সামান্য কিছু জমিজমা নিয়ে বিরোধে জড়িয়ে আমার বাবা শাবলের বাড়ি মেরে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিলেন তার জ্যাঠাতো ভাইয়ের। ব্যাপারটা হয়তো খুনোখুনি পর্যন্ত গড়াতো যদি না আমার মা বুদ্ধি করে বাবাকে ন্যাংটো করে ফেলতেন। জোরজবরদস্তি করে বাবাকে ন্যাংটো করে দরজার খিল এঁটে দিয়েছিলেন মা। বদ্ধ ঘরের ভিতরে থেকে বাবা শুধু অসার তর্জনগর্জন করেন, প্রতিশোধস্পৃহায় উন্মত্ত হয়ে বাইরে যেতে না পেরে!
পাশের গ্রামের এক আপা একদিন ঘর-সংসার ছেড়ে, মানসম্মানের মায়া বিসর্জন দিয়ে পালিয়ে যান তারই ছোটবোনের হবু বরের হাত ধরে। দুলাভাই বিদেশে থাকেন, অন্যদিকে আপা দেশে ‘একা’। শরীরের জ্বালা বড় জ্বালা, কীভাবে মেটানো যাবে! পেটের ক্ষুধা না হয় চেয়ে-চিন্তেই নিবৃত্ত হয় কিন্তু...। শরীরের ফাঁদে ফেলে আপা তারই আপন ছোটবোনের বিয়ে ঠিক হয়ে থাকা বরকে নিয়ে পালান, সাথে তার আগের সংসারের বছর পাঁচেক বয়সী মেয়ে। বাইরে গিয়ে নতুন সংসার পাতেন দুজনে। কিন্তু নতুন ‘দুলাভাই’কে আপার বাচ্চা বাবা ডাকে না। অনেক কসরত করার পরও না। শেষমেষ একদিন রাগের মাথায় ‘দুলাভাই’ জ্বলন্ত সিগারেট ঠেসে ধরেন শিশুটির হাতে!
বাসা থেকে মোবাইলফোন চুরি হয়েছে ফুপাতো ভাইয়ের। তার সন্দেহ বুয়াকে। কিন্তু বুয়াকে কিছুতেই স্বীকার করছেন না, কাজটা তিনিই করেছেন। অবশেষে ফুপাতো ভাই দেয়ালে মাথা ঠুকে দেয় বুয়ার। এই ঠুকে দেয়ার মাধ্যমেই বুয়া মোবাইলফোন ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়!
আমি জানি, সামান্য কিছু জমি নয়, ‘সাম্রাজ্য’ চলে গেলেও আমি শাবল দিয়ে কারো মাথা ফাটিয়ে দিতে পারতাম না; অন্যের সন্তান দূরে থাক নিজের ঔরসজাত সন্তানও যদি ‘বাবা’ না থাকে আমি কোনো শিশুর হাতে জ্বলন্ত সিগারেটের ছ্যাঁকা দিতে পারতাম না; শুধু মোবাইলফোন নয়, বাসার সব জিনিসপত্র লোপাট করে ফেললেও আমি পারতাম না কোনো দরিদ্র বুয়ার মাথাটা দেয়ালে ঠুকে দিতে...।
কিন্তু এসব পারাটা খুবই জরুরি। প্রয়োজনে অন্যের মাথা শাবলের বাড়িতে ফাটানো, যে কারো হাতেই সিগারেটের ছ্যাঁকা দিতে পারার দক্ষতা অর্জন, মাথা শুধু নয় প্রয়োজনবোধে কারো পুরো শরীরটাই দেয়ালে পিষ্ট করতে পারা...।
মানুষ হওয়ার যে সাধনা আমরা করি, তাতে আমরা পদে পদে ঠকি, ঠকে যাই। তারচেয়ে অমানুষ হতে পারাটা অনেক লাভজনক। বীরত্বেরও সূচক। মানুষ হয়ে অনেককিছুই পারা যায় না, অমানুষ হতে পারলে খুব সহজেই যে কোনো কাজ করা যায়। গত কয়েক মাসে কিছু নরপশু আমার সাথে যে আচরণ করেছে, নীরবে সয়ে গেছি শুধু। অমানুষ হতে পারলে, কিংবা সত্যিকারের তেজি মানুষ হলে এদের একেকটাকে ধরে মাথায় তুলে আছাড় মারতে পারতাম। এটাই ছিলো এদের প্রাপ্য। কিন্তু কিছুই পারিনি। অন্য অনেক জায়গার মতো এখানটায় আমি ভীষণ রকম ব্যর্থ। জানি না, আগামীতে আর কোনো প্রয়োজনে কারো জন্য ‘প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা’ গ্রহণ করতে পারবো কিনা। রুখে দাঁড়ানো যেমন জরুরি, তেমনি ঘুরে দাঁড়ানোর দক্ষতা অর্জনও।
এই সময়ে অমানুষরাই ভালো আছে। অমানুষ হওয়ার দীক্ষাটা কে দেবে? কোনো মানুষ, নাকি অমানুষের কাছেই যেতে হবে!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


