somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্রথম আলো থেকে: হিন্দুত্ববাদের আসল রূপ (রি:পোষ্ট)

১৫ ই নভেম্বর, ২০০৮ রাত ২:২৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বলতে গেলে ২০০৮ সালের পুরোটা সময়ই ভারতে এক তথাকথিত ধারাবাহিক বোমা হামলা চলেছে। কিছুদিন পরপর রাজধানী, তীর্থস্থান, রাজ্যের রাজধানীসহ বিভিন্ন নগরে চলেছে ধারাবাহিক বোমা হামলা। এতে হতাহত হয়েছে বহু লোক। অনেকে চিরদিনের মতো পঙ্গু হয়ে গেছে। ঘটনার পর সরকার ও বিরোধী দল একে অন্যকে দুষেছে। সবাই ‘আতঙ্কবাদী’দের গালমন্দ করেছে। পাকিস্তানকে দায়ী করেছে। এরপর সন্দেহের তীর ছোড়া হয় বাংলাদেশের দিকে। অভিযোগ করা হয়, বাংলাদেশে আশ্রিত পলাতক ভারতীয় আর তাদের সহযোগী বাংলাদেশি চরমপন্থীরাই কাজটা করছে। প্রায় প্রতিটি ঘটনায় এভাবে সংবাদমাধ্যমগুলোয় খবর আসে, অভিযোগ করা হয় এবং সন্দেহের তীরটা ছোড়া হয়।

এরপর কিছু গ্রেপ্তার, হাতে আঁকা কিছু সন্দেহভাজনের ছবি প্রকাশ, নিন্দা, সতর্কবাণী, ব্যর্থতার অভিযোগ আর শেষে একঘেয়েমির রাজনীতির রশি টানাটানির মধ্যেই ঘটনাটা চাপা পড়ে যায়। মাত্র দু-একটি ঘটনা ছাড়া কোনো বোমা হামলা ঘটনার কুল-কিনারা হয়নি। গত ২৯ সেপ্টেম্বর মহারাষ্ট্রের মালেগাঁওয়ে যে বোমা হামলা হয় তা ছিল ছোট, আর এখন সেই ঘটনার তদন্তে যা প্রকাশিত হলো তা ভারতবাসী ও পর্যবেক্ষকদের বিস্িনত করেছে। সবাই এখন দেখছে মুসলিম জঙ্গিদের পাশাপাশি হিন্দু জঙ্গিরাও তো কম যায় না। বজরং দল, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি), রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ (আরএসএস), অভিনব ভারত নামের সংগঠনগুলোর চরিত্র যে কেমন তা আজ দিনের আলোর মতো পরিষ্ককার। অনেকের উপলব্ধি হচ্ছে, এদের চরিত্রটা জানতেন বলেই ইন্দিরা গান্ধী আনন্দমার্গ ও আরএসএসকে নিষিদ্ধ করে রেখেছিলেন।

সবাই আজ এ কথা মানছে যে ভারতে সন্ত্রাস শুধু বিদেশ (পাকিস্তান) থেকে আসে না, সেটা দেশের মধ্য থেকেও করা হয়। হীন রাজনৈতিক স্বার্থে যারা এ কাজগুলো করছে, তাদের কেউ সাময়িক রোষের বশবর্তী হয়ে নয়, তাদের কেউ এ কাজে একেবারে কাঁচাও নয়। ভিএইচপি বা বজরং দলের সঙ্গে এরা ঘনিষ্ঠ এবং চক্রান্তগুলো সেই দলগুলো থেকেই আসে। সাধ্বী প্রজ্ঞা সিং ঠাকুর এবং তার দুষ্ককর্মের সহযোগীদের গ্রেপ্তার ভারতে চরম দক্ষিণপন্থী ও হিন্দুত্ববাদী দলগুলোর আসল ও কদর্য রূপের ওপরই আলোকপাত করে। ঈদের সময় মসজিদে বোমা হামলা করে চারজনকে হত্যার ঘটনায় এরাই আসলে জড়িত।

এ বছরের বোমা হামলার তদন্তগুলোয় বিজেপির ছাত্র সংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ, হিন্দু জাগরণ মঞ্চ ও অভিনব ভারত নামের সংগঠনের জড়িত থাকার কথা এসেছে। তদন্তকারী সংস্থা এটিএসের টেপ করা কথাবার্তা থেকে জানা যায়, গ্রেপ্তার হওয়া ওই তথাকথিত সাধ্বী প্রজ্ঞা সিং ঠাকুর হামলায় কম লোক মারা যাওয়ায় তাঁর পলাতক সহযোগী রামজি কালসাগ্রেকে বকছেন।

২.
এ ঘটনায় মহারাষ্ট্র ও মধ্যপ্রদেশের বেশ কিছু ছোট ছোট উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের কর্মী, অভিনব ভারতের কর্মী সমীর কুলকার্নি এবং পুনার অবসরপ্রাপ্ত মেজর রমেশ উপাধ্যায় গ্রেপ্তার হন। এই মেজরই আরডিএক্স নামের বিস্কোরক সংগ্রহে সাহায্য করেন। এরাই একই দিন গুজরাটে মোদাসা এবং মালেগাঁওয়ে বিস্কোরণ ঘটান। তদন্তে জানা যাচ্ছে, দিল্লি ও বেনারসে হামলায় প্রতিশোধ নিতে এবং হিন্দুত্ব বজায় রাখতে লক্ষণ রাজকোনদোওয়ার নামে এক অবসর নেওয়া প্রকৌশলী দুই বছর আগে আওরঙ্গাবাদে এক মসজিদে জুমার আগে বোমা পাতেন। লক্ষ্য ছিল ৩০০ থেকে ৪০০ মুসলিমকে হত্যা করা।

রমেশ উপাধ্যায়কে জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, মিঠুন চক্রবর্তী নামে এক লোক পুনার সিংগড়ে ভিএইচপির সদস্যদের বিস্কোরক ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন এবং সেখানে প্রবীণ তোগাড়িয়ার মতো নেতা ওই সদস্যদের উদ্দেশে ভাষণও দেন। নাগপুরের ভোঁসলে সামরিক স্কুলের শিক্ষক সনৎকুমার রঘুভিট্টল ভাটের ভাষ্যমতে, ২০০০ সালে শ দেড়েক ভিএইচপির কর্মী সামরিক প্রশিক্ষণ নেয়। তখন সেনা ও নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা তাদের সব ধরনের যুদ্ধবিদ্যায় প্রশিক্ষিত করেন। এটিএস বলছে, গুড়ি পাড়ওয়া, বিজয়া দশমী, গণেশোৎসব কিংবা রামনবমীর মতো ধর্মীয় উৎসবগুলোয় মুসলিমবিদ্বেষ ছড়ানো হয় সুপরিকল্পিতভাবে। ফলে কোনো কোনো কর্মী তাদের ঘর, দোকানপাট বা ব্যায়ামাগারকে অস্ত্র লুকানোর কাজে ব্যবহার করেন।

৩.
মালেগাঁওয়ে বিস্কোরণের মামলার তদন্তটা চলে ভারতের সবগুলো তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ে। তাই এটিএস কর্মকর্তারা এখন দেশের হিন্দুত্ববাদী চরম দক্ষিণপন্থী সংগঠনগুলো ও তার নেতা-নেত্রীদের চিহ্নিত করতে পেরেছেন। মুম্বাই এটিএস কয়েক মাস আগে সন্তান সংস্থা ও হিন্দু জাগরণ মঞ্চের কয়েকজন কর্মীকে গ্রেপ্তার করলে ভিএইচপি ও বজরং সারা দেশে বিক্ষোভ করেছিল।

গোয়েন্দা সংস্থার মতে, গত দুই বছরে মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ ও রাজস্থানে বেশ কিছু ছোট ছোট চরমপন্থী সংগঠনের সৃষ্টি হয়েছে। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোই তাদের পৃষ্ঠপোষক। এ বছর উড়িষ্যার কান্ধামাল এবং মহারাষ্ট্রের ধুলে ও বুরহানপুরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় এই ছোট সংগঠনগুলো ন্যাক্কারজনক ভুমিকা রাখে। বজরং দলের মহিলা সংগঠনের নাম দুর্গাবাহিনী। আরেক সংগঠন হিন্দু রক্ষা সমিতি ভুলের দাঙ্গা লাগায়। এটি শিবসেনার সংগঠন। আরএসএস ভেঙে গঠিত রাষ্ট্রীয় জাগরণ মঞ্চ মোদাসায় বোমা হামলা চালায়। মালেগাঁও বোমা হামলার তদন্তে অভিনব ভারত নামের যে সংগঠনের নাম এসেছে তার এক নেত্রীর নাম হিমানী সাভারকর। তিনি হলেন মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকারী নাথুরাম গডসের নিকটাত্মীয় হিমানী হিন্দুত্ববাদী আরেক নেতা বীর সাভারকরের এক নিকটাত্মীয়ের স্ত্রী।

৪.
সংগঠনগুলো সৃষ্টি ও পৃষ্ঠপোষকতার ইতিহাসের মতো তাদের সঙ্গে থাকা অস্ত্রভান্ডার এবং প্রশিক্ষণ রীতিমতো আশঙ্কাজনক ও ভীতি সৃষ্টিকারী। তাদের হাতে আছে আরডিএক্স ও অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট। আর সঙ্গে আছে সাবেক সেনা কর্মকর্তারা। এমন লোকই ভোঁসলে সামরিক স্কুলে তাদের প্রশিক্ষণ দেয়। সম্প্রতি সৃষ্ট বেশ কয়েকটি চরম হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সদস্যরা এই স্কুলে প্রশিক্ষণ নিয়েছে। দেশে এত চরম হিন্দু সংগঠনের আবির্ভাব এখন মূল রাজনীতিতে থাকা বিজেপি ও বজরং দলকে বেশ বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিয়েছে।

প্রজ্ঞা সিং ঠাকুরের সঙ্গে সম্পর্কটা বিজেপিতে বিপাকেই ফেলে দেয়। শুরুতে অস্বীকার করলেও শেষে তারা প্রজ্ঞার পক্ষেই বলতে থাকে। শিবসেনাও তার পক্ষ নেয় এবং আইনি সাহায্যের হাত বাড়ায়। তবে ভিএইচপি ও বজরং দল এ ব্যাপারে নিশ্চুপ আছে বলা যায়। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভিএইচপির কর্মীরা জানায়, সাধ্বী যাতে সবকিছু থেকে রেহাই পান সে জন্য তারা নেপথ্যে কাজ করে চলেছে। এরাই সংবাদমাধ্যমগুলোর পক্ষপাতিত্বের কথা বলে পুস্তিকা ও প্যাম্ফলেট ছেড়েছে। সাধ্বীর আশ্রমটি সৌদি আরব থেকে সাহায্য পায় বলে ভুয়া কাগজপত্রও তারা সংবাদপত্রের অফিসে পাঠায়।

৫.
লোকসভা নির্বাচন আসন্ন হওয়ায় বিজেপির মতো কংগ্রেসও এখন পিঠ বাঁচাতে আত্মরক্ষায় নেমেছে। কারণ, মালেগাঁও বিস্কোরণ মামলার প্রকৃত ঘটনা উদঘাটিত হলে তা নির্বাচনে কংগ্রেসের বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। অবস্থা দেখে বিচারপতি কোলাম পাতিল বলেন, তদন্ত কিছুদিন চলার পর দেখা যায় সেটা কীভাবে পক্ষপাতদুষ্ট হচ্ছে। আর বর্তমানে এই তদন্ত দেখে বোঝা যায় কংগ্রেস কীভাবে সংখ্যালঘুদের ভোট সংগ্রহের ব্যবস্থা করছে। তাই এখন আগেই বলে দেওয়া যায় যে পরে দেখা যাবে যে উপযুক্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ না থাকায় দোষী বা অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে।

তবে এখানে এটুকু বলা যায় যে ভারতে তদন্ত সংস্থাগুলোর মুখ কিছুটা হলেও খুলেছে। দেশে নতুন ধরনের সন্ত্রাসের উৎস ও তার কারণ তারা কিছুটা হলেও খুঁজে পেয়েছে। বারবার বিদেশিদের দায়ী না করে এবার তারা আয়নায় মুখ দেখল। দেশের ভাবী প্রধানমন্ত্রী (!) বলে পরিচয় দেওয়া লালকৃষ্ণ আদভানি বলেছেন, দায়ীকেই শাস্তি দেওয়া হোক। মালেগাঁওয়ের তদন্ত শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকে তা দেখার জন্য কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই নভেম্বর, ২০০৮ রাত ২:২৬
১২টি মন্তব্য ১০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×