আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে
আসে নাই কেহ অবণী পরে
সকলের তরে সকলে আমরা
প্রত্যেকে আমরা পরের তরে
এ মূলমন্ত্রকে সযতেœ লালন করে নিঃস্বার্থভাবে আলো জ্বেলে চলেছেন শারীরিক বাধা বিপত্তিকে জয় করে এক মহান মানুষ্।
সেই মহান মানুষটিকে খুঁজে পেতে কোন বেগই পেতে হলনা। সাধ অনেক কিন্তু সাধ্য নেই আবুল কালামের। ছোট বেলায় মানুষের বাড়িতে কাজ করতে গিয়ে পক্ষাঘাত প্রাপ্ত হয়ে শরীরের একাংশ অবশ হয়ে যায়, যা আজও সেই অভিশাপের মত বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছেন। তবে তিনি সমাজের অন্যান্য প্রতিবন্ধীদের মত সমাজে বোঝা হয়ে থাকেননি বরং পরিণত হয়েছেন সম্পদে।
মুক্তিযুদ্ধের পরই ভাগ্য অণে¦ষেেন গ্রামের বাড়ি মানিকগঞ্জ ছেড়ে চলে আসেন ঢাকার মিরপুরে। খুলে বসেন ছোট্ট একটি চায়ের দোকান। সেখানে বসেই জাগে বিচিত্র এক নেশা ,সংবাদ সংগ্রহ। তার পর আর কøান্তি কিংবা অবসন্নতাভর করেনি দেহ-মনে। আবুল কালামের । আজ ২৫ বছর ধরে বিবিসির সংবাদ রেকর্ড করে চলেছেন। জীবন বাঁচানোর তাগিদে চা বিক্রিকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তবে আবুল কালামের চায়ের দোকান আর শুধু চায়ের দোকান থাকেনি, পরিনত হয়েছে সংবাদ প্রেমীদেরও আড্ডাখানায়। বিবিসি সহ যে কোন চ্যানেলের সংবাদ শুনতে মিরপুরের এমনকি দুরদূরান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ আসেন কালামের চায়ের দোকানে। কখনও কখনও সংবাদপ্রেমীদের ও ভিড় সামলাতে হিমশিম খান আবুল কালাম।
আজ থেকে ৩০ বছর আগে যখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৫ বুছর তখন থেকেই তিনি শুরু করেন সংবাদ সংগ্রহের কাজ । বর্তমানে তার কাছে রয়েছে দেড় হাজার ক্যাসেটের বিশাল সংগ্রহ, যার সবই দুর্লভ এবং ঐতিহাসিক বিষয়। আবুল কালামের দুর্লভ সংগ্রহের মধ্যে রয়েছে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭-ই মার্চের ভাষণ,স্বাধীনতার ঘোষনা, শহীদ চার নেতার ভাষণ , ১৭ এপ্রিলের প্রবাসী সরকারের শপথ, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রথস ৬ মাসের খবর, ভাসানীর ফারাক্কা যাত্রার সংবাদ,বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ভাষণ,১৯৭৫ এ বঙ্গবন্ধু হত্যার ধারাবাহিক সংবাদ,¯া^ধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত সংবাদসহ স্বাধীনতা যুদ্ধেও নানা রকম গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এছাড়া বিশ্ব নেতৃবৃন্দের মধ্যে রয়েছে মার্গরেট থ্যাচার ,টনি ব্লেয়ার, ইয়াসির আরাফাত, হুসনি মোবারক ,কফি আনান, ফিদেল ক্যাস্ট্রো, বিল কিøনটন, গাদ্দাফী, নেলসন ম্যান্ডেলা জার্মান গ্রেগ সহ আরো অনেকের ভাষণ । আবুল কালামের এই সংগ্রহের কথা শুনে তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধান ২০০০ সালে ৫০০ ক্যাসেট সংগ্রহের জন্য নিয়ে গেছে । এজন্য আবুল কালাম কে ‘১০০০০ টাকাও দিয়েছিল। এ টাকা দিয়ে আবুল কালাম মুক্তিযোদ্ধার পিতার নামে আব্দুস সালাম ফাঊন্ডেশন গঠন করে গণশিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেন। যার প্রধান উদ্দেশ্য পথশিশুদের শিক্ষার আলো দান করা । এ প্রসঙ্গে আবুল কালাম বলেন, সমাজের পথশিশু দের যদি সুযোগ সুবিধা দিয়ে মানুষ করা যায় তবে ূসমাজে অপরাধের মাত্রা অনেক কমে যাবে। বর্তমানে আবুল কালামের গণশিক্ষা স্কুলে ৪০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। তবে ভাড়া করা বাসায় পরিচালিত এ স্কুলের ভাড়া পরিশোধ করতে না পারায় গত মাস থেকে ষ্কুলটি বন্ধ হয়ে গেছে। তবে তিনি জানালেন ভিক্ষা করে হলেও তিনি এ স্কুলটি চালু করবেন।
টোকাই শিশুদের পড়ানোর পাশাপাশি তিনি গড়ে তুলতে চান একটি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র যেখানে শিশুরা বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেকে দক্ষ করে গড়ে তুলবে । আবুল কালামের মতে এভাবেই গড়ে উঠবে আমাদের স্বপ্নের সোনার বাংলা।
অনেক সময় কাটালাম আবুল কালামের সাথে। ইচ্ছে হচ্ছিল এমন মানুষের সাথে আরেকটু সময় কাটানোর কিন্তু সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে । বিদায় নিয়ে আসার সময় মনের পর্দায় বারবার ভেসে উঠছে কেবল দারিদ্র্র্যের সাথে যুদ্ধ করা একজন সাদা মনের মানুষের মুখ। যিনি তার অর্থাভাবে তার নিজের সন্তানের লেখাপড়া বন্ধ করে দিলেও পথশিশুদের জন্য তার স্কুলটি চালু রেখেছেন! সেই সঙ্গে আজ নিজের কাছেই ছোট হয়ে গেলাম । আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল কে আসল প্রতিবন্ধী!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


