somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মাকে হারানোর এক বছর...

০৩ রা ডিসেম্বর, ২০০৯ রাত ১:৫২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আজ ৩ ডিসেম্বর। আমার মায়ের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। গত বছরের এই দিন ভোরে আমি আমার মাকে হারিয়েছি। যতোদিন বেঁচে থাকবো ততোদিন প্রতি বছর ৩ ডিসেম্বর আমার জীবনের শোকের দিন হয়ে থাকবে। এক বছর পেরিয়ে গেলেও আমার এখনো বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় আমার মা নেই। মনে হয়, ঢাকা ছেড়ে বাসায় গেলেই বোধহয় মা ছুটে আসবে। ব্যাস্ত হয়ে পড়বে আমাকে নিয়ে।

বিশ্বাস করতে আসলেই কষ্ট হয় এমনটি আর হবে না এ জীবনে। আর কখনোই আমার মা আমার জন্য অপেক্ষা করে থাকবে না। কি দুরন্ত উচ্ছল জীবনই না ছিল আমার। এই একটি ঘটনা আমাকে কতো বদলে দিয়েছে। মাকে হারিয়ে আমি যেন হঠাৎ বড় হয়ে গেছি। প্রতিটা দিনই মায়ের কথা মনে হয়, একা একা গুমরে কাঁদি।

গত বছর কোরবানির ঈদের কয়েকদিন আগে আমরা মাকে হাসপাতালে ভর্তি করি। সুস্থ্য একজন মানুষ, সামান্য একটি সমস্যার কারনে হাসপাতালে। আমরা কেউই বুঝতেই পারিনি এভাবে হুট করে মা আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন। হাসপাতালে তিনদিন সবই ভালো। কিন্তু ১ ডিসেম্বর কিছু বুঝে উঠার আগেই হঠাৎ আইসিইউতে নিতে হয়। দুদিন সেন্ট্রাল হাসপাতালের আইসিইউতে থাকার পর আমার মা চলে গেলেন আমাদের চোখের জলে ভাসিয়ে। আমরা কোনভাবেই মাত্র ৪৫ বছর বয়সে তার এই হঠাৎ চলে যাওয়া মেনে নিতে পারছি না।

আমার মা। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়ার সুযোগ তার হয়নি বিয়ের কারনে। মার সহপাঠীদের কাছে শুনেছি তিনি খুবই ভালো ছাত্রী ছিলেন। ক্লাসের শীর্ষ ছাত্রী ছিলেন। অনেক আদারে কেটেছে তাঁর ছোটবলা। তাঁর পরিবার ছিলো ফরিদপুরের এককালের শীর্ষ কয়েকটি পরিবারের একটি। মায়ের মনটা ছিলো বিশাল। চট্টগ্রামে আমার বাবার সরকারী চাকুরি। সরকারী কলোনীতে আমরা যে বাসায় থাকতাম সেখানে একবার যে গেছে সে মায়ের রান্না খেয়ে, তার আন্তরিকতা দেখে ভক্ত হয়ে গেছে। মা মানুষকে খাইয়ে খুব আনন্দ পেতেন। সবসময় তিনি বাসায় অনেক লোকজন, উৎসব দেখতে পছন্দ করতেন। আমরা দিন নেই, রাত নেই বাসায় বন্ধুবান্ধব নিয়ে যেতাম। মা কখনো বিরক্ত হয়ে বলতেন না অসময়ে কেন এতো বন্ধুবান্ধব নিয়ে আসিস? এমন অসাম্প্রদায়িক মানুষ, উচ্চ মনের মানুষ আমি জীবনে খুব কম দেখেছি।

মা কখনো গরীব বা ভিক্ষুকদের না বলতেন না। কলোনীতে থাকার কারনেই বাসায় সবসময় ভিক্ষুক আসতো। আমরা খুব বিরক্ত হতাম। কিন্তু মা হাসিমুখে কিছু না কিছু দিয়ে তাদের বিদায় করতেন। তাঁর জীবনে এমন দিন খুব কমই গেছে যেদিন তিনি কোন গরিব বা ভিক্ষুককে খাওয়াননি। মানুষের জন্য তাঁর ছিলো চরম সহমর্মিতা। কারো কোন কষ্টের কথা শুনলেই মা কাঁদতেন। তাদের স্বান্ত্বনা দিতেন।

মা মারা যাওয়ার পর আমার ছোট বোন জানালো, কয়েকদিন আগে নাকি সকাল ১১ টার দিকে এক ভিক্ষুক আমাদের বাসায় এসে মাকে বললো তার খুব খিদে লেগেছে। ১১ টার সময় রান্না থাকার কথা নয়, তাই বাসায় ভাত নেই। কিন্তু আমার মা গরম ভাত রান্না করে তাকে খাইয়ে বিদায় করলেন। এমন হাজারো ঘটনা আছে আমার মায়ের জীবনে। ছুটিতে বাসায় গেলেই মা আমার কাছে বলতেন হাসান টাকা দে তো। আমি বলতাম মা কি করবে? তিনি হাসতেন। সেই টাকা চলে যেতো গরীবদের কাছে। আমরা বাসায় আছি-ড্রয়িং রুমে টিভি দেখছি-হঠাৎ দেখি কোন এক ভিক্ষুক। আমরা তাকে বলি মাফ করো। সে বলে, তোমার মাকে ডাকো। তোমার মা আমাদের কখনো খালি হাতে বিদায় করে না। আমরা চুপসে যাই তখন। মাঝে মাঝে এ নিয়ে মায়ের সাথে ঝগড়াও বাঁধে। বলি মা ভিক্ষকু-গরিব এরা কি তোমার বান্ধবী? সবসময় এতো জ্বালাতন করে কেন? মা হাসে। প্রতিবেলা রান্নার আগে মা পুরনো ভাত বাইরে কাক বা শালিককে দিতেন। মার রান্না করার সময় রান্নাঘরের সামনে সবসময় পাখি থাকতো। মা প্রচুর বই পড়তেন। তাঁর কারনেই ছোটবেলা থেকে আমরা ভাই বোন প্রুচর বই পড়তাম।

আমাদের পরিবারে দুঃখ কষ্ট সেভাবে ছিল না। বেশিরভাগ সময়েই ছিল আনন্দ উচ্ছলতা। কিন্তু এতো আনন্দের মধ্যেই আমার মাটা চলে গেলো আমাদের ছেড়ে। আমরা ঘুনাক্ষরেও বুঝতে পারিনি সে এভাবে হঠাৎ করে চলে যাবে। গত বছরের ৩ ডিসেম্বর সকাল সোয়া সাতটায় আমার মা মারা যায়। সেন্ট্রাল হাসপাতালে আমার ছোটবোনটার কান্না দেখে আমার বুক ফেটে যাচ্ছিল কষ্টে। আমরা দুই ভাই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার কারনে ওই বাসায় বেশি থাকতো। ওর কতো আফসোস মাকে নিয়ে। ও হাসপাতালে মাকে সুস্থ্যে দেখে, রাতে খাইয়ে বাবার সাথে চট্টগ্রাম গিয়েছিল ভর্তি হতে। এসে দেখে মা আর নেই।

এসএসসি পাস করার পর কলেজ, এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ১০ বছর ধরে আমি বাসার বাইরে। এরপর আবার সাংবাদিকতা। তাই বছরে খুব কম সময় বাসায় গিয়ে থাকতে পারতাম। কিন্তু যখন যেতাম মা আমায় নিয়ে ব্যাস্ত হয়ে উঠতেন। কি খাওয়াবেন কি করবেন দিশা পেতেন না। আমি ফেরার সময় মায়ের চোখ ছলছল করতো। ভাবতে কষ্ট হয়, সেসব দিন আর কখনো ফিরে আসবে না।

মায়ের কথা মনে করে আমার বাবা কখনো আমাদের সামনে মন খারাপ করেন না। আমরা বুঝি প্রতিমুহুর্তে কতোটা কষ্ট তিনি পান। আমি আমার ছোটবোনের সামনে কাঁদতে পারি না মাকে নিয়ে। কিন্তু আমি বুঝি আমরা সবাই কাঁদি সবাই সবাইকে আড়াল করে। এই কান্না কখনোই হয়তো শেষ হবে না।

ফরদেপুরের বালিয়াডাঙ্গী ঈদ গা মাঠের কবরে এখন আমার মা শুয়ে আছেন। তিনি এখন সব কিছুর উর্ধ্বে। মা কি দেখছে তাঁর সাজানো পরিবারের এখন কি অবস্থা। এক বছর পেরিয়ে গেলেও কোনভাবেই মায়ের হঠাৎ চলে যাওয়া আমরা মেনে নিতে পারি নাই। ভাবলেই তাই কষ্ট হয়। আল্লাহ তাকে শান্তি দিক। মা আমরা সবাই তোমাকে খুব ভালোবাসি। তুমি ভালো থাকো মা। ভালো থাকো।



সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা ডিসেম্বর, ২০০৯ রাত ২:০২
৯টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×