেক করে দেখলেন টাকা-পয়সা ঠিকই আছে সব। কিন্তু কিছু একটা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ‘কিরে অইটা কই?’ অফিসারের প্রশ্ন। আবার কাচুমাচু পকেটমারের। অবশেষে হাত বাড়িয়ে ওই জিনিসটা দিয়ে দিল। জিনিসটা পুরোটাই দর্শককে দেখালেন। আর এটা ছিল জন্ম নিয়ন্ত্রণ প্রতিরোধক বস্তুর প্যাকেট।
আসলেই কি এটা সমাজের বাস্তব অবস্থা? সমাজের কয়েকজন বিপথগামী মানুষ কিভাবে গোটা সমাজের চিত্র হতে পারে এটা ওই মহান পরিচালকের কাছে প্রশ্ন। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ তার কোমলমতি শিশুর প্রশ্নের কবলে পড়েন। এই শিশুরা প্রশ্ন করে ‘কোথা থেকে বাবু আসে, কিভাবে জন্ম নেয়।’ পরিচালকদের বলবো, আমাদের বসে থাকার সময় নেই, এগিয়ে যেতে হবে। আধুনিক হতে হবে। তাই আপনারা আর সময় নষ্ট না করে, শিশুদের এই প্রশ্নের জবাব নিয়ে নাটক বানিয়ে ফেলেন। খাবে বেশ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



