প্রাক-কথা:
সিঁদুর-পরা পোড়ামাটি মেখে আমাদের ঘরে বাতাস এসেছে, শতছিন্ন...
বহুদিন পরে, এলোমেলো আলোর গর্তে আজ উৎসব। বাজাও তিব্বতী ঢোল, প্রজ্ঞাপারমিতসূত্রে প্রতিঅঙ্গে মেখে নাও জাপানী গোলাপ। বাজাও ঝাঝ করতাল, শঙ্খের চূঁড়া। আমাদের নিমতলি শ্মশানের ঘাটে রান্না চড়িয়েছি আকরিক হীরকখন্ড, হরিণ ও মাংসের ঘোড়া।
ঠিক লাশ-কাটা ঘরের উপরেই আমাদের ঘর। কপিলা-আসবাবে রূপোর ধুলোর সাথে মিশে আছে নয়শত চোখ, আমারই। দেখে নিচ্ছি নিভৃতে- সেই কৃষ্ণাঙ্গী বেশ্যার ঘরে হামাগুড়ি দিয়ে-ওঠা কয়েকটি শূকর শাবক, তাহাদের লৌন্ডানৃত্য। জানা ছিল, আমার নির্দিষ্ট কোন আকাশ নেই, হাত নেই, পা নেই; কান্ডহীন ক্যাকটাস যেনো... তবু ঐখানে জেলা-নোয়াখালির চাঁদ একা ভিজে যায়। শিশিরে-পোড়া আমাদের নব্বই দশক।
উৎসব। জীবিত মাথামুন্ডুসহ দিব্যোন্মাদ মৃতের উৎসব আজ। বামপন্থী কুষ্ঠরোগীরা আসো, মৌলবাদী পঞ্চপাধারী কুকুরেরা আসো। আমাদের জাফরান দেয়া তাড়িয়াগুলো লাফিয়ে লাফিয়ে ফেটে যাবে যেনো, রাজভৃঙ্গ তৈলের ভেতর একখন্ড আগুন গলে যাবে- আয়াহুস্কায়া, আয়াহুস্কায়া। জল হতে কেবলই জিহ্বা পান করেছিল পূর্বপুরুষ। আমি সারাটা হৃদপিন্ডসহ জলপান করি, আয়াহুস্কায়া- প্রিয় রতিশিক্ষিকা আমার।
রক্তবর্ণ আলখাল্লার ভেতর লুকিয়েই তো ছিলাম। ঘরের গর্তে উদয়গিরি পর্বত, লিঙ্গরাজ মন্দিরের চূড়া সংকোচিত ছিল
...আর জানোই তো- উৎসব এলে আমাদের আব-ওঠা আয়না হতে শাঙ্খবিজ্ঞান, সংলগ্ন ছায়া ঝরে পড়ে। অতঃপর রক্ত ফেটে গেলে শূন্যস্থানে তুলে রাখি রাঙা ফসফরাস, লন্ডনের ধুলা...
===========================================
আদি ও আসল:
আমি জানতাম- ঠিক দু'বছর পর তুমি অনেক ফরশা হবে, জাজ্জ্বল্যমান হবে। নিশ্চয়ই তুমি অজ্ঞাত নও- আপেল বাগানের নিচে আমারও একটি উঠোন রয়েছে। প্রায়শ মধ্যরাতে অন্ধ হাতিগুলো উঠোনে ক্রন্দন করে। সন্তানসম বেড়াল অথবা অন্ধকার একা রেখে কখনোই বেশিদূর যাই না বা যেতে পারি না। বার্মিংহাম থেকে লন্ডন সেতো বহুদূর... নগর লন্ডনে প্রায়শ উৎসব হয়। তুমি ডাকলে পাগলের মতো ছুটে আসি কিংবা আমার হৃদপিণ্ড গড়িয়ে গড়িয়ে শুধু তোমার দিকেই চলে যায়।
লন্ডন বৈশাখি মেলা নিয়ে কিছু বাক্যব্যয়ের অনুরোধ জানালেন মিলটন রহমান। ''মিলটনের স্বর্গের পাখিদের পা নেই, কারণ তারা ধুলার পৃথিবী স্পর্শ করে না।'' প্রিয় মিলটন, বৈশাখি মেলায় স্বর্গের পাখিদেরও কি তবে পা গজালো? রাঙা ধুলা কি তবে তারাও স্পর্শ করল?
বুকলিট- চারজন কবির সদ্যপ্রকাশিত গ্রন্থ নিয়ে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র যে বিনির্মাণবাদী অনুষ্ঠানের আয়োজন করল তা দেখে মোটেও বিস্মিত হইনি। কবি শামীম আজাদের মতো প্রতিষ্ঠান যে কেন্দ্রের সাথে জড়িত তা ভিন্নধর্মী বিষয়ের উদ্বোধন করতেই পারে। কবিদের মঞ্চে ডাকা হলো; কবিতা পাঠ করলেন রূপা চক্রবর্তী ও উদয়শঙ্কর দাশ। দু'একটি প্রশ্নও ছুঁড়ে দিলেন কবিদের দিকে, সঙ্গে কিছু আলোচনা সমালোচনা। দুটি বিষয় আমার কাছে মোটা দাগে সয়ম্ভূ হলো ১. অনুষ্ঠানটি ছিল মূর্খতা ও মৌলবাদ বিবর্জিত। ২. মানুষের উপস্থিতি। প্রায় শ'দেড়েক মানুষ পিন পতন নিরবতার ভেতর ঠিক ধৈর্য্য নিয়ে নয় বরং বলা যায় বিপুল উৎসাহে, স্থানাভাবে মেঝেতে বসে দীর্ঘক্ষণ তারা শ্রুত হলেন, একটানা বসে রইলেন। বিষয়টি অনেক স্নিগ্ধ। আমি কি বলতে পারি না, তারা স্নিগ্ধ সম্প্রদায়ভুক্ত!
রূপা চক্রবর্তী এবং উদয় শঙ্কর দাশ দু'জনের কণ্ঠেই কুয়াশা রয়েছে, মহিমের ঘোড়াগুলি স্বাচ্ছন্দে ঘাস খেলো কার্তিকের মাঠে; আবার কখনো কুয়াশা ভেদ করে মিলটনকিংসগামী ট্রেন আখাউড়া ভেদ করে ছুটে গেলো মনতলার দিকে। সে আওয়াজ আমি তো শুনতে পেলাম। কবিতা নির্বাচনে তারা মনোযোগী ছিলেন। কবি মুজিব ইরম, মিলটন রহমান, আবু মকসুদের কবিতা অনেক শ্রুতিমধুর মনে হলো। আরেকটি বিষয় বোধকরি অনুল্লেখিত থেকে গেল- আবু মকসুদের বিবিধ গ্রন্থ ইতোপূর্বে প্রকাশিত হলেও কাব্যগ্রন্থ হিসেবে 'দূরতম গ্রহজীবন' এবং মিলটন রহমানের 'চূর্ণকাল' প্রথম কাব্যগ্রন্থ। বই-লিটকে বলতে পারি- কবিদ্বয়ের প্রথম বইয়ের আকিকা-অনুষ্ঠান।
প্রিয় মিলটন,
পেলিক্যান ইঙ্ক এর কথা আপনার মনে আছে তো? গ্রামের বাজার থেকে কতো যে খরিদ করেছি, প্রিয় ফাউন্টেন পেন এর আহার জোগাতে। এখন সবাই তো কী-বোর্ড ব্যবহার করে, বলপেন ব্যবহার করে। বোধকরি ঐ ব্রান্ডের কালি এখন বাজারে পাওয়া যায় না। মনে পড়ছে, বোতলের গায়ে একটি পেলিক্যান পাখির ছবি ছিল। তখন শুধু জানতাম পেলিক্যান কালি দিয়ে হাতের লেখা সুন্দর দেখায়,অক্ষরগুলো জ্বলজ্বল করে। আজ এতোদিন পর মনে পড়লো, পেলিক্যান পাখি কী করে বাচ্চা ফোটায়! পালকের নিচে তা দিতে দিতে ডিম থেকে যখন বাচ্চা ফোটে না, ঠোঁট দিয়ে ঠুঁকরে ঠুঁকরে বক্ষ বিদীর্ণ করে মাতৃপেলিক্যানরা ডিমে রক্ত ঢেলে দেয়। তারপর পুনরায় তা দিয়ে গরম রক্তপ্রবাহের মধ্য দিয়ে সন্তান পেরিক্যান পৃথিবীর মুখ দেখে।
প্রিয় মিলটন, আমরা কি তবে পেলিক্যানের রক্ত দিয়ে মেট্রিক পরীক্ষা দিয়েছিলাম! কবি শামীম আজাদ তো দীর্ঘ দুই যুগ ইস্ট লন্ডনের বুকে সরবে নিরবে রক্ত ঢালছেন। কোথাও কি আমরা তার সন্তানের মুখ দেখলাম!
অনুষ্ঠানে একঝাঁক নারী এসে আমাদের বই-পত্তর আর লিটল ম্যাগের খরব নিয়ে গেলেন। নারীদল তাঁতের শাড়ি পরিহিতা নাকি বিদ্যুৎ পরিহিতা সে প্রসঙ্গ আপাতত থাক। তবে এদের কেউ কেউ আমার কন্যা সন্তানসম এ বিষয়টি আপনাকে জানিয়ে রাখলাম।কন্যার পাশে নিজকে কেবল পিতা বা পয়গম্বর মনে হয়না, ঈশ্বর মনে হয়। ঈশ্বরই তো হতে চেয়ছিলাম মিলটন; মানুষ , অর্ধমানুষ হতে হতে কীটপতঙ্গ হতে হতে মূর্খতা আর মৌলবাদের যন্ত্রণায় মাঝে মাঝে মনে হয় চামার হয়ে গেছি। তাই ভদ্রলোকের ছেঁড়া পায়ের দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকি। ভাবি, মুখগুলো সেলাই করে দেব। গড ড্যাম ইট, আমি চামার বংশীয়! ...তবু আপনারা কবি বলেন; বিষয়টি বেশ মধুর। বন্ধুবর ফারুক আহমেদ রনি, মাশুক ইবনে আনিস, দিলু নাসেরের কণ্ঠে কবি ডাক শুনতে ভালই তো লাগে। চামার বললেও যে খারাপ লাগবে না সেটাও বলে রাখি। কবি শহীদ কাদরীর একটা চিঠি বেরিয়েছিল ১যুগ আগে। তখন তিনি জার্মানীতে ছিলেন। লিখেছিলেন, শাদা রমণীর উরুর ভাঁজের চেয়েও আমর বন্ধুদের মুখচ্ছবি আজো আমার কাছে উজ্জ্বল। কবি মাশুক, কবি রণির মুখ বেথনালগ্রীনের রোদে কী করে মলিন দেখায় বলুন! আপনার চেহারাও মলিন ছিল না মিলটন। সাদা পাঞ্জাবী পরেছিলেন বলে নয়, আপনার এবং আবু মকসুদের পরিমিতিবোধে শুধু আমি কেন আমার চেয় দুর্জনও খুশী হওয়ার কথা।
...রে মিলটন, গদ্যের ভেতর ঘোড়ার গতি ঢেলে দিতে ভালই লাগে আমার। পারলাম কই! ডানাঅলা ঘোড়ায় চড়ে সাত আসমানে যেতে পারলাম কই! আমি আমার তিন চাকার বিএমডব্লিউতে চড়ে ইস্টএন্ড পর্যন্ত এসেছি। বন্ধুবর আবু তাহেরের অফিসে বসে মঞ্জুরুল আজিম পলাশ আর মঞ্জুলিকা এবং মাশুক ইবনে আনিস, ফারুক আহমেদ রনি আর নাজনীন সুলতানা শিখা, ওয়ালী মাহমুদ, মুনিরা এইসব পরিচিত মুখের পাশে অপরিচিত অবয়বের দুজন, অথচ লেখার সঙ্গে বেশ পরিচিত, সৈয়দ আফসার এবং শাহনাজ সুলতানার সঙ্গে দেখা হলে আরও কয়েক মাইল ভালো লাগা তৈরি হতো। আমি খেয়াল করেছি লন্ডন থেকে বার্মিংহামের দূরত্ব ১১৩ মাইল মাত্র। আজ থেকে কয়েক বছর আগের এক মলিন দিবসে আমি আর মুজিব ইরম যখন লন্ডন থেকে ভগ্ন মনে ফিরছিলাম আমাদের যাত্রাপথ ক্রমশই যেন দীর্ঘ হচ্ছিল...। মুজিব ইরম বারবার বলছিলেন- লন্ডনে কি তেলে জলে সব এক হয়ে গেলো! মৌলবাদীরা আগামীতে অজু করে কবিতা লেখার পরামর্শ দেবে! ড্রাইভিং সিট থেকে ফাঁকে ফাঁকে আমি তার দিকে তাকাচ্ছিলাম। মনে হলো- উই নিড আ ব্রেক! এম ওয়ানের একটা সার্ভিস স্টেশনে যাত্রা বিরতি করি । যদিও কফির পেয়ালায় চুমুক দিতে মন্দ লাগছিল না কিন্তু মাথার ভেতর ঝুলে থাকা একখণ্ড ময়লা আকাশ কিছুতেই যেন সরছিল না। তারপরও কী যেন অনুরণিত ছিল ভিতরে- ট্যানেলের ওইপাশে আলো কি দেখতে পেয়েছিলাম!একটা মলিন শহরের উদ্দেশ্যে বলেছিলাম তুমি আরো ফরশা হবে, জাজ্জ্বল্যমান হবে...
শুনেছি ব্রিকলেনে একটা ঢিল ছুঁড়লে প্রথমেই নাকি ব্যারিস্টারের মাথায় পড়বে। এরা সবাই আট /দশ বছর হলো এদেশে এসেছে। জামাতিরা পয়সা দিয়ে পাঠিয়েছে। এখন দিবারাত্রি সিমলাচুক্তির ভুল ব্যাখ্যা দেয় আর গোলাম আযম, সাইদীকে ফেরেশতারূপে চিহ্নিত করে। হায় দু:খ! পুলাপানগুলা মানুষ হওয়ার আগে ব্যারিস্টার হয়ে গেলো! তাও এতোগুলা! যে সমাজে এতো এতো ব্যারিস্টার সে সমাজে দুর্নীতির পরিমাণ যে কতো তা বলার অপেক্ষা রাখে না। জামাতীরা কি ওয়াবিবহাল নয় কয় লক্ষ নরহত্যার প্রতিনিধি তারা! আরেকটি মজার বিষয় হলো, এই লন্ডনে মৌলবাদীরা ব্যারিস্টারের মতো কবি বানাতে চায়। ভাল বাংলা বলতে ও লিখতে পারে না এমন পুলাপানদের কখন যে তারা কালিদাস বলে , কখন মধুসূদন দত্ত বলে খেই হারিয়ে ফেলে। তরুণদের আই ওয়াশ দেয়ার জন্য সনাতন ধর্মাবলম্বীদের লেখা খুব গুরুত্ব দিয়ে ছাপে। দাদা দাদা বলে নিজেকে প্রগতিশীল জাহির করে। নারী কুলের পেছনে পেছনে উল্লম্ফন করে। চল্লিশোর্ধ হওয়ার পরও যারা পোলাপান রয়ে যায় তারা কখন যে বড় হবে তা আমার বোধাতীত।
সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ:
এই পত্রে মৌলবাদীর প্রতি প্রচ্ছ্ন্ন অঙ্গুলি প্রদর্শনের পাশাপাশি সংগঠন , সভা সমিতি নিয়ে প্রশংসা করার মানে এই নয় যে মেলা, টিভি চ্যানেল, মিডিয়াবাজী, কু-সম্পাদিত লিটলম্যাগ ওগুলোর বিরুদ্ধে বলার অধিকার চিরদিনের জন্য হারিয়েছি। আমি তো কবিদের অনেক উঁচুতে দেখতে চাই মিলটন। রামগিরি পর্বতের পাশে যেমন দেখি কালিদাসকে।
আজ আঠাশ মে, আজ বুদ্ধ পূর্ণিমা। এমন রজনীতে গৌতম বুদ্ধের অধিক কে আর কবি হতে পারে! বোধিবৃক্ষের নিচে হৃদপিণ্ড চিপে চিপে কষ ঝরাতে জানে!
মিলটন, আমি আজ পশু হত্যার কৌশল ভুলে গেছি।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে মে, ২০১০ রাত ৩:৪৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


