সারাদেশে বেশ জাঁকালোভাবেই শীত পড়ছে (শুধু ঢাকা শহর ব্যতিক্রম)! শীতের প্রকোপে অন্য জেলার মানুষের জবুথবু অবস্থা। গরম কাপড়ে নিজেদের আচ্ছাদিত করার পরও... হি-হি-হি, হু-হু-হু! শীতের কাঁপুনি কমানোর (নাকি বাড়ানোর!) জন্যই এই বিশেষ ফিচার!
শীতে উষ্ণ থাকার উপায়
বিরোধী দলকে বলে-কয়ে দুই একটা বাড়তি হরতাল ডাকার অনুরোধ করা যেতে পারে। হরতাল সংস্কৃতি চাঙ্গা হলেই রাজপথ থাকবে উত্তপ্ত। আর উত্তপ্ত রাজপথ মানেই আলবিদা শীত!
বাংলা সিনেমার হিট নায়িকা মুনমুন, ময়ূরী, পলি, শানু, শাপলা, তৃষ্ণা, ডলি অভিনীত ছবি বেশি বেশি মুক্তি দেওয়া যেতে পারে। শুধু ছবি মুক্তি দিলেই হবে না, প্রতিটি ছবিতে কাটপিসের উপস্থিতিও নিশ্চিত করতে হবে। ব্যস, হট নায়িকাদের তৎপরতায় মুহূর্তেই হিট, মানে গরম!
বাসা-বাড়ি, অফিস-আদালতে কারণে-অকারণে ঝগড়া লাগিয়ে দিতে হবে। একে অপরের সঙ্গে ঝগড়া করতে থাকায় যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হবে, সে বাক্য থেকে তাপ শোষণ করে সহজেই শীত দূরীভূত হবে!
সংবাদপত্রে প্রতিদিন শিরোনাম করতে হবে_ 'অসহ্য গরমে জনজীবন অতিষ্ঠ'। সে খবর বিশ্বাস করে মানুষ শীতের কাপড় পরা বাদ দিয়ে উল্টো ফ্যান চালাবে, এসির উল্টোমুখী ব্যবহার হবে। এ প্রচারণার ফলে খুব সহজেই শীতকে পরাস্ত করা সম্ভব!
কবিতা পাঠের আসর বসানো যেতে পারে। অতি আধুনিক কবিরা শুরু করবেন কবিতা পাঠ। সে কবিতার আগামাথা বুঝতে না পেরে মানুষের চোখ-মুখ দিয়ে ধোঁয়া বের হতে শুরু করবে। সে ধোঁয়া থেকে পর্যায়ক্রমে বেরিয়ে আসবে আগুন!
দ্রব্যমূল্য অনেক গুণ বৃদ্ধি করে দেখা যেতে পারে। পত্রিকায় খবর ছাপা হবে 'বাজারে আগুন!' মানুষজনের মুখে মুখে শোনা যাবে, বাজারে আগুন লাগছে। সে আগুনের আঁচেই শীত কম্বলের নিচে মাথা লুকাবে!
সবার জন্য উচ্চাঙ্গসঙ্গীত শোনা ও সেটা হৃদয়ঙ্গম করার ব্যাপারটা বাধ্যতামূলক করতে হবে। দিনরাত আ-আ-আ-আ-আ শুনতে শুনতে যখন কান ঝালাপালা হয়ে যাবে, তখন কান থেকে বেরোতে শুরু করবে উত্তপ্ত সিসা!
গায়ক আগুনকে অনুরোধ-উপরোধ করে রাজি করিয়ে, বিভিন্ন পেল্গসে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দাঁড় করিয়ে রাখা যেতে পারে। ব্যস, মানুষ এসে ফায়ার পেল্গসে আগুন পোহানোর মতো গায়ক আগুনের চারপাশে জড়ো হবে। আর এই ফাঁকে শীত পগারপার!
কোনো তৈল বুদ্ধিজীবীকে ভাড়া করে 'জাতীয় জীবনে শীতের গুরুত্ব' শীর্ষক আলোচনা সভার আয়োজন করা যায়। বুদ্ধিজীবীর যুক্তির ঠেলায় শ্রোতাদের কান দিয়ে আগুনের হলকা বের হবে। সে আগুনে চামে রান্নাবান্নার কাজটাও সেরে নেওয়া যাবে!
জনপ্রিয় কোনো রবীন্দ্রসঙ্গীতশিল্পীকে দিয়ে 'তুমি যে সুরের আগুন ছড়িয়ে দিলে মোর প্রাণে/সে আগুন ছড়িয়ে গেল সবখানে' গানটা গাইয়ে রেডিও-টেলিভিশনে লাগাতার সম্প্রচার করতে হবে। ব্যস কেল্লাফতে। সুরের আগুন ছড়িয়ে যাওয়ার পরই শীত বাপ বাপ করে পালাবে!
কেন শীত পড়ে
সবকিছুরই কার্যকারণ থাকে। তেমনি শীত কেন পড়ে, এটারও ব্যাখ্যা আছে। কিন্তু বহু মতের এই দেশে কেন শীত পড়ে তা নিয়ে নানা মুনির নানা মত! অল্প কয়েকজন মানুষের মন্তব্য থেকে শীতের স্বরূপ উন্মোচন করা যাক_
সরকারি দল : বিরোধী দল এই দেশের ভালো চায় না! ভালো চায় না বলেই খাল কেটে কুমির আনার বদলে শীত নিয়ে আসে!
বিরোধী দল : এই সরকার নিজেরাও মানুষ মারছে, আবার শীতকে দিয়েও মারাচ্ছে। প্রতি বছর এই জালিম সরকার উত্তরবঙ্গের মানুষদের ওপর আক্রোশবশত শীত-হামলা চালায়! উত্তরবঙ্গের মানুষের একটাই অপরাধ, তারা এরশাদ সাহেবকে সাপোর্ট করে!
বুদ্ধিজীবী : শীত এলো কি এলো না, পড়ল কি পড়ল না_ বড় কথা নয়। ধর্তব্য হচ্ছে, বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য শীতের পিঠা বানানো হলো কি-না! হলে সেই পিঠার নকশা ও আল্পনা ঠিকঠাকমতো হয়েছে কি-না!
বাম রাজনীতির সমর্থক : শীত আসলে পড়ে না, শীতকে কৌশলবশত পড়তে বাধ্য করা হয়। শাসকগোষ্ঠীর চরিত্রই এই, এরা নিজেদের চরিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নানা রকম ভেলকিবাজি দেখিয়ে থাকে! ভেলকির খেল জোরালো হোক বা না হোক!
নৈরাশ্যবাদী : এই পোড়া দেশে শীতই তো পড়বে! নাকি তোমরা প্রত্যাশা কর শীতের বদলে মুক্তারেণু ঝরবে! কখনোই না, দুঃখ-জরা-ক্লান্তি-হতাশার সঙ্গে শীতও একাকার হয়ে গেছে। শীত আমাদের আরও ভোগাবে, আরও আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধবে!
ঢাকা শহরে শীত না থাকার কারণ_
তীব্র শীতে কাঁপতে কাঁপতে সারাদেশের মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম হলেও ঢাকা শহর সব সময়ই থাকে (সর)গরম! অর্থাৎ ঢাকাকে শীত মোটেই কাবু করতে পারে না। কেন পারে না, দেখা যাক_
ঢাকা শহর নামেই ঢাকা, মানে কাভারড! আর ঢাকা জিনিসের ওপর শীত পড়ার জায়গা কোথায়!
শেয়ারবাজার দুর্ঘটনা, রাজনৈতিক উত্তেজনা সব সময় বিরাজ করে ঢাকায়। ফলে এত সব ক্যাঁচালের ভেতর শীত এদিকে পা বাড়াতে সাহস পায় না!
মাঘের শীতে বাঘ পালায় বলে একটা কথা চালু আছে। এদিকে দিনকে দিন কমে যাচ্ছে সুন্দরবনের বাঘ! যেহেতু শীতের সঙ্গে বাঘের একটা সম্পর্ক আছে, তাই শীত বাঘকে তাড়াতে চায় না বলেই নিজে আসে না!
দ্রব্যমূল্য, বাসাভাড়া, যানবাহন ব্যয়সহ ঢাকা শহরের জীবনযাত্রার ব্যয় অন্য যে কোনো শহর থেকে বেশি। এত বেশি যে শীতের মতো তুচ্ছ বিষয় এখানে কুলিয়ে উঠতে পারে না!
শীতের তা ব থেকে বাঁচতে অনেক জায়গায়ই পেপার-পত্রিকা পুড়িয়ে আগুন পোহানো হয়। আর ঢাকা থেকেই বের হয় নামি, অনামি যতসব পত্রিকা। আঁতুড়ঘরেই অপমান করতে চায় না বলে শীত এদিকে আসার দিকে মনোযোগ দেয় না!
শীত কাদের আরাধ্য
শীতের অপকারিতা হয়তো আছে, তাই বলে উপকারিতাও কম নয়! কারও কারও কাছে শীত পরম আরাধ্য বস্তু! এই আরাধনাকারীদের চিনে নেওয়া যাক_
পোশাক বিক্রেতা : শীতের অনিবার্য অনুষঙ্গ একগাদা গরম কাপড়_ মাফলার, ক্যাপ, মোজা, কোট। এই সুযোগে সিজনাল ব্যবসায়ীদের পোয়াবারো!
প্রসাধনীর কোম্পানি : শীতে ঠোঁটসহ ফেটে যায় শরীরের বিভিন্ন এলাকা! পানির খরাজনিত এই সমস্যা দূর করতে প্রসাধনীর কোম্পানিগুলো বিভিন্ন প্রচারণা চালায়। তাদের প্রচারণায় ফাটা অঞ্চল স্বাভাবিক হোক বা না হোক, পণ্য বিক্রির রমরমা অবস্থা হয়!
নবদম্পতি : শীতের সঙ্গে বিয়ের অলিখিত কী একটা সম্পর্ক আছে! তাই শীতকালেই বিয়ে বেশি হয়। নবদম্পতিও কায়মনোবাক্যে শীতকে স্বাগত জানায়!
ঘুমকাতুরে : মোটামুটি বিকেল ৫টার মধ্যেই সন্ধ্যা নামে! এই সুযোগে রাতের আয়ু বেড়ে যায় অনেক! ঘুমকাতুরেরা নিজেদের ইচ্ছামতো নিদ্রাযাপন করার মওকা পায়!
বিদ্যুৎ বিভাগ : চাহিদামতো বিদ্যুৎ সাপল্গাই দিতে না পারায় বিদ্যুৎ বিভাগ প্রায়ই সমালোচনার মুখে পড়ে! কিনন্তু শীতকালে যেহেতু বিদ্যুতের চাহিদা অনেক কমে যায়, বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজন কামনা করে সারাবছরই যেন শীতটা টিকে থাকে!
শীত ঠেকানোর কৌশল
চাইলে খুব সহজেই অনিষ্টকর শীতকে ঠেকানো যায়! এর জন্য সুশীল সমাজের সমন্বয়ে গোটাকয়েক কৌশলপত্র প্রণয়ন করাই যথেষ্ট! খসড়া কৌশলপত্রে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে যা প্রতীয়মান হয়ে ওঠে_
শীতের নাম পাল্টে দেওয়া যায়! তারপর হিম পড়লে পড়ূক, শীত তো আর পড়বে না!
এক দফা এক দাবি/শীত তুই কবে যাবি-ধরনের আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে স্লোগান তোলা যেতে পারে!
পৃথকভাবে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের লোকদের কাছে শীতকে ভারতের দালাল কিংবা শীত পাকিস্তানের দালাল হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের কান ভারি করা যায়। তারপর যা করার, তারাই করবে!
পাঠ্যবইয়ে আমার প্রিয় ঋতু শীত শীর্ষক রচনাটি প্রত্যাহার করে শীতের তা ব কিংবা শীতের ক্ষতিকর প্রভাব শীর্ষক রচনা অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে!
ষ শীত নিয়ে প্যাঁচআল-জাতীয় ফান ম্যাগাজিন যে গুরুত্ব দিয়ে লেখা ছাপে, এ ধরনের আলগা আদিখ্যেতা রুখতে হবে!
শীত মৌসুমে কাদের অসুবিধা
সুবিধার পাশাপাশি শীতকালে বেশকিছু অসুবিধাও পরিলক্ষিত হয়! কিছু লোক শীতে মারাত্মক সমস্যায় পড়ে! যে সমস্যার প্রতিকার কঠিনই বটে!
পকেটমার : পকেটমারের নজর থাকে সব সময় মানুষের পকেটের দিকে। মানুষ সাধারণত প্যান্টের পকেটেই টাকা-পয়সা রাখে। কিন্তু শীতকালে উষ্ণতার খোঁজে সবাই প্যান্টে হাত ঢুকিয়ে রাখে। ফলে পকেটমারদের কার্যসিদ্ধিতে মারাত্মক বিঘ্ন সৃষ্টি হয়!
পাখা বিক্রেতা : তোমার হাতপাখার বাতাসে/প্রাণ জুড়িয়ে আসে-ধরনের গান শীতকালে কেউই গায় না! ফলে পাখা বিক্রেতাদের ব্যবসায় লালবাতি জ্বলার উপক্রম হয়। এবার সেটা বৈদ্যুতিক পাখাই হোক কিংবা হাতপাখাই!
ভ্রমণপ্রেমী : সুযোগ পেলে দূরে কিংবা গলি-উপগলিতে ভ্রমণে বের হয় এ রকম লোক অসংখ্য। বিশেষ করে গরমের উছিলা দেখিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর পর্যন্ত চলে যায় অনেকে। কিন্তু শীতকালে এই শ্রেণীর লোকদের 'বাংলার মুখ' দেখিবার সুযোগ হয় না বললেই চলে!
ঢাকাই ছবির নায়িকা : শরীরে পোশাক যতই কম থাকুক, নিজেদের হটগার্ল ইমেজ প্রতিষ্ঠায় মত্ত হোক; মানুষ হিসেবে তাদেরও শীত লাগে! কিন্তু উপায় নাই ময়ূরী বেগম, কনকনে শীতেও নামকাওয়াস্তে পোশাক পরে শুটিং করতে হয়!
ফ্যাশন করনেওয়ালা : দেশে এমন লোকের সংখ্যাও খুব একটা কম নয়, যারা সকালে এক পোশাক পরে তো বিকেলে আরেকটা! অর্থাৎ ফ্যাশনই তাদের ধ্যানজ্ঞান! এই শ্রেণীর লোকদের চরম বিপত্তিতে ফেলে ফ্যাশনের জায়গাটা দখল করে নেয় বস্তাসদৃশ মোটা কাপড়!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


