কুদ্দুস ভাই হচ্ছেন দ্য গ্রেট চাপাবাজ। অন্তত আমাদের চেনাজানার মধ্যে তার মতো এমন ক্ষমতাধর চাপাবাজ আর নেই। তার স্বভাব হচ্ছে সবকিছু বাড়িয়ে বলা, বাড়িয়ে দেখা। যদি হয় তিন, তিনি বানান তিনশ; তিনশ হলে তিন হাজার; তিন হাজার হলে...! সব চাপাবাজিই যে খারাপ কিংবা চাপাবাজি মানেই ক্ষতিকর, অশুভ কিছু বিষয়টা মোটেও সে রকম না। এই সেদিন কথা। কুদ্দুস ভাইয়ের সাথে রিকশা ভ্রমণে বেরিয়েছি। পথিমধ্যে তার এক জিগরি দোস্তকে দেখে রিকশা থামালেন। জুড়ে দিলেন ম্যারাথন আলাপ। আগপিছ না ভেবে শুরু হলো কথার খই ফোটানো। দোস্ত বেচারার বোধহয় তাড়া আছে, সে কেবলই উসখুস করছে কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলতে পারছে না। না পারার কারণ কুদ্দুস ভাইয়ের কথার তোড়। কিছু বলতে গেলে আগে এই তোড়টাকে থামাতে হবে। যে অবস্থা, তাতে অনেকটা এ তোড়ের মুখে বাঁধ না দিয়ে উপায় নেই। সেদিকে কোনো ভ্রƒক্ষেপই নেই কুদ্দুস ভাইয়ের। তিনি আপনমনে কী সব বলে যাচ্ছেন। বলছেন তো বলছেনই।
বলাবাহুল্য, রিকশাঅলা আমার বা কুদ্দুস ভাইয়ের, কারোই বন্ধু বা বন্ধুস্থানীয় না। নিদেনপক্ষে চেনা-জানাও না। দোস্ত বেচারার মতো তার সৌজন্য দেখানোর বালাইও নেই। কুদ্দুস ভাইয়ের এমন না-হক কারবার সইতে না পেরে রিকশাঅলা প্রতিবাদী হলো। সমুদয় তেজ গলায় জড়ো করে বললো, ঐ মিয়া, আপনের আজাইরা প্যাঁচাল থুইয়া গাড়িতে উডলে উডেন; না উডলে ভাড়া দেন। আমি চইলা যাই।
কুদ্দুস ভাই নম্রভঙ্গিতে বলেন, আহ, তুমিও শোনো। বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ! দেখছো না বাংলা কবিতার নন্দনতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করছি।
রিকশাঅলা মোক্ষম জবাব দেয়, আপনে যে কত্তবড় আকাইম্যা দলের সদস্য, দেখবারই পারতাছি। করেন, আলাপ করেন, আমি যাই!
দোস্তের সামনে নিজের প্রেস্টিজ হ্যাম্পার হতে যাচ্ছে দেখে কুদ্দুস ভাই তাড়াতাড়ি উঠে বসেন। দোস্ত বেচারাকে চিকনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে দেখে মনে হলো, বেচারা রিমান্ড থেকে মুক্তি পেয়েছে। রিকশাঅলা আর কথা বলে রিকশা চালিয়ে দিলো পক্সিক্ষরাজ গতিতে।
কী আশ্চর্য, এই নাজুক ঘটনা নিয়ে কুদ্দুস ভাই বিচলিত না হয়ে উল্টো পরদিনই একটা অতিকায় ‘গল্প’ প্রসব করে ফেললেন। সে গল্পের ভাষা, বর্ণনাভঙ্গি, কাহিনীবুনন_ বড়ই মনোহর! শুরুটা হয়েছে এভাবে :
গতকল্য আমার শিষ্য মাখনকে নিয়া বৈকালিক ভ্রমণে বাহির হইয়াছিলাম। অবশ্য তাহা পদব্রজে নহে, ত্রিচক্র শকটে। শকট যখন সাড়ে তিন রাস্তার মোড় অতিক্রম করিলো, এক্ষণে কুসুমকাননের পার্শ্বে দৃষ্টিগোচর হইলো আমার লেখার অনুরাগী পাঠক মফিজ তালুকদারের সহিত। সে শুধু পাঠকই নহে, বন্ধুও। প্রিয় কবিকে সামনে পাইয়া, উচ্ছ্বাস সংবরণ করিতে না পারিয়া সে আমাকে শক্ত হাতে ঝাপটাইয়া ধরিলো। আবদার জুড়িলো, স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করিয়া শুনাইতে হইবে, নইলে ছাড়িবে না। আচ্ছা মুসিবত! খ্যাতির বিড়ম্বনা যে কাহাকে বলে তাহা হাড়ে হাড়ে তো বটেই, অস্থিমজ্জায়ও টের পাইলাম। ভক্তের পাল্লায় পড়িয়া একের পর এক কবিতা আবৃত্তি করিয়া শুনাইতেছি। থামিতে গেলেই ভক্ত নাখোশ হয়, এটা নাকি কবিতা নহে, অমৃতসুধা! সুধার ন্যায্য হিস্যা থেকে তাকে বঞ্চিত করা যাইবে না। আমিও ভক্তের মন রক্ষার জন্য চেষ্টা চালাইয়া যাইতে লাগিলাম। কিন্তু টনক নড়িলো ঘণ্টাখানেক পর। এ দীর্ঘ সময়কাল অতিবাহিত হইবার পর শকটচালক করুণকণ্ঠে কহিলো, স্যার এইবার ক্ষান্ত দিয়া যথায় যাইবার কথা চলুন তথায় যাই। নিরন্ন মানুষ, আরো নতুন নতুন যাত্রীর সেবা করিতে না পারিলে জীবনটাকে টানিয়া নিবো কেমন করিয়া?
শুনিয়া বুকটা হু হু করিয়া উঠিলো। আহা, হতদরিদ্র মানুষ, দিনে আনিয়া দিনে খায়। শিষ্য মাখন হারামির অবিমৃষ্যকারিতায় রাগ হইলো; বেকুবটার বুদ্ধি দিনকে দিন লোপ পাইতেছে। আমি নাহয় কাব্যরসে মজিয়া ছিলাম, তুই ব্যাটা ইন্ডিয়ান ছাগল কী করছিলি? তোকে মাসে মাসে মাহিনা দেয়া হয় কেন? তাহা কি কেবলই আমাকে বদনখানি দেখাইবার নিমিত্তে?! আহারে গরিব মানুষটা...।
এই হচ্ছেন আমাদের কুদ্দুস ভাই। তিনি আবার সাহিত্যচর্চা (!) করেন। অন্যের কাছে নিজেকে কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, সমালোচক পরিচয়ে পরিচিত হতে ভালোবাসেন। তার (তার শব্দটার ত-এর উপর একটা চন্দ্রবিন্দু দিতে পারলে শান্তি পেতাম, কিন্তু কেন যে মন সায় দিচ্ছে না!) ভালো নাম গোলাম কুদ্দুস খান। কিন্তু নিজের পিতৃমাতৃপ্রদত্ত নামটার পশ্চাদদেশে কষে লাথি মেরে নিজেই নিজের নতুন নামকরণ করেছেন : অনন্ত অসীম। সুধীমহলে কবি অনন্ত অসীম নামেই সর্বাধিক পরিচিত। নাম পরিবর্তনের পেছনে তার যুক্তি, কবিরা অসাধারণ, নামও অসাধারণ হওয়া উচিত। উদাহরণস্বরূপ যে কবিদের নাম বলেছেন তাদের নাম আপাতত উচ্চারণ করতে চাই না। কারণ তাদের সামনে দিয়ে ফি দিনই আমাকে হাঁটা-চলা করতে হয়। তাছাড়া দুই একজন যদি রাগের বশে মামলা ঠুকে দেন? তারা না দিলেও ভক্ত-পাঠক, গুণগ্রাহী, আত্মীয়স্বজনের কথা তো বাদ দেয়া যায় না! কী দরকার কবিকুলকে ক্ষেপানোর।
কবিকুলকে না ক্ষেপিয়ে বরং আঙ্কেলের ক্ষেপার কথা বলি। আঙ্কেল মানে কুদ্দুস ভাইয়ের বাবা। কুদ্দুস ভাইয়ের নাম পরিবর্তনের একটা মজার... স্যরি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছিলো। একদিন কুদ্দুস ভাইয়ের এক ‘ভক্ত’ ফোন করে। রিসিভ করেন আঙ্কেল : হ্যালো, সøামালাইকুম।
ওয়ালাইকুম সালাম।
অনন্ত অসীমকে একটু দেয়া যাবে?
মানে?
আমি কবি অনন্ত অসীমকে চাচ্ছি।
এটা কি কোনো মানুষের নাম?
জি, মানবপ্রজাতির জ্বলজ্বলে নক্ষত্র উদীয়মান কবি অনন্ত অসীম।
অনন্ত অসীম?! অসীম আবার অনন্ত হয় কীভাবে? অনন্তই বা অসীম হয় কী করে! দুটোর মানেই তো এক। সংসদ বাঙ্গালা অভিধান এবং বাংলা একাডেমীর অভিধানে আছে...।
আঙ্কেল আরো কী কী বলেন। স্কুলে ব্যাকরণের ক্লাস নেন। সেদিন ফোনেও ব্যাকরণের ক্লাস নিয়ে ফেললেন। যে ফোন করেছিলো সে একটা আন্ধুমান্ধু। মোটেও ব্যাকরণ জানে না, বোঝাতে গেলে বুঝতেও চায় না।
পরে যখন আরো, আরো ফোন আসতে থাকে, অনেকেই কবি অনন্ত অসীমের তালাশ করে। তখনই আঙ্কেলের টনক নড়ে। এতোগুলো মানুষ একসাথে ভুল করতে পারে না। কিন্তু তার তো তিন চোদ্দ বিয়াল্লিশ গোষ্ঠীতে কেউই কবি নাই। তাহলে! টেলিফোন লাইনে কোনো সমস্যা হলো নাতো! অনুসন্ধান করতে গিয়ে বেরিয়ে আসে আসল রহস্য। কেচো খুঁড়তে সাপ। সেই সাপের পিছনে আরেকটা সাপ। তিনি জেনে গেছেন আর কোথাও নয়, কবির বসবাস তার ঘরেই। এক ছাদের নীচে একই সাথে বসবাস করছেন, অথচ তিনি কবি খুঁজে বেড়ান! একই সময়ে ব্যাপারটা জেনে যান কুদ্দুস ভাইও। তার ভক্ত-পাঠকদের টেলিফোনে ভুল তথ্য দেয়া হচ্ছে, অবগত হয়ে রাগ মাথায় চড়ে। মাথা থেকে গাছের মগডালে। কবির বাসায় কবিকে খুঁজে পাওয়া যাবে না, এ কেমন কথা? শুধু বাসায় কেন, কবির বসবাস সবখানেই, জলে স্থলে অন্তরীক্ষে। শিশিরবিন্দু থেকে হিমালয়ের চূড়া, চূড়া থেকে মহাকাশ, কোথায় নেই কবি? একজন কবি একই সময়ে, একই সাথে পুরো বিশ্বব্রহ্মা- তো বটেই প্রতিটা গ্রহে অবস্থান করে। তার অস্তিত্ব সতত বহমান।
ঘরের শত্রু বিভীষণ, ঘরের মানুষই তাকে চেনে না! তাহলে এই জগৎসংসারের মানুষ তাকে চিনবে কেন। মূল্যায়নই বা করবে কোন দুঃখে। রাগে ক্ষোভে তিনি পাকড়াও করেন আঙ্কেলকে। কঠিন কিছু কথা বলতে গিয়েও পারেন না। হাজার হোক বাবা তো! তবু যা বলেছেন তাও কম না, আমার নামই যে কবি অনন্ত অসীম তা তোমার জানা উচিত ছিলো। এদেশের পনেরো কোটি মানুষ, বহির্বিশ্বের আরো প্রায় পঁয়তাল্লিশ কোটি বাংলা ভাষাভাষী মানুষ আমার নাম জানে, আর তুমি বাবা হয়ে আমার নাম জানবে না! শেম, বাবা শেম! না জানলে তুমি অন্তত আমাকে জিজ্ঞাসা করতে। জানতে নিশ্চয়ই লজ্জা নাই। অনেকেই তো অনেক কিছু জানে না। তাই বলে জানার চেষ্টাও কি করবে না? এভাবে আমার প্রেস্টিজের বারোটা না বাজালেও তুমি পারতে বাবা...।
কুদ্দুস, কুদ্দুস... তুই এসব কী বলছিস? তুই ঠিক আছিস তো বাবা?
খবরদার, তুমি আমাকে আর কুদ্দুস বলে ডাকবে না। আমার নাম অনন্ত অসীম। শুধু অনন্ত অসীম না, কবি অনন্ত অসীম।
আঙ্কেল অনেকক্ষণ বেকুবের মতো তাকিয়ে থাকেন কুদ্দুস ভাইয়ের মুখের দিকে। ধাতস্থ হয়ে বলেন, দুই দুইটা গরু জবাই করে, তিন তিনজন হুজুর ডেকে মিলাদ পড়িয়ে তোর নাম রাখলাম। এখন তোর কী নাম, তা আমাকে নতুন করে, তাও আবার তোর কাছ থেকেই জানতে হবে? তুই এখন কবি হয়েছিস, এমনই তোর জ্ঞান, বিদ্যাবুদ্ধিতে বাবাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিস? বাবা অজ্ঞ, কিচ্ছু বোঝে না, তাই উল্টো বাবাকে জ্ঞান দেয়া লাগে!
আমি জানি না, তুমি স্কুলে কোন ছাতা পড়াও। তোমার কাছে কোমলমতি এ বাচ্চারা কী শেখে...।
ঠিকমতো পড়াতে না পারলে এদ্দিন আমার চাকরি থাকতো?
তুমি কবি অনন্ত অসীমের বাবা। সুতরাং তোমার আরো স্মার্ট হওয়া উচিত। সেদিন আর বেশিদিন দূরে নয়, যেদিন স্কুলে তুমি যাদের পড়াও অর্থাৎ সারা বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের বইতে একটা প্রশ্ন থাকবে : কবি অনন্ত অসীমের পিতার নাম কী? তারা উত্তর লিখবে মোতালেব খান। শ্রেণীকক্ষে তোমার মতো শিক্ষকরা ছাত্রদের পড়া ধরবে, কবি অনন্ত অসীমের পিতার নাম বলো। তার পিতা কর্মজীবনে কী ছিলেন? সঠিক উত্তর দিতে না পারলে ছাত্ররা শিক্ষকের হাতে মার খাবে। যদিও পেটানো নিষিদ্ধ হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু কবি অনন্ত অসীম বলে কথা! যে তোমার নাম পাঠ্যপুস্তকে স্থান করে দিচ্ছে, খ্যাতিও বয়ে আনবে, তার নামটুকু জানার সৌজন্যবোধটুকুও কি তুমি দেখাবে না?
তুই এবার কুদ্দুস। দোহাই তোর। মাথায় পানি দিয়ে ঘুমা...।
কিন্তু কুদ্দুস ভাই কি থামার মানুষ? উল্টো কুদ্দুস নামটা শুনে তার মেজাজ এমন বিগড়ে গেলো যে যাচ্ছেতাই বলা শুরু করলেন।
আঙ্কেল আর সইতে পারলেন না। মাথা ঘুরে ধপাস করে পড়ে গেলেন। সে যাত্রায় অবশ্য ডাক্তার-ক্লিনিক-ওষুধপাতি ইত্যাদির হ্যাপা কুদ্দুস ভাইকেই সামলাতে হয়েছে! আমি তো ছিলামই। পিএস বলে কথা, নইলে কি আর এই দুর্মূল্যের বাজারে চাকরি টিকে থাকে!
দুই.
গুণধর কুদ্দুস ভাইয়ের সাথেই আমার সার্বক্ষণিক ওঠা-বসা। চলাফেরা। ভদ্রলোকের ভাষায় আমি তার পিএস_ পার্সোনাল সেক্রেটারি। খাঁটি বাংলা ভাষায় উচ্ছিষ্টভোগী, তল্পিবাহক, মোসাহেব। একান্তে তাকে কুদ্দুস ভাই ডাকার অনুমতি থাকলেও জনসম্মুখে স্যার স্যার বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলতে হয়। স্যার সম্বোধনে নাকি ভাব বাড়ে। ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল হয়। তাই সবসময় আমি স্যার স্যার জি জি হ্যাঁ হ্যাঁ ডেকে ডেকেই সারা।
কুদ্দুস ভাইয়ের কর্মপরিধি এবং কর্মধারা অনেকটা শাখামৃগের মতো। শাখামৃগ যেমন কোনো শাখাই বাদ রাখে না, এখানে এক লাফ ওখানে একটা ঝাঁপ। কুদ্দুস ভাইও শাখামৃগের অনুকরণে সাহিত্যের সব শাখায় বিচরণ করেন। চেষ্টা থাকে সব্যসাচী তকমাটা বাগানোর। তবে ভালোবাসেন নিজেকে কবি হিসেবে পরিচয় দিতে। কবি মানে নাকি জ্ঞানী। প্রাচীনকালে জ্ঞানীকেই কবি বলা হইতো। জ্ঞানীরা কবি, কবিরা মহাজ্ঞানী। মহাজ্ঞানীরা মানবস্তর পেরিয়ে নতুন স্তর, অর্থাৎ মহামানব স্তরে অবস্থান করেন। যদিও দেখতে অবিকল মানুষের মতোই।
এদেশে তো পড়াশোনার চল নেই বললেই চলে। সৃজনশীল সাহিত্য আর কজন পড়ে। পড়লেও কবির নামটি মুখস্ত রাখার গরজ বোধ করে না। এই যে গরজটুকু নাই, বোধের অভাবেই তো আজ বাংলাদেশের ভাগ্যাকাশ এমন মেঘাচ্ছন্ন। জাতির পিছিয়ে পড়ার কারণও।
কুদ্দুস ভাইয়ের নামটি সঙ্গত কারণেই কারো কারো কাছে অপরিচিত ঠেকতে পারে। বিশেষ করে যারা কম পড়–য়া পাঠক। তিনি মূলত আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকায় যাবতীয় সাহিত্যকর্ম উগরে দেন। বাজার চলতি পত্রিকায় যে ট্রাই করেননি বা করেন না, তা নয়। কিন্তু চলতি পত্রিকার লোকজন তার যে মেধাস্তর, কাব্যনির্মিতির সাথে পরিচিত না। দুর্বোধ্য কিংবা ছাইপাশ ভেবে অবহেলা করে। ছাপে না। কিন্তু ছাইয়ের ভিতরেই যে লুকিয়ে থাকে সোনা, তা কে খুঁজে দেখে! অবশ্য খোঁজার জন্য, ডুবুরি হওয়ার যে মেধা দরকার, তাও বা এদের কই?
দুর্মুখেরা তাকে আন্ডারওয়ার্ল্ডের তথাকথিত পত্রিকার তথাকথিত লেখক বলে আড়ালে আবডালে বিদ্রƒপ করে। বাঁকা হাসি, টিপ্পনি কাটে। যা খুশি করুক, পাছে লোকে অনেক কিছুই তো বলে। কে না জানে, এদেশে গুণির কদর নেই, কিন্তু খুনির কদর আছে!
জীবদ্দশায় না হোক, মৃত্যুর পর হলেও শেক্সপিয়রের মতো তার সাহিত্যসম্ভার মূল্যায়িত হবে। তখন দেশবাসী তো বটেই, বিশ্ববাসীও হায় হায় করে মাথা চাপড়াবে। নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে আফসোস করবে, কিন্তু আহাজারিই সার। তখন সান্ত¡না হিসেবে তাদের জন্য কিছুই থাকবে না। লোকজনের এসব চিনি না, কোথাকার কবি, কী কবিতা লেখে ধরনের মনোভাবে কুদ্দুস ভাই কষ্ট পান। আহত হন। তার কথা কী বলবো, একবার আমার নিজেরই মাথা গরম হয়ে গিয়েছিলো। কুদ্দুস ভাইয়ের গুচ্ছ কবিতা ছাপা হয়েছে দৈনিক বাংলাদেশের খবর পত্রিকায়। অফিস থেকে সৌজন্য কপি পাঠায়নি। যদিও সবসময় পাঠায়। এবার না পাঠানোর কারণ বোধহয় বিক্রি হয়েছিলো বেশি। কুদ্দুস ভাই আমাকে টাকা দিয়ে স্টলে পাঠালেন। পত্রিকা কিনতে।
স্টলে গেলাম। বাসা থেকে মোটামুটি দশ টাকা রিকশা ভাড়া দূরত্বে স্টল। অবশ্য আমি হেঁটেই যাই। কিন্তু রিকশা ভাড়ার বিল ঠিকই করি! পনেরো-পনেরো ত্রিশ টাকা। রিকশাঅলারা এ ভাড়ার কমে যায় না। এখন সবকিছুর দাম বাড়তি। রিকশা ভাড়া বাড়বে না!
যথারীতি আজও হেঁটে গেলাম। স্টলে বিভিন্ন পত্রপত্রিকার পসরা সাজিয়ে বুড়ো-মতন একজন লোক বসে আছে। তাকে বললাম, এক কপি বাংলাদেশের খবর দিন।
তিনি কিছুক্ষণ আমার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন, চিড়িয়া দেখার মতো। পরক্ষণে প্রশ্ন করেন, কোন দেশ থাইকা আইছেন?
কী মনে হয়, ভিন গ্রহ থেকে এসেছি?
চেতেন ক্যান বাজান? আমার কাছে যত পত্রিকা আছে, সবগুলায় বাংলাদেশের খবর তো আছেই, বিদেশের খবরও আছে। আলাদা কইরা বাংলাদেশের খবর কিনবেন ক্যান?
সেদিন অনেক খুঁজেও পত্রিকাটি পাইনি। দোকানিরা নাকি এ নাম প্রথম শুনলো! একেই বলে মূর্খ জাতির মূর্খ জনগোষ্ঠী!
তিন.
আমার প্রতি কুদ্দুস ভাইয়ের অভিযোগের অন্ত নেই। তš§ধ্যে প্রথম এবং প্রধান অভিযোগ কবিতা লিখি না কেন? সব মানুষেরই নাকি কবিতা লেখা উচিত। বোধের উšে§াচনে কবিতার বিকল্প নেই। যদি বলি, ছাগল দিয়ে কি আর হালচাষ হয়? সবাই তো আর কবি অনন্ত অসীমের মতো প্রতিভা নিয়ে জš§ায়নি!
তিনি সস্নেহে আমার পিঠ চাপড়ে বলেন, চেষ্টা করলেই হয়। তোর চেয়ে আরো কত বড় বড় হাঁদারামরা কবিতা লিখছে। আর তুই তো কবি অনন্ত অসীমের মতো গুরুর সঙ্গ পাস। শুরুর দিকে অবশ্য সহজ কবিতা লেখার বিধান আছে। অভিধান ঘেটে কঠিন কিছু শব্দ পাশাপাশি বসিয়ে দিবি। ব্যস, হয়ে গেলো! পাঠক অর্থ বুঝতে না পেরে ভাববে, উচ্চমার্গের কবিতা। জাঁদরেল কবির লেখা। কবিতা লেখার আরো দুইটি পদ্ধতি আছে_
এক. চিঠি লিখে মাঝ বরাবর কেটে ফেলা। এতে একটা চিঠিতেই দুইটা ভিন্নধর্মী কবিতা হয়ে যাবে।
দুই. বিখ্যাত কবিদের জনপ্রিয় কবিতার এক-আধ লাইন মেরে দেয়া। মানে ধার হিসেবে নেয়া আরকি। এভাবে দশ/বিশ পঙ্ক্তি কবিতার খ-াংশ জোড়া দিলেই দাঁড়িয়ে যাবে অনুপম কবিতা। নিরীক্ষাধর্মী কবিতাও বলে চলে। কারণ এটা তো নতুন ফর্মই!
নাহ্, কুদ্দুস ভাইয়ের নেয়া কবিতার ক্লাসের ছাত্র হতে পারিনি। এদেশে নাকি কাক ও কবির সংখ্যা সমান। কী প্রয়োজন আরেকটা কাক বাড়ানোর। তাছাড়া জীবনানন্দ দাশ কত আগেই তো বলে গেছেন, সবাই নয়, কেউ কেউ কবি। এই ‘কেউ কেউ’র মধ্যে কুদ্দুস ভাইয়ের মতো মানুষরাই থাক, আমি নই। কিন্তু এ যুক্তি তো কুদ্দুস ভাইকে দেয়া যায় না। তাকে বলি, গুরু কবি আবার শিষ্যও কবি, তাহলে তো গুরু-শিষ্য সমান হয়ে গেলো! দুজনের মধ্যে পার্থক্য থাকলো কী! লাগবে না আমার কবি হওয়া। তোমার প্রতিদ্বন্দ্বি হতে আমার ইচ্ছা নেই।
এ কথায় কুদ্দুস ভাই কী যে খুশি হোন! ভেবে হয়তো হয়তো পুলক বোধ করেন কবি হিসেবে আমি তাকে কত মূল্যায়নই না করি। তার কবি পরিচয় আমার কাছে কত্ত বড়। বিশাল এক অধ্যায়। অবশ্য প্রশংসার রেশ খুব বেশিদিন যে তার মধ্যে স্থায়ী হয়, তা নয়। কিছুদিন পর আবার যখন কবিতা নিয়ে জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা দিতে ইচ্ছা করে, তখন আবার শুরু করেন ক্যাম্পেইন। বোধের স্ফূরণে, বাক্যের সৌন্দর্যে, শব্দের খেলায় সৌন্দর্য সৃষ্টি করতে পারে একমাত্র কবিতাই। কবিতার আছে সেই শক্তি, যা পাঠককে মোহগ্রস্ত করে, উদ্দীপ্ত করে, সতেজ-সপ্রাণ করে তুলে প্রকৃত মানুষ হওয়ার দীক্ষা দেয়। কবিতা সেই নেশা, যা বড় কোনো খরচ ছাড়াই মানুষকে ঘোরগ্রস্ত করে রাখার ক্ষমতা রাখে। এ এক নান্দনিক নেশা...। সুতরাং অবশ্যই আমার কবি হওয়া উচিত। অন্তত কবি অনন্ত অসীমের সুযোগ্য শিষ্য হিসেবে হলেও!
চার.
কীর্তিমান কবি, বহু গুণে গুণান্বিত মানুষ অনন্ত অসীম/গোলাম কুদ্দুস খান অবশেষে বেশ বড় একটা সিদ্ধান্তে এলেন। যুগান্তকারী সিদ্ধান্তটা হলো তার ছড়ানো-ছিটানো কবিতাগুলো একত্র করে একটা কাব্যগ্রন্থ বের করবেন। এ লক্ষ্যে বাংলাবাজারের একজন প্রকাশকের সাথে কথাও বলেছেন তিনি। কুদ্দুস ভাই প্রকাশককে পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা দেবেন। বিনিময়ে প্রকাশক বের করছেন তার কাব্যগ্রন্থ : সাগর মিশেছে আকাশের মোহনায়। এ বই বিক্রি হবে বাংলা একাডেমী আয়োজিত অমর একুশে বইমেলায়। অবশ্য সে প্রকাশক বইমেলায় স্টল পান কিনা, আদৌ পাবেন কিনা সে ব্যাপারে কুদ্দুস ভাইয়ের সন্দেহ। তবে এরকম একটি প্রকাশনীর সাথে চুক্তি করতে পেরে দারুণ উচ্ছ্বসিত তিনি। এ প্রকাশনীর নামডাক নাকি কম না। এ নামডাকের কারণেই এতোগুলো টাকা ইনভেস্ট করেছেন তিনি। চিন্তার কিছু নেই, ইনভেস্ট উঠে আসবে। এতোটা আশাবাদী হওয়ার যৌক্তিক কারণও আছে। প্রকাশনীর সুনাম প্লাস অনন্ত অসীমের কবিখ্যাতি_ দুয়ে মিলে মেলা শুরুর প্রথম সপ্তাহেই বিনিয়োগ উঠে আসবে। তার কাব্যগ্রন্থ যে বেরিয়েছে_প্রথম বইয়ের জনক হিসেবে অনুভূতি জানতে চেয়ে দুই একটা টিভি চ্যানেল সাক্ষাৎকার প্রচার করলেই পুরো হিট। প্রকাশিতব্য বইটি নিয়ে তিনি যে আশাবাদী তা প্রমাণ করে সদ্য লেখা কবিতাটা :
কাব্যতীর্থযাত্রায় পঁয়ত্রিশ হাজার দিলাম নিয়োগ
পঁয়ত্রিশ দিন ফুরোবার আগেই উঠবে বিনিয়োগ!
সবকিছুই হবে, তবে প্রকাশকের শর্তও আছে। মানে শর্ত প্রযোজ্য আরকি। সর্বাধিক প্রচারসংখ্যার দৈনিকগুলোয় বিজ্ঞাপন দিতে হবে। বিশেষ করে সাহিত্য সাময়িকী বা বিনোদন পাতায়। পাবলিক যাবে কোথায়, মার মার কাট কাট করে খাবে! বই চালানোর মূলমন্ত্র প্রকাশকই বাতলে দিলেন। যা করার কুদ্দুস ভাইকেই করতে হবে। গৌরী সেন তো নয়-ই, কোনো সেনই টাকা দেবে না।
বোঝার উপর শাকের আঁটি হিসেবে প্রকাশক আরেকটা বুদ্ধি দিলেন। এটাও বই চালানোর মূলমন্ত্র। একটু কৌশলী হলেই চলবে। কৌশলটা এমন : কিছু পয়সাপাতি খরচ করে নিজেই নিজেকে পুরস্কৃত করতে হবে। এই পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানের পরেই পত্রিকায় বইয়ের বিজ্ঞাপন দিতে হবে। বিজ্ঞাপনটা হবে অনেকটা_
বেরিয়েছে! বেরিয়ে গেছে!
অমুক সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত
ভিন্নধারার বিরল কবি অনন্ত অসীম’র কালজয়ী কাব্যগ্রন্থ
সাগর মিশেছে আকাশের মোহনায়
কিনবেন তো কাব্যরসের সাগরে ডুববেন
ভাসবেন, ডুববেন, ডুববেন, ভাসবেন
না কিনবেন তো মরবেন...
এবারো পয়সাপাতি সব কুদ্দুস ভাইকেই বহন করতে হবে। এমনিতেই প্রকাশককে টাকা দিতেই হিমশিম খেতে হয়েছে। তার উপর আবার...। কিন্তু টাকার অভাবে পৃথিবীর কোনো মহৎ কাজই থেমে থাকেনি। এটাও যে থাকবে না জানা কথাই। কুদ্দুস ভাই নবউদ্যমে নামলেন টাকা সংগ্রহ অভিযানে। ফান্ড গঠন করতে হবে। আপামর জনসাধারণকে এ ফান্ডে দাতা হিসেবে সম্পৃক্ত করতে পারলে ভালো হতো, কিন্তু কাব্যসাহিত্যের জন্য কারো হাত গলে ফুটো পয়সাটাও পড়বে বলে মনে হয় না। এ জাতি তো বার্গার আর পান্তা খেতে অভ্যস্ত!
বাবার পকেট কেটে, উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাবার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হাজিরা দেয়ায় কুদ্দুস ভাইয়ের টাকার অভাব কখনো হয়নি। পারিবারিকভাবে তারা যথেষ্ট সচ্ছল কিন্তু অপচয় বা বাড়তি খরচের সুযোগ নেই। এখন একসাথে এতোগুলো টাকা কোত্থেকে, কীভাবে পাওয়া যাবে। চিন্তায় রাতে ঘুম হয় না। নতুন কবিতা লিখতে বসলে প্রথমে আসে টাকার চিন্তা। টাকার জন্য এ উদ্যোগ ভেস্তে যাবে...?
আঙ্কেল শিক্ষকতার পাশাপাশি একটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়েছেন কুদ্দুস ভাইয়ের জন্যই। কিন্তু কুদ্দুস ভাই লক্ষ্মীর আরাধনা করবেন না। তার লক্ষ্য আরো উপরে, সরস্বতী দেবী। কী আর করা, অবসর সময়টুকুতে আঙ্কেল একাই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কাটান। কুদ্দুস ভাইয়ের যুক্তি হলো তিনি কেন ব্যবসায়ী হবেন। যার এইম ইন লাইফ হচ্ছে যশস্বী কবি হওয়া সে কিনা করবে টাকা পয়সা আনা পাইয়ের হিসাব? ছ্যা ছ্যা। কবিরা কখনো টাকার পেছনে ছোটে না। টাকা তাদের বাঁধতে পারে না। শুধু টাকা কেন ডলার, রিয়েল, পাউন্ড, দিরহাম, রূপি ইত্যাদির কোনো ক্ষমতাই নেই একজন প্রকৃত কবিকে আটকে রাখার। কবির চাওয়াপাওয়া, আরাধ্য শুধু, একমাত্র কবিতাই!
পাঁচ.
বন্ধুদের কাছ থেকে ধারকর্জ করে, বাবার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে অলিখিত, অনালোচ্য ‘সাহায্য’ নিয়ে ঠিকই তার ফান্ড গঠিত হয়ে গেলো। যদিও সব পথ সহজ-সোজা ছিলো না। যথেষ্ট পীড়নের পর তবেই ফান্ড গঠন। খরচপাতি যত বেশি ইনপুটও তত বেশি। কুদ্দুস ভাইয়ের কৌশলটা হলো নিজেই নিজেকে পুরস্কৃত করা। পুরস্কার প্রদানের ছবি ও সংবাদ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রেস রিলিজ আকারে পাঠানো হবে।
পুরস্কারটা দেবে ভুঁইফোড় একটা সাহিত্য সংগঠন। মানে সংগঠনের ব্যানারে। পুরস্কারটা দেয়া হবে বাংলা কবিতায় বিশেষ অবদান রাখার স্বীকৃতি হিসেবে। সংগঠনের নাম কী হবে? এতো বড় চিন্তার কথা। নিজেরাই সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে, আবার নিজেরাই সে সংগঠনের কার্যক্রম শুরু করতে হবে। উৎপাদক ও ভোক্তা একই শ্রেণী। শেষমেষ দায়িত্ব বর্তালো আমার উপরেই। যেভাবে কবিতাসংক্রান্ত সব দায়িত্ব আমার উপর বর্তায়। আমিও থেমে থাকলাম না। দুই বাংলা থেকে প্রকাশিত সব অভিধানের সহজ ও কঠিন শব্দ ঘেটে ঘেটে, দুই বাংলার জনপ্রিয় কবিদের কাব্যসমগ্র উল্টে-পাল্টে সংগঠনের নাম দাঁড় করালাম_স্বরব্যঞ্জন সাহিত্য সংঘ। কুদ্দুস ভাইয়ের নামটা পছন্দ হলো না। তিনি রাখলেন স্বরবর্ণ সাহিত্য পরিষদ। বললাম, স্বরবর্ণ তো মাত্র ১২টা, অন্যদিকে ব্যঞ্জনবর্ণ ৩৯টা। কোনোটাকেই আমরা বাদ দেবো না। কারণ স্বর ও ব্যঞ্জনবর্ণ উভয়ে মিলেই কবিতা সৃষ্টি হয়। যে কবিতা বয়ে যায় অবিরল ধারায় ইথারে, ইথারে। তা স্বরব্যঞ্জনেরই অবদান।
শেষমেষ কুদ্দুস ভাই আমার দেয়া নামটাই রাখলেন। আমার যুক্তি শুনে খুশি হলেন এদ্দিনে তুই কবির যোগ্য সহচর হয়েছিস!
স্বরব্যঞ্জন সাহিত্য সংঘ’র পুরস্কার প্রদানের দিন-তারিখ সবই ঠিক করা হলো। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে সভাপতির আসন অলঙ্কৃত করবেন কুদ্দুস ভাইয়ের নোয়াখালী নিবাসী বন্ধু মোখলেসুর রহমান। অবশ্য মঞ্চে তাকে ত্রৈমাসিক কবির কলম পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে চালিয়ে দেয়া হবে। অলক রহমানের বক্তব্যের পর কবি অনন্ত অসীম স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করবেন। তারপর বক্তব্য রাখবেন আরো দুইজন অধ্যাপক শ্রেণীর প-িত কাব্যবোদ্ধা। সর্বশেষে সাহিত্যসেবী বাতেন ম-ল কবিকে বাংলা কবিতার জ্যোতিষ্মান নক্ষত্র উপাধি দিয়ে, স্বীকৃতিস্বরূপ স্বরব্যঞ্জন সাহিত্যপদক পরিয়ে দেবেন। তুমুল হাততালির মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটবে। এলাকাবাসী দেখবে, নতুন এক অনন্ত অসীমকে। এদ্দিন তো অনেকেই দাম দেয়নি, দিতে চায়নি। জমকালো অনুষ্ঠানের পর নিশ্চয়ই একটু নড়ে-চড়ে বসতে বাধ্য হবে।
পরিকল্পনাপর্ব তো শেষ হলো, এবার কাজের পালা। অনুষ্ঠানের সংবাদ ছাপানোর অনুরোধ জানিয়ে প্রতিটি জাতীয় ও আঞ্চলিক পত্রিকার চিফ রিপোর্টার বরাবর প্রেস রিলিজ পাঠানো হলো। গণ্যমান্য ব্যক্তি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, ভক্তবর্গ, তিনজন লেডি গেস্ট কাব্যে অনুপ্রেরণাদাত্রী দেবীকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। নিমন্ত্রণ কার্ড পৌঁছানো হলো বিশেষ বিশেষ অতিথির কাছে। সব মিলিয়ে প্রায় দুই হাজার লোকের সমাগম হবে বলে আশা করা যায়। এলাকাবাসী দেখবে এক মহামিলনমেলা, অভূতপূর্ব এক কর্মযজ্ঞ।
কুদ্দুস ভাই আশা করেই খালাস, এদিকে সব সামাল দিতে হচ্ছে একা আমাকেই। যদিও কুদ্দুস ভাইয়ের উৎসাহের কমতি নেই। ক্ষণে ক্ষণে নিদের্শ দিচ্ছেন এটা কর, ওটা কর। এখানে যা, ওখানে যা, ঐ কবিতাটা কম্পোজ করিয়ে আন...। কবি শব্দটা বড় ফন্টে দিস...।
ছয়.
দেখতে দেখতে চলে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। বিশাল স্টেজ। স্টেজের সামনে খোলা প্রান্তরে আমন্ত্রিত ব্যক্তিবর্গ, দর্শকদের জন্য প্লাস্টিক চেয়ার পাতা। মতিন ডেকোরেটর্স থেকে এগুলো ভাড়ায় আনা। সাজিয়েও দিয়েছে ওদের লোক। কিন্তু দর্শক এসেছেন গুটিকয়েক। উল্লেখযোগ্য দর্শক হচ্ছে মহল্লার প্রাচীন রাসু পাগলা, বাজারের বোঝা রেখে বিশ্রাম নিতে আসা একজন শ্রান্ত মানুষ, চার/পাঁচটি দুষ্টু ছেলে যারা বিকাল হলেই দুরন্তপনায় মেতে ওঠে; আজ এখানে কী হচ্ছে কৌতূহলবশতই দেখতে এসেছে বোধহয়, আর দুই/তিনজন ভদ্রলোক। অবশ্য এরা আমন্ত্রিত, নাকি দর্শনার্থী কে জানে। অন্তত আমি জীবনের এদের কাউকে দেখেছি বলে মনে করতে পারছি না।
কিন্তু এমন হলো কেন, আমি নিজেও তো ব্যক্তিগতভাবে চেনাজানা অনেককে বলছি। অনুরূপ কুদ্দুস ভাইও। ভক্ত-পাঠক, আমন্ত্রিতদের কথা নাহয় বাদ দিলাম কিন্তু আমাদের পরিম-লের মানুষগুলো কই? সবাই একসাথে ‘নিমকহারামি’ করলো? কীভাবে পারলো এমন করতে!
দর্শকের অভাবে তো আর অনুষ্ঠান বন্ধ রাখা যায় না। বিশেষ করে নির্ধারিত সময়ের দুই ঘণ্টা পরেও! সুতরাং অনুষ্ঠান শুরু করে দিতে হলো। প্রথমে স্বাগত বক্তব্য রাখলাম আমি মাখন পাটোয়ারী। আমার পরমারাধ্য স্যার, শ্রদ্ধেয় গুরু, একমাত্র আদর্শ কবি অনন্ত অসীম যে খুব সহসা বাংলা সাহিত্যাকাশের জ্বলজ্বলে নক্ষত্র হয়ে উঠছেন, তার কবিত্ব, কাব্যপ্রতিভা ছড়িয়ে পড়বে দিগন্ত থেকে দিগন্তে, দেশ ছাড়িয়ে মহাদেশে। এমনকি ভিনগ্রহে যখন বাংলা ভাষার চর্চা শুরু হবে তখন সেখানেও পঠিত হবে অনন্ত অসীম। যার কবিপ্রতিভা অনন্ত, যার কাব্যজ্ঞান অসীম তিনিই কবি অনন্ত অসীম। এই মানের কবি বাংলা সাহিত্যে আর নেই। কখনো জš§ হবে কিনা তাও বলা যাচ্ছে না...।
অনুষ্ঠানে আগত একমাত্র দর্শকের উদ্দেশে এ জ্বালাময়ী ভাষণ পেশ করলাম। একমাত্র দর্শক মানে সাংবাদিক বাদল রহমান। অন্যরা ধীরে-ধীরে, ফাঁকতালে চলে গেছে। বাদল রহমান দৈনিক ঠেকাও দুর্নীতি পত্রিকার ক্রাইম রিপোর্টার। এ পত্রিকায় কুদ্দুস ভাই নিয়মিত কবিতা লেখেন। বাদল রহমান সেই সূত্রে তার পরিচিত। বাদল সাহেব হচ্ছে সেই মানের সাংবাদিক যারা কারো দুর্বলতা খুঁজে পেলে পাকড়াও করে বলেন, আপনি তো অমুক দুর্নীতির সাথে জড়িত। টাকা দেবেন কিনা বলেন, নইলে দিলাম সংবাদ ছেপে...।
তবু ভালো, একজন অতিথি তো এসেছে। কিন্তু আমার বক্তব্য চলাকালীন এবং বক্তব্য শেষে দেখলাম বাদল রহমান মুখ টিপে হাসছেন। বোধহয় আমার সাথে তিনি একমত নন। হাসুকগে, ক্রাইম রিপোর্টার সাহিত্যের কী বোঝে!
কিন্তু এভাবে তো অনুষ্ঠান চালানো যায় না। জমতে তো হবে। জেলির মতো গাঢ় হয়ে না জমুক, অন্তত দুধের সরের মতো তো জমবে! অনুষ্ঠানে সাময়িক বিরতি দিয়ে ভিন্ন এক ‘অভিযানে’ নামলাম। আশপাশ থেকে টোকাই, ছিন্নমূল, সাধারণ মানুষ যাকে পেলাম, সবাইকে আমন্ত্রণ জানালাম অনুষ্ঠানস্থলে বসার। অনুষ্ঠান শেষে মিষ্টি ও আরো অনেক উপহার বিতরণ করা হবে।
এ প্রলোভনে কাজ হলো। কিছু লোক ঠিকই জমলো। ধন্য করলো দর্শকের আসন। না, তাদের আমরা ঠকাবো না। অনুষ্ঠান শেষে সবাইকে নিয়ে যাবো রাধাকৃষ্ণ মিষ্টান্ন ভা-ারে। সেখানে সবার জন্য বরাদ্দ দুইটা নিমকি, একটা মিষ্টি আর এক গ্লাস ফিল্টার পানি। আর উপহার? তারা যে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা শুনলো, কবিকণ্ঠে কবিতা আবৃত্তি শুনলো এগুলো কি উপহার নয়? সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার তো এটাই!
দর্শক-শ্রোতা হলো। অনুষ্ঠান ফিরে গেলো আগের ধারাবাহিকতায়। প্রধান অতিথি অলক রহমান বক্তৃতা দিতে গিয়ে আবিষ্কার করলেন, লিখিত বক্তৃতার খসড়াটা বাসায় রেখে এসেছেন। বক্তৃতার খসড়া কপি মনে করে নিয়ে এসেছেন একদলা টিস্যু পেপার। পকেট থেকে যখন খসড়ার বদলে টিস্যু বেরিয়ে এলো, তার মুখে জমলো বিন্দু বিন্দু ঘাম। হাতে ধরা টিস্যু পেপার দিয়ে মুখ মোছেন। যতœ সহকারে।
হায়, এখন কী হবে? বদমাশটাকে কত করে বললাম, বক্তব্য মুখস্থ করতে। না, তিনি ‘মুখস্থবিদ্যা’য় বিশ্বাসী নন, দেখেই পড়বেন।
তো এখন পড়ছিস না কেন? শালা গবেট কোথাকার!
প্রধান অতিথি, বক্তৃতা তো দিতেই হবে। তার উপর তিনি এখন মাইকের সামনে। কিছু চোখ তার দিকে তাকিয়ে আছে। উপায়ান্তর না দেখে শুরু করলেন উপস্থিত বক্তৃতা, ভাইছাবরা, আঁর দোস্ত কুদ্দুইস্যা কবি অইছে ইয়ান যে আঙ্গোর লাই কত্ত বড় খুশির খবর, মুখে কই বুঝাইতাম হাইরতাম ন। হেতে আরো বড় কবি য়োক, আঁই মাইষেরে কমু, এ্যাই আঁরে সালাম দে। কবি কুদ্দুস আঁর দোস্ত। চা দোয়ানে নাস্তা খাই টেঁয়া দিতাম ন। আঁর দোস্ত এত্তো বড় কবি, আঁই টেঁয়া দিমু কিল্লাই? আঁই তো ভিআইপি পার্সন। কবির দোস্ত কবি...।
বাতাস প্রতিকূলে বইছে দেখে কুদ্দুস ভাই জোরপূর্বক প্রধান অতিথিকে চেয়ারে বসিয়ে দিলেন। ঘোষণার ধার না ধেরেই শুরু করলেন স্বরচিত কবিতা পাঠ_
মনমন্দিরের কুসুমকাননে তোমার স্মৃতি বয়ে যায়
তৃমিহীনা মম বিরান হৃদয়ভূমি নিয়ত ক্ষয়ে যায়
রক্তকণিকা পল-অনুপলে তোমার নাম লয়ে যায়
তোমার অবহেলা, প্রেমহীনতা এ-মন সয়ে যায়
ভালোবাসবো ঠিকই, বিয়ে করবো না মন কয়ে যায়...।
এ পর্যন্ত ঠিকমতোই চলছিলো। কিন্তু মাঝখানে টোকাই শ্রেণীর এক ছেলে চেঁচিয়ে বললোÑমামু, পরের লাইন বুঝি নাই। আবার কন!
সেদিকে ভ্রƒক্ষেপ না করে কুদ্দুস ভাই তার নিজের মতো আবৃত্তি করতে থাকেন। আবৃত্তি চলতে থাকে। কী ব্যাপার, কত্ত বড় কবিতা? শেষই হচ্ছে না। দশ মিনিট, বিশ, ত্রিশ মিনিট...। এটা কি কবিতা না মহাকাব্য, নাকি ‘ডাইরেক্ট’ হয়ে গেলো!
তারপরই ঘটে যায় এক অঘটন। এ অঘটনের জন্য কুদ্দুস ভাই, আমি, আমরা কেউই প্রস্তুত ছিলাম না।
সাত.
কুদ্দুস ভাইয়ের স্বরচিত কবিতা আবৃত্তির মাঝখানেই মঞ্চে যমদূতের মতো আবির্ভূত হলেন আঙ্কেল। মানে কুদ্দুস ভাইয়ের বাবা। কী ব্যাপার, তিনি এখানে কেন? দর্শক হিসেবে এলে ক্ষতির কিছু ছিলো না, বরং তা হতো আনন্দের ব্যাপার। হাতেই বা ঐ ভয়ানক জিনিসটার উপস্থিতি কেন? আঙ্কেলের হাতে বাটা কোম্পানির ছেঁড়া-ফাটা একটা প্রোডাক্ট। এটা দিয়ে তিনি কী করবেন, তাও আবার একেবারে মঞ্চে...। অবশ্য বেশিক্ষণ দ্বিধাদ্বন্দ্বে রাখলেন না তিনি। পলকে কী থেকে কী ঘটে যেতে থাকলো, চিন্তাভাবনার অবকাশও পেলাম না। আঙ্কেলের হাতের পাদুকা উপুর্যুপরি সঞ্চালিত হতে লাগলো কবি অনন্ত অসীমের পাঞ্জাবি আচ্ছাদিত পৃষ্ঠদেশে। পাদুকা সঞ্চালিত হচ্ছে... হচ্ছে... হচ্ছে...।
উহ্, কী ভয়ঙ্কর দৃশ্য। কী মর্মান্তিক, কী হৃদয়বিদারক! মানুষ কীভাবে এতোটা অবিবেচক হয়। কবিরা জাতির বিবেক... সেই বিবেকে... ছি ছি ছি। হাত চালানোর পাশাপাশি আঙ্কেলের মুখও চলছে সমানতালে_ হতচ্ছাড়া, বদমাশ, কুলাঙ্গার, আমার কষ্টার্জিত টাকার শ্রাদ্ধ করে কবি সাজা হচ্ছে। অনন্ত অসীম! কবি অনন্ত অসীম? টাকা যেন হরিলুটের বাতাসা। দাঁড়া, ছুটাচ্ছি তোর কবিগিরি, হারামজাদা...।
দর্শকবৃন্দ কিংকর্তব্যবিমূঢ়। আমি বাকহারা। কাকাকে তো মঞ্চে অতিথি করা হয়নি। অতিথি দূরে থাক, আমন্ত্রণপত্রও দেয়া হয়নি। তিনি কেন অনধিকারচর্চা করছেন। এইভাবে, না এ বড় অন্যায়। মানবতাবিরোধী অপরাধ। শিক্ষক মানুষ কেন এতো বড় অপরাধ করবে?
বিটকেলে বদরুল টোকাইটার কা- দ্যাখো, দাঁত কেলিয়ে হাসছে। আরে ব্যাটা, একজন কবির অপমান মানে তোরও অপমান। পুরো দেশ ও জাতির অপমান। জনৈক হকার বললো, এত্তো সোন্দর পাঞ্জাবিত ময়লা লাইগা যাইতাছে। অরে পাঞ্জাবিডা খুইলা পিডান!
কাকা পাদুকার অপব্যবহার করে চলেছেন। করেই চলেছেন। করেই...। পাদুকাথেরাপির লোড নিতে না পেরে কুদ্দুস ভাই দে ছুট।
কত বছর পর আবার নতুন করে রচিত হলো পাদুকাপুরাণ, পাদুকাকাব্য? যদিও এ কাব্যের চিত্রায়নের জন্য কেউই প্রস্তুত ছিলাম না।
আহারে, কুদ্দুস ভাইয়ের কী দৌড়। এই জাতি নাকি খ

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


