বর্তমানে দেশ জুড়ে সর্বাধিক আলোচিত বিষয় হচ্ছে দু'টি। একটি হচ্ছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এর বাংলাদেশ সফর এবং মেসি ও তাদের আর্জেন্টিনা দলের আগমন। তরুণ প্রজন্ম মেসি এবং তার দলের ব্যপারেই বেশী আগ্রহী। এ নিয়ে মিডিয়াতে তো তোলপাড় চলছে। আর এই মেসি ম্যাজিকের ফাঁকেই সম্ভবত: ভারতের শতভাগ স্বার্থ রক্ষা এবং বাংলাদেশের দাসখত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়ে যাবে। মনমোহন সিং এর বাংলাদেশ সফর সম্পর্কে অনেকেই লেখছেন। এই চুক্তির ক্ষতিকর দিক সম্পর্কেও মোটামুটি লেখা এসেছে। কিন্তু মেসি ম্যানিয়া সম্পর্কে তেমন কোন লেখা নেই। উপরন্তু এই ব্লগেও তাদের হাবি জাবি সব তথ্য নিয়ে দেয়া পোষ্টের জয়জয়কার। মেসি কখন হাঁসলেন, কখন ঘার বাকা করলেন, কার সাথে হ্যান্ডশেক করলেন, কার দিকে ফিরে তাকান নি.... ইত্যাদি ইত্যাদি ফালতু বিষয়ের বিরক্তিকর ছড়াছড়ি। এসম্পর্কে আমার আগে পোষ্ট করা একটি লেখা প্রাসঙ্গিক মনে করে পোষ্ট করা হলো। আশা করি এটি মুসলিম যুব তরুণদের খানিকটা হলেও কাজে আসতে পারে।
‘বিজয়ের’ স্বপ্নে পরাজিত তারুণ্য:
সমাজের আজকের তরুণ-যুবকদের স্বপ্ন কি? তাদের কাঙ্খিত লক্ষ্য কোন টি? কি হতে চায় তারা?
হ্যঁ, তাদের কিছু চাওয়া আছে। কিছু লক্ষ্য আছে। আছে কিছু স্বপ্ন বিজয়ের স্বপ্ন।
কেউবা স্বপ্ন দেখে ভালো গায়ক হবার। নোলক, সোনিয়া, বিউটির মতো গান গেয়ে দর্শক নন্দিত ক্লোজআপন ওয়ান হওয়ার। কেউ আবার স্বপ্ন দেখে নায়ক হওয়ার। কেউবা হতে চায় লাক্স চ্যানেল আই সুন্দরী প্রতিযোগীতার ষ্টার। হলে হলে তার ছবি চলবে, দর্শক তাকে দেখলে ভীড় করে অটোগ্রাফ চাইবে। ক্যামেরার ঝলক সূর্যের আলোকে ম্লান করবে।
এর বাইরে ব্যতিক্রমী বিজয়ের গল্পও আছে। গত বছরের ২২ মে মূসা ইব্রাহীম নামক এক বাংলাদেশী যুবকের এভারেষ্ট বিজয়ের কাহিনী দেখে পুরো দেশ যেন হুমড়ি খেয়ে পড়েছিলো তাকে সংবর্ধনা দিতে। এনিয়ে সারা দেশ প্রায় কয়েক মাস মূসা জ্বরে আক্রান্ত ছিলো। তার সেই কল্পিত বিজয়ের সূত্র ধরে গত ২১ মে দ্বিতীয় বাংলাদেশী তরুণ হিসেবে এভারেষ্টের চূড়ায় উঠেন এম এ মুহিত।
এর বাইরেও আমাদের যুব-তরুণদের কল্পিত বিজয়ের অনেক স্বপ্ন আছে। যার মধ্যে ক্রিকেট খেলা অন্যতম। ক্রিকেটে আমাদের সোনার ছেলেরা একটি দেশকে পরাজিত করতে পারলে পুরো দেশ সেই বিজয়ের জ্বরে কিভাবে আক্রান্ত হতে পারে তার দৃষ্টান্ত আমরা অতীতে দেখেছি বাংলাদেশের ক্রিকেট টিম কর্তৃক অন্য দেশকে হারানোর সময়। যুব-তরুণদের মধ্যকার এই ক্রেজকে আরো শত-সহস্র গুন বাড়িয়ে দেয়ার মহান দায়িত্ব (?) পালন করে যাচ্ছেন আমাদের দেশে একচেটিয়া ব্যবসা করা বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানী গুলো।
মালিন্যাশনাল কোম্পানী ও কর্পোরেট মিডিয়া গুলো ভালো নায়ক, গায়ক, অভিনয় শিলী, সুন্দরী প্রতিযোগীতায় বিজয়ী হওয়া, ভালো ক্রিকেটার হওয়া, এভারেষ্টের চূড়ায় ওঠার মতো ঠুনকো বিষয়াবলীকে আমাদের আজকের তরুণ-যুবকদের সামনে তাদের জীবনের সাফল্যের মানদন্ড নির্ধারণ করে দিচ্ছে। কিছুদিন আগে টিভিতে বিজ্ঞাপন দেখানো হয়েছে -বাংলাদেশের নাম নাকি সাকিবুল হাসান। দেখানো হচ্ছে নবজাতক সন্তানদেরকে তাদের পিতা-মাতা সাকিবের নামে নাম রাখছে। সাকিবুল হাসান কোন মহা ব্যক্তি? তিনি একজন ভালো ক্রিকেটার। তার মানে কি একজন ভালো ক্রিকেটার হওয়াই এই উম্মাহর সন্তানদের সামনে সবচেয়ে বড় অর্জন?
দিন দিন মুসলিম জাতি তার সন্তানদের এধরণের বিভিন্ন জয় আর বিজয়ের কাহিনী অবলোকন করছে একে একে। কিন্তু এতো জয় আর বিজয় সত্ত্বেও অবস্থা যেন সেই তিমিরেই। জাতির মূল স্বত্ত্বার মাঝে উন্নতি আর সফলতার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং দিন দিন তাদের অধঃপতন আর অধঃগতি এবং সমস্যার কঠিন থেকে কঠিনতর স্তরে বাঁধা পরে যাবার দৃষ্টিই ফুটে উঠছে। নায়ক আর গায়ক হওয়ার স্বপ্নে, বিভোরদের খুব কমই নোলক হতে পারে। দারুচিনি দ্বীপের নায়িকা হওয়ার স¡প্নও অল্প কয়েকজনেরই পূরণ হয়। যারা এতো কষ্টে-সৃষ্টে গতানুগতিক ষ্টার হন, তাদের অধিকাংশই এক সময় আলোর রাজপথে থাকার পরিবর্তে অন্ধকার গলিতেই নিজের স্থায়ী ঠিকানা গড়ে নিতে বাধ্য হন। আর যারা বিফল হন তাদের বছরের পর বছর হুজুগে পরে সময় নষ্টের কষ্ট তখন সীমাহীন হয়ে দাঁড়ায়।
মুসলিম উম্মাহর যুব-তরুণ সম্প্রদায়কে আজ বিভিন্ন চক্রান্তের মাধ্যমে ঘুম পাড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। আজকে যুব সমাজকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানী তাদের নীতি-নৈতিকতা বিবর্জিত চরিত্র বিধ্বংসী নানাবিধ কর্মসূচী বাস্তবায়ন করছে। কর্পোরেট মিডিয়ার সহযোগিতায় তারা মুসলিম তরুণ-তরুণীর মধ্যকার হিযাব এবং পর্দাকে উঠিয়ে দেয়ার জন্য জেহাদ শুরু করেছে। তারা এমন একটি নতুন ট্রেন্ড চালু করেছে, যার মাধ্যমে বর্তমানে এক বোতল কোমল পানীয় থেকে শুরু করে বিস্কিট, চকোলেটের বিজ্ঞাপনেও তরুণ-তরুনীর অর্ধ-উলঙ্গ নাচকে ফরজ করে দিয়েছে। ভাবখানা এমন যে, পন্য যাই হোক না কেন, তার বিজ্ঞাপনে মুসলিম তরুণ-তরুনীর এক সাথে ঢলাঢলি করে নাচতে হবেই। না হলে সেই পন্য মানসম্মত হবে না এবং বিক্রিও হবে না?। মোবাইল অপারেটর কোম্পানীর কয়েকটি বিজ্ঞাপন তো হিন্দুদের হলি খেলার ঢলাঢলিকেও হার মানিয়েছে। একটি কোম্পানী তরুণদের কাছে তার সিম বিক্রি করার জন্য মধ্য রাতে তরুণ-তরুণীকে গোপানে তাদের ঘর ছেড়ে বের হয়ে খোলা মাঠে এসে উদ্দাম নৃত্যের তালে তালে নাচার নসিহত করছে। তাদেরকে গাইতে বলছে, তুমি আসোনি সাড়া দিতে....
এভাবে তারা এই উম্মাহর শ্রেষ্ঠ সম্পদ তরুণ-যুবকদেরকে ব্যস্ত করে দিয়েছে ইন্দ্রীয় পুজায়। এরপর তাদেরকে ঘোষণা দিয়ে আহ¡ান করছে, "বন্ধু, আড্ডা, গান = হারিয়ে যাও।" অর্থাৎ বন্ধু আড্ডা আর গান নিয়ে তোমরা হারিয়ে যাও। দেশ জাতি ও মুসলিম উম্মাহ নিয়ে তোমাদের ভাবার কোন দরকার নেই। কাছে আসার গল্প শোনানোর নাম করে বিবাহ-বহির্ভূত প্রেম-ভালোবাসাকে সমাজে স্বীকৃতি দেয়ার চেষ্টা করছে তারা।
কিভাবে প্রেম করতে হবে, কোন টুলে দাড়িয়ে প্রেমিকাকে চিঠি দিলে তার হাতে পৌঁছবে তাও বলে দিচ্ছে। নাটক সিনেমার মাধ্যমে লিভটুগেদার আর জিনা-ব্যাভিচারের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে হাতে-কলমে। এভাবে তারা একদিকে মুসলিম তরুণ-তরুণীর মধ্যে পাশবিক চেতনা জাগ্রত করছে, অপরদিকে বিবাহ থেকে তাদেরকে নিষেধ করছে। দূরে সরিয়ে রাখছে। ত্রিশোর্ধ যুবককে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে পরামর্শ দিচ্ছে বিয়ে না করার। তাকে বলছে, আরে ভাই বিয়েতে অনেক খরচ। তাই বিয়ে না করে ১৩০০ টাকা দিয়ে এই মোবাইল সেট কিনেন আর প্রেমিকার সাথে কথা বলে সময় কাটান।
অথচ মহানবী সা. যুবকদেরকে বিয়ে করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং সবচেয়ে বরকতপূর্ণ বিবাহ বলে আখ্যায়িত করেছেন সেই বিয়েকে যেখানে খরচ কম হয়। কিন্তু আজ আমরা বিবাহকে কঠিন থেকে কঠিনতম করেছি, পক্ষান্তরে যিনা-ব্যভিচারকে সহজ থেকে সহজতর করে দিয়েছি। পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণে আমাদের রাষ্ট্র ও বহুজাতিক কোম্পানী গুলো অব্যাহত প্রচেষ্টায় এমন একটা অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে যুবক-যুবতীদের বিবাহ বহির্ভুত প্রেম-ভালোবাসা আর যিনা-ব্যভিচার খুব সহজ একটা বিষয় হয়ে গেছে। কিন্তু ধর্ম ও সমাজ স্বীকৃত বৈধ বিবাহকে দেয়া হয়েছে নির্বাসন। তাই দিন যত যাচ্ছে, যিনা-ব্যাভিচার, ইভটিজিং ও নারী নির্যাতন ততই বেড়েই চলছে।
আফসোস! শত আফসোস!! বিজাতীয় বিভিন্ন এনজিও, মালিন্যাশনাল কোম্পানী আর এদেশীয় আত্মবিক্রিত কতিপয় ‘সুশীল’দের বদান্যতায় আজকের তরুণ-যুবকদের সামনে জয় ও বিজয়ের এই সকল ফালতু ক্রাইটেরিয়া নির্ধারিত হচ্ছে। অথচ একটি সময় ছিলো, যখন মুসলিমরা একটি অঞ্চলকে জালিমের নির্যাতন থেকে মুক্ত করাকেই শ্রেষ্ঠ অর্জন বলে মনে করতো। সেই ভূখন্ডের লোকদের মন জয় করাকেই প্রকৃত বিজয় বলে মনে করতো। এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে ইসলামী আদর্শের দাওয়াত নিয়ে যাওয়াকে চ্যালেঞ্জ মনে করতো। তাদের স্বপ্ন থাকতো একটি অঞ্চলের পর পরবর্তী অঞ্চলে ইসলামী আদর্শকে ছড়িয়ে দেয়া।
একটা সময় ছিলো, যখন মুসলিম মা-বোনেরা তাদের সন্তানদেরকে সাহাবীদের নামে নাম রাখতেন। মুসলিম বীর সেনানী, আর সত্যের কান্ডারীদের পরিচয়ে নিজেদেরকে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করতেন। হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ, মুসান্না বিন হারেসা, মুহাম্মাদ ইবনে কাসিম, সালাহউদ্দীন আইয়ূবী, তারিক বিন যিয়াদপ্রমুখ মুসলিম বীর সেনানীদের মতো হওয়াই ছিলো মুসলিম যুবকদের স¡প্ন। আজকের মুসলিম উম্মাহর যুব-তরুণদের অনেকে হয়তো জীবনেও এই মহান ব্যক্তিদের নামই শুনেনি। তবে আজকের তরুণকে যদি জিজ্ঞেস করেন কোন দলে কয়জন খেলোয়ার আছেন তাদের নাম-ধাম কি, দেখবেন সব কিছু সে বলতে পারবে। জিজ্ঞেস করুন এই সপ্তাহে ইউএস টপচার্টে অবস্থানকারী সিনেমা গুলোর নাম কি, সে অবলীলায় বলে দেবে। জিজ্ঞেস করুন হলিউড-বলিউডের কোন নায়িকার সাথে কার প্রেম চলছে, সে তাও বলতে পারবে। কিন্তু তাকে যদি জিজ্ঞেস করেন মৃত্যুর পর কবরে তাকে প্রথম কি প্রশ্ন করা হবে? কিয়ামতের দিন কোন প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে সে নড়তে পারবে না? -দেখবেন অধিকাংশ যুবকই বলতে পারবে না। কারণ কেউ তার সামনে এসব বিষয়ের গুরুত্ব-প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেনি। আর এটি আমাদের সমাজের যুব-তরুণদের অবক্ষয়ের অন্যতম প্রধান কারণ।
আজকে আমাদের সমাজে চলমান খুবই দুঃখজনক একটি বাস্তবতা হলো, আমরা অনেক সময়ই ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে যুব-তরুণদেরকে ইসলাম থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করে থাকি। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, সুকৌশলে বা অবচেতনভাবে আমরা যুবকদেরকে ইসলাম সংক্রান্ত বিষয় থেকে দূরে সরিয়ে রাখি। এক্ষেত্রে তরুণ-যুবকদের সামনে তুলে ধরা হয়, যৌবনকাল হচ্ছে এনজয় করার সময়। শ্লোগান দেয়া হচ্ছে “লাইফ তো একটাই, ফ্রেশ থাকতে চাই।”
আর যদি কেউ ইসলাম নিয়ে অধ্যয়ন করতে চায়, ইসলাম সম্পর্কে আলোচনা করতে চায় তাহলে তাকে উৎসাহ দানকারীর চেয়ে নিরুৎসাহিত করা লোকের সংখ্যাই সমাজে বেশি দেখা যায়। তাকে বলা হয় আরে রাখো তোমার ধর্ম-কর্ম। ওগুলো তো বার্ধক্যের জন্য। আগে যৌবনকালে আনন্দ-ফুর্তি করো। নিজের ক্যারিয়ার গড়ো। তারপর যখন সময় রিটায়ার্ড করার সময় হবে তখন দেখা যাবে। ব্যবসায়ী হলে সন্তানদের বিয়ে শাদি করানোর পর হজে যেতে হবে। হজ থেকে এসে দাঁড়ি রাখবে। মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়বে। রোজা রাখবে। তখন এই সকল কাজের মাধ্যমে ইসলাম পালন করার বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করা যাবে। অথচ যদি আমরা কুরআন এবং সুন্নাহর দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাবো যে, ইসলাম মানব জীবনের সবচেয়ে বেশী মূল্যবান সময় নির্ধারণ করেছে যৌবনকালকে। প্রতিটি মানুষের যৌবনকাল হচ্ছে ইসলামের দৃষ্টিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ ব্যাপারে অনেক বাণী আছে।
সোনাল যুগে যুব-তরুণদের ইসলাম সম্পর্কে গভীর আগ্রহ ও উদ্দীপনাই ছিলো তৎকালীন বিশ্বে মুসলিমদের উত্থানের অন্যতম প্রধান কারণ। হযরত উমর রা. এর সময়ে মুসলিম তরুণ-যুবকদের বুকে তাদের জামার সাথে একটি গোলাকার বিশ¡ মানচিত্রও সংযুক্ত থাকতো। যেখানে সবুজ রঙের কালিতে মুসলিম ভূখন্ড এবং যে সকল এলাকা মুসলমানদের অধীনে এসেছে তা উজ্জ্বল করা থাকতো। প্রতিটি মুসলিম মা তার সন্তানকে বলতো, “বাবা, তোমার পিতৃপুরুষ ইসলামকে অমুক অমুক মহাদেশ পর্যন্ত নিয়ে গেছেন। যে সকল এলাকা এখনও ইসলামের আলোয় আলোকিত হয়নি। যেখানে আজও ইসলামী জীবন ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হয়নি। জাহেলিয়াত আর কুফরের অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকা এসকল এলাকায় সত্যের আলো তোমাকেই জ্বালতে হবে, ইসলামের হেলালী নিশান তোমাকেই উড়াতে হবে।”
রাষ্ট্রের প্রধান খলীফা ও কর্তাব্যক্তিদের কাছ থেকে মুসলিম তরুণ-যুবকরা দীক্ষা পেতো মজলুম মানবতাকে মুক্ত করার। ইসলামের সুমহান সাম্যের বাণী পৃথিবীর সর্বস্তরে পৌঁছে দেয়ার মহান দায়িত্বকে কাঁধে তুলে নেয়াটাই ছিলো তাদের জীবনের প্রকৃত চ্যালেঞ্জ। মজলুম মানবতাকে কুফরের শৃংখল থেকে মুক্তি দেয়ার মাঝেই তারা খুঁজে পেতো প্রকৃত আত্মিক প্রশান্তি।
মুসলিম যুব-তরুণদের সোনালী যুগের সেই জয়ের নেশা আর বিজয়ের স্বপ্নের কারণেই স্পেনের বুকে উড্ডীন হয়েছিলো আলোর মশাল। তারিক বিন যিয়াদের নেতৃত্বে মুসলিম সেনাবাহিনী বিশাল সাগর পাড়ি দিয়ে জাবালুত তারেক বা জিব্রালার প্রণালীর মুখে এসে দাঁড়িয়ে ছিলেন। রাজা রডারিকের মানবরচিত মতবাদ আর সে¡চ্ছাচারী শাসনের শৃংখল থেকে স্পেনবাসীকে মুক্ত করে তাদেরকে দিয়েছিলেন এক রবের ইবাদতের সোনালী রাজপথ।
মুহাম্মাদ ইবনে কাসিমের মতো মাত্র ১৭ বছরের টগবগে নওযোয়ানরা সেই আরব থেকে এই সূদুর ভারত উপমহাদেশে এক নির্যাতিত বোন ফাতেমার আর্তনাদে সাড়া দেয়ার জন্য ছুটে এসেছিলেন। রাজা দাহিরের বন্দিশালা ভেঙ্গে তারা মুক্ত করেছিলেন মজলুম মানবতাকে।
রাজা গৌরগোবিন্দের নির্যাতন থেকে আমাদের এই বঙ্গদেশকে মুক্ত করতে, মানবরচিত শাসনব্যবস্থার নির্যাতন-নিপীড়ন থেকে এখানকার জনগণকে মুক্ত করার জন্য সেই সূদুর ইয়ামান থেকে ছুটে এসেছিলেন হযরত শাহ জালাল ইয়ামানী রহ.।
গাজী সালাহউদ্দীন আইয়ুবী রহ. এর মতো একজন নওযোয়ান ফিলিস্তিনকে মুক্ত করেছিলেন খৃষ্টানদের হাত থেকে। বছরের পর বছর খৃষ্টানদের নানাবিধ জুলুম-নির্যাতনের কবলে নিষ্পেষিত মজলুম জনতাকে দিয়েছিলেন মুক্তির স্বাদ।
হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রা., মুসান্না বিন হারেসা রা. এর মতো বীর সেনানীরাও তাদের যৌবনে স¡প্ন দেখতেন রোম-পারস্যে ইসলামের বানী পৌঁছে দেয়ার। সেখানকার মানুষকে মানুষের গোলামী থেকে বের করে এক আল্লাহর স্বার্বভৌমত্বে নিয়ে আসার। তারা তাদের এই স্বপ্ন নিজেদের জীবদ্দশাতেই বাস্তবায়ন করেছিলেন।
কিন্তু আজকে কি হলো এই মুসলিম যুব-তরুণদের? কেউ কি আজ কথিত সেই জয় ও বিজয়ের স্বপ্নে বিভোর তারুণ্যের শত চিন্তার মধ্যে একটি বারও এই উম্মাহকে আবারও বিশে¡র বুজে বিজয়ী জাতি হিসেবে পরিচিত করার স¡প্ন তুলে ধরে? ইরাক-আফগান-ফিলিস্তিন-কাশীরসহ বিশে¡র নানা প্রান্তে নির্যাতিত-নিপীড়িত মজলুম মুসলমানদের রক্ত প্রবাহ বন্ধ করা, বিধবা আর সন্তানহারা মা-বোনের অশ্র“ মোছার কল্পনা কি কেউ করে? করে না। এটাই হলো বাস্তবতা। আর এটাই এই উম্মাহর যুব সম্প্রদায়ের বর্তমান অবক্ষয়ের অন্যতম প্রধান কারণ।
মুসিলম উম্মাহর যুব সম্প্রদায়ের এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন আজ জেগে ওঠার। উম্মাহর শ্রেষ্ঠ সন্তান এই বিদ্রোহী তারুণ্য আজ আবারো ঘুরে দাঁড়ায়, তাহলে খোদার কসম! এই পৃথিবীর বিবর্ণ মানচিত্র আবারও তার উজ্জ্বল সৌন্দর্য ফিরে পেতে বাধ্য।
তবে এই পথে চলতে হলে ত্যাগ ও কষ্ট স¡ীকার করার মানসিকতা নিয়ে চলতে হবে। এসব কষ্ট স¡ীকার করে যদি আজ আবারও কেউ উঠে দাঁড়ায় হযরত বিলাল রা. মতো, যিনি উমাইয়া ইবনে খালফের শত নির্যাতনেও মহান আল−াহর একত্ববাদ থেকে ফিরে যান নি।
যদি একটি যুব কওম ঘুরে দাঁড়ায় হযরত উসমান ইবনে আফফান রা. মতো। যাকে দীন ইসলাম গ্রহণ করার কারণে তার চাচা কষ্ট দিয়েছিলো। চাঁটাইয়ের মধ্যে পেচিয়ে আগুনের ধুয়া দিয়েছিলো কিন্তু তারপরও তিনি ইসলাম বিজয়ের মিশন ত্যাগ করেন নি।
যদি একটি দল আজ আবারও উঠে আসে সেই হযরত খাব্বাব আর খুবাইব রা. মতো, যারা শত নির্যাতন সয়েছেন, শূলিতে চড়েছেন কিন্তু আদর্শ বিচ্যুত হননি, নিজের স্থানে প্রিয়নীর আসা বা দীনের এতোটুকু ক্ষতিও মেনে নেন নি।
যদি এই উম্মাহর মা-রা এমন কিছু নবীন সন্তান ধারণ করতে পারে যারা হবে হযরত আবূ আইউব আনসারী রা. মতো। যিনি চরম অসুস্থ হওয়া সত্ত্বেও তুরস্কে এসেছিলেন। তুরস্ক বিজয়ের আগে মৃত্যু এসে গেলে সঙ্গী সাথীদেরকে তিনি এই বলে ওসিয়ত করেছিলেন যে, তাকে যেন তুরস্কের সীমানা প্রাচীরের ভেতরে কবর দেয়া হয়। যেন তিনি কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহর দরবারে বলতে পারেন, এখানকার অধিবাসীদেরকে মানুষের গোলামী থেকে মুক্ত করা ও এই ভূমিতে ইসলামী জীবনাদর্শ পৌঁছে দেয়ার জন্যই তিনি এতোদূর এসেছিলেন!
শত সহস্র ষড়যন্ত্রের মাঝে খানিকটা হলেও আশার আলো দেখা যাচ্ছে। মালিন্যাশনাল কোম্পানী এবং তাদের ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে এই উম্মাহর তরুণ-যুবকরা জাগতে শুরু করেছে। তিউনিসিয়া, মিশর তারপর সেই জোয়ার আসছে বিশ্বের একেক প্রান্ত থেকে। কবে আমরা নিজেদেরকে মানব রচিত মতবাদ আর মানুষের গোলামী থেকে মুক্ত করে আল্লাহর গোলামীর দিকে মনোনিবেশ করতে পারবো, সেটিই এখন দেখার বিষয়। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দিন। আমীন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

