somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কবিতা বিষয়ে মহাত্মা ফরহাদ মজহার এর একটা লেখা: কবি ও স্বরস্বতী

২৩ শে আগস্ট, ২০০৯ রাত ৩:১২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


০১.
গাজী রকিব আমাকে দুটো প্রশ্ন করেছেন। খুবই কঠিন প্রশ্ন। কবিতায় বিবর্তন কী? আমি কী করে জানি? প্রশ্ন করেছেন নিজের কবিতায় আমি যেভাবে বিবর্তিত হই সেই সব কথা যেন বলি। হই কি? কে জানে? আমি উত্তর দেবার ভয়ে দীর্ঘদিন পালিয়ে বেড়িয়েছি। কিন্তু রকিবের প্রশংসা না করে উপায় নাই। আমার জীবনে লেখা আদায় করবার জন্য হাজার বার টেলিফোনের স্মৃতি ভুলবার নয়। আমি এখানে কি আসলে তার প্রশ্নের উত্তর দিলাম? নাকি শুধু টেলিফোনের সাড়া দিয়েছি মাত্র? কিন্তু কিছু যদি এখন লিখে থাকি উত্তর দিয়েছি আন্তরিকভাবেই। কোনো ভনিতা না করে।

প্রশ্ন, ‘কবিতায় বিবর্তন কী?’ খুবই গুরুগম্ভীর প্রশ্ন। মাথা চুলকিয়ে আমি ভাবছিলাম আমি কি ‘কবি’ হিশাবে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেব, নাকি কাব্যতত্ত্বের জায়গা থেকে? কাব্যতত্ত্ব কবিতা বানায় না কবিতাকে কবিতা
হিশাবে বুঝতে সাহায্যও করে না, তবে কবিতার সমাজতত্ত্ব, অর্থনীতি, কবিতার গঠনবর্ণনা ইত্যাদি বুঝতে সহায়ক হয়। পদ্যের পয়দা হওয়ার কারণ অন্যত্র। কিছু কিছু জীব আছে সমাজে, যারা সমাজে বাস করে অবশ্যই, কিন্তু আবার ঠিক সমাজে ‘বাস’ করে না। বরং বাস করে জর্মন দার্শনিক হেইডেগার যেমন বলেছিলন—ভাষার মধ্যে। চিহ্নব্যবস্থায়। অবশ্য মানুষ আদৌ ভাষার বাইরে ‘বাস’ করতে পারে কিনা সেটা দর্শনের জগতে একটা বড়সড় তর্ক হয়ে রয়েছে। সমাজের মধ্যে থেকে সেই জীব ইন্দ্রিয়পরায়ণ জগতের মধ্যে নিজেকে নিজে রক্তমাংসের ফাঁদ বানিয়ে বসে থাকে, বড়ই বিচিত্র এই প্রাণি। তার সাধ এখনও যেসব নিরাকার বিষয়াদি শব্দ, অক্ষর বাক্য ইত্যাদিতে ধরা পড়ে নি, সে সেই অধরাকে ভাষায় বা কোনো না কোনো চিহ্নে, দাগে, বর্ণে, বিন্যাসে ধরবে। এই প্রাণীকুলেরই সাধারণ নাম ‘কবি’। বাংলার সাধনার জগতে এটা হচ্ছে কাব্য সম্বন্ধে খুবই প্রাথমিক একটা ধারণা যেখানে কবি এবং সাধক একাকার হয়ে থাকেন। একটা পর্যায়ে উভয়ের পথ আলাদা হয়ে যায়—সেটা অবশ্য ভিন্ন প্রশ্ন। যা এখনো ধরা হয় নি, তাকে কী করে ধরা যায়? এই কায়কারবারের মধ্যে কাব্য এবং ভাব উভয়েরই বিবর্তন ঘটতে থাকে।

হেইডেগারের সঙ্গে বাংলার ভাবের ফারাকটা নোক্তার মতো বলে রাখলে আগামিতে এই বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে। সিদ্ধান্তে যাবার দরকার নাই এখন। প্রশ্ন হিশাবেই তুলে রাখা যাক। যেমন, ফারাকটা কি সম্ভবত ওখানে যে বাংলা অধরাকে ধরবার কায়কারবারকে শুধু ভাষার ব্যাপার বলে গণ্য করে না। অধরাকে ধরা শেষাবধি ভাষাসম্পন্ন শরীরের কীর্তি নয় কি? মানুষের বাইরে তো ভাষা নাই। কিম্বা ভাষার বাইরেও ‘মানুষ’ নামক কোনো ধারণা তৈয়ার হওয়ার সম্ভাবনা নাই। হয়তো মনুষ্য শরীরের মধ্য দিয়ে আদতে প্রকৃতি নিজেই কথাবার্তা বলে? তাই না? অথচ ‘ধরা’ দেয় না। দেখা যাচ্ছে মানুষ ভাষায় ‘বাস’ করে শুধু এতটুকু বললে বাংলার ভাবান্দোলনে চলছে না। ভাষা ও শরীরের সম্পর্ক বিচারের একটা কর্তব্য থেকেই যায়। এই ‘শরীর’-কে আবার শুধু ব্যক্তির শরীর ভাবলেও চলে না, এমনকি সামাজিক শরীর ভাবাও যথেষ্ট নয়। ভাণ্ডে যা আছে ব্রহ্মাণ্ডেও তাই। এই এক অখণ্ড ‘শরীর’ নিয়ে আমাদের গল্প। ভাবান্দোলনের বয়ান। নইলে কে কোথায় কীভাবে বাস করে তার মীমাংসা হচ্ছে না। বাংলার ভাবচর্চা বা সাধারণ ভাবে যাকে আমি ‘ভাবান্দোলন’ বলে থাকি সেই দিক থেকে যদি বিচার করি তাহলে ‘মানুষ’ অধরাকে শুধু কাব্যভাষা চর্চা দিয়ে ধরতে পারে না। সেটা ভাষার ওপর দখল বা ভাষায় দক্ষতা অর্জনের ব্যাপার, কাব্যের বিষয় নয়। বরং অধরার আবির্ভাবের জন্য শরীর তৈরি করা চাই। অর্থাৎ এমন একটা জীবনাচার চাই যা ভাবচর্চার জন্য উপযুক্ত। ভাবুকতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বা সাধকের উপযুক্ত চলা ফেরার নিয়ম, খাদ্যব্যবস্থা, করণকর্ম ইত্যাদি। মানুষে মানুষে সম্পর্ক রচনার বিধিবিধান দরকার।

কুস্তিগিরকে যেমন ব্যায়াম করতে হয় নইলে সে কুস্তিগির হয় না, খেলোয়াড় শরীরচর্চা ছাড়া যেমন খেলোয়াড় হয়ে উঠতে পারে না, ঠিক তেমনি কাব্যের জন্যও বিশেষ শারিরীক চর্চা চাই। মনুষ্য শরীরের বাইরে ‘ভাব’ বা ‘ভাষা’ নাই। ঠিক যে যিনি শুধু কবি হতে চান শুধু ভাষাশিল্পী—তাঁর কায়কারবার ভাষার মধ্যে সীমিত রাখাকে আমরা স্বাভাবিক মনে করি এই কারণে যে ভাষা ও শরীরের মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে এটা আমরা মনে করি না। কিম্বা পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রতাপে আমাদের নিজেদের শরীর নিজেদেরই আর নজরে পরে না। শরীর নিয়ে কথাবার্তা বলতে আমরা শরমিন্দা বোধ করি। কাব্য ও শরীরের সম্পর্ক আমাদের অনুমানের বাইরে থেকে যায়। ভাষাচর্চা ও ভাবচর্চা একই কথা। অথচ ভাষাচর্চা শরীরচর্চা ছাড়া চলে না। বাংলার সাধনা বা ভাবুকতার এটাই কি প্রধান বৈশিষ্ট্যসূচক দিক। কবি যদি শুধু ভাষায় অধরাকে ধরবার সাধ করে থাকেন, তাহলে তিনি বাংলার সাধনার ধারার বাইরে থেকে যাবেন। বড়জোরে হেইডেগার হতে পারবেন তিনি, সেটাও, বলাবাহুল্য, কম কীর্তি নয়। কিন্তু ফকির লালন শাহ হতে পারবেন না। যে কারণে ভাবান্দোলনে সাধক মাত্রই কবি, কিন্তু কবি মানেই সাধক নয়। ঠিক না?
ফকির লালন শাহ থেকে একটা উদ্ধৃতি দিয়ে নোক্তাটা আপাতত কমপ্লিট করে রাখি।

‘অমাবস্যায় পূর্ণিমা হয়
মহাজন সেই দিনে উদয়
লালন বলে তাহার সময় দণ্ডেক রয় না
সময় গেলে সাধন হবে না’

কাব্যের উদয় একই সঙ্গে শরীরে ও ভাষায়। এই কাব্য-মুহূর্ত দণ্ডেক রয় না। এতটুকু বুঝলে এখন আপাতত আমাদের চলবে।

কাব্যতত্ত্ব কবিতা তৈরি করে না। কাব্যের ওপর যখন কাব্যতত্ত্ব হুকুমদারি চালায় তখনও এক ধরনের পদ্য রচিত হতেই পারে। সেই সব তৈয়ারি জিনিসকে কারখানার জিনিসপত্র বলে আমরা উপেক্ষা করি না, কারণ প্রতিটি যুগেই কবি এক ধরনের নন্দনতাত্ত্বিক হুকুমদারির অভিশাপ মাথায় নিয়ে কবিতা লিখতে বসেন। কাব্যতত্ত্বের দিক থেকে কবিতার বিবর্তন বিচারের মানে দাঁড়ায় এই হুকুমদারি—বা কবিতা সম্পর্কে এককটা যুগের অনুমান ও ধ্যানধারণাকে ফাঁকি দিয়ে কবিরা ভাষাকে কীভাবে নতুন ভাবে ‘বসবাসযোগ্য’ করে গড়ে তুলছেন তার ইতিহাস। কবিদের শুধু হুকুমের অধীনে রাখা হলে কবি আর কবি থাকে না। কবি নন্দনতাত্ত্বিক হুকুমদারির প্রজা হয়ে উঠলে সেটা ষোল আনা কবিতারই ক্ষতি। সেটা অকাব্যের যুগ। কাব্যতত্ত্ব কাব্যের মা বা বাবা—কোনোটাই নয়। হতে পারে না, কখনই।

কাব্যতত্ত্বের দিক থেকে কবিতার বিবর্তন সংক্রান্ত সওয়ালের উত্তর অতএব খুঁজতে হবে অন্যত্র। যথেষ্ট কবিতা আছে বলেই, কবিরা আছেন বলেই এই প্রশ্ন ওঠে যে, কবিতা কী? কবিতায় বিবর্তন কী? এইসব। কবিতা হাজির বলেই ‘এটা কী?’—এই প্রশ্ন ওঠে এবং তখন কাব্যতত্ত্বের পয়দা হতে থাকে। হাজার বছরের কবিতার ইতিহাস পড়ে ও গবেষণা করে তাত্ত্বিকরা তখন বলেন, হুঁম, কবিতা বলিতে আমরা পণ্ডিতেরা ইহাই হয় বলিয়া সাব্যস্ত করিলাম—আমার তত্ত্বের নাম কাব্যালংকার শাস্ত্র, কিম্বা আমার থিওরির নাম উপমাবাদ কারণ আমি এই মাত্র প্রমাণ করিলাম উপমাই কবিতা। বিভিন্ন সময়ে বা কালে নানান ধরনের কবিতা বিচার করে কবিতার বিবর্তন হল কীভাবে সেই সকল আদ্ধেক কেচ্ছা আদ্ধেক বানোয়াট কথাবার্তা বলে আরেক ধরনের সাহিত্য রচিত হয়। আলবৎ কবিতার বিবর্তন নিয়ে মোটাসোটা বই লেখা যায়। কবিতার ‘বিবর্তন’ জানবার জন্য যে কেউই উৎসুক হতে পারে। সে সম্পর্কে বিপুল বইপত্র লেখা হোক। সেই সকল ইতিহাস পাঠ ভাষায় বসবাস রপ্ত করবার জন্য কবির কতোটা কাজে লাগে সেটা আজ অবধি তর্ক হয়েই রয়েছে।


০২.
এর পরের প্রশ্ন, ‘নিজের কবিতায় আপনি যেভাবে বিবর্তিত হন।’ আমার কবিতায় আমি কীভাবে বিবর্তিত হই, নাকি কবিতা আমার মধ্য দিয়ে বিবর্তিত হয়? দুই ভাবে দুই দিক থেকে এই প্রশ্ন মোকাবিলা করা যায়। একেকটি প্রশ্ন নিয়েই এককটি বই হয়ে যেতে পারে।

আমি যখন কবিতা লিখতে শুরু করি তখন কবিতা কী সে সম্পর্কে কোনো ধারণা মাথায় নিয়ে লিখেছি মনে পড়ে না। বয়স তখন কত হবে? বারো কি চৌদ্দ। রবীন্দ্রনাথ পড়েছি। ‘কর্ণকুন্তি সংবাদ’ পুরাটাই মুখস্থ। ভানুসিংহের পদাবলীর বেশ কয়েকটা পদ্য মুখস্থ। গান শুনেছি। কীভাবে কবিতা লিখতে শুরু করেছি মনে পড়ে না। তবে একটা স্মৃতি মনে আছে।

আমি বড় হয়েছি এক অর্থে অজ পাড়াগাঁয়—সবে মাত্র ছোটখাট লক্ষণ নিয়ে মফস্বলের শহর গড়ে উঠছে—তার প্রান্ত সীমায়। নোয়াখালি মাইজদি কোর্ট আমার বাড়ি। আমাদের বাড়ির পেছনে কয়েক কদম হাঁটলেই ছিল বন, ওর মধ্য দিয়ে মানুষের হাঁটাপথ চলে গিয়েছে। আমরা কিশোরকুল হাঁটতে হাঁটতে গুলতি খেলতে খেলতে এবং খামাখা মারামারি করতে করতে এই ধরনের বনের অবশিষ্ট অন্ধকার নির্জনের মধ্যে প্রায়ই অনধিকার প্রবেশ করতাম, কিছুদূর হাঁটলে হঠাৎ বড় বড় গাব গাছের ফাঁক দিয়ে চোখের সামনে দড়াম করে তীক্ষ বল্লমের মতো চোখে বিঁধত রেললাইন।

এই যে হঠাৎ চোখের সামনে একদমই অপরিচিত ধাতুর চিৎকার—সবুজের বিপরীতে লোহালক্কড়ের আবির্ভাব—আমাকে এই আকস্মিকতা দারুণ বিচলিত করত। বনের মধ্যে আমার ভয় নাই। বন আমি চিনি। কিন্তু যা চিনি না, অপরিচিত, এবং যা চিনি তার সম্পূর্ণ বিপরীত জগতকে ভয় লাগত কিনা জানি না, কিন্তু সম্পূর্ণ অন্য রকম এক আশংকা আমার মধ্যে কাজ করত। তার কারণে আমি রেল লাইন চোখে পড়লেই সেই বয়সে শেখা ছড়াগুলো জোরে জোরে চিৎকার করে আবৃত্তি করতে থাকতাম। যখন ছড়া মনে পড়ত না, তখন নিজে বহুবিচিত্র জগাখিচুড়ি ও অর্থহীন শব্দ দিয়ে ছড়া বানাতাম। সেই সবের অর্থ কী আমাকে জিজ্ঞাসা করে লাভ নাই। আমার খেলার সঙ্গীরা যাদের সঙ্গে আমার মারপিট ওদের গালি দেবার ভাষা তৈরি হয়েছে এখানে হয়তো।

কিন্তু সেই প্রায়অর্থহীন—বিস্ময়, ভয় ও আবিষ্কার থেকে উঠে আসা বালকোচিত ধ্বনিসকল আজো আমার কানে বিঁধে আছে। ভয়, বিস্ময় আবিষ্কারের যে ইন্দ্রিয়প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তাকে কী ভাবে ভাষায় ধরব সেই কারিগরি আমি তখনো রপ্ত করি নি। ফলে যা ব্যবহার করতাম সেটা বিচিত্র সব ধ্বনি ও দুর্বোধ্য উচ্চারণ। ঐ ধ্বনির মধ্য দিয়ে ইন্দ্রিয়পরায়ণ জগতকে আমি ধরতে পেরেছি দাবি করতে পারব না। কিন্তু যখন কবিতা লিখতে শুরু করেছি তখন থেকেইে মনে করি কবির কাজ হচ্ছে ভাষাকে ফাঁকি দেওয়া। সেই বিস্ময়-আবিষ্কার-ছমছমানির স্বাদটা কীভাবে কবিতার ধ্বনি ও ভাবের মধ্যে ধরা যায় তাকেই কবির সাধনা বলে মেনে এসেছি।

আমার কবিতার বিবর্তন? সম্ভবত আমি বিদ্যমান বা অধিপতি ভাষা বা ভাষার ব্যবহারকে কতোটা ফাঁকি দিতে পেরেছি তারই বিবর্তন। কারণ একবার যা ‘ধরা’ পড়ে গিয়েছে তাকে নতুন করে ধরবার পরিশ্রম করে কী লাভ? কবি ভাষা ব্যবহার করে—আর দশজন যে-বাংলা ব্যবহার করে—শিক্ষিত, নিরক্ষর, জ্ঞানী অজ্ঞানী কবি বা অকবি—সেই সামাজিক ভাষাটাই কবি ব্যবহার করে, কিন্তু একই সঙ্গে কবিতা মানে সেই ভাষাকে নাকচ করে দেওয়া। অথচ কবির ট্রাজেডি হচ্ছে ওখানে যে বিদ্যমান ভাষা বা অন্য সব কবিরা যে ভাষায় লেখেন সেই ভাষার ইতিহাসের মধ্যে দাঁড়িয়েই কাব্যভাষা কোনো একটা অর্থ, প্রতিক্রিয়া বা ইংরেজিতে যাকে বলে ইফেক্ট—সেটা তৈরি করে। ভাষার মধ্যে থেকেও কাব্য ভাষার বাইরে কী যেন একটা ব্যাপার হয়ে যতটুকু হাজির থাকতে সক্ষম হয় ততটুকুই কাব্য। ততটুকুই সামাজিক চিহ্নব্যবস্থার মধ্যে কবির নিজের দাগ এঁকে দেওয়া। ভাষাটা সমাজের অথচ কবিতাটা কবির—আশ্চর্য নয় কি? এই পারাডক্সের মধ্যে কবি এবং কবিতা উভয়েরই নিরন্তর আহাজারি চলতে থাকবে। মানুষ যতদিন বেঁচে আছে।

আমি কবিতায় আদৌ কোনো দাগ দিতে পেরেছি কিনা কে জানে? যদি দিয়েও থাকি সেই দাগগুলো আমি নিজেও কি পড়তে পারি? যিনি পড়তে পেরেছেন বা পড়বেন তাঁকেও কি আমি চিনি?

০৩.
আমাদের বাড়ি থেকে কিছু দূরেই মাইজদি কোর্ট শহরের বিখ্যাত দীঘি। এখন আর তার সেই চেহারা নাই। দিনের একটা বড় অংশ আমাদের পানির মধ্যে দাপিয়ে কাটত। দীঘিতে যেতে হোত ধানের ক্ষেত পেরিয়ে। পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় চতুর্দিক ফক ফক করত। দারুণ। আর ঠিক সেই সময় দীঘি দখলে চলে যেত পাড়ার মেয়েদের। মেয়েরা সব দল বেঁধে দীঘিতে গোসল করতে যেত।

একবার ভরা জ্যোৎস্নায় দেখি—একদমই একা একজন যাচ্ছেন, নারী, কলসি কাঁখে নিয়ে সেই দীঘিতে। আমি তাঁর পিছু নিলাম দূর থেকে। আমি হাঁটছি, কিন্তু সেই জ্যোৎস্নায় যিনি যাচ্ছেন তাঁর ভয় ডর কিছু নাই। আমি তাঁর পিছু ছাড়ছি না। তিনি দীঘিতে নামলেন। অল্পসময়। এরপর ভেজা কাপড় জড়িয়ে কলস ভর্তি পানি নিয়ে চাঁদের দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকালেন আমার দিকে। কতো বয়স আমার? বয়ঃসন্ধিক্ষণ কি?

আমি লুকাতে চাইলাম। কিন্তু খালি মাঠ খা খা। চাঁদ হাসছে। চতুর্দিকে। ভয় নাই। শুধু সবুজে আর হলুদে মাখামাখি করে আলো শুয়ে আছে মাঠে মাঠে।

আমি সেই মুখ দেখলাম। প্রতিটি শিশু যে মুখ জীবনের শুরুতে দেখে।

আমি শুধু বলেছিলাম, ‘আম্মা, আমি।’

তৎক্ষণাৎ স্বরস্বতীর রাজহাঁস ঝাপট মারল পাখায়। চাঁদ হঠাৎ ফর্শা হয়ে উঠল। ধবধবে। হাতে বীণার বদলে ভরাকলসি বেজে উঠল নদীর কণ্ঠস্বরে।

তিনি, জগজ্জননী, শুধুই হাসলেন।

এই প্রথম আমি স্বরস্বতীকে। এরপর কতদিন যায়, মনে নাই, তিনি কবিতা হয়ে দেখা দিতে শুরু করলেন।

আম্মা। আমার কবিতা। ইত্যাদি। বুঝতে পারি কবিতার সঙ্গে মা জননীর একটা সম্পর্ক আছে। কিন্তু কোথায় আমি তা গদ্যে ত লিখে বোঝাতে পারব না। গদ্যের এই অক্ষমতাও হয়তো আমার কবিতা লিখবার কারণ। কোথায় আমার কবিতার বিবর্তন? বড়জোর তাঁর রাজহাঁস কয়বার পাখা সাপ্টে দিয়ে আমার অক্ষর ও বাক্য এলেমেলো করতে সক্ষম হয়েছে। অতোটুক্টুই।

ব্যস !
---------------------------------------------------------------------------------
৯ চৈত্র ১৪১৫। শ্যামলী

[লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে ১৭ আগস্ট ২০০৯ ২:৩৭ পূর্বাহ্ন, arts.bdnews24.com এ।
http://arts.bdnews24.com/?p=2450#more-2450]
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে আগস্ট, ২০০৯ রাত ৩:২২
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×