কমিউনিটি ব্লগের সঙ্গে আমার সরাসরি সম্পৃক্ততা খুব বেশিদিনের নয়; ৬ মাসের একটু বেশি সময়ের হবে। তবে, পাঠক হিসেবে ব্লগের সঙ্গে আমার সংযুক্তি দীর্ঘদিন ধরে।
আমি মনে করি ব্লগের ইতিবাচক দিক নিয়ে লেখার জন্য একটি পোস্ট কখনই যথেষ্ট হবেনা, কিন্তু নেতিবাচকতা নিয়ে লিখতে হলে একটিমাত্র পোস্টই বোধহয় যথেষ্ট।তাই এই পোস্টে ইতিবাচক প্রসঙ্গগুলো এড়িয়ে নেতিবাচক ভাবনা বা পর্যবেক্ষণগুলোই প্রাধান্য পাবে। এটি আমার ১০১তম পোস্ট ব্লগে। সেই ক্ষণে ব্লগের ব্যবচ্ছেদ করতে চাচ্ছি, তবে তার আগে আমার ব্লগিংয়ের উদ্দেশ্য ও প্রত্যাশা সম্বন্ধে বলতে চাইছি।
আমার ব্লগিং দর্শন খুব সাধারণ: বহুবিধ বিষয়ের লেখা পড়ে বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষকে প্রভাবিত করা এবং এর ফাকে ফাকে নিজে কিছু লেখার প্রয়াস চালানো, যাতে করে ধারণার আদান-প্রদান ও সম্প্রসারণ ঘটে। সর্বোপরি, একটি মুক্ত প্লাটফরম থেকে মার্জিত দৃষ্টিভঙ্গির পরিশুদ্ধিকরণের পাশাপশি স্বদেশ ও ভাষার প্রতি কিছুটা দায়বদ্ধতা পূরণের চেষ্টা করা।
ব্লগ থেকে আসলে প্রত্যাশা কী?দর্শনের মধ্যেই প্রত্যাশাটা আছে, তবুও বলি। আমি বলবো, ব্লগে আমরা নিজেদের পছন্দ অনুসারে লেখা পড়বো, পাঠ পরবর্তী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবো, মত্যক্য-মতানৈক্য নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করব, এরপর লগ আউট করে দৈনন্দিন কাজে প্রত্যাবর্তন করব। তবুও, মানবিক অনুভূতি আছে বলেই হযত শেষোক্ত প্রত্যাশাটি একটু যান্ত্রিক শোনাচ্ছে। এই পাঠ এবং এর পরবর্তী প্রতিক্রিয়ার সূত্র ধরেই ভারচুয়াল মানুষদের সঙ্গে আত্মিক যোগাযোগ গড়ে উঠবে, অপ্রত্যাশিত হলেও কারো কারো সঙ্গে আদর্শ ও অবস্থানগত দুরত্ব থেকে হয়তবা তিক্ততারও সৃষ্টি হতে পারে..........
আমার নেতিবাচক মনোভাবের শুরুটাও এখান থেকে।
ব্লগিংয়ের প্রথম দিনটি থেকেই গালাগালিকে ঘৃণা করি। একটি কমিউনিটি ব্লগে সবাই একই মতাদর্শী হলে সেটা আসলে কমিউনিটি না হয়ে কোন একটি 'brand' হয়ে উঠত। এই ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা দেখানোর ক্ষেত্রে দুঃখজনক হলেও অনেক ব্লগারের অসহনশীলতা দৃষ্টিকটুভাবে লক্ষণীয়। মতের ভিন্নতাকে যুক্তি দিয়েই প্রতিহত করা উচিৎ, অথচ কার্যক্ষেত্রে যুক্তির স্থান নিচ্ছে 'গালাগালি'। গালি দিয়ে এরা কী প্রমাণ করতে চান সেটা একটা প্রশ্ন বটে।কারণ, ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, গালি দেয়ার প্রাপ্তি একটিই- নিজের ভাষাটাকে অপমান করা, আর প্রত্তুত্তরে নিজেও অপমানিত হবার জন্য প্রস্তুত থাকা।এই ব্লগের সবাই একটি ন্যুনতম শিক্ষাগত যোগ্যতার অধিকারী, তো সেই শিক্ষা কি গালি দেয়াকে অনুমোদন করে? 'গালি'কে বরাবরই বর্বরতার প্রতীক মনে হয়। ব্লগে গালির মাত্রাতিরিক্ত চর্চা দেখে তাই ধন্ধেয় পড়ে যাই, এটা ব্লগ , নাকি পাড়ার রক?
আস্তিক-নাস্তিক ইস্যু হচ্ছে আরেক বিরক্তির খোরাক। আস্তিকতা- নাস্তিকতা কোন বিতর্কের ইস্যু হতে পারেনা, বরং এরা সহাবস্থান করতে পারে অনায়াসেই। একজন আস্তিক অথবা নাস্তিক, দুজনই নিজস্ব বোধ ও বিশ্বাস দ্বারা চালিত। তিনি তার বিশ্বাস নিয়ে থাকুন, কিন্তু ব্লগে দেখতে পাচ্ছি উল্টোচিত্র। এখানে আস্তিকদের অবস্থান দেখে মনে হয় 'নাস্তিক নিধনযজ্ঞ' শুরু হোক আজ এবং এক্ষুণি, পক্ষান্তরে নাস্তিকদের প্রকাশভঙ্গিটা এরকম যে 'সহীহ হাদীস-কুরআন' সকল কিছু পড়ার পর তারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে "ধর্ম অথবা ঈশ্বর দুই-ই কল্পকাহিনী", অতএব জোর করে হলেও ঘরে ঘরে নাস্তিকতার বাণী পৌছে দিতে হবে"। এর ফলশ্রুতিতে 'কেন ঈশ্বরে বিশ্বাস করিনা" জাতীয় সিরিজ লেখা চলতেই থাকে দিনের পর দিন। এরপর আস্তিকেরা পাল্টা পোস্ট দেবে, ব্যস, ইনফিনিটি লুপের মত চলতেই থাকবে দ্বন্দ্ব। আমি মানুষের যে কোন বিষয়ে বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে তার ব্যক্তিস্বাধীনতায় দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস ও আস্থা স্থাপন করি ; আজ যদি কেউ অগ্নি উপাসনা শুরু করে সেটা তার নিজস্ব বিশ্বাস-আদর্শের ব্যাপার। কিন্তু কারো বিশ্বাসকে হেয় করাটাকে বলবো অপরাধের শামিল। ব্লগের আস্তিক-নাস্তিক, উভয়গ্রুপের মধ্যেই এই হেয় করার প্রবণতাটাই মারাত্মকভাবে লক্ষণীয়। আস্তিকতা-নাস্তিকতা কোন পরিচয় হতে পারেনা; এটা একটা বিশ্বাস, আর 'মানুষ হিসেবে আমি কী করলাম বা কী করছি" সেটাই প্রকৃত বিবেচ্য বিষয়। তাই আস্তিক-নাস্তিক কোনভাবেই প্রতিপক্ষ হতে পারেনা। এক বড়ভাইকে জানি যিনি ঘোর নাস্তিক, অথচ রোযার সময় বন্ধুদের সঙ্গে তাকে বহুদিন ইফতার করতে দেখেছি, কারণ সবাই মিলে ইফতার করতে তার ভাল লাগে। সত্য বলতে কি, কিছু কিছু বিষয় আছে যেগুলো নিয়ে বিতর্ক শুরু করলে পৃথিবীর শেষদিন পর্যন্তও চলতে থাকবে, তথাপি কোন সদুত্তর বা সমাধানে পৌছনো সম্ভব হবেনা। এই তথাকথিত আস্তিক-নাস্তিকও তেমনই একটি বিতর্ক। তাই এইসব শিশুতোষ বিতর্ক করে ঠিক কোন্ উদ্দেশ্য হাসিল হতে পারে তা যেমন দুর্বোধ্য, তেমনি এই ইস্যুতে প্রতিদিন নিত্যনতুন রকমারী কনটেন্ট-কনসেপ্টের পোস্ট দেখে মেজাজ খারাপ হয়ে যাওয়াটাও বোধকরি অতিস্বাভাবিক। এদের ভাবখানা এমন যেন, "অন্য সবকিছু বাদ, আগে আস্তিক-নাস্তিকের মধ্যে কে সঠিক,_সেটির মীমাংসা হওয়া দরকার।"
সবচেয়ে বিরক্তিকর হচ্ছে ব্যক্তিগত রেষারেষি ও দলাদলি। হয়ত একজন ব্লগারের সঙ্গে অন্য এক ব্লগারের কোন বিষয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দিল। ব্যস, এরপর উভয় ব্লগারের দলে কিছুসংখ্যক করে ব্লগার ভীড়ে যাবে এবং ক্রমাগত উস্কানীমূলক ও ব্যক্তি-আক্রমণাত্মক পোস্ট দিয়ে যাবে প্রথম পাতায়। উদাহরণস্বরূ বলি, "নাফে এনাম"কে নিয়ে টানা কিছুদিন যে পোস্ট দেয়ার প্রতিযোগিতা চলল সেটাকে আমার ৬ মাসের ব্লগজীবনে দেখা সবচেয়ে হতাশাজনক স্থূলবিনোদন মনে হয়েছে।আর গতকাল দেখলাম বাবুয়া ইস্যু। তার মন্তব্যের ব্যাপারে আমার তীব্র আপত্তি আছে, আমি সেটা প্রকাশও করেছি হাসিব ভাইয়ের পোস্টে। কিন্তু এরপর দেখলাম এই বিষযে পোস্ট দেয়াটা যেন সবাই নৈতিক এবং অবশ্য পালনীয় দায়িত্ব হিসেবে ধরে নিল। ফলশ্রুতিতে একই বক্তব্যকে দু-একটি শব্দের হেরফের ঘটিয়ে রীতিমত পোস্ট ফ্লাডিং শুরু হয়ে গেল, অন্য সকল বিষয়ের পোস্ট বন্ধ। হয়ত ব্যাপারটা এমন যে ঐ বিষযে একটা তীব্র জ্বালাময়ী পোস্ট না দিলে নিজের অবস্থানটা পরিষ্কার হয়না। সত্যি বলতে কি, এই প্রবণতাকে স্রেফ হুজুগ মনে হয়, এবং এই হুজুগটাই গত ৬মাসে সবচেয়ে বেশি আহত করেছে।আমার বক্তব্য হচ্ছে, একজন ব্লগার একজন স্বতন্ত্র মানুষ। তিনি তার মতামত প্রকাশের জন্য একাই যথেষ্ট। তা সমমনা ব্লগার থাকতেই পারে। কিন্তু সেটাকে রীতিমত দলে রূপান্তরের মানে কী? ব্লগ কি কোন প্রজাতন্ত্র যে এর জন্য একটি শাসকশ্রেণীর প্রয়োজন, অতএব সেই উদ্দেশ্যে দলগঠন করতে হবে যাতে করে মন্ত্রীপরিষদ পাওয়া যায়?অপ্রিয় হলেও এটিই সত্যি মনে হচ্ছে। ব্লগে আসার পর থেকেই 'এ-টিম' নামে একটি শব্দ শুনে আসছি। এ নিয়ে কখনো কৌতূহল বোধ করিনি। কিন্তু কিছুদিন আগে শ্রদ্ধেয় রাগিব ভাইকে কোন একটা পোস্টে কেউ একজন বলছিল এ-টিমের মন যোগানোর চেষ্টা করছেন বা এই জাতীয় কিছু একটা, এরপর সম্ভবত ঘনাদার একটি পোস্টে দেখলাম আস্তিকগ্রুপ নাস্তিকগ্রুপকে এ-টিমের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করে দিতে চাইছে কিনা এই নিয়ে বিতর্ক , আর সর্বশেষ আজ সকালে দেখলাম অমি রাহমান পিয়াল কোন এক পোস্টে কমেন্ট করছেন "এ-টিম' যারে-তারে পুছেনা"। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এ-টিম কী এবং কেন? এরা কি ব্লগের দণ্ডমুণ্ডের অধিকর্তা?নয়তো "পুছা", .মন যুগানো" এই শব্দগুলির প্রয়োগের তাৎপর্য কী? ধরে নিচ্ছি, চেলসি-লিভারপুল-ম্যান ইউ এর মত ভবিষ্যতে সামহোয়ার ইন ও পেশাদার ফুটবলের দল গড়বে, হযতো সেই তাগিদ থেকেই এ-টিম গড়ে উঠেছে।
ব্লগে আসার পর 'কবিতা বিষয়ে" অনেকেরই এলার্জি দেখেছি। এলার্জি থাকাটা দূষণীয় নয়, কিন্তু কেউ তো তাদেরকে কবিতা পড়ার নিমন্ত্রণ জানায়নি, বা এটা পড়ার জন্যও তারা বাধ্য নন। আমার কথা হচ্ছে, একজন ব্লগার যদি ২-৩লাইনের নির্দোষ কথা-মালা সাজিয়ে তাকে কবিতা ভেবে মানসিক প্রশান্তি লাভ করে সেটা একান্তই তার নিজস্ব ব্যাপার। তিনি তো সেজন্য নোবেল পুরস্কার দাবী করছেননা,তাহলে এই কবিতাবিদ্বেষের কারণটা কি?তিনি কাউকে গালি দিচ্ছেননা,কারো অনুভূতিতে আঘাত করছেননা, আপন খেয়ালে লিখে যাচ্ছেন, সেখানে হস্তক্ষেপ করতে চাওযার মানে কী হতে পারে?পোস্টের তো অভাব নেই,; আপনি আপনার পছন্দের পোস্ট পড়ুন, অথবা নিজে পছন্দের পোস্ট লিখুন, ব্যস হযে গেল। আমি নিজে কবিতা লিখিনা, তবুও "কবিতা পোস্ট " করা নিয়ে বিদ্রূপ করাটাকে কিঞ্চিৎ লোক দেখানো, আর নিজেক 'উঁচু জাত' ভাবার একটা সস্তা বিলাসিতার মতই মনে হয়।
এই ব্লগের সবচেয় হাস্যকর কনসেপ্ট লাগে রেটিং সিস্টেম। সেই ব্যক্তিগত সম্পর্কের জের ধরে কেউ কেউ পোস্ট না পড়েই মাইনাস , অথবা না পড়েই প্লাস দেয়। এটা কী নির্দেশ করে?একটি পোস্টে 'ভাল লেগেছে' "মন্দ লেগেছে" এই দুটি কথাই যথেষ্ট। + - টাকে বানরের হাতের খুন্তি না করাটাই সমীচীন মনে করি।তাই এখনো পর্যন্ত আমার নিজের কোন পোস্টে আমি রেটিং এর দিকে নজর দেইনি। আর অন্যদের পোস্টে অধিকাংশ সময়ই হাস্যকর +- দেয়া থেকে বিরত থাকি।।
এই অংশটুকু সাবসিডিয়ারি বলা যায়। 'মন ভালো নেই", 'কেমন আছেন সবাই' জাতীয় পোস্ট আর সেখানে মন্তব্যের বন্যা দেখতেও বিরক্ত লাগে। বিশেষ করে ঐ পোস্টগুলোতে মন্তব্যের ধরন দেখে ব্লগকে চ্যাটরুম বলে ভুল হয়। চ্যাট করার জন্য অনেক প্রযুক্তি আছে, ব্লগটাকে ব্লগের মত করেই বোধহয ব্যবহার করা উচিৎ। এটিও যার যার ব্যক্তিগত অভিরুচি, কে কোথায় কী কমেণ্ট করল সেটা কোন আলোচনার বিষয়বস্তু হওয়ার যৌক্তিকতা রাখেনা, তবুও আমি এই সংক্রান্ত আমার অপছন্দের কথাটিই কেবল ব্যক্ত করলাম।।।
...................................পোস্টের শুরুতেই বলেছি এটি একটি নেতিবাচক পোস্ট, কোন ইতিবাচক কথা এখানে লেখা হবেনা। তাই আমার হতাশার কথাগুলো লিখলাম। এতে কারোরই কিছু যায়-আসেনা, সেটা আমি জানি। একইভাবে এটাও জানি ব্লগীয় সংস্কৃতিও অপরিবর্তিতই রযে যাবে ( মানে গালাগালি, আস্তিক-নাস্তিক, ব্যক্তি-আক্রমণ, দলাদলি)তবুও মনে হল হতাশার কথাগুলো লেখা উচিৎ, কারণ ইতিবাচকতার কোন লিমিট না থাকলেও হতাশার পরিধি কয়েক ইঞ্চির বেশি হবেনা। দুর্ভাগ্যক্রমে,আজ আমার মধ্যে সেই সীমাবদ্ধ কয়েক ইঞ্চিই ভর করেছিল। সবাই ভাল থাকুন। ব্লগ ব্লগের গতিতে চলতে থাকুক।
পাদটীকা:একটি বিষয় উল্লেখের প্রয়োজন বোধ করছি ; গতশুক্রবার বইমেলায় ব্লগারদের বসন্ত আড্ডায় আমারও উপস্থিত হবার সৌভাগ্য হয়েছিল। সেখানে কারো কারো ক্ষেত্রে ব্লগের ভারচুয়াল পারসোনালিটির সঙ্গে ব্যক্তিজীবেনর পারসোনালিটি মেলাতে গিয়ে ২কাপ চায়ের বদলে আমাকে ৩কাপ চা খেতে হয়েছিল । যাহোক, এটা হতেই পারে। প্রকৃত সত্য হল এই যে, একজন মানুষ কখনো কখনো একজন নিকই মাত্র, এর সঙ্গে ব্যক্তিজীবনকে না মেলানোই শ্রেয়তর।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


