somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রন্তুর কালো আকাশ - পর্ব ১-৫ (একটি ধারাবাহিক উপন্যাস)

০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৪ বিকাল ৩:৪৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



১.
রন্তু বারবার জানাল দিয়ে বাহিরের খোলা মাঠের দিকে তাকাচ্ছে, তার দৃষ্টি মাঠের শেষ প্রান্তের যে নারিকেল-সুপারির গাছের সারি তার উপরে ঐ আকাশের দিকে। না কোন সুতো কাটা ঘুড়ির দিকে নয়, সে বারবার আকাশের কালো মেঘের দিকে তাকাচ্ছে। আজো কি বৃষ্টি হবে, আকাশ জুড়ে কালো মেঘের আনাগোনা এখন জটলা পাকিয়ে ঘন হয়েছে। আজো কি বাবা আসবে না! বাবা! লোকটাকে বাবা বলে ডাকতে কেমন সংকোচ হয়ে। কেমন যেন খুব চেনা কিন্তু বড় অচেনা মনে হয় তাকে। টুকরো টুকরো কিছু স্মৃতি মনের আনাচে কানাচেতে উঁকি দিয়ে যায়, কিন্তু সেই স্মৃতিগুলো জোড়া দিয়ে একটা গল্প হয় না। শুধু কিছু আবছা আবছা স্মৃতি।

হঠাৎ পাশের জনের খোঁচায় রন্তু সম্বিৎ ফিরে পেল যেন, ছেলেটার দিকে তাকালো সে। ছেলেটি ইশারায় সম্মুখে ম্যাডামের দিকে তার দৃষ্টি নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলো। নাসরিন ম্যাডাম কড়া চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছেন, কতক্ষণ তাকে ডেকেছেন আল্লাহ্‌ই জানেন। রন্তু ভয় পেল, নাসরিন ম্যাডাম খুবই ভালো একজন টিচার, ক্লাসের প্রতিটি বাচ্চাকে খুবই স্নেহ করেন। রন্তুকে কেন জানি ম্যাডাম খুব বেশী আদর করেন, সেই নাসরিন ম্যাডাম কেমন রাগী রাগী চোখে তাকিয়ে আছেন। রন্তু শুনলো ম্যাডাম তাকে কি যেন বললেন। সে ভয়ে কখন কেঁদে দিয়েছে নিজেও টের পায় নাই। শার্টের হাতায় চোখ মুছতেই ম্যাডামের গলার আওয়াজ তার কানে এল,

‘এই রন্তু কাঁদছিস কেন?’

‘না ম্যাডাম কাঁদছি না তো’

‘তাহলে চোখ মুছছিস কেন?’ বলে ম্যাডাম রন্তুর দিকে এগিয়ে এলেন

‘কি হয়েছে রন্তু? জানালা দিয়ে বাইরে কি দেখছিলি?’

‘আ...কা...শ...’

‘আকাশ! তুই আবার আকাশ দেখা শুরু করলি কবে থেকে?’ বলে নাসরিন ম্যাডাম জানাল দিয়ে বাইরের পানে চেয়ে দেখলেন আকাশে প্রচুর মেঘ জমেছে, ঝুম বৃষ্টি হতে পারে। দ্রুত বাচ্চাদের ছেড়ে দেয়া দরকার, তার ক্লাসই শেষ পিরিয়ড; তাই তিনি ছেড়ে দিলেই বাচ্চাদের ছুটি।

‘কিরে আকাশ দেখে কান্না করতে হয়?’

অন্তু মাথা নেড়ে অসম্মতি জানালো।

‘বাবা আসবে আজ?’ বলে নাসরিন ম্যাডাম মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন রন্তুর।

রন্তুর চোখে এবার যেন জলের বাণ ডাকলো। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। ম্যাডাম তাকে বসিয়ে ডেস্কে গিয়ে বাচ্চাদের আগামী দিনের হোম টাস্ক দিয়ে ছুটি দিয়ে দিলেন। আর ক্লাস হতে বের হবার সময় রন্তুকে গিয়ে বললেন,

‘তোর বাবাকে আমার সাথে দেখা করতে বলবি। ঠিক আছে? এবারো ভুলে যাস না যেন...’। রন্তু ঘাড় নেড়ে সম্মতিসূচক জবাব দিল।

‘আর হ্যাঁ, কথায় কথায় এতো কাঁদিস কেন? ছেলে মানুষদের এত কাঁদতে হয় না বোকা ছেলে, বুঝলি?’। এবারো রন্তু ঘাড় নেড়ে সম্মতিসূচক জবাব দিল। রন্তু নিজেও কাঁদতে চায় না, কিন্তু কোথা থেকে জানি শুধু কান্নারা চোখে চলে আসে।

আসলে রন্তুর ঠিকই মনে ছিল, গতবার বাবা যখন এল, সে ইচ্ছা করেই বলে নাই। তার লজ্জা করে, স্কুলের প্রতিটি টিচার, প্রতিটি ছেলে মেয়ে তার সমস্যার কথা জেনে গেছে। জেনে গেছে যে তার বাবা-মা আলাদা হয়ে গেছেন। সবাই কেমন দৃষ্টিতে যেন তার দিকে তাকায়, ম্যাডামরা কেমন যেন একটু বেশী বেশী আদর করেন এখন তাকে। রন্তুর খুব লজ্জা লাগে, খুব। সবাই কেমন করে যেন তাকায়, আর সেই তাকান দেখলেই তার কান্না পায়। রন্তু তার বেঞ্চে বসে রইল, ক্লাসের সব ছেলে মেয়ে বের হয়ে গেলে পরে সে বের হলো।

গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেল স্কুলের মাঠ পেরিয়ে মূল ফটকের দিকে। মূল ফটক দিয়ে বের হয়ে সেই প্রতি দিনকার ঘুঘনিওয়ালা, আমসত্ত-আচার বিক্রেতা, মালাই আইসক্রিমওয়ালা বুড়ো চাচা আর চানাচুররর... বলে চেচাতে থাকা সেই চানাচুর মামা। সবার সামনেই ছেলেমেয়েদের ভীড়। সাথে রয়েছে বাচ্চাদের নিতে আসা বাবা-মা’দের ভীড়। এত্ত এত্ত ভীড় ঠেলে তার দু’চোখ তার বাবাকে খুঁজতে লাগলো।

রন্তু এখন ক্লাস টু’তে পড়ে। সে যখন স্কুলে ভর্তি হল, তার কিছুদিন পর থেকে সে তার মা’র সাথে নানাবাড়ী’তে থাকতে লাগলো। প্রথমে রন্তু ভেবেছিল তারা বেড়াতে এসেছে, কিন্তু কয়েকদিন পর যখন সে মাকে জিজ্ঞাসা করলো তারা বাড়ী কবে যাবে? মা তাকে ঠাস করে একটা চড় মেরে বলেছিল, ‘এটা কি বাড়ী না? এটা কি বস্তি? বদ ছেলে কোথাকার?’। রন্তু চড় খেয়ে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল, সে কিছুই বুঝতে পারে নাই মা তাকে কেন চড় মারলো। ধীরে ধীরে রন্তু বুঝতে পেরেছে তারা আর তাদের বাসায় ফিরে যাবে না। বাবা-মা’র ঝগড়া হয়েছে, কিন্তু কেন তা রন্তু জানে না। সেই তখন থেকে রন্তু নানাবাড়ী’তেই আছে।

এই ক্লাস টু’তে উঠার পর থেকে হঠাৎ করেই বাবা মাসে দুয়েকবার রন্তু দেখতে স্কুল ছুটির পর স্কুল গেটে আসতে লাগলো। নানু তাকে একদিন ডেকে বলল, ‘শোন তোমার বাবা স্কুল গেটে আসবে আজ, তার জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে। সে তোমাকে বাসায় দিয়ে যাবে’। সেই থেকে মাসে একবার কি দু’বার বাবা তার সাথে দেখা করতে আসে। বাবা আসলে রন্তুর কেমন যেন অদ্ভুত অনুভূতি হয়, সে চুপচাপ থাকে। বাবা কেমন গম্ভীর হয়ে তাকে প্রশ্ন করতে থাকে, পড়ালেখা করে কি না, দুষ্টুমি করে কি না, মা তাকে মারে কি না... আরও কত হাবিজাবি প্রশ্ন। রন্তু মিনমিন করে সে সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যায়।

বাবাকে দেখলে রন্তুর কেমন অস্বস্তি শুরু হয়, বাবা তার হাত ধরে যখন হাঁটতে থাকেন রাস্তা ধরে তার খুব ভালো লাগে তখন। সবচেয়ে মজা হয় বাবা যখন বড় রাস্তার খাবার হোটেলে নিয়ে গিয়ে তাকে পরাটা-মিষ্টি-দই খেতে দেয়। পরাটা তার খুবই পছন্দের খাবার, কিন্তু বাবার সামনে সেগুলো নিয়ে সে বসে থাকে। নাড়াচাড়া করে কিছুক্ষণ, কিন্তু মুখে দেয় না। বাবা তখন খুব রাগী রাগী মুখে ধমকে উঠেন, তারপর নিজ হাতে তার মুখে সেগুলো তুলে দেন। রন্তুর লজ্জা করে এত্ত মানুষের মাঝে এভাবে খেতে আবার কেমন এক ভালো লাগাও কাজ করে।

ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি শুরু হয়েছে, রন্তু কি করবে ভেবে না পেয়ে দৌড়ানো শুরু করলো বড় রাস্তাটার দিকে। প্রায় আধঘণ্টা হবে রন্তু স্কুল গেটে দাঁড়িয়ে ছিল, সারাক্ষণ তার খুদে চোখদুটি ছলছল দৃষ্টি নিয়ে বাবা নামের মানুষটিকে ইতিউতি খুঁজেছে। কিন্তু বাবা আজ আসেনি, গত মাসেও বৃষ্টির কারণে বাবা আসে নাই। পরপর দুমাস হল বাবা এলো না। রন্তু দৌড়ে বড় রাস্তায় এসে সেই খাবার হোটেলে ঢুকে পড়ল। প্রতিটি টেবিলে চোখ ঘুরিয়ে কোথাও বাবাকে না পেয়ে তার খুব কান্না পেল। চোখে হতে গড়িয়ে পড়া জল শার্টের ভেজা হাতায় মুছতে লাগলো। হোটেলে গেটে জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোর মাঝ হতে একজন বলল,

‘এই খোকা কাঁদছো কেন?’

‘কই? কাঁদছিনাতো...’ বলে রন্তু সেই মানব জটলা ঠেলে রাস্তায় নেমে এল। বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা রন্তুকে ভিজিয়ে দিতে লাগলো। বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা রন্তুর ছোট ছোট অশ্রুকে গ্রাস করে নিতে লাগলো তার বিশাল জলাধারে। রন্তু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে, কেন? সে নিজেও জানে না। এতো কান্না নয়, এ হল রন্তুর কালো আকাশ হতে ঝরে পরা বৃষ্টিকনা। রন্তুর জীবনের কালো আকাশে যে অনেক মেঘ জমেছে এই ছোট্ট সময়েই।


২.
বৃষ্টির ফোঁটাগুলো খুব তীক্ষ্ণ আজ, রন্তুর শরীরে সূচের ন্যায় বিঁধছে। একটু শীত শীত অনুভূতি, কিন্তু রন্তুর সেদিকে খেয়াল নেই। কিছুক্ষণ ফুঁপিয়ে কেঁদে এখন অনেকটা শান্ত সে। সামনে বৃষ্টির ঘোলাটে পর্দা ভেদ করে কোন সুদূর পাণে তার দৃষ্টি তা বোধগম্য নয়। একটানা বৃষ্টিতে সে ভিজে ভিজে হেঁটে চলেছে। হঠাৎ করে রাস্তার জমে থাকা পানির নীচের কোন এক খানাখন্দে হোঁচট খেয়ে সে পড়ে গেল এবং তখন বুঝি তার সম্বিৎ ফিরে এল। হঠাৎই তার খেয়াল হল তার ব্যাগের বইখাতা সব ভিজে একাকার। হায় হায় কি হবে এখন! ভাবতেই তার আবার কান্না পেতে লাগলো।

রন্তু খেয়াল করলো সে বাড়ীর রাস্তা ছাড়িয়ে অনেক দূর চলে এসেছে, সে আবার উল্টা পথে হাঁটা শুরু করলো। রন্তু নানু বাসায় আসার পর প্রথম কয়েকদিন মা অথবা নানু তাকে স্কুলে আনা নেওয়া করেছে। এরপর একটা বুয়া ঠিক করা হল, কিন্তু প্রথম দিনই ঘটনা ঘটলো। বুয়া রন্তুকে স্কুল থেকে আনতে দেরী করলো, আর রন্তু নিজে নিজে বাসায় চলে আসলো। মা আর নানু তাকে সেই কি বকাটাই না দিল! কিন্তু লাভ হল একটাই, রন্তুকে স্কুল থেকে আনা নেওয়া করার জন্য আর কাউকে কষ্ট করতে হল না। সে প্রতিদিন একা একা বাসা থেকে স্কুল যাওয়া আসা করতে লাগলো। যদিও প্রথম দিকে নানু আর মা তাকে রোজ সাবধান করে দিত, কারো সাথে রাস্তায় কোন কথা না বলতে অথবা কেউ কিছু দিলে যেন সে না খায় ইত্যাদি ইত্যাদি। এখন কেউ আর এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। রন্তু নিয়ম করে রোজ স্কুলে যায়, আসে।

বাসার দরজায় রন্তু খুব হালকা করে কড়া নারে, কলিং বেল পর্যন্ত তার হাত যায় না। অনেকক্ষণ কড়া নাড়ার পর গেট খুলল নানু, রন্তুকে দেখেই তিনি হা হা করে উঠলেন।

‘এই ছেলে তুই এই বৃষ্টিতে ভিজে এসেছিস কেন? তোর বাবা কই...?’ বলে নানু দরজার বাইরে কাউকে খুজলেন। কাউকে সেখানে খুঁজে না পেয়ে তিনি আবার রন্তুর দিকে দৃষ্টি দিলেন।

‘কিরে তোর বাবা আজ আসে নাই?’

রন্তু মাথা নিচু করে ঘাড় নেড়ে জানালো যে, বাবা আজ আসে নাই।

‘আমি এই জন্যই শায়লাকে বলি, ছেলেকে তার বাবা কেন মায়া দেখাতে স্কুলে আসবে। নিকম্মাটার যদি এতই ছেলের জন্য মায়া লাগে তো নিয়ে যা না তোর কাছে বাবা... সেই মুরোদতো নেই...’ নানু গজগজ করতে করতে ভেতরে চলে গেলেন।

রন্তুর এসব কথা শুনতে মোটেও ভালো লাগে না। নানু কেন জানি বাবাকে দুচোখে একদমই দেখতে পারে না, বাবার নাম শুনলেই কেমন রেগে যায়। বাবা সম্পর্কে খুব বাজে বাজে কথা বলতে থাকে। রন্তুর কেন জানি বাবার জন্য খুব মায়া লাগে। কেন? সে নিজেও জানে না। বাবাকে ঘিরে তার তেমন জমাট স্মৃতি নেই, কিন্তু তারপরও বাবার জন্য তার খুব মায়া লাগে।

হঠাৎ করেই নানুর গলার স্বরে রন্তু সজাগ হয়।

‘এই যে রাজপুত্র, নবাবজাদা... ব্যাগটা খুলে দেন। বইপত্রতো সব ভিজিয়ে ছারখার করে নিয়ে এসেছেন। এগুলো শুঁকোতে দেই, আর আপনি গিয়ে ভেজা জামা কাপড় পাল্টে দ্রুত গোসল করে আসেন। এইবার যদি জ্বর আসে... রন্তু... তোকে ঐ বড় রাস্তার পাশে মসজিদের গেটে শুইয়ে দিয়ে আসবো...’

নানুর কথা শুনে রন্তু ফিক করে হেসে দিল। নানু রেগে গেলে উল্টাপাল্টা কিসব যে বলে, শুনলেই রন্তুর খুব হাসি পায়।

‘এই বাঁদর কোথাকার, হাসছিস কেন? কি বললাম কথা কানে যায় না? হায় খোদা শায়লা নিজেও পুড়লো, আমাকেও পোড়ালো...’ বলে নানু গজগজ করতে করতে আবার ভেতরে চলে গেল।

রন্তু পায়ে পায়ে গোসলখানার দিকে গেল। জামা কাপড় খুলে কল ছেড়ে দিতেই বালতিতে জল পড়তে লাগলো, কেমন গরম মনে হচ্ছে কল হতে বের হওয়া পানিগুলোকে। রন্তু খেয়াল করেছে বৃষ্টিতে ভেজার পর গোসলখানার জল কেমন গরম লাগে, কি আশ্চর্য! অন্যসময় কিন্তু এমন হয় না, কিন্তু বৃষ্টিতে ভেজার পরপরই কেন যেন এমন লাগে। রন্তু দ্রুত গায়ে ঝপাঝপ পানি ঢালতে লাগলো। দরজায় নানুর আওয়াজ পেয়ে রন্তু ঘুরে তাকালো। নানু তার জন্য শুকনো জামা কাপড় নিয়ে দাঁড়িয়ে। রন্তুর সাথে কিছুক্ষণ চেঁচামেচি করে, এখানে সাবান দাও, তো সেখানে ভালো মত পানি দাও... উফ! নানুর যন্ত্রণা ভালো লাগে না।

গোসল শেষ করে শুকনো জামা গায়ে দিয়ে রন্তু খেতে বসলো। মা’কে কোথাও দেখা গেল না। রন্তু খুব ভয়ে ভয়ে ছিল, মা তাকে না আজ মেরেই ফেলে। গত সপ্তাহে সে স্কুলের হোমওয়ার্ক করে নাই, ম্যাডাম ডায়েরিতে তা লিখে রিপোর্ট করে দিয়েছিল গার্ডিয়ানের সিগনেচার এর জন্য। রন্তু মা’কে সেই ডায়েরি দেখাতেই মা কেন জানি খুব ক্ষেপে উঠলো। রন্তুকে আচ্ছা মত চড় মারতে লাগলো, এমন মার রন্তু তার জীবনে কখনো আগে খায় নাই। মা একসময় রন্তুরকে মাটিতে ফেলে তার উপর বসে তাকে মারতে লাগলো। মায়ের নখের আঁচড় লেগে রন্তুর বাঁ চোখের নীচের দিকে ছড়ে গিয়ে রক্ত বেড়িয়ে গিয়েছিল। নানু এসে মা’কে না থামালে মা বোধহয় তাকে মেরেই ফেলতো। রন্তু দ্রুত খাওয়া শেষ করে বিছানায় চলে আসলো। তার কেমন যেন ঘুম পাচ্ছে।

ঘর অন্ধকার, কেমন যেন কালো একটা জগৎ। রন্তু’র ঘুম ভেঙ্গেছে এই কিছুক্ষণ আগে। প্রথমে সে কিছুতেই চোখ খুলতে পারছিল না, অনেক কষ্টে চোখ খুলল। পুরো ঘর অন্ধকার, এখন কয়টা বাজে? রন্তু ঠাওর করার চেষ্টা করল। সে স্কুল থেকে ফিরেছে দুপুর বারোটা নাগাদ। গোসল খাওয়া শেষে সে যখন বিছানায় গেল তখন দুপুরের আজান দিচ্ছে। ওমা! সে নিজে অবাক হল, কতক্ষণ ঘুমিয়েছে সে? এখন কি রাত হয়ে গেছে? সবাই কি ঘুমিয়ে পড়লো নাকি? রন্তু’র খুব শীত করছে। তার গায়ে কে যেন একটা পাতলা কাঁথা দিয়ে গেছে, মা অথবা নানু হয়তো। তারপরও রন্তুর খুব শীত শীত করছে। মা’র কথা মনে হতেই রন্তুর খুব ভয় হতে লাগলো। আজ সে স্কুল থেকে ফেরার সময় সব বইপত্র ভিজিয়ে ফেলেছে। গত মাসে অংক বইটা হারিয়ে ফেলায় মা তাকে কত বকাঝকা দিল, আর আজতো সে সব বইপত্র ভিজিয়ে ফেলছে। আজ আর তার রক্ষা নেই, ভাবতেই রন্তুর খুব কান্না পেল।

কান্না ভেজা চোখ মুছতেই তীব্র আলো চোখে লাগলো, চোখে আলোটুকু সয়ে আসতেই রন্তু দেখতে পেল তার মা এই ঘরে এসেছে। ভয়ে ভয়ে রন্তু মা’র মুখের দিকে তাকালো। মা রন্তুর পাশে বিছানায় বসে তার কপালে হাত রাখলো।

‘রন্তু সোনা, খুব জ্বর এসেছে যে? বৃষ্টিতে কেন ভিজলে?’ মা’কে খুব শান্ত এবং মিষ্টি দেখাচ্ছে। রন্তু কোন কথা বলল না।

‘আজো বাবা আসে নাই’ শায়লা’র কথায় রন্তু ঘাড় নেড়ে জানালো যে না আসে নাই।

‘রন্তু সোনা, বাবাকে তোমার খুব ভালো লাগে?’

‘জানি না...’

‘জানি না মানে কি? তোর বাবা, তোর তাকে ভালো লাগে কি না সেটা তুই জানবি নাতো কে জানবে? আমি?’

মায়ের কথা শুনে রন্তু ফিচ করে হেসে দিল।

‘এই যে জ্বর বাঁধালি, এখন যদি নানু তোকে সত্যি সত্যি মসজিদের গেটে দিয়ে আসে? তো কেমন হবে?’ মা কেমন দুষ্টুমি মাখা স্বরে বলল।

‘জানি না...’

রন্তুর উত্তর শুনে শায়লা একটু হেসে উঠলো।

‘কিরে তোর সব উত্তর কি আজকে ‘জানি না’ দিয়েই হবে?’

‘মা পাখাটা বন্ধ করে দাও না... শীত করে...’

‘ওমা, পাখাতো বন্ধই। দেখি জ্বর বোধহয় আরো বেড়েছে... দেখি জলপট্টি নিয়ে আসি...’ বলে শায়লা উঠে যেতে নিতেই রন্তু তার ছোট্ট হাত দুটি দিয়ে তাকে টেনে ধরলো।

‘মা... ওমা...’

‘আবার কি হল?’ শায়লা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে রন্তুর দিকে তাকালো।

‘আমি আর বৃষ্টিতে ভিজবো না, সত্যি... এইযে তোমায় ছুঁয়ে বললাম’

‘হুম বুঝলাম...’

‘মা আমার বইগুলো না সব ভিজে গেছে, তুমি আমাকে মেরো না। আমি আর বইখাতা নষ্ট করবো না’ বলেই অন্তুর ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো।

শায়লা ছেলের পাশে বসলো। রন্তু এখনো ফুঁপিয়ে কাঁদছে। শায়লা রন্তুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। জানালা দিয়ে দূরে ঐ আকাশে একটুকরো চাঁদ মাঝে মাঝে উঁকি দিচ্ছে। কিন্তু আকাশে প্রচুর মেঘ থাকায় চাঁদ বারবার হারিয়ে যাচ্ছে মেঘেদের আড়ালে। শায়লার কাছে তার ছেলে রন্তু ঐ চাঁদের মত দামী। ঠিক হল কি ভাবনাটা? শায়লা নিজেকেই প্রশ্ন করে। ঐ চাঁদের জীবনে অমাবস্যা আছে, কলঙ্ক আছে। রন্তুর জীবনে সেগুলো আসুক শায়লা তা চায় না। কিন্তু না চাইতেও ঐ কালো মেঘের দল যেমন চাঁদটাকে ঢেকে দিচ্ছে, তেমনি রন্তুর জীবনেও না জানি কতশত কালো মেঘের দল ধেয়ে আসছে। ভাবতেই দুফোঁটা অশ্রুজল শায়লার চোখ হতে আবার ঘুমিয়ে পড়া রন্তুর গায়ে গিয়ে পড়ল।


৩.
শায়লাদের এই বাড়িটা একতলা। শায়লার বাবা সরকারী কেরানী ছিলেন, তাই পৈত্রিক এই ভিটায় তিনি কোন দালান তুলতে পারনে নাই। একতলা এই পুরানো আমলের বাড়ী’র মাঝখানে উঠান রেখে চারিদকে ঘরগুলো তৈরি হয়েছিল। উঠোনে এখনো একটা নারিকেল গাছ আছে, যা শায়লার দাদী নিজ হাতে লাগিয়েছিল। মোট চারটে ঘর চারদিকে রেখে মাঝখানে উঠোন। পূবপাশের ঘরটা শায়লার, বিয়ের আগে শায়লা এই ঘরটাতেই থাকতো। জাভেদের সাথে বিয়ের পর থেকে ঘরটা ফাঁকাই ছিল, শায়লার বড় ভাই ভাড়া দিতে চেয়েছিল কিন্তু মা দেয় নাই। শায়লার বিয়ের মাস ছয়েক আগেই তার বাবা মারা গেলেন। শায়লা কলেজে যাওয়া আসার পথে জাভেদের সাথে দেখা হত, জাভেদ কলেজের রাস্তায় বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দিত। সেই থেকে কখন কীভাবে পরিচয়, পরিণয় এবং দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে। সব আজ কেমন ঝাপসা লাগে শায়লার কাছে।

রন্তু এখনো বেঘোরে ঘুমুচ্ছে, কাল রাতে জ্বর আরও বেড়েছিল, সারারাত মাথায় জলপট্টি দিয়ে দিয়ে পার করেছে। ছেলেটা যে কার মত হল আল্লাহ্‌ই মালুম। শায়লা বা জাভেদ কারো সাথেই ছেলের স্বভাব চরিত্র মিল খায় না। জাভেদের কথা মনে পড়তেই শায়লার মুখ ইস্পাত কঠিন হয়ে ওঠে। জাভেদ একটা মানুষ নয়, মানুষ নামের হিংস্র পশু সে শায়লার কাছে। বিয়ের আগে কতশত ভালোবাসার গান...! বিয়ের পর একে একে বের হয়ে আসলো তার আসল রূপ। অল্পতেই রেগে যাওয়া আর রাগলে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে শায়লার গায়ে হাত তোলা... এ ছিল নিত্যকার ব্যাপার। মজার ব্যাপার ছিল, রাগ কমে আসলে জাভেদের হাস্যকর আচরণগুলো। কতশত পাগলামি যে করতো, কানে ধরা, নিজেকে নিজে চড় মারা আরও কত কি। প্রথম প্রথম শায়লা খুব স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছিলো ব্যাপারগুলোকে। অনেকের খুব রাগ থাকে, রাগ কমলে আনুশোচনা হয়; জাভেদকেও শায়লা তেমনই ভেবেছিল। কিন্তু দিন দিন অবস্থা খারাপের দিকে যেতে লাগলো, জাভেদের মধ্যে নতুন রোগ দেখা দিল সন্দেহ বাতিকগ্রস্থতা। অবস্থা এতটাই খারাপের দিকে গেল যে, একরাতে জাভেদ কুকুর-বেড়ালের মত পেটালো শায়লাকে, তুচ্ছ এক সন্দেহের কারণে। অমানুষিক প্রহারে শায়লা অচেতন হয়ে পড়েছিল, হঠাৎ চেতনা ফিরতে দেখে ঘর রক্তে ভেসে যাচ্ছে। জাভেদ নিজে নিজের হাত থেতলে দিয়েছে। শায়লা দৌড়ে কাছে যেতেই তাকে হাসি মুখে বলল, ‘শায়লা দ্যাখো, এই হাত...এই হাত তোমার গায়ে তুলেছি আমি! তাই এই হাতকে শাস্তি দিলাম...’। এই বলে কেমন অপ্রকৃতস্থ মানুষের ন্যায় হাসতে লাগলো।

সেদিন সকালের আলো ফুটতেই শায়লা রন্তুকে নিয়ে মায়ের বাসায় চলে আসে। জাভেদ বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেছে তাকে বুঝিয়ে ফেরত নিয়ে যেতে, কিন্তু শায়লা রাজী হয় নাই। সেই রাতে জাভেদের চোখে যে পশুর চাহনি দেখেছে সে, সেই চাহনিকে শায়লার বড্ড ভয়। বছর খানেকের মাথায় মিউচুয়ালি ডিভোর্স হয়েছে তাদের, জাভেদ কোনরকম ঝামেলা করেনি। মাঝে মাঝে স্কুলের গেটে এসে রন্তুকে দেখে যায়, কখনো-সখনো বাসার গেট পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে যায়।

শায়লা দ্রুত নিজের ব্যাগ গুছিয়ে রন্তুকে এক নজর দেখে নিয়ে বাসা হতে বের হল, গত আট মাস হল সে একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে পারসোনাল এসিস্টেণ্ট এর চাকুরী করছে। কলেজের গণ্ডি না পেরুতেই বিয়ে, একাডেমীক কোয়ালিফিকেশন না থাকায় এর চেয়ে ভালো কিছু সে আশাও করে নাই। এই যবটাও পেয়েছে তার এক কাজিনের বাবার অফিসে, ঐ আঙ্কেলেরই পিএ হিসেবে। শায়লাদের বাসাটা একটু গলির ভেতরের দিকে, বড় রাস্তা পর্যন্ত গিয়ে রিকশা নিতে হয়। আজ লেট হয়ে গেছে, শায়লা দ্রুত পা চালাল।

রন্তু’র ঘুম ভাঙ্গলো বেলা দশটার পরে, এখন তেমন জ্বর নেই, কিন্তু কাশছে সমানে। ঘড়ির কাটা দশটা পেরুনো দেখে রন্তু চিৎকার করে নানুকে ডাকতে লাগলো। রন্তুর নানু ছিলেন রান্না ঘরে, দৌড়ে আসলেন...

‘এই ছাগল কোথাকার, এত চেঁচাচ্ছিস কেন?’

‘এখন কয়টা বাজে তুমি দেখনি? আমার যে স্কুল মিস হয়ে গেল...’

‘হয়েছে আমার স্কুলওয়ালা, এতোই যখন স্কুলের চিন্তা তখন বৃষ্টিতে ভেজার সময় মনে ছিল না? জ্বর বাঁধিয়ে উনি এখন স্কুলগিরি ফলাচ্ছেন’

রন্তুর মনে পরে গেল কাল বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে সে বাসায় ফিরেছে এবং জ্বর এসে হানা দিয়েছে তার শরীরে।

‘নবাবজাদা এখন কি জ্বর আছে?’ বলে নানু এগিয়ে এসে কপালে হাত দিলেন।
‘হুম, খুব অল্প। নে, এখন বিছানা থেকে ওঠ। দাঁত ব্রাশ করে হাত মুখ ধুয়ে আয়’

রন্তু বিছানা থেকে নামলো।

‘আর শোন নাস্তায় দুধ পাউরুটি... কোন ঘ্যানর ঘ্যানর করবি না খবরদার, নাইলে পিটিয়ে তক্তা করে দিবো।’

দুধ পাউরুটির কথা শুনেই রন্তুর গা গুলিয়ে উঠলো। ইয়াক, এসব মানুষ খায়? উহ... নানুকে নিয়ে আর পারা গেল না। রন্তুর জ্বর হলেই তাকে এই বিচ্ছিরি খাবারটা খেতে দেয়, ধুর ভাল্লাগে না। রন্তু বাথরুমের দিকে পা বাড়ালো।

ফ্রেশ হয়ে নাস্তা শেষ করার পর রন্তুর হাতে কোন কিছু করার ছিল না, শুয়ে থাকতে আর ভালো লাগে না। এখনো হালকা হালকা শীত লাগছে, কিন্তু কেমন আরামও লাগছে। একবার ভাবলো ড্রইং খাতাটা নিয়ে বসে, কিন্তু মন টানলো না। সে চলে এলো ছাদের উপরে চিলেকোঠার ঘরে, ছোট মামার ডেরায়। শায়লারা দুই ভাই এক বোন। বড় ভাইয়ের পর শায়লা, আর শায়লার বছর তিনেকের ছোট আরেক ভাই। রন্তুর ছোট মামা শিবলি, ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পরে, রন্তুর খুব পছন্দের মানুষ ছোট মামা। ছোট মামার ঘরে ঢুকে দেখে মামা দুই বন্ধুকে নিয়ে দাবা খেলায় মশগুল। গুটি গুটি পায়ে মামার ঘরে ঢুকলো রন্তু।

‘আরে রন্তু সাহেব যে, কি খবর? জ্বর সাহেব কি আছেন না গেছেন?’

রন্তুর ছোট মামাটা না খুব মজার, রন্তুকে সব সময় সাহেব বলে ডাকেন। মামার বন্ধুগুলোও তাকে রন্তু সাহেব বলেই ডাকে।

‘গেছেন...’ বলেই রন্তু একটা হাসি দিল।

‘তো, ভালই চালাকি শিখেছিস তাই না? জ্বর বাঁধিয়ে স্কুল কামাই...’

‘মোটেও না, আমি স্কুল কামাই দিতে চাই নাই। মা-নানু কেউ আমাকে ঘুম থেকে ডেকে দেয় নাই।’

‘আহালে... আর তুই যে কাল বৃষ্টিতে ভিজে জ্বর বাঁধালি’

রন্তু কোন উত্তর দিল না, সে একমনে মামাদের দাবা খেলা দেখতে লাগলো। কিছুদিন হল রন্তু ছোট মামার কাছ থেকে দাবা খেলা শিখেছে। মামা যখন একা থাকে, দুপুরের পরটায় বিকেলের শুরুর বেলা, তখন মাঝে মাঝে রন্তুকে নিয়ে দাবা খেলা শেখায়। রন্তু সবসময় তিন চালে মামার কাছে হেরে যায়। মামাটা না খুব পচা, প্রতিবার তাকে তিন চালে হারিয়ে দেয় শুধু। তবে মামার দোষ না, মামা প্রতিবার তাকে শেখায় কোন ঘুটি প্রথমে চাললে কখনো কেউ তিন চালে হেরে যায় না। কিন্তু রন্তু প্রতিবারই ভুলে যায় আর তিন চালে হেরে যায়।

মামার এক বন্ধু হঠাৎ বলল, ‘রন্তু সাহেব, কাল তোমার বাবাকে দেখলাম সকাল বেলা, বৃষ্টিতে এক দোকানে দাঁড়িয়ে’। বাবার কথা উঠতেই রন্তুর মনটা খারাপ হয়ে গেল, বাবার উপর খুব অভিমান হল। রন্তু যদি ভিজে ভিজে বাসায় ফিরতে পারে, বাবা কি ভিজে ভিজেই রন্তুর সাথে দেখা করতে আসতে পারলো না। রন্তু ছোট মামার ঘর থেকে ছাদে চলে এলো। সকালের রৌদ্রজ্জ্বল আকাশ, কিছু ধবধবে সাদা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। কোন এক বাসা হতে কেউ লাল রঙের একটা ঘুড়ি ওড়াচ্ছে। ঘুড়িটাকে দেখে রন্তুর মনে হল, সে যদি ঐ ঘুড়িটার মত উড়ে উড়ে ঐ সুদূর আকাশে হারিয়ে যেতে পারতো। অনেক দূরে, কোথায় তা রন্তুর জানা নেই।


৪.
আজ বেশ কয়েকদিন পর স্কুলে এসেছে রন্তু। দু’দিন জ্বরে ভুগেছে, এরপর মাঝে ছিল বৃহস্পতিবার, নানু বলল স্কুলে আজ আর যাওয়ার দরকার নেই, একেবারে সামনে রবিবার থেকে যেয়ো। টানা পাঁচদিন! পাঁচদিন স্কুল আসে নাই রন্তু, আর তাতেই তার কেমন কেমন যেন লাগছে। একটু কেমন যেন, ছোট্ট মাথায় সেই কেমন কেমনটা ধরা দেয় না। এখন টিফিন টাইম, ছেলে-মেয়েরা সব স্কুলের মাঠে ধুলো উড়িয়ে খেলছে। রন্তু মাঠের উত্তর পাশটাতে যে ছাতিম গাছটা আছে, তার তলায় বসে আছে। ইদানীং তার খেলতে মন চায় না, টিফিনের এই সময়টায় এই ছাতিম গাছের নীচে বসে থাকতে তার ভালো লাগে। বসে বসে রন্তু অনেক কিছুই ভাবে। এই যেমন ভাবছে কীভাবে ছোট মামাকে দাবা খেলায় হারানো যায়, পারলে তিন চালে। এরকম একেকদিন একেক ভাবনা আসে মনে। মাঝে মাঝে রন্তু ভাবে তার বাবা-মা আবার মিলেমিশে গেছেন, আর তাদের মধ্যে রাগ নেই, আড়ি নেই। যেমন তোতোনের সাথে এখন আর তার আড়ি নেই, মিল হয়ে গেছে। তোতোনের সাথে কি ঝগড়াটাই না হয়েছিলো রন্তুর!

টিফিনে রন্তু তেমন কিছুই একটা খায় না, ভোর বেলা নানু ঘুম থেকে উঠে তার জন্য নাশতা রেডি করে দেয়। অবশ্য শুধু তার জন্যই না, মা আর ছোট মামা’র জন্যও রেডি করে। এত্ত সকালবেলা এত্তগুলো খাবার খেতে মোটেও ভালো লাগে না রন্তু’র। নানুটা মহা দুষ্টু, জোর করে তাকে রোজ একগাদা খাবার খাইয়ে দিবে। আর তাই রন্তু স্কুলে টিফিন নিয়ে আসে না, যদিও নানু এক্ষেত্রেও জোরাজুরি করে অনেক। মাঝে মাঝে রন্তু’র আম্মু তাকে পাঁচ টাকা কি দশ টাকা দিয়ে দেয়, কিন্তু রোজ না। বেশীরভাগ দিনই রন্তু টাকাগুলো খরচ করে না, রেখে দেয় তার পুরোনো জ্যামিতি বক্সটার ভেতর। মাঝে মাঝে আমসত্ত্ব আর মালাই কুলফি খায়, এই দুটো খুব ভালো লাগে রন্তুর। ঘণ্টা বাজছে, টিফিন পিরিয়ড শেষ, সবাই ক্লাসের দিকে ছুটছে। পুরো মাঠ জুড়ে যেন ধুলোর তুফান।

ক্লাসে আসতেই রন্তু দেখল সবাই বই নিয়ে পড়ায় খুব ব্যাস্ত হয়ে পড়েছে, ঘটনা কি? আজও! আবার! উফ... রন্তুকে বিমর্ষ দেখালো। এখন মারজিনা ম্যামের ক্লাস, উনি জেনারেল নলেজ ক্লাস নেন, সপ্তাহে দুইদিন, বৃহস্পতিবার আর রবিবার। প্রায় সপ্তাহেই তিনি বৃহস্পতিবার হঠাৎ কুইজ নেন। রন্তু গত বৃহস্পতিবার স্কুলে আসে নাই, তাই সে জানে না। আর জানলেই বা কি? ম্যাম কোথা থেকে যে উদ্ভট উদ্ভট সব প্রশ্ন করেন, কেউ বুঝে উঠতে পারে না। পুরো সাধারণ জ্ঞান বই পড়ে শেষ করে ফেললেও কোন লাভ হয় নাই, ম্যাম এই আচমকা টেস্টে যেসব প্রশ্ন করেন, সেগুলো ঐ বইগুলোয় খুঁজে পাওয়া যায় না। আর মজার ব্যাপার হল, ম্যাম পরে বোর্ডে সেইসব প্রশ্ন এবং উত্তর লিখে দেন। সেগুলো স্টুডেন্টদের তুলে নিতে হয় খাতায় এবং নেক্সট ক্লাসে সেগুলো তিনি পড়া ধরেন। আজ যেমন ধরবেন!

রন্তু চুপচাপ তার সিটে গিয়ে বসে রইল, পাশ থেকে তোতোন কয়েকবার তাকে ওর খাতা থেকে পড়তে বলল, কিন্তু রন্তুর মন চাইছে না। এইসব ছাইপাশ পড়তে ভালো লাগে না তার, আর এগুলো থেকে একটাও ফাইনাল এক্সামে আসবে না। আসবে সেই সাধারণ জ্ঞান বই থেকেই। একটু পর মারজিনা ম্যাম ক্লাসে এলেন, উনি সবসময়ই একটু দেরী করে ক্লাসে আসেন। ক্লাসে ঢুকেই তিনি বললেন, ‘এই যে লিটল লিটল বিচ্ছুরা, পড়া শিখে এসেছো?’ সবাই সমস্বরে উত্তরে জানালো হ্যাঁ। রন্তু বোকার মত ঘাড় নেড়ে না জানালো এবং মারজিনা ম্যামের তা চোখ এড়াতে পারলো না।

‘কি ব্যাপার রন্তু, ঘাড় নাড়ছো কেন?’

‘ম্যাম আমি গতদিন আসি নাই, তাই পড়া পড়ে আসি নাই।’

‘আচ্ছা তাই নাকি? ইয়েস, ইয়েস... গতদিন তোমাকে দেখি নাই। তো কোথায় গিয়েছিলে? মামা বাসা বেড়াতে? নাকি খালা বাসা?’ ম্যাম হেসে উঠলেন।

‘ম্যাম...জ্বর...জ্বর এসেছিলো...’

‘ও আচ্ছা! গুড গুড... ভালো বাহানা স্কুল কামাই দেবার। এখন বলো ইথুপিয়ার রাজধানীর নাম কি?’

‘ম্যাম জানিনা...’

‘না জানলেতো হবে না... যা ক্লাসের বাইরে গিয়ে নীল ডাউন হয়ে বসে থাক’

রন্তু মুখ গোঁজ করে দাঁড়িয়ে রইলো, সে মরে গেলেও এমনটা করতে পারবে না। বাইরে নীল ডাউন হওয়া মানে পুরো স্কুলের ছেলে মেয়েদের দেখা।

‘কিরে? কথা শুনিস না?’... মারজিনা ম্যাম কাছে এসে উনার ভয়াবহ শাস্তিটি দিলেন। দুই আঙ্গুলের মাঝখানে কাঠ পেন্সিল রেখে জোরে আচমকা চাপ দিলেন। মট করে একটা শব্দ রন্তুর চিৎকারের শব্দে ঢাকা পরে গেলো। ম্যাম রন্তুকে ছেড়ে দিয়ে অন্যদের দিকে মনোযোগ দিলেন। রন্তু তার আঙ্গুলের দিকে তাকিয়ে দেখে ফুলে টোল হয়ে আছে জায়গাটা, কেমন নীল হয়ে গেছে। প্রচণ্ড ব্যাথা হচ্ছে, ব্যাথায় রন্তুর চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।

রন্তু ব্যাথা নিয়ে কোনমত ক্লাস শেষ করল, ক্লাশ শেষ হতেই ওয়াশরুমে গিয়ে অনেকক্ষন পানি দিল ফুলে ওঠা আঙ্গুলটায়। পরের দুইটা ক্লাস কোনমতে পার করলো, একটুও মন বসাতে পারে নাই ক্লাসে। ম্যাথ রন্তুর খুবই প্রিয় সাবজেক্ট, সেই ম্যাথ ক্লাসেই সে মনোযোগ দিতে পারলো না। আজ ছিল জ্যামিতির ক্লাস, আঁকাঝোঁকার সাথে গনিত, রন্তুর খুব ভালো লাগে। কিন্তু আজ সেই জ্যামিতি ক্লাসেও রন্তুর মন বসে নাই। স্যারের কোন কথাই যেন মাথায় ঢুকছিলো না। ছুটির ঘণ্টা পড়তে রন্তু যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো।

আজ অনেকক্ষণ রন্ত একা একা ক্লাসে বসে রইল। সব ছেলে মেয়ে বের হয়ে গিয়ে যখন প্রায় মাঠ ফাঁকা, তখন সে মেইন গেটের দিকে পা বাড়াল। হাতে খুব ব্যাথা হচ্ছে, মারজিনা ম্যামটা এমনই, কিচ্ছু বুঝতে চায় না। তার জ্বর ছিল শুনেও বিশ্বাস করলো না, তাকে শাস্তি দিয়ে দিল। স্কুল এক্সামে কিন্তু জেনারেল নলেজে রন্তুই হাইয়েস্ট মার্কস পায়। রন্তু হঠাৎ আকাশে ঘুড়ি দেখল, নীল-সাদা ডোরাকাটা ঘুড়ি। ঘুড়ি দেখলেই রন্তুর খুব ভালো লাগে, মনে হয় সে যদি ঘুড়ি হতে পারতো! তবে ঐ ঘুড়ির মত নীলাকাশে উড়ে উড়ে সুদূরে হারিয়ে যেত।

স্কুল গেট দিয়ে বের হতেই রন্তু খুব বড় অবাক হল। রাস্তার অপর পাশে রন্তুর বাবা শিবলি দাঁড়িয়ে আছে। বাবাকে দেখে রন্তু যারপরনাই খুশী হল, কিন্তু সাথে সাথে প্রচণ্ড অভিমানও হল। এতদিনে সময় হল বাবার, সেই দুই মাস আগে এসেছিলো, আর আজ এলো। রন্তুকে বাবার বুঝি আর মনে পরে না! অভিমান করে রন্তু বাবাকে না দেখার ভান করে সোজা হাটতে লাগলো।

জাভেদ কিন্তু রাস্তার অপর পাড়ে দাঁড়িয়ে ছেলের কাণ্ড দেখছিল। ছেলেকে হাঁটা আরম্ভ করতে দেখে দৌড়ে গিয়ে ছেলের হাত ধরতেই রন্তু ‘উফ’ করে উঠলো। সেই আঙ্গুলটায় জাভেদের হাতের চাপ পড়েছিল।

‘কি হল রন্তু, এমন করছো কেন?’

‘কৈ, কিছু হয়নিতো। তুমি কবে এলে?’

‘আমি কবে এলাম? তুমি কিন্তু গেট থেকে বের হয়েই আমাকে দেখেছো...’

‘নাহতো...!’ রন্তু কপট অভিনয় করলো।

‘আমার সাথে মিথ্যে কথা বলবে না রন্তু। আমি মিথ্যে কথা একদম পছন্দ করি না’

রন্তু কিছু বলল না। মনে মনে বলল, তুমি যে দুই মাস এলে না? তোমার জন্য গতদিন ভিজে ভিজে বাসায় গেলাম, তিনদিন জ্বরে ভুগেছি... তুমি খুব খারাপ বাবা, তুমি খুব খারাপ।

‘কি হল রন্তু? কথা বলছ না কেন? আমার রাগ উঠাবে না কিন্তু...”

কথাটা বলেই জাভেদ থেমে গেল। রন্তু কেমন হিংস্র চোখে তার দিকে তাকালো মনে হল? নাহ, এ হয়তো তার দেখার ভুল। ঐতো রন্তু, মাথা নিচু করে হাঁটছে তার সাথে সাথে, এখনো রন্তুর কচি সরু হাতটি তার হাতে ধরা। দীর্ঘ দুই মাস পর ছেলেকে দেখছে, শায়লাকে দেখেনা কত দিন? জাভেদের রাগ! তার রাগ তাকে শেষ করে দিল। স্ত্রী, ছেলে, সংসার... সব। সব তছনছ হয়ে আজ এক যন্ত্রণার জীবন সে ভোগ করছে। তার এই যন্ত্রণা কি কেউ বুঝবে? কেউ বুঝবে না। অথচ তারই সন্তান, রন্তু কি সুন্দর, শান্ত, চুপচাপ প্রকৃতির হয়েছে। জাভেদ ছেলের হাত ধরে হেঁটে যাচ্ছে পিচ ঢালা পথ ধরে কোন অজানায়? এতো কাছে থেকেও সে আজ রন্তুর কত দূরে।


৫.
জাভেদ যে মেস বাড়িটায় থাকে তা মোটামুটি ভালোই বলা চলে, গতমাসে সে এখানে উঠেছে। এটাকে মেস বাড়ী বলা উচিত নয়, বাড়ী বলতে ঠিক যেমনটা বুঝায়, এটা ঠিক তেমনটা নয়। রুবেল নামের চাটগাঁও এর এক ছেলে ঢাকায় বদলী হয়ে এসছে, প্রাইভেট ব্যাংকের চাকুরী, উঁচু পদে মোটা অংকের সেলারি। তাই বাধ্য হয়ে ঢাকায় আসতে হয়েছে। গুলশান-১ এ তার অফিস বলে, মহাখালী ওয়্যারলেস গেটের কাছের তিন রুমের এই ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছে, তার একজন পার্টনার দরকার ছিল, টাকার সমস্যা না, সমস্যা ভদ্রলোক খালি বাসায় একা থাকতে ভয় পান। জাভেদের স্কুল ফ্রেন্ড মনিরও রুবেলের সাথে ঐ ব্যাংকে চাকুরী করে, তবে একটু নীচের পোষ্টে। যাই হোক, সেই সুত্র ধরে জাভেদের এই ফ্ল্যাটে ওঠা।

আগের কোন মেস বাড়ীতেই তার এডজাস্ট হচ্ছিল না, এক জায়গায় এক বোর্ডারের সাথে হাতাহাতি পর্যন্ত হয়েছে। মনির বলে, তার নাকি ধৈর্য কম এবং উগ্র মেজাজ আর রাগ; শায়লাও বলতো। কি জানি? জাভেদের মনে হয় কেউ আসলে তাকে বুঝতে পারে না, বোঝার চেষ্টা করে না। সে যে জিনিশগুলো অপছন্দ করে, তার চারিপাশের মানুষগুলো সবসময় সেই কাজগুলোই বেশী করে করবে। আর জাভেদ তাতে রিঅ্যাক্ট করলেই সে খারাপ হয়ে যায়, সত্যি আজব এই পৃথিবী!

আর এই এডজাস্ট করতে না পাড়ার জন্য আজ সে একা, সম্পূর্ণ একা, মুক্ত, পিছুটানহীন এক মানুষ, সুখী মানুষ। সুখী! সুখী কি তাকে বলা যায়? অথবা পিছুটানহীন? জাভেদ নিজেই মাঝে মাঝে নিজেকে বুঝতে পারে না। মাঝ রাতে যখন ঘুম ভেঙ্গে অবুঝ শিশুর মত সে ডুকরে কেঁদে উঠে, কেন? কোন অজানা কষ্টে। আগের মেসের রুমমেট একদিন মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে জাভেদকে কাঁদতে দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিলো। কি হয়েছে জিজ্ঞাসা করতে বলেছিল দুঃস্বপ্ন দেখেছি। পিছুটান কি সে নিজে এখনো বয়ে বেড়াচ্ছে না? নইলে কেন ছুটে যায় রন্তুর স্কুলে? সত্যি মাঝে মাঝে নিজের কাছেই নিজেকে বড় অচেনা লাগে জাভেদের।

এই মধ্য দুপুরে জাভেদের কিছু করার নেই। জাভেদ টুকটাক ব্যাবসা করতো আগে, বিয়ের আগে দিয়ে ভালোই জমে উঠেছিল ব্যাবসা। সব গুছিয়ে নিয়ে বিয়ে করেছিল শায়লাকে। কিন্তু বিয়ের পর থেকে কোন কিছু আর ভালো হতে লাগলো না। একটু আধটু মনোমালিন্য ধীরে ধীরে বাক-বিতন্দতায় রূপ নিলো। রন্তু জন্মের পর কিছুদিন ভালোই চলছিল, এরপর কথায় কথায় ঝগড়া শুরু হল জাভেদ আর শায়লা’র মাঝে। জাভেদ মানসিকভাবে সারাক্ষণ ভীষণ অস্থিরতার মধ্যে কাটাতে লাগলো, ব্যাবসা গেল খারাপের দিকে। শায়লা তাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার পর গ্রামের বাড়ীর সাথেও যোগাযোগ বন্ধ করে দিল, ব্যাবসা গুটিয়ে নিল। সব কিছুর সাথে গুটিয়ে নিল নিজেকেও। ব্যাংকে কিছু টাকা জমানো আছে তা দিয়ে এখন চলছে জীবন। একে কি চলা বলে? এতো জীবনকে বয়ে চলা।

জাভেদের চোখ গেল ফোনটার দিকে, রন্তুকে একটা ফোন করলে কেমন হয়? এতক্ষণে নিশ্চয়ই স্কুল থেকে ফিরে নাওয়া খাওয়া শেষ করে ফেলেছে ছেলেটা। জাভেদ ডায়াল ঘুরালো, ওপাশে রিং হচ্ছে।

‘হ্যালো?’ ফোন ধরেছে শায়লার মা। জাভেদ কোন শব্দ করলো না।

‘হ্যালো? এই কে? কথা বলছো না কেন?’

‘আমি জাভেদ...’

‘তুমি ফোন করেছো কেন?’ ওপাশ থেকে রাগী কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।

‘একটু রন্তুর সাথে কথা বলতাম...’

‘দেখো, তোমাকে আগেও বলেছি, এখনো বলছি। রন্তুর প্রতি তোমার এই আলগা আদর দেখানো বন্ধ কর। ছেলেকেতো নিজের কাছে নিয়ে রাখার মুরোদ নেই, তবে এই আদিখ্যেতা কেন?’

‘না...মানে...’

‘রাখো তোমার মানে। আর তোমার কাছে এই ছেলে থাকলে সেও তোমার মত পাগলই হবে। শোন আজকের পর আর কখনো তুমি ফোন করবে না। আর স্কুলে গিয়ে ছেলের সাথে দেখা করার নামে দয়া করে রন্তুর মাথায় তোমার পাগলামির বীজ ঢোকানো বন্ধ কর...’ বলেই ভদ্রমহিলা খট করে ফোন রেখে দিলেন।

জাভেদ ঘরের লাগোয়া এক চিলতে বারান্দাটায় এসে দাঁড়ালো, চোখ জ্বালা করছে। প্রচণ্ড ক্রোধে মাথার রগগুলি দপদপ করছে। লোহার গ্রিলে প্রচণ্ড আক্রোশে ঘুষি বসিয়ে দিয়ে একদলা থুথু বাইরের রাস্তার দিকে ছুড়ে ফেলল। এই বিশাল পৃথিবীতে এতো নিঃসঙ্গতা কেন? কেন কেউ কেউ তার মত এতো একলা, এতো অসহায়। কেন জীবনের গল্পগুলো ছিঁড়ে যাওয়া বইয়ের পাতার মত এতো বেশী এলোমেলো হয়ে গেল।

=====================
'রন্তু'র কালো আকাশ' প্রথমে একটি এক পর্বের ছোট গল্প আকারে লিখেছিলাম। কিন্তু 'রন্তু' আমার খুব প্রিয় একটি চরিত্র বিধায় আমি সিদ্ধান্ত নিই ২৫ পর্বের একটি ধারাবাহিক আকারে উপন্যাস লিখবো (যদিও জানি সে যোগ্যতা আমার নেই, তারপরও অপচেষ্টা আরকি)। সেই থেকে এই লেখা। তবে প্রতিটি পর্ব আমি এমনভাবে লেখার চেষ্টা করছি যেন একেকটা পর্বই একটা ছোট গল্প হিসেবে পাঠক পড়তে পারে। গত জুলাই মাসে শেষ পর্ব-৪ লিখেছিলাম। এরপর অনেক লম্বা বিরতি পড়ে গেল। তাই নতুন করে শুরু করা, পর্ব-৫ সহ একসাথে পাঁচ পর্ব দিয়ে পোস্ট করলাম। এখন থেকে প্রতি একদিন বিরতি দিয়ে এই ধারাবাহিক উপন্যাস হিসেবে এগিয়ে নেবো। একজন পাঠক হিসেবে আপনাদের পাশে পাবো আশা রাখি। রন্তু আমার খুব প্রিয় একটা চরিত্র, আর তাই আমি এই উপন্যাস শেষ করবোই, আর তা সম্ভবত ২৫ পর্বে। সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৪ বিকাল ৩:৫১
৯টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শাহ সাহেবের ডায়রি ।। রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা ও পদ্মশ্রী পুরস্কার

লিখেছেন শাহ আজিজ, ২৩ শে এপ্রিল, ২০২৪ সকাল ১১:৫৬



এ বছরের পদ্মশ্রী (ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মাননা) পদকে ভূষিত করা হয়েছে, বাংলাদেশের রবীন্দ্র সংগীত এর কিংবদন্তি শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যাকে।

আমরা গর্বিত বন্যাকে নিয়ে । ...বাকিটুকু পড়ুন

কষ্ট থেকে আত্মরক্ষা করতে চাই

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২৩ শে এপ্রিল, ২০২৪ দুপুর ১২:৩৯



দেহটা মনের সাথে দৌড়ে পারে না
মন উড়ে চলে যায় বহু দূর স্থানে
ক্লান্ত দেহ পড়ে থাকে বিশ্রামে
একরাশ হতাশায় মন দেহে ফিরে।

সময়ের চাকা ঘুরতে থাকে অবিরত
কি অর্জন হলো হিসাব... ...বাকিটুকু পড়ুন

রম্য : মদ্যপান !

লিখেছেন গেছো দাদা, ২৩ শে এপ্রিল, ২০২৪ দুপুর ১২:৫৩

প্রখ্যাত শায়র মীর্জা গালিব একদিন তাঁর বোতল নিয়ে মসজিদে বসে মদ্যপান করছিলেন। বেশ মৌতাতে রয়েছেন তিনি। এদিকে মুসল্লিদের নজরে পড়েছে এই ঘটনা। তখন মুসল্লীরা রে রে করে এসে তাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

= নিরস জীবনের প্রতিচ্ছবি=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ২৩ শে এপ্রিল, ২০২৪ বিকাল ৪:৪১



এখন সময় নেই আর ভালোবাসার
ব্যস্ততার ঘাড়ে পা ঝুলিয়ে নিথর বসেছি,
চাইলেও ফেরত আসা যাবে না এখানে
সময় অল্প, গুছাতে হবে জমে যাওয়া কাজ।

বাতাসে সময় কুঁড়িয়েছি মুঠো ভরে
অবসরের বুকে শুয়ে বসে... ...বাকিটুকু পড়ুন

Instrumentation & Control (INC) সাবজেক্ট বাংলাদেশে নেই

লিখেছেন মায়াস্পর্শ, ২৩ শে এপ্রিল, ২০২৪ বিকাল ৪:৫৫




শিক্ষা ব্যবস্থার মান যে বাংলাদেশে এক্কেবারেই খারাপ তা বলার কোনো সুযোগ নেই। সারাদিন শিক্ষার মান নিয়ে চেঁচামেচি করলেও বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরাই বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে সার্ভিস দিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×