গত কিছুদিনে দেশের প্রতিটি মানুষের কাছে আলোচ্য বিষয় হল ভ্যাট। সেই নব্বইয়ের দশকের শুরুতে প্রচলিত এই ভ্যাট সম্পর্কে প্রায় সকল মানুষই অবগত। পোশাক, ঔষধ, খাদ্যদ্রব্য থেকে শুরু করে মোবাইল কল, ইন্টারনেট বিল, পানি-বিদ্যুৎ-গ্যাস প্রতিটি ক্ষেত্রে ছিল ভ্যাট। এখন যোগ হয়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি এর উপর ভ্যাট। নানান কাহিনীর পর সরকার এখন বলছে এই ভ্যাট দিবে বিশ্ববিদ্যালয়, ছাত্রছাত্রীরা নয়। শুধু মন্ত্রী-আমলা নয়, খোদ রাজস্ব বোর্ড এমনটা বলছে। আসলে ঘটনা কি?
প্রথমে আমি বলি ভ্যাট জিনিষটা কি? ভ্যাট হল ভ্যালু এডেড ট্যাক্স। অর্থাৎ কোন পণ্য বা সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে প্রতিটি ধাপে যে পরিমাণ ভ্যালু অ্যাড হবে, তার উপর একটি নির্দিষ্ট হারে ট্যাক্স দিতে হবে প্রান্তিক ভোগকারীকে। সহজভাবে একটা উদাহরণ দেই, মনে করুন একটি শার্ট আমি বা আপনি কিনব। এখানে কি হবে? প্রথমে সুতা উৎপাদনকারী যে তুলা কিনে সুতা তৈরি করবে সেখানে সে ভ্যাট দিয়ে আসবে। এটা তার ইনপুট ভ্যাট। মনে করেন ১০০ টাকার তুলা কেনা হল, সেখানে ১০% (ধরে নেয়া হল) ভ্যাট চার্জ হল, মোট খরচ হল ১১০ টাকা। এই ১০ টাকা ভ্যাট কিন্তু ঐ তুলা উৎপাদনকারী সরকারের কোষাগারে জমা দিবে। এখন এই ১১০ টাকার ভ্যাটযুক্ত সুতা দিয়ে যে কাপড় তৈরি হল তার মোট খরচ হল আরও ৯০ টাকা। ফলে কাপড়ের মোট মূল্য দাঁড়াল ২০০ টাকা। এই ২০০ টাকা খরচের কাপড় ১০% মুনাফায় পোশাক প্রস্তুতকারকের কাছে বিক্রয় করল সেই কাপড় প্রস্তুতকারক। ফলে তার বিক্রয়মূল্য দাঁড়াবে ২২০ টাকা। এর উপর দিতে হবে মনে করে আবার ১০% ভ্যাট। তাহলে মোট মূল্য দাঁড়াবে ২৪২টাকা। এখন এই ২২ টাকা কিন্তু ঐ প্রস্তুতকারকের আউটপুট ভ্যাট, ইনপুট ভ্যাট ছিল সুতা কেনার সময় দেয়া ভ্যাট ১০টাকা। এখন তাকে অবশিষ্ট ১২ (২২-১০) টাকা সরকারের কোষাগারে জমা দিতে হবে। এখন এই কাপড় দিয়ে পোশাক প্রস্তুতকারক অন্যান্য উপকরন এবং শ্রম যুক্ত করে যে শার্ট তৈরি করল তার মোট খরচ ধরে নিলাম আরও অতিরিক্ত ৫৮ টাকা। তাহলে মোট খরচ দাঁড়াল ৩০০ টাকা। এর উপর সে আরও ৫০ টাকা মুনাফা যোগ করে আমাদের মত সাধারণ ভোক্তার কাছে ৩৫০ টাকায় বিক্রয় করল, এখানেও যদি ১০% ভ্যাট ধরে নেয়া হয়, তাহলে মোট মূল্য দাঁড়ায় ৩৮৫ টাকা। এখানে পোশাক প্রস্তুতকারকের জন্য ইনপুট ভ্যাট ছিল ২২ টাকা আর আউটপুট ভ্যাট হল ৩৫ টাকা, ফলে সরকারী কোষাগারে জমা দিতে হবে (৩৫-২২) ১৩ টাকা।
এখন ব্যাপারটা সংক্ষেপে বুঝিয়ে বলা যাক। ইনপুট ভ্যাট হল যখন কোন প্রস্তুতকারক তার কাঁচামাল কেনার জন্য ভ্যাট প্রদান করেন। আর আউটপুট ভ্যাট হল যখন ঐ প্রস্তুতকারক যখন তার তৈরিকৃত পণ্য বিক্রয় করে কাস্টমার এর নিকট হতে ভ্যাট গ্রহণ করেন। যেহেতু উনি প্রথমে ইনপুট ভ্যাট প্রদান করেছেন, তাই ভ্যাট আইন অনুযায়ী উনি কাস্টমার হতে যে ভ্যাট গ্রহণ করেছেন, সেখান হতে উনার সেই ইনপুট ভ্যাট কেটে রেখে বাকীটাকা সরকারী কোষাগারে জমা দিবেন। এভাবে প্রতিধাপে প্রদানকৃত ভ্যাট ক্যারি ফরওয়ার্ড হয়ে প্রান্তিক ভোক্তা তথা কনজিউমারের উপর বর্তায়। এটাই হল আমাদের দেশের বিদ্যমান ভ্যাট আইন অনুযায়ী নিয়ম।
তাহলে দেখা যাচ্ছে, শেষ পর্যন্ত ভ্যাট দিচ্ছে চূড়ান্ত ভোগকারী তথা কনজিউমার। এটাই স্বাভাবিক, কারণ ভ্যাট হচ্ছে ভোক্তার ট্যাক্স। উৎপাদক বা বিক্রেতারা দিচ্ছে কাস্টমস ডিউটি, ইনকাম ট্যাক্স সহ অন্যান্য প্রযোজ্য ট্যাক্সগুলো। বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় এই ভ্যাট হাইড করার জন্য, সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের সাথে ভ্যাট যোগ করে বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করে থাকে। বেশীরভাগ খাবার প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এই কাজ করে থাকে। এটা একটা সাধারণ চলমান প্রক্রিয়া। এমনকি বিমান টিকেট থেকে শুরু করে সাধারণ ঔষধে লেখা থাকে দেখবনে, সকল প্রযোজ্য ভ্যাট এবং ট্যাক্স সংযুক্ত।
এখন আসুন শিক্ষাখাতে ভ্যাট নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বলছে ভ্যাট দিবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কেন? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তো কোন ইনপুট আইটেম নিয়ে আসছে না, তাই না? তাই তার ইনপুট ভ্যাট নেই। তাহলে তার আউটপুট ভ্যাট হবে ছাত্রছাত্রীদের কাছ হতে নেয়া টিউশন ফি’র টাকা হতে কেটে নেয়া ভ্যাট। এখন যদি স্টুডেন্ট ভ্যাট না দেয়, তাহলে তাদের টিউশন ফি হতে সরকারকে এই ৭.৫% টাকা দিয়ে দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, ভার্সিটির জন্য এটা কিন্তু রেভিনিউ এর উপর ৭.৫%, মুনাফার উপর নয়। একটা উদাহরণ দেই, মনে করুন কোন একটা কোম্পানির সাধারণ ট্যাক্স রেট হল ২০%, এখন সে যদি এক লক্ষ টাকা বিক্রয় করে এবং সেখান থেকে ত্রিশ হাজার টাকা তার নিট লাভ হয়, তাহলে তাকে ট্যাক্স দিতে হবে ছয়হাজার টাকা মাত্র। আর এই এক লক্ষ টাকা যদি কোন ভার্সিটির টিউশন ফি হয়, তাহলে তাকে ভ্যাট বাবদ দিয়ে দিতে হবে সাড়ে সাত হাজার টাকা!
তাহলে কি ভার্সিটিগুলো তাদের এই মোট টিউশন ফি’র সাড়ে সাত শতাংশ সরকারকে দিয়ে দিচ্ছে? কারণ, এখনো কোন ভার্সিটি থেকে কোন প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় নাই। কারণ, এটা কখনই হবে না। যেটা হবে সেটা হল, মোট টিউশন ফি’র কমপক্ষে ৭.৫% বৃদ্ধি হবে, কোন কোন ক্ষেত্রে আরও বেশী। এটা হবেই, এখন যে যাই বলুক না কেন। কারণ, ভ্যাট হল কাস্টমারের ট্যাক্স, আরও বিশদে বললে কনজিউমারের ট্যাক্স। তাই, এটা কখনো উৎপাদক বা বিক্রেতা প্রদান করে না, যেমনটা করবে না শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। দুঃখ লাগে আমাদের প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী সবাই জোর দিয়ে বলছেন, ভ্যাট ছাত্রছাত্রীদের দিতে হবে না। কথা হল, ভ্যাট আইনে এই বাজেটে সংশোধনী আনা হোক, যেখানে নিয়ম করে দেয়া হোক, বর্তমানে যে টিউশন ফি আছে, সেটা বহাল থাকবে এবং সেই টিউশন ফি হতে সাড়ে সাত শতাংশ ভ্যাট প্রদান করতে হবে। এটা কখনই হবে না, হওয়া সম্ভব না। কারণ, ভ্যাট, ট্যাক্স আইনের নিজস্ব একটি স্বরূপ আছে, ধারা আছে, সারা বিশ্বব্যাপী। এর বাইরে আপনি আমি নতুন ধারা শুরু করতে পারি না।
আরেকটি ব্যাপার বলে শেষ করছি, প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি কিন্তু সেবাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। তাদের রেভেনিউ এর প্রায় পুরোটাই খরচের খাতে দেখানো হয় (খরচ করুক আর না করুক )। যাই হোক, তারা যদি তাদের এই রেভেনিউয়ের ৭.৫ শতাংশ ভ্যাট বাবদ দিয়ে দেয়, তাহলে এটা তো ভ্যাট হবে না, হবে ট্যাক্স। কথা হল, দেশের বড় বড় কর্পোরেট হাউজের প্রদত্ত ট্যাক্স কিন্তু তাদের নিট মুনাফার উপর প্রদত্ত, রেভিনিউয়ের উপর নয়। যদি সেই ট্যাক্সকে রেভিনিউয়ের শতাংশে হিসেব করে দেখা হয়, দেখা যাবে তা রেভিনিউয়ের ৫ শতাংশও হবে না। তাহলে একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিভাবে তার রেভিনিউ থেকে ৭.৫ শতাংশ সরকারকে দিয়ে দেবে? পুরাই মফিজ হয়ে গেলাম ভাই ।
তাই শেষ কথা হল, ভ্যাট কিন্তু শিক্ষার্থীকেই দিতে হবে, ডিরেক্ট অর ইনডিরেক্ট। সরকার মহাশয় তো বলছেন না, দিতে হবে না। তাই আমার এতদিনের শেখা ভ্যাট এবং ট্যাক্স বিষয়ক জ্ঞান আজ অপ্রতুল ঠেকছে। সরকারের কাছে আমার একটাই আবেদন, প্লিজ একটু ভ্যাট শেখাবেন!
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৫ দুপুর ১:১৪