ক্লাস শুরু হতে আর বেশী সময় নেই।সবাই ক্লাসে বসে আছে আর আমি বাইরে চারদিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি।অপেক্ষা করতে আর ভাল লাগছে না।আজ কি সে আসবে না?হতাশ হয়ে ক্লাসে ঢুকলাম।কিন্ত বসব কোথায়?পুরো রুম ভর্তি।শুধু ডান পাশে মেয়েদের বসার পেছনের ব্রেঞ্চ ফাঁকা কিন্ত ওখানে তো বসা যাবে না। হাসাহাসি করবে সবাই।শেষে ফাঁকা ব্রেঞ্চের ঠিক পেছনের ব্রেঞ্চে চাপাচাপি করে বসলাম।কিন্ত তাতেও রক্ষে নেই,পেছন থেকে একজন একটা মন্তব্য করেই বসল।ক্লাসে মনোযোগ দিতে পারছি না।বন্ধুদের সাথে চাপা গলায় কথা বলছি আর দরজার বাইরে মাঠের দিকে তাকিয়ে আছি।হঠাৎ চোখ দুটো বড় হয়ে গেল।বুকের ভিতর ঢিবঢিব শব্দ হচ্ছে।আমাদের ক্লাস রুম থেকে কলেজ গেটটা দেখা যেত।চোখ পড়তেই দেখি রিক্সা থেকে সে নামছে।হলুদ রঙের জামা পড়েছিল সেদিন।বড় বড় চুল খুলে রেখেছিল পিঠের ওপর।হাতে খাতা বই নিয়ে আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে।যেন কোনো মানুষ নয় অন্য কিছু।সুন্দরের ব্যাখ্যা জানা থাকলে তার পরিচয়টা দেয়া সহজ হতো। নিরুপায় আমি নিষ্পলক দেখছিলাম শুধু।রুমে ঢুকে সে দ্বিধান্বিত,কোথায় বসবে?শেষে ঐ ফাঁকা ব্রেঞ্চে বসল একা। এক স্বর্গীয় ভাললাগা ছুঁয়ে গেল।স্নিগ্ধ গন্ধের মাদকতায় আমি শিহরিত।অবশ।আমার হাতের কলমটা হঠাৎ পড়ে গেল ওর বসার ডেস্কের উপর।খুব তাড়াতাড়ি কলমটা তুলে হাতে ধরিয়ে দিল।কিভাবে বুঝেছিল কলমটা আমার?আমি তখন স্বপ্নের ঘোরে।
ধরি তার নাম তনু।তনুর কথা অনেক শুনেছি বন্ধু অর্ক’র কাছে।সেটা স্কুলে থাকতে।তনুর বাবা ছিলেন স্কুলের অধ্যক্ষ।ক্লাসমেটরা স্যারের বাসায় পড়তে যেত শুধু তনুকে দেখার জন্য।মজার ব্যপার হচ্ছে অর্ক’র সাথে তনুর খুব ভাল বন্ধুত্ব ছিল।অর্ক তনুর কাছে গিয়ে বলত আমার কথা আর আমার কাছে এসে বলত তনুর কথা।তখন থেকেই তনুকে দেখার খুব ইচ্ছে ছিল।অর্ককে খুব কাছের বন্ধু মনে হতো তখন আমাদের দু’জনের।সে কথা জেনেছি অনেক পরে তনুর মুখে।
স্কুল পেরিয়ে আমরা একই কলেজে ভর্তি হলাম।তনুকে দেখার অপেক্ষায় ছিলাম।ওকে দেখলাম আমাদের নবীন বরণ অনুষ্ঠানে।গোলাপী রঙের শাড়ি পড়ে নেচেছিল সেদিন।ভাললাগাটা বোধহয় দ্বিগুন হয়ে গিয়েছিল সেদিন।কিন্ত আশ্চর্যজনক কথা সে আমাকে তখনো চিনত না।আমাকে দেখেছে এমনকি দু একটা কথাও হয়েছে ঐ নাচের অনুষ্ঠানের পর কিন্তু সে আমাকে অন্য নামে চিনত।নিজেকে লুকিয়ে তনুর সাথে কথা বলতাম।সে বুঝতে পারেনি।তবে বেশী দিন ঐ ভাবে থাকা সম্ভব হয়নি।একদিন ক্লাসে স্যার নাম ধরে ডাকলেন।সে চমকে তাকাল আমার দিকে।তাকিয়ে ছিল কিছুক্ষণ।আমি তাকাতে পারিনি ঐ দু’চোখে।এক ভয়ঙ্কর সুন্দর আমাকে গ্রাস করে ফেলছিল ঠিক বুঝতে পারছিলাম।
দু’দিন স্যারের বাসায় পরতে যাই নাই।তৃতীয় দিন গেলাম কিন্ত বাইরে বসে ছিলাম।পড়া শেষে সে বের হয়ে এল।জানতে চাইলাম আজ কয়টা ক্লাস হয়েছে।উত্তরে সে যেন কি বুঝিয়ে দিল আমাকে।কথা আটকে যাচ্ছিল বারবার।তবে কী তনুর আমার মতোই সব কিছু অন্য রকম মনে হচ্ছে?এই দিনগুলো কী তনুর খুব বর্ণিল মনে হচ্ছে?তাকেও কী কোনো বিষণ্ন দুপুর এলোমেলো করে দিচ্ছে?শেষ বিকেলের আবছা নীল আলোয় তারও কী আমার কথা মনে পড়ে?তারও কী সারারাত নিয়নের আলোয় হেঁটে বড়াতে ইচ্ছে করে?উত্তর পেয়ে গিয়েছিলাম।স্যারের বাসায় ঠিক দুপুরে একা পড়তে গিয়েছি।রুমে ঢুকেই দেখি তনু বসে আছে।পুরো একটা রুমে তনু আর আমি একা।কথা চলছিল লেখাপড়া নিয়ে,পরীক্ষা নিয়ে,বন্ধু অর্ককে নিয়ে।স্যার আসার ঠিক আগে জানাল আগামীকালও যেন ঠিক এ সময়ে আসি।
পরেরদিন ঠিক সময়ে হাজির।দেখি সে বসে আছে।আমাদের কথা এগুতে লাগল।নাচের প্রসঙ্গ এল।আমাদের ভাললাগা,মন্দ লাগা আর কত্ত কী।রবীন্দ্র সংগীত আমার খুব ভাল লাগে বলাতে সে জানিয়ে দিল,যারা রবীন্দ্র সংগীত পছন্দ করে আমি তাদের পছন্দ করি।তারমানে তুমি আমাকে পছন্দ কর?দু’চোখ নিচে নামিয়ে খুব লজ্জ্বা পেয়ে উত্তর দিয়েছিল,হ্যাঁ।
এরপর কেটে গেছে অনেক বছর।বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনে অনেককে দেখেছি,দেখছি কিন্তু সেই পুরোনো আর খুব পরিচিত চোখ আর কোথাও খুঁজে পাই নাই।রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে যদি কখনো দু’চোখ আটকে যায় এ আশায় অনেক অনেক হেঁটেছি।এখনো হাঁটি গভীর রাতে অথবা গভীর দুপুরে।দিনগুলো খুব ভাল কেটে যায় এখনো।বন্ধু,আড্ডা,পড়ালেখা।আমি ভাল আছি সত্যি।তারপরও সেদিনের ঐ হ্যাঁ কথাটির প্রকৃত অর্থ আজও বুঝতে পারিনি।তনুর কাছে আর কখনো জানার সুযোগ হয়নি।সেদিন স্যারের বাসায় যে আমাদের শেষ দেখা এবং শেষ কথা হবে তা কখনো ভাবিনি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



