somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জাক দারিদা

৩০ শে এপ্রিল, ২০০৯ ভোর ৫:১৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

জেফ কলিনস, বিল মেবলিন
ভাবানুবাদ: গেওর্গে আব্বাস

প্রাক কথা:

মানবমনে যে জিজ্ঞাসা একবার উদিত হয় তা কখনোই হারিয়ে যায় না (The questions once asked, seem never go away); যদিও ব্যাখ্যাত, বিশ্লেষিত ও অনুধাবনযোগ্য হয় বিবিধ প্রযত্নে; যদিও সিদ্ধান্ত, অনু-সিদ্ধান্ত কিংবা সিদ্ধান্তহীনতা অস্তিত্বলাভ করে আমাদের চিন্তাস্তরে। সৃষ্টির আদিতে বিরাজিত শব্দময় একক, প্রচন্ড শব্দে বিস্ফোরিত হল আর তৈরি হল মহাবিশ্ব। ঈশ্বরের আদেশে অর্থাৎ তিনি উচ্চারণ করলেন হও, অর্থাৎ তাঁর স্বশব্দ আদেশে তৈরি হল পৃথিবী; এই হল অধিবিদ্যার কথা। ধরে নেয়া যায় এই হল শব্দ এবং বিশ্বব্রহ্মান্ড নিয়ে আদি মানুষের জিজ্ঞাসা এবং উত্তর। জাক দারিদা মানুষকে মুক্ত করতে চেয়েছেন অধিবিদ্যাকেন্দ্রীক চিন্তা হতে। শব্দ বিষয়ে নতুন নতুন জিজ্ঞাসা তৈরির মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন (Deconstruction) বিনির্মাণ, (Logos) শব্দব্রহ্ম , (Logocentrism) শব্দব্রহ্মকেন্দ্রিকতা। কোনো বিষয়েই জাক দারিদা সোজাসুজি বলেননি, কোনো চিন্তনকেই বাণী-চিরন্তনী বলে দাবি না করে মানবমনের সিন্ধান্তহীনতাও যে একটি কর্ম, তা তিনি বিপুলভাবে ছড়িয়ে দেন আমাদের উপলব্ধির জগতে। Introducing Derrida গ্রন্থপাঠের এক পর্যায়ে যখন অনুবাদে উদ্যোগী হই তখন গ্রন্থে ব্যবহৃত চিত্র ও অঙ্গসজ্জার অনুবাদ নিয়েও ভাবিত হলে কর্মটিকে সজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করি কিংবা নিজ থেকেই সজ্ঞায়িত হয় ‘চিত্রানুবাদ’ শিরোনামে। আপন ভাবনায় এই বর্ণলেপনের জন্য দায়ী কে? জাক দারিদার বিনির্মাণবাদ? তাৎক্ষণিক এই অনুভূতির সাথে বিনির্মাণের সাযুজ্য খুঁজে পেলেও যা অনুভূত হয়েছে তা কি সম্পূর্ণ প্রকাশিত হয়েছে ভাষার মাধ্যমে? ভাষা কি মানব মনের সম্পূর্ণ অর্থ প্রকাশের যোগ্যতা রাখে? মানুষের ভাষাজ্ঞান কি Logocentric? সৃষ্টির আদি থেকেই কি মানুষ বিনির্মাণবাদী ছিল? প্রাচীন দার্শনিক থেলিস (খ্রিঃ পূর্ব ৫৪৬-৬২৪) জলপরিবেষ্টিত নগরীতে বাস করতেন এবং জলকে তিনি ঈশ্বর ঘোষণা করেন। এই বস্তু পৃথিবী জলের নির্মাণ বলেই ছিল তার ধারণা (what is reality made of? everything is made of water)। জাক দারিদা জন্মগ্রহণ করেন আলজেরিয়ায়, ১৯৩০ সালে। দার্শনিক এডমুন্ড হুর্সালের চেতনাচিত্রবাদ (phenomenology) দারিদাকে বিশেষভাবে আলোড়িত করে। হুর্সালের প্রভাবেই ষাটের দশক থেকে দার্শনিক রচনা লিখতে শুরু করেন। তিনি মনে করতেন, অধিবিদ্যা চর্চার কারণে ভাষাকেন্দ্রীক মানুষের জ্ঞান কখনোই সত্যের সন্ধান পায়নি। দার্শনিক থেলিসের ঘোষণা অধিবিদ্যাকেন্দ্রীক হলেও জল, গ্রহ, নক্ষত্র অর্থাৎ বস্তুপৃথিবীর বিনির্মাণ কখনোই তো থেমে থাকেনি। কিন্তু জাক দারিদার বিনির্মাণতত্ত্বের প্রভাব এতই বহুধাবিস্তৃত, যেন বা আমাদের চিন্তারাজ্যে নতুন করে তৈরি করতে হবে গোলযোগ; নতুবা একঘেয়ে হয়ে পড়বে জলের কলধ্বনি, পাখির উড়াল, আমাদের মাতৃ বা পিতৃভাষা ক্লান্তিকর হয়ে উঠবে।

জাক দারিদা বাংলাভাষ্যে কোনো অপরিচিত দার্শনিকের নাম নয়। আমাদের সমকালে মনীষা-জগতে তিনি ছিলেন সর্বালোচিত ব্যক্তিত্ব। তাঁর ডি-কন্সট্রাকশন তত্ত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব, উৎসাহ ও বিস্তর আলোচনা বাংলা ভাষায় খুঁজে পাওয়া দুষ্কর নয়। ডি-কন্সট্রাকশন বা বিনির্মাণতত্ত্ব দুনিয়ার সর্বঅঞ্চলে বিদ্বজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং বিভিন্ন অনুষঙ্গে ব্যাখ্যাত হয়েছে। জ্ঞানের উত্তর-উপলব্দি পৌঁছে দেবার লক্ষ্যে গুরুমস্তিষ্ক নিয়ে বাংলা ভাষায় দারিদা-আলোচনা করেছেন মঈন চৌধুরী, আফসার আহমদ, আফজালুল বাসার প্রমুখ। তাঁদের রচনায় তুলনামূলক আলোচনা, বিশদ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ লক্ষ্যণীয়; প্রত্যালোচনা, প্রত্যাক্রমণ দূর্লক্ষ্য। জেফ কলিনস ও বিল মেবলিন এর গ্রন্থখানি পরিচয়ধর্মী হলেও বেশ কিছু অংশে প্রত্যাক্রমণ সহ নতুন জিজ্ঞাসা লক্ষণীয়।

-------------------------------------------------------------------------------





দারিদা?

জাক দারিদা এমনই একজন দার্শনিক, দর্শন বিষয়ে যিনি কোন কিছুই সোজাসুজি রচনা করেননি।
তাঁর কর্ম সমসাময়িক চিন্তাজগতে অগ্রগ্রামী বলে গুরুত্ব পেয়েছে। কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তির মূল্যবোধকে দূর্ণীতিগ্রস্থ করার অভিযোগে তিনি নিন্দিতও হয়েছেন।
জাক দারিদার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য চিন্তন হচ্ছে ডি-কন্সট্রাকশন (বিনির্মাণ) সমসাময়িক উত্তীর্ণ দর্শন তত্ত্বের মধ্যে বিনির্মাণ তত্ত্বের সংক্ষেপকরণ সর্বাধিক জটিল।

বিনির্মাণ কি?
(ইতোমধ্যে বহুবিদ উত্তর বর্ণিত হয়েছে)

একটি নির্দিষ্ট পথে দর্শন-চর্চা করা
তাত্ত্বিক রচনা পাঠের একটি ধারা
গোলযোগ তৈরির জন্য স্পষ্ট কৌশল
যা চিন্তা করা হয় তা নয়
সাহিত্য-তত্ত্বের নব্য-গঠন
দর্শনের উপর সাহিত্যের প্রতিঘাত
দার্শনিক নিশ্চয়তার দিকে সংঘাতমূলক প্রতিক্রিয়া
অসঙ্গতি এবং সন্দেহবাদের পুরাতন ত্রুটি
প্রশ্নের প্রতিবন্ধক, যার শুরু, কী হয়...?
জার্মান আদর্শবাদে মৃত বিষয়ের পুনরাবৃত্তি
বিপজ্জনক নব্য-হাইডেগার তত্ত্ব
প্রায়-অতিন্দ্রীয়বাদ
ধারণাকৃত আত্মতুষ্টির নৈতিক দায়িত্ব
অপ্রয়োজনীয় এবং লঘুচেতা সন্ন্যাসীতত্ত্ব
পশ্চিমা দার্শনিক ঐতিহ্যে অনুমোদিত অভ্যাঘাত

বিনির্মাণ সম্পর্কে উল্লেখিত মন্তব্য (আরও অধিক) বিবৃত হয়েছে। একটি বিষয়ে অনেকেই একমত- জাক দারিদা নেতৃস্থানীয় ব্যাখ্যাকার।

রচনা (Text) সম্বন্ধে আমাদের প্রচলিত ধারণা, পরিচয় ও অর্থকে দারিদার রচনা দূর্বল করে তোলে। তা শুধু দর্শনের ক্ষেত্রেই নয়, ব্যাপকভাবে অন্যান্য বিষয়েও।

বিনির্মাণতত্ত্ব আপাত বিতর্ক থেকে শুরু করে বিকৃত সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে। বিনির্মাণতত্ত্ব কি অনিষ্টকর রাজনৈতিক উগ্রবাদের মত নিন্দিত হবে? মৌলিক মনোনয়ন বা নির্বাচনের দর্শন এবং পার্থক্য তৈরির জন্য নিন্দিত হবে? কিভাবে?

দারিদার রচনায় সমালোচকদের বাদানুবাদের অনেক উপাত্ত বর্তমান। কিন্তু বাদ-প্রতিবাদ সমসাময়িক দর্শন চিন্তায় অনেক কিছু প্রত্যাখ্যান বা পরিবর্তন প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠা করে। কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামান্য একটি অন্তর্দন্ধ নির্দিষ্টভাবে নিম্নরূপ:



সীমান্তচিহ্ন:
১৪৭৯ সাল থেকে ঐতিহ্যিক ভাবে ইংলিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের সম্মাননা ডিগ্রী প্রদান করে আসছে। কিন্তু কেন? তা পরিষ্কার নয়। আমাদের ধারণা, ডিগ্রীদাতা এবং গ্রহীতা এ-কর্ম হতে উপকৃত হয়ে থাকে।

২১ মার্চ ১৯৯২ সালে কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্ধ্বতন সদস্যরা বাৎসরিক ডিগ্রী প্রদান উপলক্ষে প্রাক-নির্বাচনী বৈঠকে একত্র হন। এটি একটি আনুষ্টানিকতা মাত্র। পুরস্কারের জন্য মনোনীত ব্যক্তির বিরোধীতা গত ২৯ বছরে কেউই করেননি। কিন্তু ১৯৯২ সালের বৈঠকে বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন সভ্য জাক দারিদাকে সম্মাননা ডিগ্রী প্রদানের বিরোধীতা করেন এবং তাকে আধ্যাত্মিক ভাবে 'non placent' ঘোষণা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন সদস্য হলেন ড. হেনরি আরস্কিনহিল (সাহিত্য ও ইতিহাস বিভাগ), লান জেক (ইংরেজী বিভাগ), ডেভিড হিউজ মিলর (দর্শন বিভাগ), রেমন্ড লান পেজ (অ্যাংলো-সাক্সন অধ্যাপক)। তাঁরা বিতর্কের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় কমিটিকে ভোটপত্র গ্রহণে বাধ্য করেন।

বিদ্যমান দু’টি সমস্যার প্রথমটি হল অভিযোগ চিহ্নিতকরণ। দারিদার নাম প্রস্তাবকারীদের অধিকাংশ সভ্য ছিলেন ইংরেজী বিভাগের, কিন্তু কর্ম এবং চর্চার ক্ষেত্রে দারিদা একজন দার্শনিক। কেম্ব্রিজের ঐতিহ্যবাদীরা সুকৌশলেই সামনে নিয়ে আসেন জাক দারিদার দর্শন গভীরভাবে ভ্রান্ত, আক্রমণাত্মক এবং উচ্ছেদকারক। তাঁদের এই প্রচারণা ছিল সু-সংবদ্ধ এবং এ বিষয়ে সংবাদপত্রও ছিল সতর্ক। কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের অ্যাংলো-স্যাক্সন মনোবৃত্তিতে আঘাত তৈরির কারণ, তারা মনে করলেন জাক দারিদা ফরাসিতত্ত্ব হতে অনিষ্টকর, ফ্যাশনচারী অংশকেই উপস্থাপন করেছেন।

ফরাসি প্রাতিষ্ঠানিক দর্শন পরিচালিত হয় চৈনিক, ভারতীয় ও চলতি-ফ্যাশন পদ্ধতিতে যা ব্রিটিশ দার্শনিক দ্বারা সমান যথার্থতা, মানসম্পন্নতা, স্পষ্টতা, এবং দৃঢ়তায় উপলব্ধিযোগ্য হবে না

(ডেভিড হীলেন রুবেন)

বর্তমানকালে অনেকেই তত্ত্বের জন্য প্রত্যাশা করে। আমি মনে করি, একজন প্রকৃত দার্শনিক তত্ত্বে অগ্রসর হবে না। দারিদা কী ধরণের লেখক? অসফল তাত্ত্বিক? যদি না তাত্ত্বিক হন তাহলে তিনি কী?

(হেনরি ইয়ারস্কিন-হিল)

ফরাসীরা মিথ্যা উদ্ভাবনীতে সর্বদা অগ্রসর যা দার্শনিক অনুধ্যানে দুর্বোধ্য ও অর্থশূন্য। বিনির্মাণতত্ত্ব এমনই এক দর্শন যা কোনো অর্থ দাঁড় না-করিয়ে তড়িৎ বলতে প্রস্তুত।

(পিটার লেনন)


নিরুৎসাহমূলক ভাবার্থ নিয়ে অসঙ্গত মতবাদ যা বিপজ্জনক ও অযৌক্তিক মতবাদ হতে মন/চিন্তাকে প্রতিরক্ষা হতে বঞ্চিত করে।

(ডেভিড মীলর এবং অন্যান্যরা)


দর্শনে প্লেটোর প্রতিষ্ঠা

জাক দারিদা মতানৈক্য তৈরি করে সিন্ধান্তহীনতা পশ্চিমা দর্শনের একটি মূল উপাদান। দর্শন সনাক্ত হতে প্রত্যাখ্যান করে, নতুবা দর্শন হিসেবে চিহ্নিত হবে না যে দর্শনের সাথে আমাদের পরিচয় (অবশ্যই সত্যের কাছে বিশ্বাস প্রত্যাখ্যাত হবে)।

দারিদা প্রত্যক্ষ করেন সিদ্ধান্তহীনতা পশ্চিমা রচনায় (Text) মূলতন্ত্রে অবস্থান করে; যেমন প্লেটোর রচনা (খ্রিষ্টপূর্ব ৪২৮-৩৪৭), সক্রেটিসের ছাত্র, এথেন্স একাডেমীর প্রতিষ্ঠাতা, ধর্ম-রাজনীতি, আইনশাস্ত্র, দর্শনের লেখক, পশ্চিমা দর্শনের অভিষিক্ত দার্শনিক এবং ব্যপকভাবে আধুনিক চিন্তার উদ্রেককারী।

প্লেটো>>> আমার কাছে সক্রেটিস-এর চিন্তাই জ্ঞানের পথে সত্য দিকনির্দেশনা। সত্য জ্ঞান নির্ণয় করতে প্লেটো যাবতীয় মিথ্যাকাঙ্খার বিরুদ্ধে ভালবাসার কারণ ও সত্য প্রতিষ্ঠা করেন। তার্কিক পন্ডিত (Sophists) ও অলংকারশাস্ত্রজ্ঞ (Rhetoricians) কবি, পুরাণজ্ঞ (Mythologists) এবং গল্প-লেখকরা যারা শুধু প্রকৃতির অনুকরণ (Imitate) করে অথবা ‘না-জেনে পুনরাবৃত্তি করে’ সত্য দর্শন হচ্ছে কারণ এর জন্য যথার্থ কর্ম।

কিভাবে প্লেটো দারিদার কাছে ব্যাখ্যাত হবেন?

প্লেটোর ঔষধালয়

প্লেটোস ফার্মেসী (১৯৬৭) গ্রন্থে জাক দারিদা ফেডরুস-এর অধিশ্রয়ণ করেন, যা সক্রেটিস ও ফেডরুস- দু’টি ঐতিহাসিক চরিত্রের রূপক কথোপকথন। ফেডরুস একজন তরুণ এথেন্সবাসী, যিনি আন্দোলিত হয়েছিলেন অলংকারশাস্ত্রজ্ঞ দ্বারা। দারিদার বিষয় ছিল যৌনসঙ্গী এবং চিন্তক হিসেবে প্রেমিক ও অপ্রেমিকের আপাতমূল্য অথবা দর্শন ও অলংকারশাস্ত্রের আপাত মর্যাদা কিংবা (সম্ভবত) লেখা এবং বলা-র মূল্য।



সক্রেটিস>>> আমার উদ্বেগ বলা এবং লেখা নিয়ে। আমি পরীক্ষা করি সংক্ষিপ্ত ও চূড়ান্ত অধ্যায়; লেখার চেয়ে বলা অধিকতর শ্রেষ্ট এই বলে সক্রেটিস (যিনি কোনো দিন কিছু রচনা করেন নি) ফেড্রোসকে আশ্বস্ত করেন।


দারিদা >>> লেখা কতখানি যথোপযুক্ত? লেখক কি কোনো সম্মানিত অবয়ব তৈরি করেন? লেখা কি খুব জরুরী বিষয়? অবশ্যই না। কিন্তু সক্রেটিস যৌক্তিকভাবে দ্বন্দ্বে জড়াবেন না। পৌরাণিক (মিথ) এসে প্রথমেই আঘাত করবে।


সক্রেটিস>>> আমরা যদি শব্দকে কেন্দ্রাতীত ধরি, তুমি কি জান ঈশ্বরকে কী সন্তুষ্টি দেয়?

ফেড্রোস>>> আমি জ্ঞাত নই। আপনি কি জ্ঞাত?

সক্রেটিস>>> পূর্বপুরুষের কাছ থেকে যা শ্রুত, তা বলতে পারি।


তারা বলে, ইজিপ্টের নাউক্রেটিসে একজন প্রাগৈতেহাসিক সৃষ্টিশীল
ঈশ্বরের অস্তিত্ব ছিল, যার নাম থুত।


তিনি গণনা, গণিত, জ্যামিতি, জ্যোর্তিবিদ্যা এবং ড্রাফট ও ডাইস ক্রীড়া (লুডু খেলা) উদ্ভাবন করেন।

... লিখন পদ্ধতি

ঐ সময় মহান ইজিপ্টে ঈশ্বরের রাজা ছিলেন থমাস। গ্রীকবাসী তাঁকে আমন বলে সম্বোধন করত। ঈশ্বর থুত থমাসের কাছে নিজ উদ্ভাবনা প্রদর্শন করেন এবং ইজিপ্টবাসীর কাছে তা পৌঁছে দেবার প্রস্তাবনা করেন।

দারিদা>>> থুত এর উদ্ভাবনার কোনো মূল্যই থাকে না, যদি না ঈশ্বরের রাজা কর্তৃক তা স্বীকৃত হয়।

থমাস এক এক করে সকল উদ্ভাবনা প্রত্যক্ষ করেন। কিছু কিছু বাতিল করে কোনো কোনো উদ্ভাবনাকে স্বাগত জানান। সবগুলোর বর্ণনা শুনতে যেহেতু সময় ব্যয়িত হবে, থমাস আলোকপাত করেন লিখন পদ্ধতিতে...

হে ঈশ্বর
শিক্ষার এই শাখা ইজিপ্টবাসীকে বিদ্যান করবে এবং তাদের স্মৃতিশক্তির উন্নতি সাধন হবে। আমি ‘পারামাকন’ উদ্ভাবন করেছি জ্ঞান-বিজ্ঞানের জন্য।

পারামাকন একটি গ্রীক শব্দ যা যাদু-খন্ড নামে চিহ্নিত হতে পারে। ইংরেজী অনুবাদে আরও অনেক প্রতিশব্দ ব্যবহৃত হয়েছেÑ উপকরণ, পুনঃর্বিন্যাস, প্রতিকারক, উপশম, পরিচর্যা ইত্যাদি।

দারিদার মন্তব্য পারামাকন একটি অনিশ্চিতার্থক শব্দ।

গ্রীক ভাষায় পারামাকন দ্বৈত অর্থ বহন করে প্রতিকারক এবং আক্রমণাত্মক; যেমন ইংরেজী ভাষ্যে ‘ড্রাগ’ শব্দটি ভাল এবং মন্দ দ্বিমাত্রিক অর্থ বহন করে। কোনো কোনো অনুবাদে একটিমাত্র অর্থ গ্রহণ করা হয়। কিন্তু পারামাকন দ্ব্যর্থক, দ্বি-মাত্রায় অর্থবহ।

ঈশ্বর থুত লেখ্য রূপকেই পারামাকন হিসেবে উপস্থাপন করেন। তিনি কি ‘উপশম’ (cure) হিসেবেই বর্ণনা করলেন? ‘লেখা’ বিষয়টি হল স্বল্প স্মৃতি এবং সীমাবদ্ধ বিদ্যার উপশমকরণ।

ঈশ্বরের রাজার প্রতিক্রিয়া কি এখন ব্যক্সমপূর্ণ হবে?

একটি চিত্র-আবিষ্কারকের পক্ষে বিচার করা সম্ভব নয়, চিত্রটির উপকারিতা অথবা অপকারিতা। যে তুমি লেখা-র জনক, সন্তানের প্রতি (উদ্ভাবিত লেখার প্রতি) তুমি এতই অনুরাগী যা ব্যক্ত করছ তা প্রকাশিত না-হয়ে বিপরীতধর্মীতা ব্যক্ত হচ্ছে।


যিনি লেখক, ক্রমে স্মৃতির অনুশীলন ভুলে যাবে এবং আত্মভোলা হবে। তারা অন্তর্গত স্মৃতিশক্তির ক্ষমতার বদলে বাহ্যিক দৃশ্য-চিহ্নে নির্ভরশীল হবে। তুমি পারামাকন আবিষ্কার করেছ পুনঃর্বার মনে করিয়ে দেয়ার জন্য, সত্য স্মৃতির জন্য নয়...

জ্ঞানের জন্য, তুমি তোমার শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের শুদ্ধ আবির্ভাবের সঙ্গে পরিচয় করাও। তারা তোমার কাছ থেকে বহু কিছু অর্জন করবে উপযুক্ত দিক নির্দেশনা ছাড়া। দৃশ্যত তাদের জ্ঞানী দেখাবে, যারা অগ্রাহ্যকারী। তাদের সাথে সম্বন্ধ স্থাপন অসম্ভব হবে; তারা জ্ঞানিক আত্মশ্লাঘা বহন করবে এবং নিজকে মননশীল ভাববে, যদিও তারা মননশীল নয়।

থিবান নগরের বাসিন্দা যা বললেন, আমি মনে করি তা বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিকৃতি চিত্রের মত সত্য রচনাও জীবনহীন। ইহা প্রতিউত্তরে অক্ষম, যখন তুমি কোনো প্রশ্ন কর। লেখা যে কোনো ক্ষেত্রে দস্যুর ভূমিকা পালন করতে পারে, যারা লেখাটি পাঠ করে জ্ঞাত হল এবং যারা এ বিষয়ে অজ্ঞাত এবং অসম্পৃক্ত।

দারিদা
লেখা দোষী সাব্যস্থ হয়েছে: প্রকৃত স্মৃতি ক্ষয়প্রাপ্ত হবে, প্রকৃত শিক্ষা বিকৃত হবে, মিথ্যা জ্ঞান প্রতিস্থাপিত হবে সত্যজ্ঞানে। লেখা প্রাণহীন, এতিম এবং অসহায়।

সক্রেটিস
লেখা জ্ঞাত হবে না কার সঙ্গে কথা বলেছে। লেখা-যখন অযৌক্তিকভাবে নির্যাতিত তখন সহযোগিতার জন্য প্রয়োজন পিতৃ-সমর্থনের কারণ, সে নিজের প্রতিরক্ষায় অযোগ্য।

সত্যের সত্য
সত্য প্রস্তাবিত হয় পারামাকন হিসেবে। রাজার রাজা, এই ক্ষমতা নিয়ে থমাস সিদ্ধান্তে উপনীত হন লেখা একটি বিষক্রিয়া।

অধিবিদ্যা (metaphysics) ও শব্দভ্রহ্মকেন্দ্রীকতা (logocentrism)

অধিবিদ্যা বাস্তবার প্রকৃতি অনুসন্ধান করে, যা অভিজ্ঞতা সঞ্জাত জ্ঞানের ভিত্তিতে মিথ্যা মনে হয়, যা বৈজ্ঞানিক সত্যের অতীত। সময়, মন, অস্তিত্ব, সত্য, ইচ্ছার স্বাধীনতা, ঈশ্বরবিশ্বাস, মানুষের অমরত্ব ইত্যাদি অধিবিদ্যার জিজ্ঞাসা দার্শনিক জিজ্ঞাসার মতোই। এসব প্রশ্নের কি কোনো ভিত্তি রয়েছে? অভিজ্ঞাতাবাদী ডেভিড হিউম (১৭১১-৭৬) সহ অন্যান্য প্রত্যক্ষবাদী, বৈজ্ঞানিক প্রকৃতিবাদী, নাস্তিক্যবাদীরা প্রশ্নগুলোর অস্তিত্ব অস্বীকার করেছেন।

ঈশ্বর বিশ্বাস, অস্তিত্ব, সত্য ইত্যাদি প্রশ্নগুলো দৃঢ়ভাবে দীর্ঘস্থায়ী। এসব প্রশ্ন সজ্জিত করে উত্তরদানের জন্য পশ্চিমা অধিবিদ্যা অনুধ্যায়ী হয়েছে ভিত্তিমূলে মৌলবাদ, আদর্শ অথবা বিশ্বাস কেন্দ্রীকতায়। এটাই মূলভিত্তি, বক্তব্য এবং অনুসন্ধানের মৌলিক সত্যকে তাড়িত করে এককেন্দ্রীক বিকল্প চিন্তায়, বিকল্প সত্যে। দারিদা চিহ্নিত করেন শব্দভ্হ্মকেন্দ্রীকতা (logocentrism)। (logos )শব্দটি নেয়া হয়েছে অবিভক্ত কেন্দ্র, অপৃথক কেন্দ্র হতে বা মূল হতে। অধিবিদ্যা (logos) এ সত্য অন্বেষণ করে, অন্বেষণ করে সাধারণভাবে সত্যের উৎপত্তি।

অধিবিদ্যা আপন ভিত্তি রচনায় উদ্যোগী, এ প্রক্রিয়াই শব্দভ্রহ্মকেন্দ্রীকতা।

অধিবিদ্যা? পুড়িয়ে ফেল। কুতর্ক এবং বিভ্রম ছাড়া আর কিছু নেই তাতে।

logos (গ্রীক): শব্দটি যে সকল অর্থ বহন করে যুক্তি, কারণ, ঈশ্বর ইত্যাদি

কাঠামোবাদ, গঠনতান্ত্রিকতা বা অবয়ববাদ (structuralism), এবং চেতনাচিত্রবাদ, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যবাদ (phenomenology)
এ দু’টি বিষয়কে কেন্দ্র করে ১৯৬৭ সালে জাক দারিদার ত্রয়ী গ্রন্থ প্রকাশিত হয়: speech and phenomena, writing and difference, and of grammatology. জাক দারিদার প্রথম উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা। ত্রয়ীগ্রন্থে অধিবিদ্যা সম্পর্কে মিশ্র অভ্যাঘাত ঘোষিত হয়।

জাক দারিদার কোনো রচনাই চিরাচরিত নিয়মে প্রশ্ন তৈরি করে না; সাধারণভাবে অপ্রমাণ ও সমর্থন করে না; প্রশংসা ও বিরোধিতার বদলে চিন্তার সূত্র তৈরি করে দেয়। structuralism and phenomenology সুপ্ত চিহ্নের সন্ধান করে, যেখানে সিদ্ধান্তহীনতাই একপ্রকার কর্ম।

প্রকৃত অর্থে, জাক দারিদা গঠনতান্ত্রিকতাবাদ এবং চেতনাচিত্রবাদের সমান কাজটিই করেন, যা তিনি প্লেটো ও অন্যান্য রচনায় করেছেন। পাঠ শেষে সিদ্ধান্তহীনতা সন্ধান করা: লিখন পদ্ধতি (the paramakon), পরিশিষ্ট (suppliment), চিহ্ন বা পদাঙ্ক (trace) ইত্যাদি। অধিবিদ্যার ভিত্তিমূলে আঘাতের জন্য জাক দারিদা সিদ্ধান্তহীনতাকেই ব্যবহার করেন। এতে করে ব্যাখ্যা করতে সহজ হয়, কেন দারিদার রচনা গোলমেলে (puzzling), উৎসাহব্যঞ্জক (infuriating) অথবা বিরক্তিকর (exasperating)। তাঁর রচনার রহস্যপূর্ণ যুক্তিগ্রহণে পাঠককে স্বেচ্ছায় সংযুক্ত হতে হয় রচনা (text) যতদূর নিয়ে যায়: অধিবিদ্যাগত চিন্তার মধ্যে সৃষ্টিশীলতার অসামঞ্জস্য (destabilizing) উদ্যোগে।

এরকম পাঠ কি গুরুত্বপূর্ণ বা প্রয়োজনীয়, জাক দারিদার পরামর্শ মত? তাঁর সকল পাঠক অবশ্যই সমান ভাবে ভাবিত হয় না। দারিদার রচনা প্রত্যাখ্যানের জন্য বলা যায়, ইচ্ছাকৃতভাবে অপ্রচ্ছন্ন এবং হঠকারী। আমাদের বোধগম্য হয় পাশ্চাত্য অধিবিদ্যার কঠোর, বিশৃংখলভাবটি, তার মাধ্যমে দারিদার কিম্ভুতকিমাকার ব্যাখ্যা ও অর্থ প্রকাশ করে। দু’টি কৌশল সম্পর্কে অনুসন্ধিৎসু হওয়া যেতে পারে নতুন শব্দ উদ্ভাবন এবং জীবাশ্ম বিজ্ঞানের ব্যবহার। উভয়ই অধিবিদ্যার সিদ্ধান্তহীনতার বিরুদ্ধাচরণ করে।

পদ্ধতি:
‘লেখা’
‘লেখা’ বলা-র চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এটি একটি বিষয়। কিন্তু এটি কোনো চিন্তার বিষয় নয় লেখা ও বলার পারষ্পরিক বৈপরিত্য। দারিদা লেখাকে সিদ্ধান্তহীন বিষয় বলে ধারণার পুর্নঃবিন্যাস করেন: একই সাথে অনুপস্থিতি/উপস্থিতি এবং মৌলিক পার্থক্য লেখা ও বলায় অন্তর্নিহিত। এটি একটি অংশ দারিদা কর্তৃক বর্ণিত (গ্রামাটলজির অংশ বিশেষ)

লেখা জীবাশ্মে পরিণত হয়। শব্দ সর্বদা পুরাতন, লেখক নতুন। কোনো রচনা বলা’র চেয়ে লেখা প্রকাশ করে না, কিন্তু উভয়ই সিদ্ধান্তহীন লেখা উচ্চারিত শব্দকে অধিকার করে এবং উৎকীর্ণ করে চিহ্ন।

কিভাবে আমরা বলতে পারি শব্দ ব্যবহার হচ্ছে অর্থে? দারিদার মতে আমরা তা পারি না, যতক্ষণ পর্যন্ত না সহকারী কিছু যুক্ত করি উদহারণ হিসেবে। কিন্তু সহকারী শব্দ নিজস্ব সিদ্ধান্তহীনতা নিয়ে আসে। জাক দারিদার ‘লেখা জীবাশ্মে পরিণত হয়’ এ বিষয়টি সম্ভাব্য সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য, নিজের এবং অন্যের রচনাতেও।

দারিদা নতুন শব্দ উদ্ভাবনের কথা বলেন। ব্যবধান হচ্ছে একটি বিষয়, কোনো অর্থ প্রকাশ করে না। ব্যবধান উদ্ভাবিত, বিনিময়যোগ্য নয়।

সম্ভাব্যতা
রচনা বিষয়ে দারিদা আমাদেরকে অসমান্তরালের মুখাপেক্ষী করেন। পুনরাবৃত্তিতা ভাষার সমস্যা, ভাষাগত সীমাবদ্ধতা এবং অক্ষমতা হতে যোগাযোগ ব্যাহত হতে পারে।

কিন্তু পুনরাবৃত্তিতা সম্ভাব্যতারই সূত্র। এ ব্যতিরেকে রচনায় দস্তখত চিহ্নিতকরণ সম্ভব নাও হতে পারে। একটি উদ্ধৃতিমূলক অনুবাদ ব্যতিরেকে সত্য এবং আসল অজ্ঞাত থেকে যায়।

পুনরাবৃত্তির জন্য যোগাযোগ ব্যাহত হতে পারে। স্থানচ্যুতির বিষয়টি ভাষা নিজেই বহন করে।

লেখা এবং সাহিত্য

পঞ্চাশের দশকে ফ্রান্সে অধিবিদ্যা এবং সাহিত্যে নতুন করে সংযোগ স্থাপিত হয়। ত্রিশ দশকের পরাবাস্তববাদী লেখকরা কবিতায়, উপন্যাসে অধিবিদ্যাগত তত্ত্ব প্রচার করেন আলবার্ট কামু (১৯১৩-৩০), জা পল সাঁত্রে (১৯০৫-৮০) এবং অস্তিত্ববাদী তত্ত্ব প্রচার করেন অন্যান্যরা জীন পল ভেলারী (১৮৭১-১৯৪৫)। মালার্মীয়ান কবি, সমালোচকরা লেখার অনুশীলন হিসেবে অধিবিদ্যাকে সাহিত্যের একটি শাখা হিসেবে বিবেচনা করেন। জাক দারিদা ইঙ্গিত সনাক্ত করেন পল ভেলার থেকে। সাহিত্য পাঠের মত অধিবিদ্যার রচনা পাঠও সমানভাবে অত্যাবশ্যক। আমাদের অনুধ্যায়ী হতে হবে রচনার ভঙ্গীতে, কাঠামো ও বলার গঠনে এমনকি তাদের শিরোনামে, রচনা-সজ্জায় এবং মুদ্রণ-বিন্যাসে। কিন্তু ঐতিহ্যিকভাবে সত্যের জন্য অধিবিদ্যাগত অন্বেষণ সাহিত্যের চেয়ে অগ্রবর্তী সম্বন্ধ স্থাপন করে।

সাহিত্য-রচনা, অধিবিদ্যাগত রচনা

ভেলেরীর মত সাহিত্যের উপর দর্শনের পুরোহিততান্ত্রিকতা বিষয়ে দারিদার উৎসাহ সামান্য ছিল। তিনি বিষয়দ্বয়ের মধ্যবর্তী বা ব্যবধান অংশে স্থানচ্যুতির পথ সন্ধান করেন এবং বিষয়কে নিজ নিজ বিষয়ে প্রশ্নাপেক্ষী করেন।

দারিদা
সাহিত্যে বা অধিবিদ্যায় নিশ্চিত কোনো উপাদান নেই। উভয়ই অনিশ্চিত এবং ”ঞ্চল। দৃশ্যত মনে হয় স্বাভাবিক এবং নিশ্চিত, কারণ উভয়ই নিয়ন্ত্রিত শক্তিশালী ঐকমত্যে; মৌলিক চিন্তায় যা সংকল্পবদ্ধ।

দর্শন ও সাহিত্যের সীমা কখনোই কেন্দ্রাতীক নয়। রচনায় কাহিনী থাকে, চরিত্র থাকে যা অন্যান্য রচনার সাথে সম্বন্ধ স্থাপন করে। সাহিত্য রচনার কোনো কোনো অংশ, দর্শন, রাজনীতি অথবা আইন সম্বন্ধীয় ইত্যাদি রচনার সাথে সংযোগ তৈরি করে।

দারিদা স্বতঃস্ফুর্ত মন্তব্য করেন, সীমানা ও শ্রেণী বিন্যাস সমস্যা-সংকুল হলে পান্ডিত্য অদৃঢ় হওয়ার আশংকা থাকে।

বিনির্মাণতত্ত্ব এবং নারীবাদ

বিনির্মাণতত্ত্ব কিভাবে বাস্তবানুগ, সমসাময়িক রাজনীতির সাথে সম্বন্ধ স্থাপন করতে পারে? ১৯৮২ সালে ‘করিওগ্রাফিস’ এর সাথে এক সাক্ষাৎকারে জাক দারিদা কিছু সম্ভাবনার কথা বলেন। নারীবাদ প্রশ্নের সঙ্গে যে রাজনীতি জড়িত এর সঙ্গে বিনির্মাণতত্ত্বের সরাসরি সহজ সম্বন্ধ নেই। কিছু কিছু নারীবাদীর কাছে বিনির্মাণতত্ত্ব একটি ব্যবহারিক বিষয়। সরলীকরণ হল বিনির্মাণতত্ত্ব সন্ধিচ্যুত করে নারী/পুরুষ বা পুংলিঙ্গ/স্ত্রী: গোষ্ঠীপতির জৈবিকতার ভিত্তি।

গোষ্ঠীতন্ত্র (patriarchy)
অন্যান্য নারীবাদীরা (সমভাব-নারীবাদী) বিনির্মাণকে প্রতিসরণ বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দেখেছেন। বিনির্মাণতত্ত্ব সরাসরি রাজনৈতিক আনুগত্য প্রত্যাখ্যান করে নারীবাদী রাজনীতির দিক নির্দেশনা বা কর্মসূচী প্রস্তাবনা করে না। এটি দার্শনিকের সবচেয়ে সাম্প্রতিক কালের বর্ম।

প্রথমত দারিদার কিছু কিছু মতানৈক্য অক্ষর-দৃশ্যকে সমর্থন করে। তিনি এক সময় জোর দিয়ে বিনির্মাণকে নারীবাদ হতে বিচ্ছিন্ন করতে চেয়েছেন।

নারীবাদ একটি ব্যবহারিক প্রক্রিয়া, যেখানে একজন নারী পুরুষ হয়ে ওঠার আকাঙ্খা লালন করে যেমন গোড়া দার্শনিক, দাবীকৃত সত্য, বিজ্ঞান বস্তুতান্ত্রিকতা এসবই পুরুষতান্ত্রিক বিভ্রান্তি ছড়ায়।
বিনির্মাণ সর্বাবস্থায় নারীবাদী নয়... বিনির্মাণের সঙ্গে যে একটি বিষয় সম্পৃক্ত করা যাবে না, তাও নারীবাদ। কিন্তু দারিদা সহজভাবে নারীবাদের রাজনৈতিক সংঘাত প্রত্যাখ্যাত করেননি। নারীবাদেরও একটি নিজস্ব ও নির্দিষ্ট অস্তিত্ব রয়েছে। নারীবাদ বিনির্মিত হবে বিশেষ মুহুর্তে নির্দিষ্ট পন্থা রূপে।


চলবে...
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা মে, ২০১০ সকাল ৭:০৮
২৩টি মন্তব্য ২২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×