পড়ন্ত বিকেল।
নদীর পাড়ে একা দাঁড়িয়ে আছে একটি ছেলে। গোধুলীর আবির রংয়ে লাল ওর মুখটা। শরীরে শতছিন্ন কাপড়, তাতে ধুলো। ডুবন্ত সূর্যের দিকে তাকিয়ে আছে সে।
নদীর অন্য পাড়ে মেয়েটি। এলোমেলো বাতাসে চুল উড়ছে তার, উড়ছে শাড়ির আঁচল। কিন্তু এ কি? ওর চোখে শুকিয়ে যাওয়া কান্নার দাগ!!
ছেলেটি অবাক হয়। ভাবে, বিকেলের ওই রঙ্গীন সূর্যের মত আমি কি রাঙ্গিয়ে দিতে পারি না ওর মন?
মেয়েটি ভাবে, নদীর ওইপাড়ের মানুষটা অন্ধ। সে জানে না তাদের দুইজনের মাঝে খরস্রোতা নদী, এ পাড়ি দেবার সাধ্য ছেলেটির নেই।
মেয়েটির চোখে কি খেলছে অবিশ্বাস? একবার আহবান শুধু শুনতে চায় ছেলেটি, তাতেই পাড়ি দিতে রাজি আছে ও এই উত্তাল ঢেউ......শুধু একটি ডাকের অপেক্ষা...
মেয়েটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে। একরাশ হতাশা এসে ঘিরে ধরে তাকে। তার চোখ তো মিথ্যে বলতে পারে না, ও চোখের চাহনি শরতের আকাশের মত স্বচ্ছ। কিন্তু হায়! আজো কেন ওই মূর্খ বোঝেনি এ চোখের ভাষা?
ছেলেটি ভাবে, মাঝখানের এই নদীর দুরত্ব কি আড়াল করতে পেরেছে এ আকুতি? এই জলের ওপরে রংধনুর খেলা কি ছেলেটির দৃষ্টি সরিয়ে নিচ্ছে মেয়েটির সজল চোখ থেকে? কেন মেয়েটি একটিবার মুখ ফুটে বলছে না, ‘এসো প্রিয়’?
মেয়েটি প্রাণপণে খুঁজছে একটু আশ্বাস, একফোঁটা শান্তির স্বপ্ন ছেলেটির চোখে, যা তাকে শুধু নদী কেনো, সাগর পাড়ি দেবার উদ্যম এনে দেবে, কিন্তু......ওই চোখ কেন ভাষাহীন?
সত্যিই কি ভাষাহীন? সত্যিই কি ওই চোখে নেই ভালোবাসার স্বপ্ন? হয়তো পৌরুষ অপেক্ষা করে আছে একটি স্পর্শের, যার ছোঁয়ায় জেগে উঠতে পারে ছেলেটির আহত হৃদয় ...... কী নিয়ে সংশয় মেয়ে তোমার?
বুক ফাটলেও মুখ ফোটে না মেয়েটির। কিন্তু ছেলেটি? সে কেন কিছুই খেয়াল করতে শেখেনি? কেন অনুভূতির কোন দাম দেয় নি? কেন উচ্ছ্বাসের পেছনে ছুটতে গিয়ে একবার ফিরেও তাকায়নি, কেন?
অনুভূতির দাম দেবার জন্য কতকাল ধরে উদগ্রীব হয়ে আছে ছেলেটি, কেন অবুঝ মেয়ে বোঝেনা এসব? উচ্ছ্বাসের পেছনে ছুটতে গিয়ে যে আঘাত পেয়ে ফিরে এসেছে সে, তা থেকে সেরে উঠতে কি মেয়েটি সাহায্য করতে পারে না?
অনুভূতিগুলো একটু আশ্রয়ের খোঁজে কেঁদে ফিরে গেছে বারবার, মেয়েটি আজ কোথায় খুঁজবে তাদের? বড্ড বেশি দেরী হয়ে গেছে আজ, সময়ের প্রয়োজনে আজ সবকিছু হয়ে উঠেছে আরও নির্মম আর কঠিন। ছেলেটির আহত মনকে শক্তি দেবার সামর্থ্য আজ কোথায় পাবে মেয়েটি?
তাহলে? শুকনো চোখের জলের দাগ গালে নিয়ে মেয়েটি কি দাঁড়িয়েই থাকবে? ছেলেটি যদি ওই ডাক শোনার জন্য সব ফেলে ছুটে আসতে পারে, তবুও কি মেয়েটি নির্বাক চেয়ে থাকবে?
শুকনো চোখে নির্বাক তাকিয়ে থাকাই মেয়েটির নিয়তি, এ নিয়তি বজ্রের আলোর মত পরিষ্কার, বৃষ্টির জলের মত স্বচ্ছ। ভালোবাসার অন্তহীন দড়ি টানাটানি খেলায় মেয়েটি আজ নিঃস্ব, তার অনুভূতিগুলো পরাজিত। কী দিয়ে সে ছেলেটিকে দেবে স্বান্তনা? কী দিয়ে সারিয়ে তুলবে ক্ষত?
ভাবছেন কী আছে এই সংলাপের শেষে?
...
...
...
কিছুই নেই।
(শেষ দৃশ্যের চিত্রকল্প নতুন কিছু নয়, এ গল্পের শুরু যেখানে, সেখানেই। সেই একই নদীর পাড়, সেই একই উদ্দাম স্রোত, সেই একই গোধূলীবেলা, সেই ডুবন্ত সূর্য, এক পাড়ে ছেলেটি, আরেক পাড়ে মেয়েটি। মাঝে কিছু সময় পার হয়েছে। সেই সময়টুকু পালটে দিয়েছে অনেক কিছুই।
ছেলেটির হৃদয়-ক্ষতের ওপর সময় টেনে দিয়েছে ব্যথাহীনতার আস্তরণ। তার অনুতাপগুলো ততটা তীব্র নয় আর। সে পা বাড়ায় নতুন জীবনের পথে, যে জীবনে আসবে কোন নতুন ভালোবাসা, যে ভালোবাসা কোন দড়ি টানাটানি খেলা নয়, যে ভালোবাসা স্বপ্ন দেখতে শেখায়, চোখের ভাষা পড়তে শেখায়, অনুভব করতে শেখায়, যে ভালোবাসা কখনো ব্যর্থ হবার নয়...
মেয়েটি দাঁড়িয়ে থাকে একা। তার সজল চোখ একসময় শুকিয়ে আসে। ভালোবেসে যে ভুল সে করেছে তার বোঝাও আস্তে আস্তে হাল্কা হয়ে আসে। সাঁঝবেলার বর্ণীল আকাশের মায়াবী সৌন্দর্যকে একসময় ঢেকে দেয় রাতের অন্ধকার। মেয়েটিও ফিরে আসে তার নিজের ঠিকানায়।)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

