উৎসর্গ: সুলতানা শিরীন সাজি (প্রিয় "সাদা বক আপু)
কিছু একটা বলা উচিৎ, যেহেতু অভিশপ্ত এক মহাপাপ করতে যাচ্ছি আর মাত্র ৪৭মিনট পর। সত্যি বলতে কি,পাপ-পুণ্য আমার কাছে প-বর্গীয় দুটি ভিন্ন শব্দ বৈ অন্য কিছু নয়। তাইতো এই গল্পটির সরলীকরণে তিনটি বিশেষ বিভাজন রয়েছে: প্রধান চরিত্র, দ্বন্দ্ব বা টানাপোড়েন, এবং অপ্রধান চরিত্র। প্রধান চরিত্রকে মূখ্যচরিত্র বললে কি অন্ধ হার্মিসন দৃষ্টি ফিরে পাবে?না পেলে, মুখ্য চরিত্র সাড়ে তিনটি: চুমকি, চমক, এবং তন্ময় অথবা শিবলি। তন্ময় আর শিবলি মিলে দুটির বদলে দেড়টি চরিত্র কিভাবে হল, কথা দিচ্ছি পাপ করার আগে অবশ্যই তা জানানো হবে।গল্প-উপন্যাসে চরিত্রগুলোর নামকরণে লেখকেরা যথেষ্ট মুন্সিয়ানা দেখান, তাই জয়দীপ-জয়িতা, সৌমিক-সুমিত্রা, কিংবা অমিত-লাবণ্য কখনো কখনো চরিত্রকেও ছাপিয়ে নাম হয়ে উঠে, কিন্তু এই গল্পের নামগুলোতে কোন আহামরিত্ব নেই, কারণ বাস্তবে কোন শিশুর জন্মের সময় যখন “আকাশ” নাম রাখা হয়, তখন মা-বাবা নিশ্চয়ই এটা ভেবে রাখেননা যে ২০-২৫বছর পরে “নদী” নামের কোন মেয়েকেই সে“143” সাংকেতিক সংখ্যার আড়ালে সেই আপ্তবাক্যটি শোনাবে;আমি গল্পকে বাস্তবতার বন্ধু না হোক, যে কোন প্রকারে অন্তত প্রতিবেশী হিসেবে দেখতে চাই। টানাপোড়েন বা দ্বন্দ্ব প্রসঙ্গে আসা যাক। প্রায় প্রতিলাইনেই এমন আবহ থাকলেও একেবারে “দ্বন্দ্বযুদ্ধ” বলতে যা বোঝায় সেটি সম্ভবত বাস্তবতা বনাম ফ্যান্টাসির।বাকিগুলোর পূর্বাভাস অনিবার্য কারণবশত এখন দেয়া নিষেধ। এরপর, অপ্রধান চরিত্র; যদিও এরা কেবলই কয়েকটি নাম হয়ে থাকে সাধারণত, অথবা কাহিনীর প্রয়োজনে নিষ্প্রভ উপস্থিতি বাড়ানো ব্যতিরেকে বিশেষ কোন ভূমিকা রাখেনা গল্পে, কিন্তু কখনও কি এমন হতে পারে যে কোন একটি অপ্রধান চরিত্রই গল্পের নিয়ন্তা হয়ে উঠল?উত্তর যদি “না” হয়, সেক্ষেত্রে “হ্যা” যে কখনই হবেনা এটি কি নিশ্চিত? সবশেষে, গল্পটি কোন্ ধরনের?সেটাই তো বলতে চাইছি_
পৃথিবীর গোলার্ধের ব্যাসার্ধ মাপতে মাপতেই ঢাকা নামের শহরটিতে ভোর হয় রোজ, আর সেইসাথে এখানকার বিমানবন্দরে বিমানের আসা-যাওয়া চলে পরিসংখ্যানিক জ্যামিতিকগড়-তরঙ্গ গড়ের ব্যবধান খুঁজতে খুঁজতে।এই ফ্লাইটের হিসাব রাখাটা নিতান্তই অপ্রয়োজনীয় ছিল যদিনা গল্পের অন্যতম মুখ্যচরিত্র চুমকি আজ ভোরের ফ্লাইটে লণ্ডন থেকে ঢাকা ফিরতো। ব্রিটিশ কাউন্সিল পরিচালিত “Connecting Future program” এ লণ্ডন সফর করা বাংলাদেশের ৪সদস্যের ছাত্রপ্রতিনিধি দলের দলনেত্রীর নাম ফারহানা হক চুমকি, এই গল্পের ঠাকুরমা, যার ঝুলিতে ভরা আছে গল্পের প্রাণভোমরা। গত ৭দিনকে তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় হিসেবে মনোনয়ন দেয়া যায় নির্দ্বিধায়: ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এর অধিবেশন দেখা, পররাষ্ট্র মন্ত্রীকে প্রশ্ন করার সুযোগ পাওয়ার সঙ্গে বাড়তি প্রাপ্তি বিভৎস সুন্দর দেশটির অনেক জায়গা ঘুরে দেখার সুযোগ, এবং অতি অবশ্যই বিশ্বের ১২২টি দেশের ভার্সিটি পড়ুয়া ছেলে-মেয়েদের সাথে পরিচিত হওয়া_ এই বয়সে এর চেয়ে সুন্দর সময় কী-ই বা হতে পারে!
বিমানে অধিকাংশ সময় ঘুমিয়ে কাটলেও ৭দিনের খণ্ড স্মৃতিগুলো স্বপ্নহয়ে সেই ঘুমকেও শৈল্পিক ঘুমে রুপ দিয়েছিল যেন_ আবুধাবি এয়ারপোর্টে ওর লাগেজ সাময়িক লাপাত্তা হওয়া, হোটেলে খাবারের সব অপরিচিত মেনু দেখে উপয়ান্তর না পেয়ে সরাসরি “Halal Food” লিখে অর্ডার দেয়া, জনৈক ফিলিস্তিনি ছাত্রের প্রশ্নবাণে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নাজেহাল হওয়া থেকে শুরু করে ওদের সঙ্গে গাইড হিসেবে থাকা স্থানীয় এক ছাত্রের “এদেশে প্রথমবারের মত এসে কেমন লাগছে” প্রশ্নের বিপরীতে ওর সেই কিংবদন্তীতুল্য জবাব_ “ তোমার দেশের দালানকোঠায় আমার পূর্বপুরুষের রক্ত লেগে আছে। তাই প্রথম আসলেও এদেশ আমার মোটেই অপরিচিত নয়”, সবকিছু ওকে ঘুমন্ত রেখিছিল চিরঘুমের অনিঃশেষতায়।
৭দিনের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবিজয়ীকে(!) রিসিভ করতে বিমানবন্দরে আগত পরিজনের সংখ্যা ৪: মা, রুমকি, চমক,এবং জাফর।ভার্সিটিতে সবমিলিয়ে হাজারখানেক বন্ধু-বান্ধব থাকলেও চুমকির যে কোন প্রয়োজন-অপ্রয়োজনের একমাত্র সময়নিরপেক্ষ বন্ধু জাফরকে “ও” নিকনেম দিয়েছে “কাসেম ভাই”(হাতেম তাঈ এর অনুকরণে), কারণ বন্ধুদের জন্য নিজের খেয়ে বনের মহিষ-হাতি-ঘোড়া-ভাল্লুকসহ সবকিছুই তাড়াতে গিয়ে প্রায় সময়ই নিজের ঘরের বেড়া উন্মুক্ত ফেলে সে।এই যেমন, চুমকির প্লেন সকালে আসবে বলে ওর মা-ভাই-বোন গতকালকেই মুন্সীগঞ্জ থেকে ঢাকায় চলে এসেছে; রাতে ছিল বাসাবো, ওর মামার শ্বশুরবাড়িতে।এত সকালে এই দুটি কিশোর বয়সের ছেলে-মেয়েকে নিয়ে চুমকির মা একা মানুষ কিভাবে এয়ারপোর্ট যাবেন, সেই দুশ্চিন্তায় জাফর টিউটোরিয়াল পরীক্ষা বাদ দিয়ে ভোরবেলা ট্যাক্সিক্যাব নিয়ে বাসাবোতে চলে গেছে, অথচ এর আগেও বেশ কয়েকটি টিউটোরিয়াল না দেয়ায় পাশ করা নিয়েই টানাটানি চলছে তার।একে উদারতা নাকি মুর্খতামি বলা উচিৎ? এমন মনে হওয়ার কারণ হচ্ছে বন্ধুরাও মুফতে একটা কলুর বলদ পেয়ে তাকে ব্যবহার করতে সঙ্কোচিত হয়না। চুমকি তেমন বন্ধুদের দলভুক্ত কিনা এই মুহূর্তে বলা মুশকিল।
চুমকির মা নুরুন্নাহার হক, জীবনের পরম অনিশ্চয়তা তত্ত্বের শিকার হয়ে বিধবা হয়েছেন দশ-এগারো মাস হল; কিন্তু এই পরিণতিকে তিনি মেনে নিয়েছেন, আবার নেননি। একজন সুস্থ মানুষ বাথরুমে গোসল করতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে মাথার পিছন দিকে আঘাত পেল, আর তাতেই স্ট্রোক করে হাসপাতালে নেয়ার আধঘণ্টার মধ্যে বেনজীর ভুট্টোর সঙ্গে দেখা করতে রওয়ানা হয়ে গেলো? এ তো যমদুতের জোর করে জানকবচ করার খামখেয়াল, এর বিরুদ্ধে মানব বন্ধন করতে হবে!শুরুর কয়েকমাস এরকম উদ্ভট চিন্তা-ভাবনা করতে করতে প্রায় উন্মাদদশা হয়ে গিয়েছিলো তার, এরপর সন্তানদের জন্যই ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছেন।স্বামী-স্ত্রী দুজনই ছিলেন মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষক ।স্বামী বিজ্ঞানের শিক্ষক হওয়ায় টিউশনির টাকায় মফঃস্বলে বেশ স্বচ্ছল সংসার ছিল তাদের, কিন্তু নিজে আর্টসের হওয়ায় স্কুলের বেতনটাই সম্বল এখন। তাই দারিদ্র্যের সঙ্গে বেশ চেনা-জানা গড়ে উঠেছে গত কয়েকমাস থেকে।কিছুদিন হলো,স্কুলের এক বিপত্মীক শিক্ষকের সঙ্গে তার বিয়ের সম্বন্ধ করতে চাইছে শুভাকাঙ্ক্ষীদের অনেকে; কেউ কেউ আকারে ইঙ্গিতে বললেও বিষয়টাকে এখনো সেভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। বয়স ৩৭ চলছে; রবিঠাকুর ১৩-১৪বছরের কিশোরদের যেমন “বালাই” বলেছেন,এই বয়সের নারীকে বালাই না হলেও “পালাই” বলা যেতে পারে_ তরুণী-প্রৌঢ়া-মাঝ বয়সী কোন শ্রেণীতেই ফেলা যায়না। তবুও এই বয়সে বিয়ে করাই যায়; তার যে খুব অনীহা তাও নয়, কিন্তু অনেকগুলো পিছুটান কাজ করছে ভাবনাজুড়ে। মফঃস্বল শহরে এই বয়সী একজন মহিলার ২য় বিয়েকে খুবই নিন্দার দৃষ্টিতে দেখা হয়, মেয়ে দুটি বড় হয়েছে, এ সময় এমন একটি কাজ করলে ওদের বিয়ে দিতে সমস্যা হবে, ওই লোকেরও আগের পক্ষের ছেলে-মেয়ে আছে; এতসব সমস্যার বিপরীতে এভাবে থাকাই অনেক ভালো মনে হচ্ছে এখনো পর্যন্ত। তাছাড়া জীবনের একটি পর্যায়ে এসে জায়া সত্তা জননী সত্তার মাঝে লীন হয়ে যায়; স্বাভাবিকের চেয়ে একটু আগে হলেও তার জীবনে সেই পর্যায় চলেএসেছে ধরে নিয়ে সন্তানদেরকেই আকড়ে ধরবেন কিনা, দোলাচলে আছেন।তার দোলনা চলতে থাকুক, সেক্ষণে সন্তাদের বৃত্তান্ত বয়ান করি। চুমকির পরিচয় দেয়া হয়েছে, বাকি রইল রুমকি-চমক। রুমকির ব্যাপারে বলার কিছু নেই; পাঠে অমনোযোগী, ইচড়ে পাকা কলেজ পড়ুয়া মেয়েরা যেমন হয় সে-ও তাই। এবার, গল্পের অপর মূখ্যচরিত্র চমকের পালা; বয়ৰসন্ধির শেষ বা মাঝামাঝি সময়ের এক কিশোর হয়ে ক্লাস টেনে পড়ছে বিজ্ঞান বিভাগে। ছাত্র হিসেবে পৌনে মেধাবী, সব ব্যাপারেই কম-বেশি আগ্রহ থাকলেও আগ্রহগুলো বরাবরই ভীষণ ক্ষণস্থায়ী, শুধু গানের ক্ষেত্রটি এক আশ্চর্য ব্যতিক্রম।গানটা বাসা থেকে সেভাবে সিরিয়াসলি না শেখালেও শহরের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মাঝে মাঝে গাইলে মানুষ ততটা খারাপ বলেনা।রুমকি মাত্রই দেড় বছরের বড় হওয়ায় এখনো সময় পেলেই পিঠে কিল বসায় চুলের মুঠি ধরে, পক্ষান্তরে চুমকির সামনে একেবারে আরবি বর্ণ “আলিফ” এর মত স্থির থাকে ভয়ে।বলতে গেলে চুমকি-ই ওকে বড় করেছে ছোট থেকে, কারণ স্কুলের চাকরি করে এত কাছাকাছি বয়সের দুটি বাচ্চাকে ঠিকমত দেখভাল করা মা’র পক্ষে মোটেই সম্ভব ছিলনা। যদিও চমকের জন্মের সময় ওর নিজের বয়সই ছিল মাত্র ৬বছর, তবুও একটি শিশুর যত্নেই বেড়ে উঠেছে আর এক নবজাতক। সেই হিসেবে চুমকি বোনের চেয়েও চমকের কাছে মা বোধহয়।
..............................চলবে.............................

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


