এই লেখাটি উৎসর্গ করছি বন্ধুপ্রতিম ব্লগার “ভাঙ্গা পেন্সিল”কে, আর সেই সাথে ঘৃণা প্রকাশ করছি সকল প্রকার বিভৎসতার প্রতি
একটু আগে জানাযা হল আমার। গত ৭দিনের তীব্র যন্ত্রণা আর জীবন-মৃত্যুর ওবামা-ম্যাকেইন বিতর্কে আজ মৃত্যুই শেষ হাসি হাসল।
মৃত্যুর আগপর্যন্ত আমি পড়তাম বুয়েটে, আর মাত্র ১টি সেমিস্টার বাকি ছিল শিক্ষাজীবনের।আমার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রাম।
বৃহস্পতি-শুক্র দুদিন আমাদের ক্লাস বন্ধ থাকে। বাবার শরীরটা খুব ভালো যাচ্ছিলনা কয়েকদিন যাবৎ, গতমাসে মৃদু স্ট্রোক হযে গেছে একটা, মা’ও শুনলাম হঠাৱ রান্না করতে গিয়ে হাত পুড়িয়ে ফেলেছে। তাই বুধবার ক্লাস শেষেই বাড়ি যাব বলে ঠিক করেছিলাম।মা অবশ্য বলছিল আসার দরকার নেই, কারণ টার্ম প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, এ মুহুর্তে বাড়ি আসলে থিসিসের কাজে চাপ পড়বে; আমি তখন মুখে সম্মতি দিলেও পরিকল্পনা ছিল হঠাৱ সকালে হাজির হয়ে মা আর মিলিকে চমকে দেব। মিলি আমার ছোটবোন, নবম শ্রেণীতে পড়ে।
বুধবার ক্লাসে মন বসছিলনা কোনভাবেই, মা’র হাতের শিংমাছ রান্না খাব, মিলির কান টেনে চুলে গেড়ো লাগিয়ে দেব, বেচারি কাঁদতে থাকবে, আর ঠিক সেই মুহুর্তে ওর হাতে সমরেশ মজুমদারের ‘উত্তরাধিকার’ বইটি তুলে দেব_ এই বইয়ের জন্য মাথা খারাপ হয়ে গেছে ওর। বান্ধবীরা পড়েছে, এমন ফাটাফাটি বই না পড়লে তার চলবেনা। মা’তো কিছুতেই পড়তে দেবেনা; এইসব উপন্যাস পড়লে নাকি পড়াশোনা শিকেয় উঠবে।তাই আমি নিশ্চিত, এই কান টানা খেযে আর জটবদ্ধ চুলের মধ্যেও এই বইটি ওর হাতে দিলে এই বয়সেও “ও’ লাফিযে আমার কোলে উঠে পড়বে। এইসব রোমাঞ্চকর ভাবনার বাড়াবাড়িতে উত্তেজনায় শেষ ক্লাসটা আর করাই হলনা। তার চেয়ে বরং আজিজ সুপারে বই কিনতে যাওয়াটাকেই পবিত্রতম দায়িত্ব বলে মনে হয়েছিল।
আমার বাস ছেড়েছিল রাত ১১টায়। সাধারণত দূরপাল্লার বাসগুলি এরকম অদ্ভুত সমযেই ছাড়ে। মা বলত বাসে নাকি সবসময় বামপাশে বসতে হয। আমি অবশ্য ডান-বাম হিসেব করতাম না_ টিকেট অনুযায়ী যেখানে সিট নির্ধারিত থাকত সেখানেই বসতাম। সেদিন পড়ল ডানপাশে। এমনিতে বাসে অনেকেই দেখতাম পাশের যাত্রীর সঙ্গে খোশগল্প জুড়ে দেয়। একেতো আমি অন্তর্মুখী স্বভাবের, তার উপর রাত্রিকালীন ভ্রমণে গল্প করার মত বিড়ম্বনা আর নেই।সবদিক বিবেচনায় আমি মোবাইলে গেম খেলাতেই মনোনিবেশ করেছিলাম, আর কিছুক্ষণ পর পর ব্যাগ খুলে নিশ্চিত হচ্ছিলাম “উত্তরাধিকার” বইটি আছে তো! ইচ্ছে হচ্ছিল বাসের জানালা খুলে দেই, খুব বদ্ধ বদ্ধ লাগছিল ভেতরে, কিন্তু সহযাত্রীর প্রতিক্রিয়া লক্ষ করে সাহসে কুলোয়নি। আমি তাই শুধু খেলছিলাম, খেলছিলাম....................আমাদের বাসটা প্রচণ্ড গতিতে একটা ট্র্রাকের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে একদিকে হেলে পড়ল, ট্রাকটিতেও তরল জাতীয় কিছু একটা বহন করা হচ্ছিল বোধহয় ড্রামে করে........ ....বেশ কয়েকটি ড্রামের ঢাকনা খুলে গেল এবং সেগুলো তরলসহ আমাদের বাসের ভিতরে আছড়ে পড়ল। পুরো ঘটনাটি ঘটল কয়েক মাইক্রো সেকেণ্ডের মধ্যে, তাই হঠাৱ করেই আবিষ্কার করলাম কেউ যেন বোরাকের দ্রুততায় আমিসহ বাসের সামনের দিকের যাত্রীদের গায়ে সেই তরল ঢেলে দিল, এরপর?..........আহ, উহ, ওরে মা, ওরে মা’ রে, আহ....... আমাকে ফার্নেসে নিক্ষেপ করল কে?আমি দগ্ধ হয়ে কয়লা হয়ে যাচ্ছি বোধহয়, আমার চোখ একটা কেন, আন্যটি গেল কোথায়?, আমাকে কি জিওনার্দো ব্রুনোর মত পুড়িয়ে মারতে চাইছে এই ড্রামের তরল?হে খোদা, আমি কি তবে অনেকদিন আগেই মৃত্যুবরণ করে দোযখের বিধান পেয়েছি, একেই কি বলে নরক যন্ত্রণা!!!হায় হায়, আমাকে ক্রমেই পুড়িয়ে নিঃশেষ করা ড্রামের এই তরলতো অন্যকিছু নয়, রীতিমত সালফিউরিক এসিড....!!!
আমার কফিন ঘিরে হাজারো বেদনার্ত চেহারা দেখতে পাচ্ছি। এদের কেউ কেউ আমার চেনা, বাকিদের বেশির ভাগকেই জীবদ্দশায় কখনো দেখিনি। মৃত্যুর এ এক আশ্চর্য ক্ষমতা- কী ভীষণ আয়েশে পরম অপরিচিতকেও জানাযায় শরিক করে দেয়। হ্যা ওইতো সুমন আমার শিয়রে দাড়িয়ে আছে ভাবলেশহীন মুখে_এইতো গত বুধবারও স্টার কাবাবে গেলাম রাত বারোটায় ৩-৪জন মিলে। স্টার-পেনাং ,এই হোটেলগুলোতে সপ্তাহে অন্তত একবার না গেলে আমাদের রসনা বিদ্রোহ করে বসত রীতিমত_ প্রতিদিন হলের এই একঘেয়ে খাবারের অম্লস্বাদ(!) গ্রহণ করতে রসনা রাজী হবেই বা কেন! সুমনরা হয়ত সামনে সপ্তাহেই আবার যাবে, কিন্তু আমি?এরকম ভাবনা-অনুভুতির বহু উর্ধ্বে উঠে গিয়ে এখন আমি রুহ হয়ে গিয়েছি; বাতাসের মত সর্বত্র বিচরণ করতে পারছি, ইচ্ছে হলেই হোয়াইট হাউস দেখে আসছি, তো পরক্ষণেই চলে যাচ্ছি লুভর মিউজিয়ামে, সেখান থেকেই আবার প্রত্যাবর্তন করছি জানাযাস্থলে।
“না ভাই মুখ দেখানো যাবেনা, সহ্য করতে পারবেনা”- আচ্ছা সুমন এমন কথা বলছে কেন আমার কফিনের সামনের লোকটাকে?আমি কি এতটাই বিভৎস হয়ে গিয়েছিলাম দেখতে? মানুষতো বলতো আমার মুখাবয়বে এই বয়সেও শিশুসুলভ কমনীয়তা ছিল, হাসলে গালে টোল পড়তো বলে ক্লাসের মেয়েরা পর্যন্ত দুষ্টুমি করে “গুল্লু বাবু” বলত_ সেই আমার মুখটা দর্শনেরও অযোগ্য হয়ে গেল? অবশ্য টিভিতে বা সংবাদপত্রে এসিডদগ্ধদের ছবি দেখে আমি যেরকম শিউরে উঠতাম, ড্রামভর্তি সালফিউরিক এসিডে আপাদমস্তক দগ্ধীভুত আমাকে দেখে কেউ যদি আমারই মত রুহ হয়ে যায তাতে অবাক হওযার কী থাকতে পারে!
গত ৭দিন আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের মুহুর্ত কাটিয়েছি। বুয়েটে টার্ম শেষে PL(preparatory leave) এ যেমন পুরো টার্মের পড়া নতুন করে পড়তে হয়, বলতে গেলে এই ৭দিন আমিও তেমনি প্রায় পুরোটা সময় পুরনো স্মৃতির মাঝে ডুবে ছিলাম।এখন মানুষের কথা-বার্তায় বুঝতে পারছি আসলে আমি পুরোপুরি অচেতন ছিলাম এ কয়দিন। এই অচৈতন্য দশা আমাকে নিয়ে গেছে শৈশবে, কলেজ জীবনে, বুয়েটের প্রথম দিনগুলি, কক্সবাজারের ট্যুর, বিশ্বকাপ ফুটবলের সময়কার পরীক্ষা পেছানো মিছিল, টিভি রুমে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থকদের উল্লাস-হতাশাসহ অসংখ্য স্মৃতিতে। খুব দ্রুত যেন ঘটনাগুলো ঘটে যাচ্ছিল, অনেকটা বুয়েটের দেড়ঘন্টা সেশনাল ক্লাশে ৫ঘন্টার পরিশ্রম করানোর মত বাড়াবাড়ি গতিতে।
আমি শৈশব-কৈশোরে ছিলাম ভয়ানক বাদর প্রকৃতির। একবার তো বাদরামি করতে গিয়ে সিলিং ফ্যানে মাথাই কেটে ফেলেছিলাম; প্রায় ১মাসের মত হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হয়েছিলো ।পড়াশোনায় মন বসতোইনা, রোদ-ঝড়-বৃষ্টিতেও ক্রিকেট খেলতেই হবে, আর টেলিভিশনে খেলা থাকলে তো স্কুলে যাওয়াই বন্ধ, এমনকি বাবার ভয়ে স্কুলে যেতে হলেও ক্লাস ফাকি দিয়ে স্কুলের সামান্য দুরেই একটা ক্রিকেট ক্লাবে চলে যেতাম খেলা দেখতে। ৯৭এর আইসিসি ট্রফির সময় আমি ৭ম শ্রেণীর ছাত্র।তখন আমরাও নিজেদের মহল্লায় আইসিসির আদলে টুর্ণামেণ্ট চালু করলাম; ব্যস সারাদিন থাকতাম মাঠে, এবং অবধারিতভাবে ১ম সাময়িক পরীক্ষাতে ৪বিষয়ে অকৃতকার্য। আমার মনে আছে, বাবার ভয়ে পুরো ১মাস “প্রোগ্রেস রিপোর্ট” লুকিয়ে রেখেছিলাম। বাবা কিভাবে যেন একদিন টের পেয়ে গেল। আমি ধরেই নিয়েছিলাম ১মাসের জন্য পুনরায় হাসপাতালে অবস্থান নিতে যাচ্ছি। কিন্তু অবাক ব্যাপার। বাবা আমার জন্য নতুন ব্যাট কিনে আনল, আমিতো কেমন যেন হতভম্ব হযে গেলাম। বাবা বলল “ক্রিকেট খেলবি না কেন?আমি নিজে তোর খেলা দেখতে যাব ছুটির দিনে। কিন্তু ক্রিকেট খেললে পড়া যাবেনা এই কথা তোকে কে বলল? তুই সবকিছু ডানহাতে করা সত্ত্বেও সাঈদ আনোয়ার বাহাতি বলে বামহাতে ব্যাট করিস শুনেছি, অথচ এটা জানিস না সাঈদ আনোয়ার কেমন মেধাবী ছাত্র ছিল? তো, সেটাও অনুসরণ কর।“ বাবার সেদিনকার কথা থেকেই আমি বদলে যেতে শুরু করি।
আমার ক্লাসের মেয়েগুলো তো বটেই, ছাত্রীহলের অনেক মেয়েও দেখছি বুয়েট মাঠে এসেছে। নওশিন নামের সেই বিশেষ মেয়েটি যাকে জড়িয়ে ফার্স্ট ইয়ারে বন্ধুরা আমাকে অপদস্থ করত নিয়মিত, সেও এসেছে। মেয়েটি ছিল একটু মুখরা স্বভাবের (যাকে বলে Tomboy), মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের সাথে মিশতো বেশি।অন্যদিকে আমি লজ্জায় লাজুকলতা_ মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে গেলেই মুখে ট্রাফিক জ্যাম বাধে, তোতলামি শুরু হয়ে যায়,ঘনঘন কাশতে থাকি, তার সাথে যোগ হয় হাচি - মানে হযবরল অবস্থা।একদিন ক্লাস শেষে ফিরছিলাম, হঠাৱ সেই Tomboy আমাকে পিছু ডাকল। আমার ধারণা ছিল ক্লাসে ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ছেলে বাদে আমাকে সেভাবে কেউ চেনেই না, বিশেষত মেয়েরা তো নয়ই, কারণ আমি ভাবতাম মেয়েরা ছেলেদের ব্যাপারে ততটুকই আগ্রহী যতটুকু আগ্রহী গলফ কিংবা রেসলিং এর প্রতি। কিন্তু এই Tomboyএর মুখে স্পষ্ট উচ্চারণে আমার নাম শুনতে পেয়ে বুঝলাম মেয়েমাত্রই “মাদার তেরেসা” নয়, অনুভুতি-আগ্রহের ক্ষেত্রে তারাও একেকজন “বর্ণচোরা ছেলে”।ডাকার কারণ খুবই তুচ্ছ_ পরের দিন ক্লাস টেস্ট, মিস শারাপোভার(ক্লাসে সে এই নামেই পরিচিত) ক্লাসনোট নেই, আমার খাতাটি ফটোকপি করতে তিনি ভীষণভাবে আগ্রহী। ক্লাসে অন্য মেয়ে এবং এত ছেলে থাকা সত্ত্বেও আমাকেই কেন তার নিভর্রযোগ্য প্রাপ্তিস্থান মনে হয়েছিলো আজ রুহ হয়ে যাওয়ার পরও সে রহস্য আনুন্মোচিত আমার কাছে। সেদিনের পর থেকে বন্ধুরা দীর্ঘদিন ওকে দেখলেই বলত “ঐ মেয়ে তোকে ভালোবাসে রে, তুমি খালি আগায়ে যাও মামা, আমরা দেখতেছি বাকিটা।“আমি কৃত্রিম ভয় মিশ্রিত কণ্ঠে বলতাম_”তোরা কি চাস আমি সালফিউরিক এসিডে পুড়ে মরি?এই মেয়ে তো একটা কনসেনট্রেটেড সালফিউরিক এসিড!” এখন ভাবছি নওশিন কি আসলেই কি এতটা ভয়ানক ছিল?পৃথিবীর কোনকিছুর পক্ষেই কি এতটা ভয়ানক আর বিভৎস হওয়া সম্ভব, কিংবা আমার সেই বন্ধুগুলো কি সত্যিই এমনটা চেয়েছিল?
রসায়ন বিষয়টি আমার বরবরই ভীষণ প্রিয় ছিল , যদিও আমাদের এক শিক্ষক বলতেন “Chemistry is a subject, the more you read, the more you forget’. আমি তার সে ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে নবম-দশম শ্রেণীতে সবসমযই রসায়নে অন্যদের থেকে অনেক বেশি নম্বর পেতাম, বিক্রিয়াগুলোকে মনে রাখার জন্য নিজের মত করে অদ্ভুত কিছু সুত্র তৈরি করে নিয়েছিলাম। কিন্তু এত প্রস্ত্ততি এবং মুগ্ধতা সত্ত্বেও প্রাক-নির্বাচনী পরীক্ষায় একটি প্রশ্নের উত্তর কোনভাবেই লিখতে পারলাম না। এমনটি হতেই পারে, কিন্তু বিষয়টি রসায়ন বলেই ইগোগত একটা ব্যাপার ছিল। প্রশ্নটি ছিল এরকম-“অলিয়াম কি?অলিয়াম কিভাবে প্রস্ত্তত করা হয়?” চরম বিরক্তিতে পরীক্ষা শেষ হওয়ামাত্র আমাদের রসায়ন স্যারের সন্ধানে মরিস গ্রীনের গতিতে ছুটলাম। তিনি সেসময় শিক্ষক মিলনায়তনে জনৈক শিক্ষকের সঙ্গে দাবা খেলছিলেন। আমার হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসা দেখে এবং কাঙ্ক্ষিত প্রশ্নটি শুনে তিনি হাসতে হাসতে বললেন_ “বোকা ছেলে, ধুমায়িত সালফিউরিক এসিডকে “অলিয়াম” বলে জানোনা?মা’কে বলো, তোমার মাথায় যেন তেলের বদলে অলিয়াম মেখে দেয় রোজ, তাহলে আর কখনো ভুলবেনা।" আচ্ছা, মানুষ এমন নির্মম রসিকতা করে কিভাবে?এসিড কি রসিকতার জিনিস!
নটরডেম কলেজের ব্যবহারিক ক্লাসের সুনাম এবং দুর্নাম দুই-ই সমপ্রচলিত।সবাই পদার্থবিজ্ঞানের ব্যবহারিক ক্লাসগুলো পছন্দ করলেও রসায়নকে ভাবত শিশুতোষ,কিন্তু আমার দুটিকেই সমানভাবে ভালো লাগত। তখনো আমার রসায়ন প্রীতি যথারীতি অব্যাহত ছিল, সঙ্গে প্রীতির মাঝেও ছিল উপবিভাজন। অম্লমিতি-ক্ষারমিতির গাণিতিক সমস্যাগুলোকে এত হাস্যকর আর শিশুতোষ মনে হত যে আমার ধারণা ছিল আমি হয়ত ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও সেগুলোর সমাধান পারবো।অপরপক্ষে, ব্যবহারিক ক্লাসের টাইট্রেশন, লবণ বিশ্লষণগুলো সবসময়ই হত ঘটনাবহুল। একবার লবণ বিশ্লষণ করতে গিয়ে লঘু নাইট্রিক এসিড হাতে পড়েছিল সামান্য, তাতেই ল্যাব ব্রাদার আমার প্রতি চরম ক্ষিপ্ত হয়ে বলেছিল_ “এইটারে কি পানি ভাবছো?তোমার ভাগ্য ভালো, যদি সালফিউরিক এসিড হত, তাহলে হাত আর জ্যান্ত থাকতো না।“.......যেখানেই যাই, কোন না কোনভাবে সালফিউরিক এসিড আমার ছায়াসঙ্গী ঠিকই হয়েছে। তাই জীবনের শেষটাতেও সে আমায় ছাড়তে চায়নি। কিন্তু সে কেন বুঝলনা এসিডের সঙ্গে মানুষের প্রনয়ের অর্থই হল ভালোবাসার অভিশাপ। আমি সেই “অভিশপ্ত ভালোবাসারই” বলি হয়ে অপেক্ষায় আছি মুনকার-নাকীরের।
আমার সহপাঠী এবং সংশ্লিষ্ট সকলের আন্তরিকতায় মুগ্ধ না হযে পারলাম না।বুয়েটের হলগুলোতে কোন feast হযনি আমাকে সাহায্য করার জন্য, ক্যাফেটেরিয়ার সামনে আমার বন্ধুরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকেছে তহবিল সংগ্রহের উদ্দেশ্যে। তাদের অনেকেই হযত বুয়েটে কখনো আমাকে দেখেওনি, বিদেশ থেকেও অনেকে সাহায্য পাঠিয়েছেন শুনেছি।অথচ এই মানুষগুলোই ভিন্ন মত-ভিন্ন পথের পথিক, অনেকের মধ্যে ব্যক্তিগত রেষারেষিও ছিল। কিন্তু আমার বাঁচার প্রশ্নে সবার নীতি অভিন্ন। এসিড শুধু পোড়ায়না, এসিড অলঙ্কারও জোড়া লাগায়। মনের চেয়ে শ্রেষ্ঠ অলংকার কিছু আছে কি?
“এই শালা পেপার-মিডিয়া আছে শুধু রাজনৈতিক সংবাদ প্রকাশের তালে। পিন্টু কবে কন জেলাররে পিটাইলো, তারেক কার সাথে বৈঠক করলো, শেখ হাসিনা কবে দেশে ফিরলো, জলিল কোন ট্রাম্পকার্ড দিল...এইসব আজাইরা খবরে পাতার পর পাতা ভইরা থাকে, অথচ সেগুনবাগিচায় একটা মহিলা উকিলরে জবাই করল তার খবর একটু দায়সারাভাবে দিয়াই শেষ, ফয়সাল ভাইয়ের খবরটাও কি তেমন আহামরি গুরুত্ব দিয়া ছাপাইছে?এইরকম খোলারাস্তায় এসিডের ট্রাক চলে কেমনে?এইডা নিয়ে লেখা যাইতনা টানা কয়দিন?ফয়সাল ভাইয়ের পরিণতি তো কালকে আমারও হইতে পারে;সেইসব মোটেই লিখবেনা।অন্যদিকে, ডিপজল-ময়ুরীর খবর কিন্তু ঠিকই পাবি বড় বড় হেডিংয়ে।আসলে এই পেপারগুলা চায় কেমনে-কিসে বিক্রি বাড়বো এমন ধান্ধা করতে; সাধারণ মানুষের আবেগের কোন মুল্য নাই এই কাকড়াগুলার কাছে। আমি দোস্ত মিডিয়ার ভুমিকায় ব্যাপক হতাশ, মন চায় কইষা একটা উশটা মারি”_ বুয়েটেরই কয়েকছাত্র সন্ধ্যার সরব শহীদমিনারে আলোচনা করছে তথ্যমাধ্যমের ভুমিকা বিষয়ে। জীবদ্দশায় এই শহীদ মিনারটা খুবই পছন্দের একটি স্থান ছিল আমার। জানাযাস্থলটা খুব একটা ভাল লাগছেনা আর, একটুপরই আমার কফিনটা গাড়িতে তোলা হবে। তাই শহীদমিনারটা ভাল করে দেখে নিই, মুনকার-নাকীর আসলে কী বিধান হবে তা তো জানিনা। এই শহীদমিনারেই কতবিকেল কাটিয়েছি আড্ডা দিয়ে, কতগুলো বৃহস্পতিবার রাতে শিমুলদের সঙ্গে গীটার নিয়ে এসে রাতভর গানবাজনা করেছি, ওভারব্রীজটায় বসে তিতুমীর হলের ছেলেদের সঙ্গে দুষ্টুমি করেছি। সেই শহীদমিনারটিকে আমি কিভাবে ছেড়ে যাই?শহীদ মিনার কি আমাকে মনে রাখবে? মনে তো হয়না। প্রতিদিনই তো আমার মত কতজন কতস্মৃতির জন্ম দেয় এখানে।আমি ভীষণভাবে খারাপ লাগার একটি অনুভুতি সৃষ্ট করতে চাইছি, কিন্তু মৃত্যু বোধহয় সব অনুভুতিকেই জয় করে নেয়। তবুও মৃত্যুর পর রুহ হয়ে এখনো পর্যন্ত যতস্থানে ঘুরলাম, একমাত্র শহীদ মিনারেই কিছুটা সময় বেশি থাকতে ইচ্ছে হল, এমনকি মুনকার-নাকীর আসার পুর্বমুহুর্তেও আমি এখানে ফিরে আসতে চাইবো।
আমার কফিনটা গাড়িতে তোলা হয়েছে।মানুষের কথা থেকে অনুমান করতে পারছি আমাকে আমার বাড়ি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তাতো যাবই, কিন্তু মিলির জন্য কেনা ‘উত্তরাধিকার” বইটা? আমিতো এসিডে পুড়ে নিঃশেষিত হবার আগমুহুর্তেও ব্যাগটি হাতছাড়া করিনি। আমার শরীরের ৩০% অক্ষত অংশের মত ব্যাগটিকেও রক্ষা করতে চেয়েছি। মিলিরে, তোর হাতে “উত্তরাধিকার”টা তুলে দেয়া হলনা আপুমনি। পারলে আমায় ক্ষমা করে দিস?তোর চুলে আর গেড়ো দেয়া হবেনা, এমনকি তোর কানও আর টানা হবেনা আমার। এ আমি কোন জগতে চললামরে আপু বলতে পরিস??
..........................................................................দীঘর্দিন ব্লগে আর কোন পোস্ট দেয়ার ইচ্ছা ছিলনা পরীক্ষা সংক্রান্ত ব্যস্ততায়। কিন্তু গতকাল দুপুরে হঠাৱ ব্লগার ভাঙ্গা পেন্সিলের একটা লেখা পড়ে সারাদিন ভয়ানক মন খারাপ ছিল।একসময় বিবেকের প্রচণ্ড তাড়না থেকে বিকেল ৫টা থেকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত একটানা পিসির সামনে বসে থেকে এই লেখাটা লিখে ফেললাম সম্প্রতি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত বুয়েট ছাত্র ফয়সাল ভাইকে নিয়ে।গতকাল সন্ধ্যা থেকে হলে ইন্টারনেট সংযোগ দীর্ঘক্ষণ বিচ্ছিন্ন থাকায় লেখাটি ব্লগে প্রকাশ করতে একটু দরি হয়ে গেল। আমি লেখালেখিতে অভ্যস্ত প্রায় ১২-১৩বছর যাবৎ।কিন্তু জীবনে এই প্রথম কোন লেখা লিখতে গিয়ে আমি একহাতে অক্ষর টাইপ করার সঙ্গে সঙ্গে অন্যহাতে ছোখের জল মুছেছি। আমরা ফয়সাল ভাই সহ এই ঘটনায় নিহত সকলের রুহের মাগফেরাত কামনা করি।মহান আল্লাহ তাদের জান্নাত নসিব করুন।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই নভেম্বর, ২০০৮ দুপুর ১:১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


