ইশকপাল
রিফাত ওর কপালকে সবসময় ইশকপাল বলে। সব সাফল্যই ওর কপাল ছুঁয়ে যায়; কিন্তু কখনো কপালে লাগে না। তখন আপনাআপনিই মুখ থেকে বেরিয়ে আসে : ইশ, আমার কপালটাই বুঝি এমন!
লটারিতে সবসময় ওর সিরিয়ালের ঠিক আগেরটা অথবা পরেরটা লেগে যায়। সবগুলো পরীক্ষায় ওর নম্বর পাঁচশো নব্বইয়ের ওপরে। সেনাবাহিনীর সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট পোস্টে মুর্তাজা ওর চেয়ে খারাপ ছাত্র হয়েও টিকে গেলো। কিন্তু ওর হয়নি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কারণে। ভাইভা বোর্ডের সামনে বসে টাই ঠিক করার কারণে না কি ওকে বাদ দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে ইশ বলা ছাড়া আর কীই বা করার থাকে? ঐদিন ছিলো ওর জীবনে দ্বিতীয়বার টাই পরা। প্রথমবার পরেছিলো বড় ভাইদের অনুরোধে সোনারগাঁ হোটেলের একটা মেলার স্টলে কাজ করার কারণে।
তবে একটা জায়গায় এসে ওকে ইশ বলা লাগবে না বলে ওর ধারণা। সেটা হলো নার্গিসকে বিয়ে করার ক্ষেত্রে। রূপ, শরীর, মেধা, গুণ, ব্যক্তিত্ব—সবকিছুই নার্গিসের মধ্যে আছে। রিফাতের চেয়ে হিসাবে কিছু টাকা বেশি বেতন পায় নার্গিস। এরপরও কোনোদিন এমনটা বলতে হয়নি, আজ বৃষ্টি হচ্ছে; ইলিশ-খিচুড়ির অর্ডার দিলে ভালো হতো।
এটা আবার প্রকাশ্যে কখনো স্বীকার করতে যায় না ও। অন্য অনেক পুরুষের মতো ওরও ধারণা হলো এমনটা করলে পরে স্ত্রীর অহঙ্কার বেড়ে যাবে।
বরং নার্গিসই মাঝেমধ্যে মনে করিয়ে দেয় : এটা ভেবো না যে, তুমি পছন্দ করেছিলে বলে বিয়ে চূড়ান্ত পর্যায়ে যাচ্ছে। আমি পছন্দ করেছিলাম বলেই ঘটনা এগুচ্ছে। দেখতে যাওয়ার দিন আমি ‘না’ বললে কি হতো কিছু?
: আমি না বললে হতো বুঝি?
: তুমি কখনো না বলতে পারতে না।
রিফাতও সেটা জানে। তারপরও জেতার জন্য বলে : শোনো হে সুন্দরী, কালো ছেলেদের বৌ বেশিরভাগই সুন্দর হয়; আর সুন্দর ছেলেদের বৌ বেশিরভাগ কালো না হলেও শ্যামলা হয়।
এ কথা শুনেই যে নার্গিস দমে যাবে, এমনটা নয়। কথাটা শুনে রাখবে এবং ঠিক সময়মতো এর জবাবটা দিয়ে দেবে। আর সেই জবাবের উৎস হলো ওর পড়া প্রচুর পরিমাণ বই। এই মেয়ে বেতনের অর্ধেক খরচ করে বইয়ের পেছনে। প্রতিদিন তার সাধারণ মাপের একটা বই শেষ করা চাই।
রিফাত অবশ্য মাঝেমধ্যে খোঁচা মেরে বলে : এত বই পড়ছো, কোনো গবেষণা তো দাঁড় করাতে পারলে না।
: তোমার সংসারে যখন যাবো, তখন আর বই কিনবো না। সেই সময় তুমি কিনে দিও। আমার টাকা দিয়ে শুধু শাড়ি-গয়না কিনবো।
রিফাত চুপ মেরে যায় এ কথা শুনে।
একই ওফিশে চাকরি করার সুবাদে দুজনের কথা বলতে তেমন কোনো সমস্যা হয় না। ইন্টারকমে কথা বললে পাশেরজন শুনে ফেলবে বলে ডেস্কটপ শেয়ার করে নীরব কথাবার্তা চালায় ওরা। সেটাও অবশ্য বেশিক্ষণ চলতে পারে না। নার্গিস বলে ফেলে : এখন এত কথা বললে তো সব কথা ফুরিয়ে যাবে।
: এখন কথা না বললে আর কথা বলার সময় হবে না কি? তখন তো সবই হবে সংসারের সাধারণ কথা।
: এখন কি খুব অসাধারণ কথা বলছো?
: অসাধারণ না হলেও দরকারী।
: তোমার দরকার নিয়ে তুমি থাকো। আমার আরো দরকারী কাজ আছে। কেটে দিলাম কানেকশন।
: আরে শোনো শোনো। আসল কথাটাই বলা হয়নি। ভাইয়া আমাকে বলেছেন কার্ড করতে। একই ডিজাইন হবে দুই কার্ডের। আমি চাচ্ছি তুমি ডিজাইনটা পছন্দ করে দাও।
বড় ভাই সিফাত রিফাতের চেয়ে ছয় ঘণ্টার বড়। জন্মের পর থেকেই ওদের আব্বা-আম্মা দুই ছেলের জন্য সব আয়োজন করেছেন একই ধরনের। বিয়েটাও তাই একই দিনে হচ্ছে। একই সময়ে, একই বৈঠকে।
কাজী যখন লেখা শেষ করে ফেলেছেন প্রায়, ঠিক সেই মুহূর্তে হৈ চৈ বাধালেন নার্গিসের ছোট মামা। তিনি জানিয়ে দিলেন, রিফাতের কাবিননামায়ও সিফাত লেখা হয়েছে।
সবাই বললো : এটা তো কোনো ব্যাপার না। একটা অক্ষর কেটে ঠিক করে নিলেই চলবে।
কিন্তু সই করানোর জন্য কাবিননামা নার্গিসের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো, তখন নার্গিস কলমটা ছেড়ে দিয়ে মৃদু কিন্তু অনড় উচ্চারণে বললো : না।
হৈ চৈ আরো বেড়ে গেলো। নার্গিসকে বোঝানোর জন্য সবাই উঠেপড়ে লাগলো। কিন্তু রিফাত জানে, এই ‘না’ কখনো ‘হ্যাঁ’ হওয়ার নয়।
রিফাত এই প্রথম নিজের জন্য ‘ইশ’ শব্দটা উচ্চারণ করলো না।
অপরিপক্কতা মার্জনীয়। পরিমার্জিতভাবে ঢাকা ডাইজেস্টে প্রকাশিত হয়েছিলো। কিন্তু সেই কপি আমার কাছে নেই। পুরনো কাগজপত্র ঘেঁটে এই খসড়া পেলাম।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


