সহজ ইতিহাস : ২য় বিশ্বযুদ্ব Click This Link
২য় বিশ্বযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যোগ দেয়ার পর থেকেই যুদ্ধে জয়ের ব্যাপারে মিত্র বাহিনী মোটামুটি নিশ্চিত ছিল, কিন্তু যুদ্ধ পরবর্তী বিশ্বব্যাবস্থা সম্পর্কে মতপার্থক্যের কারনে তাদের ভেতরই ২টি পক্ষ তৈরী হয়ে যায়। একপক্ষে পুঁজিবাদী যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেন অপর পক্ষে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত রাশিয়া! ফ্রান্স তখন জার্মানীর অধিনে, তাদের মূল লক্ষ্য ছিল পুনরায় স্বাধীন হওয়া।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া শক্তিমত্তার দিক থেকে অন্য দেশগুলোর চেয়ে বহুগুনে এগিয়ে ছিল, তাই যুদ্ধপরবর্তী বিশ্বে কে হবে নেতা সেটা নিয়ে এই ২টা দেশের মধ্যে যে প্রতিযোগীতা আরম্ভ হবে সেটা স্বাভাবিকই ছিল।
এবং এই প্রতিযোগীতাই চলে পরবর্তী ৪ দশক ধরে! যাকে ইতিহাসে স্নায়ুযুদ্ধ / কোল্ডওয়ার বলেই সবাই জানি। পুরো বিশ্ব এই কয়েক দশকের চলমান যুদ্ধে কমবেশী আক্রান্ত হয়েছিল। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ছিল ২টা স্পষ্ট শিবিরে বিভক্ত। ২টি ভিন্ন ধারার আদর্শের ধারক ২টা দেশের হাতেই ছিল বিশ্বের লাগাম, তাদের আন্তপ্রতিযোগীতার ফলাফল ভোগ করে পুরো দুনিয়া! এই কোল্ডওয়ার সবসময় কোল্ড থাকে নাই কখনো কখনো পুরো বিশ্বের নিরাপত্তা ব্যাবস্থার প্রতি চুড়ান্ত হুমকী হয়েও দাড়িয়েছিল!!!
আজকে সহজ ইতিহাসে এই স্নায়ুযুদ্ধ সম্পর্কেই কিছু সহজ আলোচনা করবো। তাই প্রথমে কিছু প্রাথমিক ফ্যাক্টর্স জেনে নেই :
সংঘাতটা কিসের ছিল?
সংঘাতটা ছিল বিশ্ব নেতৃত্বের! আদর্শের, পুঁজিবাদ এবং সমাজতন্ত্রের , সংঘাত ছিল স্বার্থের বাজার দখল এবং নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠার।
যেহেতু পুঁজিবাদের মন্ত্র হচ্ছে বিনিয়োগ নির্ভর মুক্ত বাণিজ্য যা ব্যাক্তির চাহিদা নির্ভর বাজার তৈরী করা আর সমাজতন্ত্রের মূল মন্ত্রই হচ্ছে ব্যাক্তিমালিকানার বিলোপ তাই এটা পরিষ্কার যে পুঁজিবাদই হচ্ছে সমাজতন্ত্রের পথের কাঁটা। এবং ভাইস-ভার্সা!
এর আওতায় কোন এলাকা ছিল?
মূল ফোকাসে ছিল ইউরোপ। ইউরোপ কার্যত পূর্বের সমাজতান্ত্রিক ( সোভিয়েত স্যাটেলাইট স্টেটস) ও পশ্চিমের গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদি মার্কিন সাহায্য ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ২টা ভাগে ভাগ হয়ে যায়। এবং পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠায় তৎপরতা দেখায় ২ দেশ!
কখনো মধ্যপ্রাচ্য, কখনো আফ্রিকা থেকে দক্ষিন আমেরিকা এবং এশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় কোরিয়া বা দক্ষিন এশিয়া বিশ্বের সকল এলাকায় এই ২ দেশের প্রতিযোগীতার ক্ষেত্র হয়েছিল!
যুদ্ধের সূচনা:
সদ্য জয়ী বিশ্বযুদ্ধের মূল ময়দান ইউরোপে মার্কিন ও সোভিয়েত নিয়ন্ত্রন স্থাপনের প্রতিযোগীতা উগ্র হয়ে যায় ১৯৪৬ সালে মস্কো'র মার্কিন দুতাবাসের কূটনীতিবিদ জর্জ কেনানের বিখ্যাত এক টেলিগ্রামে! "লং টেলিগ্রাম" নামেই সেটা পরিচিত।
কেনান মার্কিন সরকারকে ব্যাখ্যা করেন যে, "রাশিয়ার সরকারে একদল উগ্র সমাজতন্ত্র সমর্থক আছে যারা বিশ্বাস করে, পুঁজিবাদী যুক্তরাষ্ট্রের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান কখনোই সম্ভব নয়। যদি সোভিয়েত ক্ষমতা নিশ্চিত হয় তবে আমাদের প্রচলিত জীবনব্যাবস্থা, রাষ্ট্রিয় কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা সবই ধ্বংস হবে"।
প্রভাবশালী মার্কিন সাময়িকি "ফরেন এ্যাফেয়ার্সে" ১৯৪৭ সালে এই এই টেলিগ্রাম আর্টিকেল রূপে ব্যাপক প্রচারিত হয়। কেনানের নামের বদলে "এক্স" ব্যাবহৃত আর্টিকেলটি মার্কিন সরকারের সকল মহলে এটা ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। এবং পরবর্তীতে এই টেলিগ্রামের প্রভাবেই মার্কিন সরকারকে ব্যাপক তৎপর হতে দেখা যায়। কেনান টেলিগ্রামে পরিষ্কার করে বলে এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী,ধৈর্যশীল কিন্তু বলিষ্ঠ এবং সতর্ক পদক্ষেপ নেয়া!
বিভক্ত বিশ্ব!!!
---------------------------------------
এবার আসি মূল ঘটনায় :
যেহেতু এটা সহজ ইতিহাস, তাই আলোচনা ও বুঝার সুবিধার্তে কোল্ডওয়ারের পুরো সময়টাকে ৩ ভাগে আলোচনা করবো :
১- সরাসরি বিরোধীতা এবং শান্তিপূর্ণ সহ অবস্থান - ১৯৪৫-১৯৬২
২- ডেতান্ত ( আপেক্ষিক শান্তিপূর্ণ সময় )-১৯৬৩-১৯৭৮
৩- পুনরায় ঝামেলা এবং সমাপ্তি -১৯৭৯-১৯৯১
সরাসরি বিরোধীতা ও সহ অবস্থান - ১৯৪৫-১৯৬২ :
মার্কিন প্রাথমিক পদক্ষেপ :
মার্কিন সরকার তখনই পরিকল্পনা গ্রহন করে যা "কন্টেইনমেন্ট" নামেই পরিচিত। এর লক্ষ্য ছিল, সোভিয়েত ইউনিয়নের বাইরে সমাজতন্ত্রের প্রসার রোধ করা। সোভিয়েত সীমান্তে পুঁজিবাদি দেশগুলো দ্বারা বৃত্ত রচনা করা। এই লক্ষ্যে প্রথমেই গ্রীস এবং তুরস্কের জন্য "ট্রুম্যান ডকট্রিন" নামের এক অর্থসাহায্যের পরিকল্পনা গ্রহন করে যার মাধ্যমে দেশ ২টাকে ৪০০ মিলিয়ন ডলার অর্থসাহায্য দেয়া হয়। যেটাকে বলা যায় সমাজতন্ত্র প্রতিরোধে ওদের উপহার!
এরপর আসে আরো বড় "মার্শাল প্ল্যান", এই প্ল্যানের আওতায় পশ্চিম ইউরোপ পুণর্গঠন করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকগুলো ব্যাপক ঋন দেয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারও উন্মুক্ত করা হয়।
সোভিয়েত প্রাথমিক পদক্ষেপ :
যেহেতু সমাজতন্ত্রের মতবাদ অনুসারে এর কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌছানোর জন্য সারা বিশ্ব থেকে পুঁজিবাদ হটানো দরকার তাই সোভিয়েত ইউনিয়ন তার অধীনে যতসম্ভব এলাকা এনে সমাজতন্ত্রকে বিশ্বব্যাপী প্রসারিত করার ধারাবাহিক সর্বোচ্চ চেষ্টা করে।
১৯৪৬ সালে যুদ্ধের সময় প্রবেশকৃত সোভিয়েত সৈন্য ইরান থেকে প্রত্যাহারে অস্বীকার করে, ১৯৪৮ সালে চেকোস্লোভাকিয়ায় কম্যুনিস্ট ক্যু ঘটে, একই বছর পশ্চিমাদের একটু "টাইট" দেয়ার লক্ষ্যে বার্লিন অবরোধ করে! ১৯৪৯ সালে চীনে কম্যুনিস্ট বিপ্লব হয়ে যায়, ১৯৫০ সালে সমাজতন্ত্রের প্রসার নিয়ে হওয়া বিরোধ কোরিয়া যুদ্ধে রূপ নেয়, একই বছর চীন তিব্বত এবং তাইওয়ানেও বিরোধে জড়ায় এবং এর সবই মার্কিন দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে চলছিল!
---------------------------------------
খেয়াল করার মত বিষয় :
এখানে একটা বিষয় লক্ষনীয় যে, মার্কিনীদের পদক্ষেপগুলোর পেছনে সামরিক শক্তির সমর্থন থাকলেও মূল ফোকাসে ছিল তাদের দ্বারা গৃহীত অর্থনৈতিক পলিসিগুলো!
কিন্তু সোভিয়েতের ক্ষেত্রে সেটা উল্টো, তাদের পলিসির চুড়ান্ত লক্ষ্য একটি অর্থনৈতিক সাম্যবস্থা হলেও বাহ্যিক রূপে সেগুলো প্রাথমিকভাবে সামরিক সাফল্য নির্ভর ছিল!
এই ভিন্ন অথবা ভুল ফোকাস কিন্তু ২ শিবিরেরই জনসমর্থন আদায় এবং কুটনৈতিক অগ্রাধিকার এবং আন্তর্জাতিক আইনের সামনে "পজেটিভ ফেসভ্যালু" আদায়ের ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে! এবং আমার মতে এই পয়েন্টগুলো মার্কিনদেরই বেশী সুবিধা দিয়েছে!
আরেকটা মার্কিন সুবিধা ছিল, সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত পারমানবিক বোমা'র অধিকারী ছিল না। তাই যুক্তরাষ্ট্র তাদের বেশ সফল ভাবেই মোকাবেলা করে।
তাই যুক্তরাষ্ট্র বেশ কিছু প্রি এম্পটিফ পলিসি গ্রহন করতে পেরেছে!
--------------------------------------
আপেক্ষিক শান্তিপূর্ণ সময় -১৯৬৩-১৯৭৮ :
যাইহোক, স্ট্যালিনের মৃত্যুর পর নিকিতা ক্রুশ্চেভ ক্ষমতায় এসেই সোভিয়েত আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পলিসি'তে পরিবর্তন আনে। বিশ্বব্যাপী পূঁজিবাদের বিপক্ষে স্ট্যালিনের দেখিয়ে যাওয়া আগ্রাসী পথ থেকে সরে এসে "শান্তিপূর্ণ সহ অবস্থান" / পিসফুল কো এক্সিস্টেন্স" এর নীতি গ্রহন করে ক্রুশ্চেভ। ক্রুশ্চেভ বুঝতে পেরেছিল যে প্রযুক্তি সামরিক উৎকর্ষতা অর্জনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চলমান রেশারেশি চালিয়ে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কিন্তু কম্যুনিস্ট চায়না ক্রুশ্চেভের এমন নমনীয় মনোভাবের ব্যাপক বিরোধীতা করে আন্তর্জাতিক সমাজতন্ত্রায়নের পথে সোভিয়েত নেতৃত্বের দাবী অস্বীকার করে বসে! আগে থেকেই সোভিয়েত বর্ডারে আরেক আদর্শিক পার্টনার মার্শাল টিটো সোভিয়েত নেতৃত্বের প্রতি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আসছিল, এবার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চাইনিজ চ্যালেঞ্জ এলো!
ক্রুশ্চেভ শান্তিপূর্ণ সহ অবস্থানের নীতি গ্রহন করলেও তার প্রথম প্রতিফলন ঘটে ১৯৫৬ সালে "কমিনফর্ম" এর বিলুপ্তি মাঝ দিয়ে, যেই কমিনফর্মের কাজই ছিল বিশ্বের কম্যুনিস্ট দলগুলোর সাথে যোগাযোগ রক্ষা।
ক্রুশ্চেভকে অনেকই নমনীয়তার জন্য দোষী করলেও কিন্তু তার "শান্তিপূর্ণ সহ অবস্থান" কালেই সোভিয়েত প্রযুক্তি এবং সামরিক শক্তির তাৎপর্যপূর্ণ উন্নতি করেন। যার কারনে সোভিয়েত ইউনিয়ন মার্কিনদের প্রতি পূর্ণ চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পেরেছিল!
১৯৬২ সালে আসে সেই "কিউবা মিসাইল ক্রাইসিস"! কোল্ডওয়ারের সবচেয়ে হট অধ্যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের একেবারে মুখের সামনে কিউবা'তে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবার পারমানবিক মিসাইল স্থাপন এবং সাবমেরিনও মোতায়েন করে। যা ছিল মার্কিনদের চোখে, ভয়াবহ এবং অগ্রহনযোগ্য "থ্রেট"! কিন্তু "ন্যাটো"র মাধ্যমে আগে থেকেই সোভিয়েতের মুখের সামনে মানে, তুরস্কে মার্কিন মিসাইল মোতায়েন করা !!! তবে, মার্কিনদের দাবী, তুরস্কে যে মিসাইল সেটা পারমানবিক ছিল না!
কিউবা মিসাইল ক্রাইসিস উপলক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত একটি সম্ভাব্য পারমানবিক যুদ্ধের একদম দ্বারপ্রান্তে পৌছে গিয়েছিল ( এ নিয়ে একটি স্বতন্ত্র পোস্ট হতে পারে আগামীতে )! দুই পরাশক্তি মুখোমুখি দাড়িয়ে গিয়েছিল। ভাগ্য ভাল যে সোভিয়েত পিছু হটে!
কিন্তু এর ফলাফল ছিল সুদুর প্রসারী, তৎকালীন ডেমোক্র্যাট মার্কিন প্রেসিডেন্টটাও ছিল একজন ভদ্রলোক জন,এফ, কেনেডি, যিনি সম্ভাব্য পারমানবিক যুদ্ধের ভয়াবহতা আন্দাজ করতে পেরে কিছুটা নমনীয়তা দেখান। উভয় পক্ষই বুঝতে পারে, ২ দেশের পারমানবিক যুদ্ধ মানে, "পারস্পরিক নিশ্চিত ধ্বংস"!!! সুতরাং তারা ১৯৬৩ সালে "যুদ্ধের মাঝেই বন্ধুত্বের" নতুন দ্বার উন্মোচন করেন! দুই দেশের মাঝে যে কোন ধরনের সামরিক / রাজনৈতি ক্রাইসিসে ২ দেশের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বের মাঝে সরাসরি যোগাযোগের লক্ষ্যে হোয়াইট হাউস এবং ক্রেমলিনের সার্বক্ষনিক যোগাযোগের জন্য একটি "হট লাইন" প্রতিষ্ঠিত করা হয়!
ছোটখাট উত্তজনার মাঝেও এই অবস্থার আরো উন্নয়ন ঘটে পরবর্তী বছরগুলোতে, ৬৭'র আরব-ইসরাইলের যুদ্ধের প্রভাবে দুই পরাশক্তিই আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়ে একটু ঠান্ডা হয়। ১৯৬৯ সালে একে অপরকে হুমকি এবং অস্ত্রপ্রতিযোগীতা নিয়ন্ত্রনের লক্ষ্যে "সল্ট" চুক্তির প্রাথমিক আলাপ শুরু করে। ১৯৭২ সালে প্রথম সল্ট চুক্তি সম্পন্ন করে এবং ১৯৭৯ ২য়টি ( যদিও ২য় সল্ট চুক্তি মার্কিন সংসদ (কংগ্রেস) এ চুড়ান্ত অনুমোদন পায় নাই)
পুনরায় ঝামেলা এবং সমাপ্তি -১৯৭৯-১৯৯১
১৯৭৯ সালে শুরু হয় নতুন করে উত্তেজনা! ইরানের বিপ্লবের পর পারস্য উপসাগরে মার্কিনদের অবস্থান নড়ে যায় এবং আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনের ফলে বদলে যায় পুরো পরিস্থিতি! আফগানিস্তানের ভৌগলিক অস্থান স্ট্র্যাটেজিগতভাবে প্রচন্ড গুরুত্বপূর্ণ কারন, আফগানিস্তানের পরেই ইরান এবং তারই সমুদ্রে বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশী তেল পরিবহন করা হয়! সুতরাং, শুধু পুঁজিবাদীই নয় বরং সারা বিশ্বের অর্থনীতি সচল বা অচল করে দেবার জন্য এই জায়গার গুরুত্ব অপরিসীম! আর পুঁজিবাদী অর্থনীতির প্রধান শর্তই হচ্ছে ব্যাবসায় ধারাবাহিকতার নিরাপত্তা!
ফলে মার্কিনরা ১৯৮০ সালের মস্কো অলিম্পিক বর্জন করে এবং সোভিয়েত ইউনিয়নে গম রপ্তানী বন্ধ করে দেয়। এরপর ক্ষমতায় আসে রিপাবলিকান "কাউবয় প্রেসিডেন্ট" রোনাল্ড রিগ্যান! রাশিয়াকে সকল সমস্যার মূল এবং "শয়তান" আখ্যা দিয়ে নতুন করে কোল্ডওয়ারকে হট করে তুলে! দক্ষিন আমেরিকার দুর্বল থেকে দূর্বলতম দেশগুলোতে সোভিয়েত জুজু দেখিয়ে আগ্রাসন চালায়! আফগানিস্তানে সোভিয়েত বিরোধী লড়াইে পাকিস্তানের মাধ্যমে তালেবানদের পূর্ণ সমর্থন দেয়। এবং রিগ্যান শেষপর্যন্ত সোভিয়েতের বিরুদ্ধে একটি পারমানবিক যুদ্ধে মার্কিন জয়ের কথা প্রকাশ্যে বলা আরম্ভ করে!
ততদিনে অনেক কিছুই বদলে গেছে, সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো এবং স্বয়ং রাশিয়ার ভেতরের জনগণ বদলে গেছে, নেতৃত্ব বদলে গেছে, এবং দেশে দেশে বিক্ষোভ দানা বেধে উঠছে। গর্বাচভ ক্ষমতায় এসে গেছে, ১৯৮৭ সালে গর্বাচভ যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ঘোষনা দেয়, তোমাদের চমকে দিবো, তোমাদেরকে একজন শত্রু থেকে বঞ্চিত করবো! মানে মার্কিনদের সাথে শত্রুতা সব শেষ!
এবং সত্যি সত্যিই সেটা বাস্তব হয়!!!! এইএনএফ চুক্তি করে, কিউবা, আফগানিস্তান,পূর্ব ইউরোপ থেকে সরে যায় সোভিয়েত সামরিক বাহিনী, অস্ত্র হ্রাসের লক্ষ্যে "স্টার্ট" চু্ক্তি করে এবং আভ্যন্তরীন সংস্কারের লক্ষ্যে "পেরেস্ত্রইকা ও গ্লাসনস্ত" নামের নতুন পদক্ষেপ নেয়! যেই সংস্কারের ধাক্কায় ৪ দশক ধরে প্রতিযোগীতায় টিকে থেকে অবশেষে সোভিয়েত ভেঙ্গে পড়ে!
এবং পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর পুঁজিবাদী অর্থনীতি গ্রহনের মাধ্যমে এবং বার্লিন দেয়াল পতনের মাধ্যমে ৪ দশকের স্নায়ুযুদ্ধ বা কোল্ডওয়ারের ইতি ঘটে!
শেষ কথা: কে জিতলো ?
বলা যায় যুক্তরাষ্ট্র জিতছে কিন্তু আসলেই কি তাই? ১৯৯১ সালেই পাপা বুশ বলেছেন, "কম্যুনিজমের পতনে প্রাগ ঐতিহাসিক ঘৃণা, অপমানবোধ এমনকি প্রতিশোধপরায়নতা বৃদ্ধি পাবে"!
কিন্তু এটুকু নিশ্চিত করে বলা যায়, ২ পরাশক্তি যতই প্রতিযোগীতা করুক, শেষ পর্যন্ত "র্যাশনাল" / সূবিবেচক ও বাস্তববাদী ছিল তাই কোন ধরনের সরাসরি যুদ্ধে জড়ায় নাই। নইলে সমস্যা ছিল!
আরেকটা কথাও নিশ্চিত করে বলা যায়, এই যুদ্ধে বিশ্ব শান্তি এবং শক্তি ২টা স্বয়ং নিজেরা পরাজিত হয়েছে, কারন তাদের জন্যই ৯০'র দশকের আগে জাতিসংঘ কার্যকর কোন ভূমিকা রাখতে পারে নাই আর বিশ্বজুড়ে যত সামরিক বাহিনীর শাষন টিকে ছিল, তার সবই ছিল এই স্নায়ুযুদ্ধেরই ফসল!
আর তারা পরাজিত এই কারনে যে, তারা এই অনর্থক অস্ত্র প্রতিযোগীতার পেছনে যেই পরিমান সময় ও অর্থ ব্যায় করেছে, এই সুযোগে চীন,জাপান,জার্মানী'র মত দেশ অর্থনৈতিকভাবে ব্যাপক সমৃদ্ধ হবার সুযোগ পেয়েছে।
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে নভেম্বর, ২০১১ দুপুর ১২:১৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



