কেমন আছেন?? .... এই বলে ম্লান হেসে দুহাত জড়োকরে নমস্কার করলো অনুরাধা ..........
অনুরাধা , এককালে বিশ্ববিদ্যালয়ের তুখোড় ছাত্রী ........ এখন ----
পঙ্গু বাবার চিকিৎসার টাকা যোগার করতে হন্যে হয়ে চাকরি খুজেঁ ,
ওর শুকনো মুখের ম্লান হাসি বলে দেয়, আজও ওর সকালটা না খেয়ে কেটেছে ।
বিকেলে দেখা হয় সোহেলের সাথে
সেই পুরাতন প্যান্ট , শুকনো গায়ের সাথে লেপ্টে থাকা আধময়লা গেন্জি
মুখে খোচা খোচা দাড়ি...........
আমায় দেখে যেন ওর মিইয়ে যাওয়া বুকে ধপ করে আগুনের মতো আশা এসে ভর করে
.''......... দোস্ত পঞ্চাশটা টাকা ধার দে ...... খুব দরকার
সামনের মাসে চাকরিটা হয়ে গেলেই সব একসাথে শোধ করে দেব ......''
আমি ভাবলেশহীন মুখে মানিব্যাগ বের করি
যদিও জানি সোহেলের চাকরি কোনদিন হবেনা .............
ছোটবোন আর মায়ের সংসারটা ওকে আরো বহুদিন এভাবেই টেনে নিয়ে যেতে হবে ...........
রাত এলে শহরের উচুঁ উচুঁ প্রাসাদের মতো দালানগুলো কুৎসিত নীলচে আলোয় জেগে ওঠে
আর সেই নীল রক্তের আহ্বান আমায় টেনে নিয়ে যায় কোন গভীর থেকে গভীরতর নিষিদ্ধ আনন্দের দিকে
বুড়ো দারোয়ানটা আমায় পথ দেখিয়ে দেয়
বস্তির নোংরা আবর্জনা ছাপিয়ে নাকে ভেসে আসে দেশি মদের গন্ধ
তড়িঘড়ি পা চালিয়ে একছুটে আমি তরুবালার ঘরের দরজায় কড়া নাড়ি
দুটো শুকনো ফর্সা হাত দরজা খুলে দেয়
ভেতরে টিমটিমে হারিকেনের চিমনিটা গতকালের চেয়েও কালো হয়ে গেছে
দেয়ালে দুটো নতুন হিন্দি সিনেমার পোস্টার এসে লেগেছে '
তরুবালার চোখের নীচের কালচে রঙটা আরও একটু গাঢ় হয়েছে .........,
সে চোখে কাম নেই , ঘৃনা নেই , ভালোবাসা নেই ...... বরং কেমন যেন একধরনের নির্লিপ্ততা ...............
আমি তা আর সহ্য করতে পারি না .........
দুহাতে দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে আসি
পেছন থেকে তরুবালার শীর্ন হাতদুটো আমার শার্টের কলার আকড়ে ধরে
.''.......... যাবেন না ........ তাহলে যে আজও আমার বুড়ো মা টা না খেয়ে থাকবে .............. ''
আমি কোনও কথা না বলে ওর দিকে বিশটা টাকা ছুড়ে দেই ..........
এই সেই তরুবালা ,
যার মাকে একাত্তরে নরপশুরা একমাস আটকে রেখেছিল ........
অত:পর এই পল্লী ভিন্ন পৃথিবীর অন্য কোথাও যার জন্য একটুকরো আশ্রয় ছিলনা .........
......... সোহেল , যার মুক্তিযোদ্ধা বাবাকে ব্রক্ষ্মপুত্রের পাড়ে বদর বাহিনী কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে মেরেছিল , অত:পর তার দেহটা গন্জের হাটে ঝুলিয়ে রাখে তিনদিন ...........
অথচ তার ছেলে আজ সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি একটা চাকুরীর জন্য পাগলের মতো ঘুরে বেড়ায় ............
..........সম্পন্ন হিন্দু গৃহস্থ কন্যা অনুরাধা,
লুটপাটের পর যার বাবাকে আল শামস বাহিনী চিরতরে পঙ্গু করে দেয় ...
টাকার অভাবে সেই অনুরাধার আর বেশিদিন পড়া হয়নি .........
অথচ এই আমি , যে কোনদিন মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি , যুদ্ধ করিনি ---
বাতাসে ফুল ভিন্ন গন্জের হাটে লটকে থাকা কোন লাশের গন্ধ পাইনি ---
শরীরি মত্ততায় মৃদু শীৎকার শুনেছি..... কোন গগনবিদারী চিৎকার শুনিনি ......
সেই আমি ...........
সেই আমি আজ তরুবালা, অনুরাধা , সোহেলদের স্বাধীন দেশের পথে ঘাটে অহর্নিশি ঘুরে বেড়াতে দেখি ............
তখন সেইসব যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি কেমন এক ধরনের নির্লিপ্ততা অনুভব করি
রাগ নয়, ঘৃনা নয়, করুনা নয় বরং ...........
বুকের সবটুকু ঘৃনা শেষ হয়ে আজ সেখানে শুধুই নির্লিপ্ততা এসে ভর করে ..........

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

