somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা - মেজর জলিলের বইটি এখন অনলাইনে । ডাউনলোড করুন ।

১৪ ই নভেম্বর, ২০১১ দুপুর ১২:০০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ডাউনলোড লিঙ্ক ►
চতুর্থ অধ্যায় : মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রকৃত অবস্থা

১৯৬৫ সনের পাক-ভারত যুদ্ধবিরতির পর থেকে ১৯৭১ সনের ১৩ই ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত আমি পাকিস্তানের মুলতান শহরে ১২ নম্বর ক্যাভলরী রেজিমেন্টে(ট্যাংক রেজিমেন্ট) চাকরীরত ছিলাম। ১৪ই ফেব্রুয়ারী ১মাসের ছুটি নিয়ে ঢাকায় অবতরণ করি। তারপরে বরিশালের উজিরপুর থানায় দেশের বাড়ীতে থাকাকালীন অবস্থায় ২৬শে মার্চ সকাল ৮টায় আমি বরিশাল শহরে মুক্তিযুদ্ধে দায়িত্ব গ্রহন করি। মায়ের অসুস্থতার খবর শুনে দেশে আসা সৈনিক দেশ-মাতৃকার দুর্দিনে মায়ের রোগশয্যা ছেড়ে ঝঁপিয়ে পড়ি বৃহত্তর ডাকে সাড়া দিতে। শুরু হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধ। তরুণ যুবকদের বুকে প্রচন্ড আবেগ উচ্ছাস ও উত্তেজনা-বয়স্কদের চোখে-মুখে ভীতি, অনিশ্চয়তা এবং নিরপত্তাহীনতার উদ্বেগ। শিশু-কিশোরদের চোখ জুড়ে সীমাহীন কৌতুহল-নারী সমাজের বুকে অজানা উৎকন্ঠায় প্রকম্পিত অহরহ মায়ের বুক খালি করে হাজার হাজার তরুণ যুবকরা ছুটে যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধে। দিকে দিকে বাংলার জননীর অশ্রুসিক্ত চোখের উদাস চাহনিই যেন তাদের ছেলে-সন্তানদের পিছু পিছু দোয়া-আশীর্বাদ নিয়ে ছুটছে। পরিবেশ-পরিস্থিতি থমথমে। মানুষ কেবল ছুটে চলছে এখান খেকে ওখানে, শহর থেকে গ্রামে। এর মধ্যে রয়েছে তাড়া খাওয়া সেনা, পুলিশ এবং ই,পি, আর বাহিনীর সশস্ত্র সদস্যরাও। এখানে-সেখানে হঠাৎ গুলীর শব্দ।তরুণ যুবকরা ট্রেনিং নিচ্ছে এবং তাদেরই সংগে প্রতিনিয়ত যোগদান করে চলছে তাড়া খাওয়া সেই সশস্ত্র সদস্যরা। তাদের চোখে-মুখে আগুন ঠিকরে দেশ স্বাধীন করার অংগীকার সোচ্চারিত হচ্ছে।
বিহারী এবং অবাঙালী অধিবাসীরা প্রাণের ভয়ে এদিক-ওদিক, ঝোঁপেজঙ্গলে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। কারো সংগে শিশু সন্তান, কারো সংগে যুবতী মেয়ে। প্রাণ এবং সম্ভ্রম দুটোই বাঁচিয়ে চলতে হবে। অথচ মানব হিংস্রতার মুখে এর কোনটিরই সামান্যতম নিরাপত্তা নেই। বাঙালীর ভয়ে বিহারী পালিয়ে বেড়াচ্ছে, আর বিহারী-পাকিস্তানীদের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে বাঙালী। অথচ কারো সংগে কারো কোন ব্যক্তিগত শত্রুতা নেই, তবু ৭১-এর ২৫শে মার্চের পরে শত্রুতার যেন কোন শেষও নেই। স্বাধীনতার নামে স্বার্থবাদী মহলের ক্ষমতা দখলের উন্মত্ততা ঘর সংসার করা সাধারণ শান্তিপ্রিয় মানুষের মধ্যে আকস্মিক ভাবেই জন্ম নিয়েছে ভয়াবহ হিংস্রতা এবং প্রতিশোধ গ্রহণের বর্বর নেশা। মানুষ মানুষের মধ্যকার স্বাভাবিক মানবতাবোধ ভিত্তিক সম্পর্কের ছেদ্‌ ঘটেছে, সকলেই যুদ্ধংদেহী।
পাকিস্তানী সেনাবাহিনী অতর্কিতে হামলা দিচ্ছে বিভিন্ন শহরে বন্দরে। টার্গেট হচ্ছে তরুণ, যুবক, ছাত্র এবং শ্রমিক সমাজ। সুন্দরী নারীরা বিশেষ টার্গেট রূপে বিবেচিত। শহরের বিভিন্ন ডাকবাংলাগুলোতে বিলাস-অনাচারের জমজমাট পাকবাহিনীর আড্ডা। পচা, গলিত লাশের চারিদিকে শেয়াল, কুকুর ও শকুনের ভীড়। রাতের গভীরে নির্যাতিতা নারীর বুকফাটা চীৎকার। বধ্যভুমিতে মেশিনগনের ব্রাশ ফায়ারের ঠা ঠা শব্দ। নদীতে হামলাকারী গানবোটের বিকট উল্লাস। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার দলে দলে শরণার্থীরূপে বর্ডারে আহাজারী। ত্বরিতে নৌকায় নদী পাড়ির সময় মাঝ নদীতে নৌকাডুবি-আপনজনদের হাহাকার। পংগু ও অসহায়দের আর্তনাদ। বাতাসে বারুদের গন্ধ। মুক্তিযুদ্ধ চলছে।
হাট-বাজার জমছে না। ব্যবসা বাণিজ্যে ভাটা। মিল, ফ্যাক্টরী কল-কারখানাগুলো নীরব শূন্য শুন্য। স্কুল, কলেজ, ভারসিটিগুলো নিস্তব্দ। অফিস-আদালতগুলো প্রাণহীন। আওয়ামী লীগের নির্বাচিত সংদ সদস্যদের অনেকেই দেশের অভ্যন্তরে গা-ঢাকা দিয়ে আছে। কিছু কিছু বর্ডার অতিক্রম করে ভারতে নিরাপদ আশ্রয় গ্রহণ করেছে। সেনাবাহিনী থেকে ছুটে আসা তরুণ অফিসারদের নেতৃত্বে দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে মুক্তিবাহিনীর ট্রেনিং শিবির। দলে দলে তরুণ ছাত্র যুবকরা যোগ দিচ্ছে ট্রেনিং শিবিরে।
সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে সর্বস্তরের সাধারণ জনগণ। দেশ শত্রমুক্ত হবে এটাই তাদের কামনা। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী শত্রুপক্ষ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গেছে। ১৭ই এপ্রিল মুজীব নগরে স্থাপিত স্বাধীন বাংলাদেশ বেতার কেন্দ্র থেকে ৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি মন্ত্রিসভার ঘোষণা করা হয়। শেখ মুজীবুর রহমানকে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি এবং সৈয়দ নজরুল ইসলামকে ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং শেখ মুজীবের অবর্তমানে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষনা করা হয়। মন্ত্রিসভঅর অন্যান্য সদস্য জনব তাজউদ্দিন আহমদ প্রধানমন্ত্রী, জনাব খন্দকার মোশতাক আহমদ বৈদেশিক এবং আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী, জনাব এ, এইচ, এম, কামুজ্জামান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী এবং জনাব মনসুর আহমদকে অর্থমন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল মোহাম্মদ আতাউল হক ওসমন গণিকে স্বাধীনদা যুদ্ধের জন্য প্রধান সেনাপতি হিসাবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৭১ সনের ১৭ই এপ্রিল তারিখে মুজীব নগর থেকে আরো গোষণা কর হয় ৯ জন সেক্টর কমান্ডারের নাম। সমগ্র রণক্ষেত্রকে ৯টি সেক্টরে বিভক্ত করা হয় এবং নবম সেক্টরের দায়িত্বভার অর্পিত হয় আমার উপরে। প্রায় সমগ্র দক্ষিণ বাংলা নিয়েই গঠিত হয়েছেল এই ৯ নম্বর সেক্টর। বৃহত্তর বরিশাল জেলা, ভোলা, পটুয়খালী, ফরিদপুর এবং খুলনা সহকারে ৯নং সেক্টর বস্তুত-পক্ষে ছিল বৃহত্তম সেক্টর।
এই ঘোষণার সাথে সাথেই এলোমেলো মুক্তিযুদ্ধ একটা নির্দিষ্ট রূপ পরিগ্রহ করল। কোন সেক্টরের আওতাধীন নয় এমনও অনেক স্বাধীন গ্রুপ ছিল যারা বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় তৎপর ছিল। এদের মধ্যে টাংগাইলে কাদের সিদ্দিকী এবং বরিশালের একটা অঞ্চলে সর্বহারা পার্টির নেতা সিরাজ সিকদার বিশেষ ভাবেই উল্লেখযোগ্য। আরো কিছু বামপন্থী দল তাদের নিজস্ব উদ্যোগেই যুদ্ধ পরিচালনা করেছে। তারা ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেনি। তবে ৯টি সেক্টর ঘোষণা হওয়ার সংগে সংগেই সেনাবাহিনী অধিকতর সতর্ক এবং সক্রিয় হয়ে পড়ল। হত্যাকান্ড বৃদ্ধি পেল, মুক্তিযোদ্ধাদের ঘরবাড়ী পোড়ানো শুরু হলো। দেশের অভ্যন্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি দানা বাঁধতে লাগল। মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি জন্ম নিল পুরাতন মুসলিম লীগ, নেজাম-ই-ইসলাম সহ অন্যান্য ইসলাম ভিত্তিক রাজনৈতিক এবং সামাজিক সংগঠনসমূহ থেকে।
তাঁদের যুক্তি হলো যে, তারা বাঙালীর স্বাধীনতার বিরুদ্ধে নয়, তবে তারা ভরতীয় আধিপত্যবাদী শক্তির সাহায্য নিয়ে দেশ স্বাধীন করার পক্ষে মোটেও নয়। কারণ হিসেবে তারা মত প্রকাশ করেছেন যে, পাকিস্তানী শাসক শোষকের শোষণ-যুলুম থেকে মুক্ত হয়ে ভারতীয় শাসক শোসকদের অধীনস্থ হওয়াকে স্বাধীনতা হিসেবে বিবেচনা হওয়ার কোন যু্ক্তি নেই। তারা ভারতীয় আধিপত্যবাদী শক্তিকে পাকিস্তানী আধিপত্যবাদী শক্তির তুলনায় অধিকতর বিপজ্জনক বলে গণ্য করেছেন। তাদের মতে ব্রাহ্মণ্যবাদী ভারতীয় প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী মুসলমানদের বাসভূমি সৃষ্ট পাকিস্তানকে কেবল দ্বিখন্ডিত করতে আগ্রহী নয়, বরং দ্বিখন্ডিত করার পরে পূর্ব অঞ্চল অর্থাৎ বাংলাদেশকে সর্বতোভাবেই গ্রাস করার হীন পরিকল্পনও লিপ্ত। এমন যু্ক্তিকে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন অবস্থায় সাধারণ দেশবাসী মনেপ্রাণে মেনে না নিলেও একেবারে অগ্রাহ্য করতে পারেনি: কারণ এ কথা অতীব সত্য যে, এদেশের জনগণের মধ্যে একটা স্বভাবিক ভারতভীতি বিদ্যমান।
তবে পাকিস্তানী সেনবাহিনীর হাতে তাড়া খাওয়া বাঙালী আত্মরক্ষার স্বার্থে ৭১-এর সেই দুযোর্গপূর্ণ দিনগুলোতে ভারতের বুকেই নির্দ্বিধায় ঠাঁই নিয়েছিল এবং ঠাঁই সেথায় পেয়েছিলও। এই ঠাঁই লাভের পেছনে উভয় পক্ষেরই স্বার্থ জড়িত ছিল। স্বার্থ ছাড়া কখনো সদ্ধি হয় না। বাঙালীর স্বার্থ ছিল ভারতের কাছ থেকে অস্ত্র নিয়ে দেশ মুক্ত করা, আর ভারতের স্বার্থ ছিল দেশ মুক্ত করার নামে তার চিহ্নত এবং প্রমাণিত শত্রু পাকিস্তানকে দ্বিখন্ডিত করার মধ্য দিয়ে শত্রুপক্ষকে স্থায়ীভাবে দুর্বল করে রাখা এবং মুক্ত বাঙলাদেশের উপর প্রাথমিক ভাবে খবরদারী করে পরবর্তীতে সময় ও সুযোগমতে ভারতরে সাথে একীভূত করে নেয়া। এটাকে শুধু কেবল তাদের নিছক স্বার্থ হিসেবে চিহ্নিত করলে ভুল হবে, বরং এটা ছিল তাদের দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন।
১৯৪৭ সনের দেশ বিভক্তির সময় বংগ-ভংগের ইচ্ছা ভারতীয় কংগ্রেসী নেতৃবৃন্দের মধ্যে মোটেও ছিল না। তারা সমগ্র বাংলাকেই পেতে চেয়েছিলেন ভারতের সংগে, কিন্তু মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ চেয়েছিলেন ‘বাংলাকে’ একটি পূর্ণ স্বাধীন দেশ হিসেবে দেখতে যা হবে কমনওয়েলথভুক্ত একটি স্বাধীন রাজ্য। শেরেবাংলা জনাব এ,কে, ফজলুল হক, জনাব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেবরাও ছিলেন ঐ ধরনেরই স্বাধীন বাংলা রাজ্যের পক্ষে। কিন্তু বাধ সাধলেন কিছু কংগ্রেসী নেতৃবৃন্দ বিশেষ করে শ্রী প্যাটেল বাবু এবং দেশ বিভক্তির একান্ত শেষ মূহূর্তে অজানা কারণে অবশেষে পূর্ববংলা পশ্চিম বাংলা থেকে বিভক্ত হয়ে নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের সংগে শামিল হয়ে পূর্ব পাকিস্তান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এ রকম একটি নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়েই জাতি ঐতিহাসিক ভাবে দ্বিখন্ডিত হয়ে পড়ে মুসলিম প্রধান পূর্ববাংলা এবং হিন্দু প্রধান পশ্চিম বাংলা হিসেবে। বাঙালী মুসলমান এবং বাঙালী হিন্দুর মধ্যে ধর্মের তারতম্য থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেই একে অপরের অনেক কাছাকাছি ছিল। যদিও বা উভয়েরই সাংস্কৃতিক ধ্যান-ধারনার উৎসস্থল ছিল ভিন্ন। ১৯৪৭ সনের দেশ বিভক্তির মধ্য দিয়ে যে ঐতিহাসিক ছেদ ঘটানো হলো তার সাময়িক অবসান ঘটলো ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। তার বড় প্রমাণ লক্ষ লক্ষ শরণার্থীকে পশ্চিম বাংলায় অনায়াসে নিরাপদ আশ্রয় প্রদান। পশ্চিম বাংলার বাঙালী জনগণের প্রাণঢালা আন্তরিকতা, আতিথেয়তা এবং ভালবাসা স্নেহাশীলা মায়ের কোলকেই কেবল স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।
পশ্চিম বাংলার আনাচে-কানাচে তাই গড়ে উঠেতে পেরেছে শত শত ট্রেনিং শিবির, অসংখ্য শরণার্থী শিবির। রাস্তা-ঘাটে, হাটে-বাজারে, বাগানে বাগানে, বাড়ীর বারান্দায় পর্যন্ত ভীড় জমেছে শরনার্থীদের। মুক্তিযোদ্ধা এবং শরনার্থীদের সকল ধরনের অত্যাচর নীরবে এবং হাসিমুখে সয়েছে পশ্চিম বাংলার বাঙালী জনগণ। মানবতার এই অপূর্ব নিদর্শন ছিল তুলনাহীন। পশ্চিম বাংলার বাঙালীদের এই মমতাভরা সাহায্য- সহযোগিতার অবর্তমানে মুক্তিযুদ্ধা এবং লাখো শরণার্থীরা আদৌ ভারতে আশ্রয়গ্রহণ করে টিকে থাকতে পারত কিনা আমার সন্দেহ।
বাংলাদেশের স্বাধীন সরকারের প্রথম অফিস ছিল এই পশ্চিম বাংলারই কোলকতা নগরীর ৮ নম্বর থিয়েটার রোড এবং এখানেই প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের হেড কোয়ার্টার। পশ্চিম বাংলার বর্ডারে বর্ডারে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং শিবির। আর্থিক, নৈতিক, সামাজিক, মানসিক এবং সংস্কৃতিক দিক দিয়ে প্রতিনিয়ত সাহায্য-সহযোগিতার মধ্য দিয়ে পশ্চিম বাংলার রাজ্য সরকার এবং জনগণ বাঙালীর মুক্তিযুদ্ধকে বিশেষভাবেই করেছে অনুপ্রাণিত। স্বাধীন বাংলা সরকার ঘোষণা করার সাথে সাথেই তো আর সরকার প্রতিষ্ঠা লাভ করা যায়নি। প্রকৃতপক্ষে ১৯৭১ সনের জুন মাসের পূর্ব পর্যন্ত ‘স্বাধীন বাংলা’ সরকারের কোন নির্দিষ্ট অফিস পর্যন্ত ছিল না। জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের দিকে ৮ নম্বর থিয়েটার রোডে অবস্থিত ভারতীয় বি,এস, এফ এর অফিস খালি করে জনাব তাজউদ্দিন গঠিত মন্ত্রিসভাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বসার সুযোগ করে দেয়া হয়। এর পূর্বে এই মন্ত্রিসভার মাননীয় সদস্যবৃন্দকে আমি দেখেছি আনুমানিক ৫৬/এ, বালিগঞ্জে অবস্থিত একটি দোতলা বাড়ীর দোতালায় মেসে ভাড়া থাকা বেকার যুবকদের ন্যায় গড়াগড়ি করতে এবং তাস খেলতে।
এসব কথা বলতে গেলে আর একটু পেছনে যেতে হয়। বরিশালের বিভিন্ন অঞ্চল সহ আমার সেক্টরের প্রত্যেকটি জায়গায় মুক্তিযুদ্ধাদের জন্য ট্রেনিং ক্যাম্প চালু করা শহর প্রতিরক্ষার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থাদি সহ মোটামুটি প্রস্তুতি গ্রহনের পর্ব প্রায় শেষ। কিন্তু অস্ত্রের দিক দিয়ে যে দুর্বলতা ছিল তা পর্বত প্রমাণ। কিছু কিছু পুরানো ধাঁচের থ্রি নট থ্রি রাইফেল, কিছু স্টেনগান এবং গ্রেনেড ছাড়া আমার কাছে তেমন আর কিছুই ছিল না। কেবল মনোবল এবং মানসিক প্রস্তুতিই যুদ্ধের জন্যে যথেষ্ট নয়, সাথে সাথে আধুনিক সমর অস্ত্রও যুদ্ধ জয়ের জন্য অত্যাবশ্যকীয়। অস্ত্র সংকট আমকে সব সময়েই ভাবিয়ে তুলত। তাই সমগ্র ৯ নং সেক্টরকে কয়েকটি সাব সেক্টরে বিভক্ত করে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা চালু রেখে আমি একুশে এপ্রিল কয়েকটি মোটর লঞ্চ সহকারে সুন্দরবনের পথ ধরে ভারতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করি। প্রধান লক্ষ্যই ছিল ভারতরে কাছ থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করা। বরিশাল সদর থেকে নির্বাচিত জনপ্রিয় সংসদ সদস্য(প্রাদেশিক) জনব নুরুল ইসলাম মঞ্জুর ইতিপূর্বেই পশ্চিমবংগ ঘুরে বরিশালে ফেরত এসে আমাকে জানালেন যে, লেঃ জেনারেল অরোরা ভারতের পূর্ব অঞ্চলীয় সর্বাধিনায়ক এবং তিনি মু্ক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বাঙালী সামরিক অফিসরের কাছে অস্ত্র সাহায্য প্রদান করতে প্রস্তুত আছেন। এই তথ্র লাভের মাত্র ১ দিন পরই আমি কিছু মু্ক্তিযুদ্ধা সহকারে ভারত অভিমুখে রওয়ানা হয়ে প্রথমে পৌঁছি পশ্চিম বাংলার বারাসাত জেলার হাছনাবাদ বর্ডার টাউনে। ঐ অঞ্চলের বি.এস.এফ-এর কমান্ডার লেঃ কমান্ডার শ্রী মুখার্জীর সংগে হয় প্রথম আলোচনা। কমান্ডার মুখার্জী অত্যন্ত সুহৃদ বাঙালী অফিসার। তিনি সর্বান্তকরণেই্মাকে সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে সরাসরি লেঃ জেনারেল জগজিৎ শিং অরোরার কাছে নিয়ে গেলেন। কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে তার হেড কোয়ার্টার। তিনি আমাকে প্রথম সাক্ষাতেই সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাস করতে পারলেন না। সাক্ষী-প্রমাণ দাব করলেণ আমার। তখনই আমাকে সদ্য ঘোষিত স্বাধীন বাংলা সরকারের প্রধান মন্ত্রী জনাব তাজউদ্দিন এবং সর্বাধিনায়ক কর্নেল ওসমানী সাহেবের নাম নিতে হয়েছ্ উত্তরে জেনারেল অরোরা সাহেব আমাদের নেতৃবৃন্দ সম্পর্কে যা বাজে মন্তব্য করলেন, তা কেবল ‘ইয়াঙ্কী’দের মুখেই সদা উচ্চারিত হয়ে থাকে। সোজা ভাষায় তার উত্তর ছিল ‘ঐ দু’টা ব্লাডি ইঁদুরের কথা আমি জানি না, ওদের কোন মূল্য নই আমার কাছে। অন্য কোন সাক্ষী থাকলে আমাকে বলো’।
মহা মুশকিল দেখছি! এই ভারতের মাটিতে আমার মত একটা নাম না জানা তরুণ মেজরকে কোন দুঃখে কেউ চিনতে যাবে? ব্যাটা বলেটা কি? আমার স্বাধীন বাংলায় প্রথম প্রধানমন্ত্রী এবং সেনাবাহিনীর প্রথম সর্বাধিনায়ক শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিদের সম্পর্কেই যে ব্যক্তি এরূপ কদর্য উক্তি করতে ছাড়েননি, তিনি আমার মত চুনোপুঁটিদের যে কি চোখে দেখবেন, তা অনুধাবন করতেই একটা অজানা আতঙ্কে আমার সর্বাংগ শিহরিয়ে উঠল। অমনি আমি জেনারেল অরোরনকে অতি স্পষ্ট ভাষায় একজন বিদ্রোহীর সুরে জানিয়ে দিলাম যে, আমার অস্ত্রের কোনই প্রয়োজন নেই, আমি শূন্য হাতেই দেশের অভ্যন্তরে ফিরে গিয়ে যুদ্ধ করতে করতে মৃত্যুবরণ করব তবু তার কাছে আর অস্ত্রের জন্য আসব না। আমার এই বিদ্রোহী ভূমিকায় জেনারেল রীতিমতন চককে উঠেন এবং আমাকে জিজ্ঞাসাবাদরে জন্য তার সিকিউরিটি এবং ইনটেলিজেন্স-এর লোকদের কাছে হাওয়ালা করেন। চারদিন বন্দী অবস্থার মধ্য দিয়ে আমাকে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় বিশেষ করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করাই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য। আমার দ্রুত মুক্তি এবং মুক্তিযুদ্ধের জন্য অস্ত্র সংগহ করার লক্ষ্যকে সামনে রেখেই আমি পাকিস্তান সেনাবাহিনী সম্পর্কে কিছুটা তথ্য প্রদান করি। পূর্ব অঞ্চলের ‘চীফ অফ স্টাফ’ জেনারেল জ্যাকব আমার দেয়া তথ্য বিশেষ প্রয়োজনীয় মনে করেন এবং আমাকে যে কোন ধরনের অস্ত্রপাতি জোগান দেয়ার আশ্বাসও প্রদান করেন। এভাবে কোলকাতার সেই বৃটিশ রচিত দুর্গফোর্ট উইলিয়ামের অন্ধকুপ থেকে আমি মুক্তি পেয়ে জনাব তাজউদ্দীন সাহেবের সাথে সাক্ষাৎ করতে যাই।
দেশের সাধারণ শান্তিপ্রিয় জনগণকে হিংগ্রদানবের মুখে ঠেলে দিয়ে কোলকাতার বালিগঞ্জের আবাসিক এলাকার একটি দ্বিতল বাড়ীতে বসে প্রধানমন্ত্রী তার মন্ত্রিসভা সহকারে (খন্দকার মোশতাক আহমদ বাদে)নিরাপদে তাস খেলছিলেন দেখে আমি সে মুহূর্তে কেবল বিস্মিতই হইনি, মনে মনে বলছিলাম ‘ধরণী দ্বিধা হও’। ধরণী সেদিন দ্বিধা না হলেও আমি কিন্তু সেদিন থেকেই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের প্রতি চরমভাবে আস্থাহীন এবং বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছি। এর ফলাফল ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্য মংগলজনক না হলেও, আমি আমার সকল ক্ষতিকে নীরবে মাথা পেতে নিয়েই আওয়ামী লীগের এই দায়িত্বহীন, উদাসীন এবং সৌখীন মেজাজসম্পন্ন নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আপোসহীণ সংগ্রাম অব্যাহত রাখঅর জন্য অংগীকারাবদ্ধ হয়ে পড়েছিলাম। দেশ ও জাতির স্বার্থে বাস্তবেও আমি করেছি তাই। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসই তার সাক্ষী। যে জাতির নির্বাচিত প্রতিনিধিবৃন্দ জনগণকে যুদ্ধের লেলিহান শিখার মধ্যে নিক্ষেপ করে কোন নিরাপদ আশ্রয়ে বসে বেকার, অলস যুবকদের মত তাস খেলায় মত্ত হতে পারে, সে জাহির দুর্ভাগ্য সহজে মোচন হবার নয়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহিসে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের আচরণে এ ধরনের ভুরি ভুরি নমুনা রয়েছে। যুদ্ধকালীন অবস্থায় তাদের আরাম-আয়েশী জীবনধারা কোলকাতাবাসীদেরকে করেছে হতবাক।
ব্যক্তিজীবন পদ্ধতিতে সীমাহীন ভোগ-লালসার কারণেই আশ্রয়দানকারী ভারত কর্তৃপক্ষ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের দুর্বলতা সমূহ অতি সহজেই নির্নীত করে নিয়েছে এবং তাদের ভোগ-বিলাসে কোনরূপ বাধা প্রদান করা থেকে বিরত থেকেছে। এ ব্যাপারে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের ঔদার্য আমাদের মু্ক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে উত্তরোত্তর কলংকময় করে তুলতে সহায়তা করেছে। অপরদিকে , কোলকাতার ৮নম্বর থিয়েটার রোড স্বাধীন বাংলাদেশের অফিস থাকলেও ক্ষমতার সকল উৎসই ছিল ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। স্বাধীনতা যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক কর্নেল ওসমানী সাহেব একজন ‘সম্মাতি বন্দীর’ জীবন যাপন করা ব্যতীত আর তেমন কিছুই করার সুযোগ ছিল না তার। সেক্টর পরিদর্শন করা তো দুরেরই কথা তার তরফ থেকে লিখিত নির্দেশও তেমন কিছু পৌঁছতে পারেনি সেক্টর কমান্ডারদের কাছে।
ভারতীয় কর্তৃপক্ষ মুক্তিযোদ্ধাদেরকে অস্ত্র সরবরাহ করার আগ্রহ প্রদর্শন যা করেছে তার তুলনায় অধিকতর উৎসাহ এবং আগ্রহ প্রদর্শন করেছে তথ্য সংগ্রহ করার ব্যাপারে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধাদের হাতে অস্ত্র প্রদান নয়, পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং বাংলাদেশ সম্পর্কে জরুরী তথ্য সংগ্রহই ছিল যেন ভারতীয় কর্তৃপক্ষের মূল উদ্দেশ্য। তাদের এ ধরনের আচরণই তাদের গোপন লালসা পূরণের ‘নীল নকশা’ তৈরী করার ইংগিত প্রদান করেছে। আমার এ সন্দেহ সত্য বলে প্রমাণিত হতে খুব বেশী সময়ের প্রয়োজন হয়নি।
ডাউনলোড লিঙ্ক ►
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×