আজ আবার তিন মাস পর লিখতে বসলাম। আমি কখনই ভাল লেখক ছিলাম না আর হবও না কোনো দিন। তবে লিখেতে ইচ্ছা করে অনেক কিছু। ব্লগ লেখার শুরুর দিকে আমাকে সর্তক করে দেয়া হয়েছিল কোন প্রকার ধর্ম, রাজনৈতিক, পক্ষ পাত্তিত এবং প্রতিবাদী মূলক লেখা না লেখার জন্য এবং এই সব লেখা থেকে ১০০ হাত দূরে থাকার জন্য। আমি অক্ষরে অক্ষরে তা পালন করেছি। কিন্তু আমি এই নির্দেষ আর মানতে পারলাম না। এখন যদি আমি চুপ করে থাকি তাহলে অন্য কারো কিছুই হবে না আমি শুধু নিজের বিবেকের কাছে আমৃত্যু একজন অপরাধী হয়ে থাকব। আর আমি সেটা চাই না। একজন মানুষ হিসেবে আমি কখনই আমার দায়িত্ব থেকে পিছপা হইনি। আজ সেই দায়িত্ববোধ আমাকে লিখতে বাধ্য করল। তবে এই লেখা কাউকে হেও করার জন্য না বা কাউকে মনে কষ্ট দেবার জন্যও না।
আমার জীবনের বেশ বড় একটা অংশ জুরে আছে ট্রেন ভ্রমন। যতবার ট্রেনে ভ্রমন করেছি প্রতিবারই নানা রকম অভিজ্ঞতা হয়েছে, তার কিছুটা মজার কিছুটা ভয়ের আবার কিছুটা বিরক্তিকর। এই রকম নানা রকমের অভিজ্ঞতা। যা লিখলে একটা বই হতে পারে। কিন্তু কখনো লেখার প্রয়োজন পরেনি বা আমিও লেখার মত কিছু মনে করিনে। তবে এবারের গল্পটা একটু ভিন্ন। এবারের গল্পে এমন কিছু হয়েছে যা আগে কখনও হয়নি। সেই কথা বলার জন্যই আমার আজকেই এই লেখা।
দীর্ঘ আরাই মাস পর আমি ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম ফিরছি। গত ১৬ই জুলাই। সুর্বণ এক্সপ্রেস, বগি “গ” সিট নং ৫৪। কমলাপুর থেকে ট্রেনে উঠলাম। ট্রেন ছাড়ার সময় বিকেল ৩:৩০ মিনিট। আমি সব সময়ের মত ট্রেনে উঠেই গান শোনা শুরু করলাম। বাকি যাত্রীরাও যার যার মত তাদের জায়গা বুঝে নিচ্ছিল। সবই ঠিক ছিল ব্যতিক্রম হল শুধু ৫ জন যাত্রীর। মা, দুই মেয়ে, আর তাদের ২ জন সহকারী। মেয়ে দু’টির কিছু সমস্যা থাকায় তারা তাদের নির্ধারিত স্থানে আসন না নিয়ে ট্রেনের দরজার কাছে ৫টি আসন নিয়ে বসতে চাইল। পিছনের আসনের যাত্রীদের সাথে কথা বলে টিকেট অদল বদল করে নেয়া আরকি। খুব সাভাবিক একটা ব্যপার। কমলাপুর থেকে ঠিক ৩:৩০ মিনিটে ট্রেন ছেড়ে দিল। সবই ঠিক চলছিল, ট্রেন কমলাপুর থেকে ছেরে বিমান বন্দর স্টেশেনে এসে থামলো।
আপনারা হয়তো ভাবছেন এই কাহীনিতে এমন কি আছে যা আমি এত ঘটা করে বলছি। কারণ সেই বড় মেয়েটি। তিনি হলেন সবার পরিচিত ব্লগার সাবরিনা সুলতানা।
সাবরিনা তাদের ৫টি আসনের মধ্যে ৪টি আসন বদল করে নিলেন। ৪ জন ভদ্রলোক বিনা বাক্য ব্যায়ে তাদের আসন বদলাতে রাজি হলেন। এবার আসল ৫নং আসন বদলাবার পালা। আসন নং ৫৫ এর যাত্রী একজন মহিলা। তিনি যখন দেখলেন তার আসনটি দখল হয়ে আছে তিনি তখন ট্রেনের এটেন্ডেন্সকে ডেকে তার আসনটি খালি করে দিতে বললেন। এটেন্ডেন্স এসে সাবরিনা কে যখন বললেন এই কথা তখন সাবরিনা বললেন “আপনি ওনাকে ডেকে দিন আমি অনুরোধ করি” এটেন্ডেন্স চলে গেলেন এখন কিছুখনের মধ্যেই ফিরে এসে বলেন যে উনি তার আসন ছাড়া অন্য কোথাও বসবেন না। এই রকম করে বেশ কিছুখন চলার পরে আরও একজন যাত্রী উঠে গিয়ে অনুরোধ করলেন তাতেও কাজ হল না। এটেন্ডেন্স আবারো ফিরে এসে বললেন তিনি একা বসবেন কারো সাথে বসবেন না। (এর মধ্যেই আমার মেজাজ গরম হতে শুরু করেছে) এবার আমি উঠে গিয়ে ঐ মহিলার সাথে কথা বললাম। তাকে বললাম আমার সিট নং ৫৪ আপনি আমার সিটটা নিন। বার বার তাকে বুঝানোর চেষ্টা করলাম কিন্তু তিনি কোনো ভাবেই রাজি বলেন না। তখন আমি আমার আসনটি সাব্রিনাদের সাথে বদলে নিলাম আর ৫৫ আসনটি খালি করে দেয়া হল কিন্তু তারপরও ঐ মহিলে ৫৫নং আসনে বসবেন না। এর কারণ জানতে চাইলে তিনি উত্তরে বলেন সাবরিনার হুইল চেয়ারের চাকা তার সিটের সামনে চলে আসে তাই তার বসতে নাকি সমস্যা হবে। আমার দেখা মতে এমন কিছুই অসুবিধা তার হতো না। আমার খুব অবাক লাগলো এই দেখে যে সাবরিনা এত অনুরোধ করার পরেও ঐ মহিলা একটা বারের জন্যও কথা বললেন না। পাশ কাটিয়ে চলে গেলেন। পরে আমি এটেন্ডেন্স এর কাছ থেকে জানতে পারি তিনি নাকি একুশে টিভির প্রাক্তন সাংবাদিক নাম সুমি খান। বর্তমানে তিনি কোথায় আছেন আমি জানি না।
অনেক দিন আগে ন্যাশনাল জিওগ্রাফি চ্যানেলে একটা পোগ্রাম দেখেছিলাম। একটি সিংহি একটি হরিণ শাবকের সামনে বসে আছে। আমি মনে মনে ভাবছিলাম এই বুঝি হরিণ শাবক সিংহির পেটে গেল। কিন্তু কিছুখন দেখার পর এবং ধারা বিবরণী শোনার পর বুঝতে পারলাম আসল ব্যাপার। কোনো এক কারণে হরিণ শাবকের মা ছিল না। তখন ঐ সিংহিটি হরিণ শাবককে নিজের সন্তানের মত আগলে রাখতে শুরু করে। এই রকম করে অনেক দিন প্রায় ৪০ দিন চলে যায়। অন্য সিংহ আর জন্তু জানোয়ার এর কবল থেকে শাবকটাকে বাচিয়ে রাখার জন্য নিজের শিকার করাও ছেরে দেয়, এতে আস্তে আস্তে সিংহিটি দুর্বল হয়ে পরে কিন্তু তারপরও সে শাবকটাকে একলা ছাড়ে না। কিন্তু একটা সময় পরে সিংহিটা আরে হরিণ শাবকে রক্ষা করতে পারে না। পুরো পোগ্রাম দেখার পর আমি খুবই অবাক হলাম। কারণ সিংহ বা সিংহি শিকারী প্রানী। কিন্তু তার পরও সব কিছু ভুলে গিয়ে সিংহিটা হরিণ শাবককে আগলে রাখে নিজের সন্তানের মত। এটি আসলেই বিরল ঘটনা আমার জন্য। কিন্তু মাঝে মাঝে আমরা মানুষরা এই সিংহির চাইতেও অধম হয়ে যাই। আমরা মানুষ কিন্তু পশুর চাইতেও আমাদের অবস্থান নিচে।
ছোট বেলা থেকেই যেনে এসেছি মানুষ মানুষের জন্য। মনুষত্ব বলে একটা শব্দ আছে। মানুষের সেই মনুষত্ব এখন আর নেই বললেই চলে। নিজের সার্থের জন্য আমরা যা ইচ্ছা তাই করছি। এতে কে বাচলো কে মরলো তাতে কারো কিছুই আসে যায় না। আমি আজ ভিষন লজ্জিত প্রথম বারের মত। আমি নিজে একজন মানুষ এবং একজন নারী। সেই হিসেবে নিজের সাথে সাথে অন্য সবার প্রতি একটা মানবিক দায়িত্ব আমার আছে। সেখানে সুমি খানের মত একজন একজন নারীর এহেন ব্যবহার আমাকে শুধু লজ্জিতই করেনি মানুষের মনুষত্বে আঘাত করেছে। যেখানে ৪ জন পুরুষ বিনা বাক্যে তাদের সিট বদলাতে রাজি বল সেখানে সুমি খান তারউপর পেশায় একজন সাংবাদিক হয়ে এমন একটা কাজ করলেন। তার কি উচিৎ ছিল না একবার অন্তত সাবরিনার সাথে কথা বলা?? তিনি কি পারতেন না খুব সহজেই তার আসন কি বদলে নিতে???
আমার এই লেখা কাওকে আঘাত করার জন্য নয়। বরং বিবেকের কাছে কিছু প্রশ্ন রাখলাম...এমনটা কি হওয়া উচিৎ? এটা কি আমাদের দেশের চিত্র? এই কি আমাদের মানবতা? খুব কষ্ট নিয়ে লেখাটা লিখলাম। কারণ কাল হয়ত সাবরিনার জায়গায় আমি ও হতে পারি। হতে পারেন আপনাদের মধ্যে কেও একজন। একবার সাবরিনার জায়গায় দাড়িয়ে চিন্তা করুন তখন আপনিও আমার মতই বলেবন এমন সাংবাদিক আমরা চাইনা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

