বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, পুলিশ শব্দটিই কেমন যেন! এ শব্দের মাঝে মিশে আছে সন্দেহ আর অবিশ্বাস। শব্দটি শুনলে রাগ এবং ঘৃণা অনুভব করেন এমন মানুষের সংখ্যাও খুব একটা কম নয়। সময়ের পরিক্রমায় এটি অপশব্দ তথা নেগেটিভ শব্দে রূপ নিয়েছে। একটি শব্দ যখন ইতিবাচক বা নেতিবাচকভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠে, বুঝতে হবে তার ‘মাহাত্ম্য’ অনেক। পুলিশ (মেফধডণ) শুধু একটি শব্দ নয়, এক বিশেষ পেশাজীবীও। যে কোনো রাষ্ট্রের অনিবার্য অনুষঙ্গ। অধুনা বিশ্বের প্রায় প্রতিটি কল্যাণ রাষ্ট্রেই রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষীবাহিনী। এ বাহিনীকে আবার একাধিক ভাগে বিভক্ত করা যায়। তবে বাংলাদেশ এবং পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে মূলত পুলিশই হাতে তুলে নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি জনগণের জানমাল হেফাজতের ভূমিকা। কিন্তু বাংলাদেশে পুলিশবাহিনীর ভূমিকা যাই হোক, ইমেজ সন্তোষজনক নয়। ব্রিটিশ পিরিয়ড থেকেই এ বাহিনী স্বীয় কর্মগুণে আলোচিত। পুলিশের ক্ষমতার কথা ভেবে আজও মানুষ ছড়া কাটে-মাছের রাজা ইলিশ/জামাই’র রাজা পুলিশ! পুলিশের ভয়াবহতা প্রবাদে রূপ পেয়েছে-বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা, পুলিশ ছুঁলে ছত্রিশ! জামাই হিসেবে পুলিশকে প্রথম সারিতে স্থান দেয়া হলেও মানুষ হিসেবে কিন্তু অগ্রভাগে রাখা হয়নি। এদেশে পুলিশ মানেই ভেজাল উৎপাদনকারী, দুর্নীতিবাজ, দুর্নীতির আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা, চাঁদাবাজ, ধর্ষক, ঘুষখোর, শক্তের ভক্ত নরমের যম, ধনবান এবং অবৈধ প্রতিপত্তি-বিত্তশালীদের প্রতি নির্লজ্জভাবে নতজানু এবং আরো অনেককিছু।
কেন এই অনাস্থা, সন্দেহ-অবিশ্বাস, বিরূপ মনোভাব? পুলিশ শব্দটিকে মানুষ গ্রহণ করতে পারেনি কেন?
এ প্রশ্নের উত্তর অনেক গভীরে প্রোথিত। সাদামাটা চোখে দেখলে বোঝা হয়ে যাবে, পুলিশের এই চরিত্র একদিনে দাঁড়ায়নি। ব্রিটিশ পিরিয়ড থেকেই পুঞ্জিভূত হতে হতে বর্তমানে এই অবস্থায় রূপ নিয়েছে। এ পেশাজীবীদের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা-ভালোবাসা-সম্মান এখন তলানিতে। নেপথ্যে জোরালো কারণ অবশ্যই আছে। কোনোকিছু এমনিতে হয়ে যায় না। তাহলে কি পুলিশ বিভাগ মানেই অসৎ মানুষের আখড়া, সৎ কোনো মানুষ নেই এখানে! অবশ্যই আছে, কিন্তু নেতিবাচক ইমেজের কাছে চাপা পড়ে পাদপ্রদীপের আলোয় উঠে আসতে পারছে না সেগুলো। তারপরও কিছু কিছু ঠিকই উঠে আসে। কিছু সৎ এবং পরিচ্ছন্ন ইমেজের দেশ ও মানবপ্রেমিক পুলিশ মানুষের চোখে ঠিকই ধরা দেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, সিংহভাগই থেকে যান আড়ালে।
এই পুলিশেরই শিল্পসত্তা যখন পরিস্ফুট হয়ে ওঠে, পুলিশ লেখক-গবেষক-শিল্পী হিসেবে আবির্ভূত হন, তখন বিষয়টা কেমন দাঁড়ায়! একজন পুলিশ সদস্য, পুলিশ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আহমেদ আমিন চৌধুরীর জীবন ও কর্মের দিকে আলোকপাত করলে যে কারোরই চোখে বাসা বাঁধবে মুগ্ধতা, ভালোলাগার মোহন আলো। পুলিশ বিভাগে বেশ কয়েকজন লেখকের উপস্থিতি শক্তিশালী। কিন্তু তুলনামূলকভাবে গবেষক নেই বললেই চলে। অর্থাৎ একই সাথে যারা লেখক ও গবেষকসত্তাকে লালনপালন করে চলেছেন। বাংলাদেশিদের জন্য চরম সৌভাগ্য, একজন নিবেদিতপ্রাণ আহমেদ আমিন চৌধুরী তাঁর সৃজনসম্ভার নিয়ে, নিজের সবটুকু সৃজনশীলতা-প্রজ্ঞা-মেধা-কর্মযজ্ঞ নিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন। তিনি তাঁর সময়টাকে অর্থবহ করে তুলতে চেয়েছেন, তাঁর একার প্রচেষ্টায় পুরো একটি জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য-কৃষ্টি-সংস্কৃতির উর্বর জমিন ভরে উঠছে ফুলে-ফলে। যে মহতী কর্মের সূচনা করেছেন তা যে প্রজন্মের পর প্রজন্মের বাতিঘর হয়ে পথ দেখাবে, আলোকিত করবে-বলার অপেক্ষা রাখে না।
ঐতিহ্য অনুরাগী এ গবেষক একদিনে গড়ে ওঠেননি; পারিবারিকভাবে তিনি গঠিত হয়েছেন। বাবা মরহুম আবদুল হক চৌধুরী একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠিত গবেষক। বিশেষ করে চট্টগ্রাম-গবেষক হিসেবে তিনি চট্টগ্রামবাসীদের কাছে প্রাতঃস্মরণীয়। আর পুরো বাংলাদেশের মানুষের কাছে প্রণম্য। পারিবারিক উত্তরাধিকার যে কোনো মানুষকেই সমৃদ্ধ করে; জনাব আমিনকে করেছে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। পিতাকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার কোনো গোপন অভিলাষ তাঁর মনে লুকায়িত আছে কিনা, এটা জানার উপায় নেই; তবে তিনি যে পিতার আদর্শ বুকে ধরে রেখেছেন, পিতার কাজের পাশে আরো নতুন নতুন কাজ যুক্ত করে চলেছেন-উত্তরাধিকার সংস্কৃতিটি এককথায় সাধুবাদযোগ্য। পিতা আবদুল হক চৌধুরী ২০১১ সালে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পদক লাভ করেছেন। ব্যক্তিজীবনে সৎ, নির্লোভ এ মানুষটি যথার্থ উত্তরসূরি তৈরি করেছেন। তাঁর সফল প্রতিনিধি আহমেদ আমিন চৌধুরী ১৯৭১ সালে দেশমাতৃকার টানে ঝাঁপিয়ে পড়েন। প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেন মুক্তিযুদ্ধে। এই বিজয়ের পরই তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন অন্যরকম, আরেক যুদ্ধে। সেদিকে আলোকপাত করার আগে আমরা তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত জেনে নিই-
১৫ জানুয়ারি, ১৯৫০-এ জন্ম আহমেদ আমিন চৌধুরীর। জন্মস্থান : নোয়াজিষপুর, রাউজান, চট্টগ্রাম। ১৯৬৫ সালে গহিরা হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন। ১৯৬৭ সালে রাউজান কলেজ থেকে এইচএসসি, ১৯৬৯ সালে স্যার আশুতোষ কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। ৪ জানুয়ারি, ১৯৭১-এ পুলিশ একাডেমী সারদায় ক্যাডেট এসআই হিসেবে কর্মজীবনের শুরু। ১২ এপ্রিল ১৯৭১ সালে একাডেমী এলাকার মুক্তিযোদ্ধার মুক্তিযোদ্ধার কার্যক্রম শেষে ১৩ এপ্রিল ভারতের বহরমপুর কেএন কলেজ ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যোগদান করেন। পাকহানাদারদের নাস্তানাবুদ করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের আকাশে উদয় হয় স্বাধীনতার সোনালি সূর্য। একটি নতুন দেশ হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে জায়গা করে নেয় বাংলাদেশ। স্বাধীনতার অব্যবহিত পর এ উদ্যমী মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েন ‘অস্ত্রহীন যুদ্ধে’। এ যুদ্ধ দেশ গড়ার। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটিকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর। যত রকমভাবে দেশসেবা করা যায়, তন্মধ্যে সবচেয়ে বড় হচ্ছে রাষ্ট্রের যে কোনো চাকরিজীবী কর্মীর স্ব স্ব অবস্থান থেকে নিজ দায়িত্ব সুচারুরূপে পালন করা। এ মন্ত্রে পুরোদমে দীক্ষিত জনাব আমিন। বৃহত্তর সিলেট, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মানিকগঞ্জ, বরগুনা, গোপালগঞ্জ, কুমিল্লা ও ঢাকার বিভিন্ন স্থানে দায়িত্বপূর্ণ পদে চাকরি করেছেন তিনি। তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার, সুদীর্ঘ সাড়ে ছয় বছর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-এর অভিজ্ঞতা সাপ্লাই অফিসে সহকারী পুলিশ কমিশনার সাপ্লাই হিসেবে তাঁর নিয়োজিত থাকা। এটাই স্মরণকালের দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব পালন। কর্মধারাবাহিকতায় গোপালগঞ্জে প্রায় সাড়ে তিন বছর ও কুমিল্লায় প্রায় দেড় বছর যাবৎ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একজন সৎ, সাহসী ও বিচক্ষণ পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর ভিত নির্মিত হতে থাকে। পেশাগত জীবনে মালয়েশিয়ার ইপো শহরে ১৯৭৬ সালে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১৯৮৯ সালে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে আফ্রিকার নামিবিয়ার স্বাধীনতা প্রক্রিয়ায় সর্বপ্রথম আনটাগ মিশনে যোগদান করেন। এছাড়াও জীবনের পরতে পরতে অনেক স্থানে তিনি রেখে এসেছেন স্বীয় পদচিহ্ন। সবকিছুরই শেষ আছে। তাঁরও কর্মজীবনের সমাপ্তি ঘটে একসময়। সরকারি নিয়মে ২০০৭-এর জানুয়ারিতে অবসর গ্রহণ করেন এ কর্মবীর। অবসর নেয়ার পরই গবেষণায় পুরোদমে মনোনিবেশ করেন। এছাড়াও বিভিন্ন সমাজকল্যাণমূলক ও সামাজিক সংস্থার সাথে গণউন্নয়নে নিজেকে আরো ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত রেখে কাজ করে চলেছেন।
চাকরিজীবনে কর্মব্যস্ততার জন্য গবেষণায় শতভাগ মনোযোগ দিতে পারেননি, সে সুযোগটা এবার ফিরে আসে। নতুন-পুরোনো কাজ সবকিছুকেই নতুন করে, নানা দৃষ্টিকোণ থেকে ফিরে দেখা শুরু করলেন। আহমেদ আমিন চৌধুরী শুধু একজন গবেষকই নন, লেখকও। অন্য অনেক গবেষকের মতো তিনি গবেষণা থিস্িস পেপারে সীমাবদ্ধ বা আলমারিতে রেখে দেননি। মানুষের মানসিক পরিপুষ্টি সাধনে, ভাবনার খোরাক জোগাতে, জ্ঞানচর্চার জায়গা উন্মুক্ত করতে ভাবনাগুচ্ছ ছড়িয়ে দিচ্ছেন বইয়ে। তাঁর প্রতিটি বই অনুসন্ধানী পাঠকের জিজ্ঞাসা-পূরণ, মানস-চারণভূমিতে ভূমিকা রেখে চলেছে। এ যাবৎকালে তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৭টি। যেমন-১. ইতিহাস ও ঐতিহ্য (১৯৯০), ২.
বাংলাদেশ পুলিশ উত্তরাধিকার ও ব্যবস্থাপনা (১৯৯৭), ৩. চট্টগ্রামী ভাষার শব্দসম্ভার (১৯৯৮), ৪. পুলিশ আইন সহায়িকা (২০০৪), ৫. চট্টগ্রামী বাংলার অভিধান ও লোকাচার (২০০৯) ৬. সিলেটি আঞ্চলিক ভাষার অভিধান (২০০৯), ৭. চট্টগ্রামী ডাক-দিস্তান, ধাঁধা ও হাস্তর (২০১০)।
বাংলাদেশ পুলিশ উত্তরাধিকার ও ব্যবস্থাপনা
বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পে অনন্য বই এটি। এমন দরকারি এবং অনুসন্ধিৎসু বিষয় নিয়ে বাংলাদেশে আর কোনো বই প্রকাশ হয়েছে কিনা বলা যাচ্ছে না। বইটি এ লেখকের সবচেয়ে উজ্জ্বল কাজ। ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত দুটি সংস্করণই নিঃশেষিত। বর্তমানে পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। আগের সংস্করণে বইটি ২৬০ পৃষ্ঠায় (এ ফোর সাইজ কাগজে মুদ্রিত) পরিবর্ধিত সংস্করণ ৪০০ পৃষ্ঠার। ১০টি অধ্যায়ে বিন্যস্ত এ বইতে পুলিশবাহিনীর সূচনাকাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত সামগ্রিক ইতিহাসকে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রথম অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে মৌর্য আমলের পুলিশ ব্যবস্থাপনা (খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দী), গুপ্ত আমলের পুলিশ ব্যবস্থাপনা, পাল ও চন্দ্র আমলের পুলিশ ব্যবস্থাপনা, বর্মণ ও সেন আমলে পুলিশ ব্যবস্থাপনা, দিল্লীর সুলতানি আমলে পুলিশ ব্যবস্থাপনা, হুসেন শাহী আমলে বাংলার পুলিশ ব্যবস্থাপনা, মোগল আমলে পুলিশ ব্যবস্থাপনা ও প্রাচীন আমলের প্রশাসনিক স্থাপনা। ব্রিটিশ উপনিবেশ প্রায় দুইশ বছর ঘাড়ে চেপে বসেছিলো বাঙালি জাতির। ভালোমন্দ মিলিয়ে তাদের আমলেই পুলিশ বাহিনী একটি সংহত রূপ লাভ করে। এখনকার যে আধুনিক পুলিশ এ ধারণা এবং বিন্যাসটাও সে সময়কালের ভিনদেশি শাসকদের। দ্বিতীয় অধ্যায়ে বিধৃত হয়েছে ওয়ারেন হেস্টিংসের আমলে পুলিশ ব্যবস্থাপনা, লর্ড কর্নওয়ালিশের সময় পুলিশ ব্যবস্থাপনা, পুলিশ বিভাগে অপর্যাপ্ত ও অদক্ষ সংস্কার, ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে গঠিত পুলিশ কমিশন, ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে গঠিত পুলিশ কমিশনের সুপারিশ, কমিশনের সুপারিশ কার্যকরীকরণ, পুলিশ অফিসারদের মধ্যে বিদ্বেষ, বিভিন্ন স্তরের পুলিশ কর্মকর্তার ক্ষমতা, জেলায় পুলিশের অঞ্চলসমূহ, পুলিশ ও জনগণের মধ্যে সম্পর্ক, জনগণ কর্তৃক পুলিশকে এড়িয়ে চলার কারণ, জনগণের ত্রুটি ও পুলিশ বাহিনী। তৃতীয় অধ্যায়ে বিধৃত হয়েছে পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশে পুলিশ পুনর্গঠন, পাকিস্তান আমলে পুলিশ ব্যবস্থাপনা, ১৯৪৮ সালে পুলিশ অসন্তোষ, ১৯৫৫ সালে ঘটিত দ্বিতীয় পুলিশ অসন্তোষ, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস। চতুর্থ অধ্যায় থেকে শুরু হয়েছে বাংলাদেশ অধ্যায়। যে বিবর্তনের মধ্য দিয়ে পুলিশ বাহিনীর গঠন এবং কার্যক্রম সেটা স্থিত হয় বাংলাদেশে এসে এবং এখনো তা চলমান। এ অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে বাংলাদেশ আমলের পুলিশ ব্যবস্থাপনা, সিআইডি পুলিশ, এসবি পুলিশ, রেলওয়ে পুলিশ, ট্রাফিক পুলিশ, নৌ পুলিশ, মহানগর পুলিশ, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন, মাউন্টেড পুলিশ, মহিলা পুলিশ, গ্রাম্য সংগঠন প্রথার ভিত্তি, গ্রাম্য পুলিশ প্রথা, পঞ্চায়েত কমিটি ও কমিউনিটি পুলিশিং, বাংলাদেশ পুলিশের প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা ও জনবল, থানা পদ্ধতি। পঞ্চম অধ্যায়ে স্থান পেয়েছে পুলিশ প্রশিক্ষণের নানা দিক, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিচিতিমূলক বর্ণনা। যেমন সারদা পুলিশ একাডেমী, এএসপি ক্যাডার, সাব ইন্সপেক্টর ক্যাডেট, ড্রিল ক্লাস, কনস্টবল ট্রেনিং, ডিটেকটিভ ট্রেনিং স্কুল, ট্রাফিক ট্রেনিং স্কুল, এসবি ট্রেনিং স্কুল, জাঙ্গাল ওয়ালফেয়ার ও টেক্টাটিক্যাল ট্রেনিং স্কুল, টেলিকম্যুনিকেশন ট্রেনিং সেন্টার। ষষ্ঠ অধ্যায়ে স্থান পেয়েছে খ্যাতিমান ও ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের পরিচিতি। যথা-পুলিশের পদবি পরিচিতি, বাংলাদেশি আইজিপিগণ, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বাংলাদেশি পুলিশ, জাতিসংঘ কার্যক্রমে বাংলাদেশ পুলিশ, পদকপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য। সপ্তম অধ্যায়ে স্থান পেয়েছে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য দেশের নামকরা পুলিশবাহিনীর আদ্যোপান্ত। যেমন ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিস, পাকিস্তান পুলিশ সার্ভিস, পদোন্নতি প্রাপ্ত সুপিরিয়র পুলিশ অফিসার, বাংলাদেশ পুলিশ বিভাগে আত্মীকৃত সামরিক অফিসার, বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (পুলিশ), ইন্টারপোল ও বাংলাদেশ, সাংস্কৃতিক অঙ্গণে পুলিশ।
বইটির বড় বৈশিষ্ট্য, প্রাসঙ্গিক বিষয়ের ছবি স্থান দেয়া। পাতায় পাতায় প্রচুর ছবি গুরুত্ব বাড়িয়েছে অনেক। যদিও বেশির ভাগ ছবিই ঝাপসা ও অস্পষ্ট। অবশ্য এতো প্রাচীন ছবি পরিষ্কার থাকার কথাও নয়। উল্লেখযোগ্য পুলিশ কর্মকর্তার ছবির পাশাপাশি স্থান পেয়েছে পুলিশের নানা বিবর্তন, ভবন, প্রয়োজনীয় স্থাপনা। বিভিন্ন আমলের অস্ত্র, পুলিশের বাহন, প্রথম দিককার মহিলা পুলিশ, বিভিন্ন সময়ের ম্যাপ ও ছক ইত্যাকার নানা জিনিসে ঠাসা। উপক্রমনিকা লিখেছেন ড. এনামূল হক, আহমেদ নাজমূল হুসেইন ও শফিকুল আসগর। তবে বইটির সবচেয়ে বাজে দিক হচ্ছে, ছিরিছাদহীন পৃষ্ঠাবিন্যাস, ছাপায় অমনোযোগিতা এবং ছবির দুর্বল বিন্যাস। ক্ষুদ্র এসব ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকা সত্ত্বেও বইটিকে বাংলাদেশ পুলিশের এনসাইক্লোপিডিয়া বললে অত্যুক্তি হবে না। পুলিশ বিষয়ে জানতে বইটি অনুসন্ধিৎসু, জ্ঞানপিপাসু যে কোন লোকের জ্ঞান-তৃষ্ণা মেটাবে। পুলিশ বিভাগে কর্মরত প্রতিটি অফিসারকে এই বই পুলিশ বিভাগ ও পেশা সম্পর্কে বিশেষভাবে পরিচিত করবে সন্দেহ নেই।
পুলিশ আইন সহায়িকা
সাধারণ মানুষের জানার আগ্রহ এবং জ্ঞানতৃষ্ণা মেটানোর পাশাপাশি এটি পুলিশ বিভাগে কর্মরত প্রমোশন প্রত্যাশী, ট্রেনিং সেন্টার বা একাডেমিতে প্রশিক্ষণরত সদস্য ও মাঠকর্মী অফিসার, আইনের ছাত্র, শিক্ষানবিস বিসিএস প্রশাসন অফিসার প্রমুখের দৈনন্দিন কর্মপ্রবাহের একটি নির্ভরযোগ্য বই হিসেবে ইতোমধ্যে স্বীকৃত হয়েছে। এটি গুরুত্বপূর্ণ গাইড বই হিসেবে বিবেচিত। এ বইয়ের বিষয়গুলো আত্মস্থ করে সহজেই যে কেউই পেশাগত কিংবা যাপিতজীবনে নৈপুণ্য প্রদর্শন করতে পারেন। পুলিশি তদন্ত, রেকর্ড সংরক্ষণ ও পুলিশের বিভিন্ন অফিস পরির্দশন প্রক্রিয়ার ব্যাপারে এ বই সারথি হিসাবে দিকনির্দেশক। সর্বস্তরের পুলিশ অফিসারদের জন্য এ বই অবশ্য পাঠ্য হিসাবে বিবেচিত হবার যোগ্য।
লেখক-গবেষক আহমেদ আমিন চৌধুরী বাংলাদেশ পুলিশের ইতিহাস রচনা করে পুলিশ বিভাগের সরকারি দায়িত্ব বেসরকারিভাবে পালন করেছেন। এতে পুলিশবিভাগ ধন্য হোক বা না হোক, পাঠক উপকৃত হচ্ছে।
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
নাম থেকেই অনুমেয় বইটির বিষয়বস্তু। লেখকের প্রথম প্রকাশিত এ বইতে তাঁর ইতিহাস-ঐতিহ্য অনুরাগে শতভাগ পরিচয় মেলে। তবে বইটির নাম নরসিংদীর ইতিহাস রাখা হলেও খুব একটা হেরফের হতো না। প্রায় সব লেখাই নরসিংদীকে কেন্দ্র করে রচিত। বাইরের রচনা রয়েছে গুটিকয়েক-লুপ্ত প্রায় বাংলাদেশী কয়েকটি মুসলমান গোত্র, প্রসঙ্গ-হবিগঞ্জ ও সৈয়দ নাসিরুদ্দীন সিপাহসালার, শ্রীহট্ট মুসলিম অধিকার ও তরফ বিজয় প্রসঙ্গ, সম্ভার থেকে সাভার, রুহিতপুরের কথা, কেরানীগঞ্জের কথা। এ বইয়ের অধিকাংশ রচনায় মূর্ত রচনায় মূর্ত হয়ে উঠেছে নরসিংদী; এছাড়া দেশের আরো বেশকিছু সম্ভ্রান্ত অঞ্চলের ইতিবৃত্ত। অধ্যয়নকৃত ইতিহাসে প্রাচীন বাংলার ঐতিহ্য বাঙ্ময় হয়ে ওঠে।
চট্টগ্রামী ভাষার শব্দসম্ভার
প্রকৃতির লীলা নিকেতন হিসেবেই শুধু নয়, দেশের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র হিসেবেও খ্যাতি আছে চট্টগ্রামের। সঙ্গত কারণেই চট্টগ্রামের প্রতি অনেকেই বিশেষ একটা টান অনুভব করেন। নিছক বেড়াতে কিংবা জীবনজীবিকার সন্ধানে প্রচুর মানুষ চট্টগ্রামে যাতায়াত করেন। কিন্তু অনেকের কাছেই চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা যেন পাহাড়সমান আতঙ্ক! ভাষাটি দুর্বোধ্য বলে তারা বুঝতে পারেন না। তাছাড়া যে আঞ্চলিকতা সেটাও সম্পূর্ণ ভিন্ন। চট্টগ্রামের ভাষা যারা বুঝতে চান তাদের কাজে লাগবে বইটি। এছাড়াও চট্টগ্রামবাসীদেরও স্বরূপ অন্বষণেও ভূমিকা রাখবে। পণ্ডিত, ভাষাবিদ, গবেষকদের গবেষণার আকর হিসেবে কাজ করবে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষার্থীও যথেষ্ট উপকৃত হবে, বইটির সাহায্য গ্রহণ করলে। চট্টগ্রামী ভাষায় এটাই প্রথম অভিধান স্বরূপ।
চট্টগ্রামী বাংলার অভিধান ও লোকাচার
চট্টগ্রামী বাংলার শব্দসম্ভার বইটির পরিবর্ধিত রূপ এটি। পূর্বের ভুলত্রুটি, অপূর্ণতা কাটিয়ে সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে সাজানোর প্রয়াস নিয়েছেন লেখক। ইতিহাস ঐতিহ্য কৃষ্টি সংস্কৃতির পাশাপাশি আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ আর অসীম ভালোবাসায় সঙ্কীর্ণ-নির্জন-বন্ধুর পথের পথিক হয়ে এগিয়ে চলা এ লেখকের আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে ব্যাপক পড়াশোনা। শব্দের প্রমিত রূপ, প্রবাদ-প্রবচন, ধাঁধা, গ্রাম্য ছড়া, সংস্কার, শতকিয়া পঠন পদ্ধতি ইত্যাদিও পাশাপাশি বর্ণাক্রমিকভাবে (অ থেকে হ) তুলে ধরেছেন আঞ্চলিক শব্দ। শব্দের অর্থ প্রমিত বাংলায় তুলে দিয়েছেন, অনেকটা শব্দার্থ আকারে। শব্দার্থের পাশাপাশি প্রবাদ-প্রবচনও বর্ণানুক্রমিকভাবে স্থান পেয়েছে। বইটির প্রাঞ্জল ভূমিকা লিখেছেন অধ্যাপক মনসুর মুসা, পাঠপ্রতিক্রিয়া স্থান পেয়েছে ড. তসিকুল ইসলাম, বিচারপতি মোহাম্মদ ফজলুল করিম। চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের লালিত সংস্কৃতি, নানাভাবে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন লেখক। তাঁর পরিমিতি বোধ ও নির্বাচনে সতর্কতা বইটিকে করেছে অনন্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। উত্তরপুরুষের কাছে বর্তমানের সৎ লেখকের যে দায়, তা পূরণে শতভাগ আন্তরিক লেখক। গতিধারা থেকে প্রকাশিত এ বইয়ের ছাপা ও পৃষ্ঠাবিন্যাস ঝকঝকে।
সিলেটি আঞ্চলিক ভাষার অভিধান
অন্যান্য জেলার মানুষের কাছে সিলেট অঞ্চলের ভাষা দুর্বোধ্য। তবে দুর্বোধ্য হলেও শ্রুতিমধুর। এ ভাষার অন্দরে প্রবেশ না করলে মজাটুকু বোঝা যায় না। আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে বাংলাদেশে খুব গুরুত্বের সাথে কাজ খুব একটা হয় না। এ নিয়েও অনেক গবেষণাকর্ম করা যায় এমন উপলব্ধি আমাদের হয়নি। তাই আঞ্চলিক ভাষার ওপর লিখিত বই-ও খুব একটা চোখে পড়ে না। শূন্যতার মাঝে আহমেদ আমিন চৌধুরীর সংকলিত সিলেটের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান ব্যতিক্রমধর্মী প্রয়াস। সিলেটের সুপ্রাচীন ইতিহাস-ঐতিহ্য বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। এর প্রভাব পড়েছে ভাষা এবং কৃষ্টি-সংস্কৃতিতেও। সময়ের পরিক্রমায় সিলেটের আঞ্চলিক ভাষা বিশেষ এক আভিজাত্য ধারণ করেছে-এটা বোদ্ধাজন স্বীকার করবেন। বইটির ভূমিকা লিখেছেন প্রফেসর মনসুর মুসা। ভূমিকা পাঠে জানা যায় অনেককিছুই। প্রতিটি ভাষাই দেশের সম্পদস্বরূপ। দুঃখজনক হলেও সত্যি অনেক বিজ্ঞজনও আঞ্চলিক ভাষাকে অবজ্ঞার চোখে দেখেন। অনেকে আঞ্চলিক ভাষাভাষীদের গেঁয়ো বলে উপহাস করতে ছাড়েন না। অথচ প্রতিটি ভাষাই সমমূল্যের-প্রমিত বা আঞ্চলিক যা-ই হোক না কেন। একটি ভাষা একটি অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করে, ঐতিহ্যেরও। প্রমিত বাংলা যেমন বাংলা ভাষাভাষীদের গর্বের ধন, তেমনি আঞ্চলিক ভাষাও। কারণ ভাব প্রকাশের বাহন হিসেবে মাতৃভাষা অদ্বিতীয়। এক্ষেত্রে আঞ্চলিক ভাষার গুরুত্ব আরো অনেক বেশি। যে ভাষায় (আঞ্চলিক) সর্বাধিক সংখ্যক লোক কথা বলে সে ভাষাকে খারিজ বা অবজ্ঞা করা অযৌক্তিক।
গ্রন্থটির বড় একটি বৈশিষ্ট্য-নাগরী ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি বিশেষ আলোকপাত। নাগরী সিলেটের অঞ্চলের বিলুপ্ত লিপি। প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে লিপিটি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এ লিপিতে সিলেট এবং আরো বেশকিছু অঞ্চলের আদিবাসীরা সাহিত্যচর্চা এবং পড়ালেখা করতো। সিলেটের অধিবাসী না হয়েও লেখক নিরেট সিলেটি ভাষায় সর্বপ্রথম অভিধানস্বরূপ রচনা করে সিলেটবাসীর শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন। আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে অতীতের মতো তাঁর এ উদ্যোগও অত্যন্ত সাহসী প্রশংসনীয়, উৎসাহব্যঞ্জক। এমন ব্যতিক্রম বই প্রকাশ করায় উৎস প্রকাশনও ধন্যবাদ পাওয়ার দাবিদার। স্থানীয় ভাষায় অভিধান প্রণয়নে বইটি অভিধানপ্রেমী ও ভাষা সাহিত্যিকদের উৎসাহিত করবে যা আমাদের দেশের ভাষার তথা বাংলা ভাষার উৎকর্ষে ও স্বরূপ সন্ধানে অবদান রাখবে।
চট্টগ্রামী ডাক-দিস্তান, ধাঁধা ও হাস্তর
নাম থেকেই অনুমেয় বইটি চট্টগ্রামের লোকসংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে রচিত। এতে রয়েছে ২২৫০টি চট্টগ্রামী প্রবাদ, ৩০০টি ধাঁধা, ১৪০টি বিভিন্ন খেলার রোল, ১৫০টি গ্রাম্য ছড়া, ২২০টি লোকবিশ্বাস বা হাস্তর। এছাড়াও স্থান পেয়েছে চট্টগ্রাম অঞ্চলের খুঁটিনাটি আরো নানা বিষয়। একটি জেলার সংস্কৃতি-কৃষ্টি-ঐতিহ্যকে চেনার জন্য যা যা দরকার তার প্রায় সবই আছে এই বইতে। জনাব আহমেদ আমিন চৌধুরীর সর্বশেষ প্রকাশিত বইও এটি। বলার অপেক্ষা রাখে না, বইটি সংস্কৃতি অনুরাগী, লেখক-অনুসন্ধিৎসু গবেষকদের কাজে লাগবে।
দীর্ঘ লেখকজীবন, ততোধিক দীর্ঘ কর্মজীবনে মননশীল এ লেখকের যতটুকু প্রাপ্তির কথা ছিলো, ততটুকু তিনি পাননি বললেই চলে। এদেশে গুণী মানুষ সম্মানিত হন না। কাউকে কাউকে মরণোত্তর সম্মাননা জানিয়ে তামাশা দেখানো হয়। জীবদ্দশায় কেউ যদি প্রাপ্য স্বীকৃতিটুকু না পান, মৃত্যুর পর তথাকথিত সম্মানটুকু কাকে জানানো হচ্ছে-মরহুমের প্রেতাত্মাকে? দুঃখজনক হলেও সত্য, আহমেদ আমিন চৌধুরীর মতো একনিষ্ঠ গবেষক সরকারি বা বেসরকারি-কোনো তরফ থেকেই পুরস্কৃত হননি বললেই চলে। তাঁর প্রাপ্তির মধ্যে রয়েছে একটিই-২০১০-এ কবি নবীন চন্দ্র সেন সাহিত্য পুরস্কার। অবশ্য পুরস্কারের আশায় সত্যিকারের কোনো শিল্পী কাজ করেন না। তাঁরা কাজ করেন নিজের কিংবা দেশ ও জাতির প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে; বিশেষ কোনো ভালোলাগা থেকেও অনেকে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ হন। তবু বলা যায়, পুরস্কার এক ধরনের অনুপ্রেরণা, স্বীকৃতিও। শুধু যোগ্যতার স্বীকৃতিই নয়, পুরস্কার এক লহমায় যে কারো যোগ্যতা এবং গ্রহণযোগ্যতা অনেকগুণ বাড়িয়ে দিতেও সক্ষম। পুরস্কার নামক স্বীকৃতির মাধ্যমে কর্ম-প্রেরণাও বেড়ে যায় অনেক গুণ।
প্রচারবিমুখ এ লেখক অবসর গ্রহণ করার পরও নিজেকে যুক্ত রেখেছেন বেশকিছু সংগঠনের সাথে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য-বাংলা একাডেমী, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদ, চট্টগ্রাম সমিতি-ঢাকা, রাউজান একাডেমী, চট্টগ্রাম, চাটগাঁ ভাষা পরিষদ-চট্টগ্রাম।
বয়সজনিত কিংবা অন্য যে কোনো কারণেই হোক, ইদানীং তিনি নির্দিষ্ট সংখ্যক পত্রপত্রিকা ও সাময়িকীতে কমই লেখেন। একসময় নিয়মিত লেখক ছিলেন বাংলাদেশ পুলিশের পাক্ষিক মুখপত্র ‘ডিটেকটিভ’-এর; এছাড়াও লিখতেন নানা স্বাদের সাময়িকী ও জার্নালে। বিরলধারার, বহুমুখী প্রতিভাধর এ লেখক পেয়েছেন বোদ্ধা পাঠক এবং সমঝদার মানুষের ভালোবাসা। বাংলাদেশের প্রকাশনার ইতিহাসে বছরের পর বছর তাঁর মতো আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে গবেষণায় মেতে আছেন এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কষ্টকর। ব্যক্তি উদ্যোগে গবেষণা করে তিনি শুধু যে সময় ব্যয় করছেন, তা নয়। সময়ের সাথে ব্যয় হচ্ছে প্রচুর অর্থও। তবু একথা তিনি গর্বের সাথেই উচ্চারণ করতে পারেন-যা কিছু তাঁর কীর্তি, সৃষ্টি, এতে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কোনো অর্থানুকূল্য বা কোনো ধরনের সহযোগিতা নেই।
একজন আত্মপ্রচারবিমুখ লেখক, সুদক্ষ পুলিশ অফিসার, জটিল পুলিশী আইনের উপর বই প্রণেতা, নিজ জেলা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা বাদেও ভিন্ন জেলার আঞ্চলিক ভাষার উপর অভিধান প্রণেতা জনাব আহমেদ আমিন চৌধুরী; মহৎ প্রাণ এ লেখক-গবেষক বাংলাদেশ পুলিশের ইতিহাস রচনা করে পুলিশ বিভাগের সরকারি দায়িত্ব বেসরকারিভাবে পালন করে এ বিভাগকে করেছেন ধন্য। তাঁর এ অবদানকে খাটো করে দেখলে তা হবে আমাদেরই মানসিক দৈন্যতার প্রকাশ এবং নির্বুদ্ধিতা। বীর মুক্তিযোদ্ধা, সংস্কৃতি অন্তঃপ্রাণ, আঞ্চলিক ভাষাপ্রেমী গবেষক আহমেদ আমিন চৌধুরীকে আমাদের অভিবাদন, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা। আশা করছি, আরো দীর্ঘদিন তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যসেবায় নিয়োজিত থাকবেন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

